প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখতে, সালাম জানাতে রোজ সড়কে দাঁড়ান তিনি
· Prothom Alo

ব্যাংকের এটিএম বুথে নিরাপত্তা প্রহরীর কাজটা নেই প্রায় এক মাস হলো। তারপরও নিরাপত্তা প্রহরীর পোশাক পরে আগের সেই কাজের জায়গায় চলে আসেন প্রতিদিন সকালে। হাতে এক তোড়া ধানের শীষ নিয়ে দাঁড়ান পথে। উদ্দেশ্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে একনজর দেখতে পাওয়া, তাঁকে সালাম জানানো।
Visit umafrika.club for more information.
ষাটোর্ধ্ব আবদুস সালাম প্রতিদিন সকাল নয়টায় প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতের সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। বিএনপি সরকার গঠনের পর থেকে প্রায় ছয় মাস ধরে এটাই তাঁর রোজকার রুটিন। তাঁর ভাষায়, ‘প্রধানমন্ত্রীরে সালাম দেই। উনি সালাম লন। কইলজাডায় শান্তি লাগে।’
আজ রোববার দুপুরে আবদুস সালামের সঙ্গে কথা হয় রাজধানীর রমনা এলাকায় (পুরোনো রমনা থানার পাশে)। ঠিক যেখানে এক মাস আগেও ছিল তাঁর কর্মক্ষেত্র। পরনে নিরাপত্তা প্রহরীর পোশাক। হাতে একটি ব্যাগের মধ্যে ধানের শীষের ছড়া।
জানালেন, একটি বেসরকারি ব্যাংকের এটিএম বুথে নিরাপত্তা প্রহরীর কাজ করতেন তিনি। পোশাকটি সেই প্রতিষ্ঠানেরই দেওয়া ছিল। তবে মাসখানেক আগেই বুথটি বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে তাঁর চাকরিটা আর নেই।
রাজধানীর মানিকনগর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন আবদুস সালাম। তাঁর গ্রামের বাড়ি পাবনা জেলার আমিনপুরে। পরিবারে স্ত্রী ছাড়াও রয়েছেন দুই ছেলেমেয়ে। মেয়ের বিয়ে হলেও ছেলে এখনো বেকার। তাই পরিবারের হাল ধরতে এই বয়সেও তাঁকে কাজের খোঁজে বের হতে হয়।
কথায় কথায় জানালেন, একসময় দূরপাল্লার একটি পরিবহনের চালকের কাজ করতেন। ২৫ বছর সেই কাজ করেছেন। তবে কয়েক বছর আগে মস্তিষ্কের রক্তক্ষরণজনিত রোগে (স্ট্রোক) আক্রান্ত হয়ে একরকম বিছানায় পড়ে যান। তিন বছর বাড়িতেই ছিলেন বেকার অবস্থায়। পরে কিছুটা সুস্থ হয়ে নেন একটি বেসরকারি ব্যাংকের নিরাপত্তা প্রহরীর কাজ। তবে মাসখানেক আগে সেই কাজও হারিয়েছেন।
বেকার আবদুস সালাম আর্থিক টানাপোড়েনের মধ্যে আছেন। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীকে সালাম জানানোর রোজকার রুটিনে পরিবর্তন আনেননি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘কাম নাই। এ্যার পরেও প্রতিদিন পোশাক পরি। ব্যাগে ধানের শীষ লইয়া সকালে চইল্লা আসি। শুক্র-শনি বাদ দিয়া প্রতিদিনই আইসা পড়ি। রেগুলার এহানে দাঁড়াই। রেগুলার আমারে প্রধানমন্ত্রী একনজর তাকায়া দেখে।’
ধানের শীষের তোড়া হাতে আবদুস সালাম। আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর রমনা এলাকায়প্রথম যেদিন প্রধানমন্ত্রী তাঁর উদ্দেশে হাত ইশারা করেছিলেন, সেই গল্পও শোনান আবদুস সালাম। তাঁর ভাষায়, ‘শপথ লওয়ার পর, প্রথম যেদিন প্রধানমন্ত্রী গুলশান থেইকা সচিবালয়ে যান এই পথ দিয়া, আমি দৌড় মাইরা ধানের শীষ নিয়া দাঁড়াইলাম। আমাকে হাত নাইড়া, আমার সালাম গ্রহণ করলো। খুব শান্তি পাইছিলাম।’
রমনা এলাকার যে জায়গায় আবদুস সালাম নিয়মিত দাঁড়ান, সেখানে একটি চায়ের টংদোকান রয়েছে। দোকানির সঙ্গে কথা হলে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘লোকডা প্রতিদিন আহে, খাড়ায়া থাহে। দৌড়ায়া প্রধানমন্ত্রীরে সালাম দেয়। আগে তো এহানেই কাম করত, অহন আহে, হেরপর চইলা যায়।’
প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের ভাষ্যমতে, শুধু আবদুস সালামই নন, প্রতিদিন সড়কের পাশে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি যাওয়ার অপেক্ষায় থাকেন আরও অনেক মানুষ। গাড়ি কাছাকাছি এলে হাত নেড়ে কিংবা চোখের ইশারায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন তাঁরা। গাড়ি থামে না, কাছে এসে কুশল বিনিময় হয় না, কথাও হয় না। তবু দিনের পর দিন এই ক্ষণিক দেখাতেই গড়ে উঠেছে অদ্ভুত এক রুটিন।
নিরাপত্তা প্রহরী আবদুস সালাম প্রথম আলোকে জানান, যখন তাঁর চাকরি ছিল, তখন খুব সকালে এসে বুথ খুলে পরিষ্কার করে অপেক্ষা করতেন প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর আসার। এরপর তাঁকে সালাম জানিয়ে সকালের নাশতা করতেন। তাঁর ভাষায়, ‘সব কইরা অপেক্ষায় থাকতাম প্রধানমন্ত্রী কখন আসবে। এরপর উনি যখন সামনে দিয়া পার হইয়া যাইতেন, তখন নাশতা খাইতাম।’
আবদুস সালাম বললেন, ‘আইজকাও প্রধানমন্ত্রীরে সালাম দিলাম। রুমন স্যার ছিল। ওনারে সালাম দিলাম। ওনারা আমারে তাকায়া দ্যাখলো। আমার সালাম নিল।… তবে যেদিন উনি এই রাস্তা দিয়া যান না, ওই দিন বড় আফসোস হয়।’