খুলনায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে ৩০% শিক্ষার্থী

· Prothom Alo

খুলনা শহরের শিববাড়ী এলাকার মেহমানে আলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক যুগ আগে শিক্ষার্থী ছিল ৩২০ জন। এর পর থেকে প্রতিবছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। এ বছর বিদ্যালয়টিতে পড়ছে ১১০ জন।

শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পাশাপাশি এই বিদ্যালয়ের একাডেমিক সাফল্যও উল্লেখ করার মতো নয়। গত বছর চারজন শিক্ষার্থী বৃত্তি পরীক্ষার জন্য নিবন্ধন করেছিল। পরীক্ষায় অংশ নেয় দুজন, কেউ বৃত্তি পায়নি।

Visit orlando-books.blog for more information.

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে ২০১৩ সালেও শিক্ষার্থী ছিল ৩২০ জন। ২০২৪ সালে তা কমে হয় ১১৮ জনে। ২০২৫ সালে সংখ্যাটি ছিল ১১০।

গত বৃহস্পতিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, দোতলা ভবনের পাশাপাশি টিনের একটি ঘরে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হয়। ভবনের নিচতলায় দুটি শ্রেণিকক্ষ ও অফিসকক্ষ রয়েছে। আর দোতলায় দুটি শ্রেণিকক্ষ। টিনের ঘরে আরও দুটি শ্রেণির পাঠদান চলে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন নয়জন।

নিচতলার পঞ্চম শ্রেণির কক্ষে গিয়ে দেখা যায়, জানালায় গ্রিল নেই, শুধু কপাট আছে। কক্ষটি স্যাঁতসেঁতে ও অন্ধকারাচ্ছন্ন। সেখানে ক্লাসে উপস্থিত ছিল মাত্র তিন শিক্ষার্থী। গত বৃহস্পতিবার সব মিলিয়ে বিদ্যালয়ে হাজির ছিল ২৮ শিক্ষার্থী।

বৃষ্টির কারণে সেদিন বিদ্যালয়ের ছোট মাঠ কাদা-পানিতে ডুবে ছিল। শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ভারী বৃষ্টি হলে বিদ্যালয়ের দুটি শৌচাগারে পানি ওঠে।

এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার পেছনে করোনার পরবর্তী সময়ে অনেক অভিভাবকের খুলনা শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরে যাওয়াকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষকেরা। প্রধান শিক্ষক (চলতি দায়িত্ব) আছমা খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, শিক্ষার্থী পাওয়া দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে।

খুলনা বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রাথমিক স্তরে প্রতি ১০০ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩০ জন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বাইরে পড়ছে। তাদের বড় অংশ পড়ছে কিন্ডারগার্টেনে। বাড়তি খরচের পরও অভিভাবকদের বড় অংশ সন্তানকে কিন্ডারগার্টেনে পাঠাচ্ছে।

কেন খুলনার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে, সে বিষয়ে শহরের ছয়টি কিন্ডারগার্টেনে গিয়ে ২০ জন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তাঁরা পড়াশোনার মান, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, তদারকি, সহশিক্ষা কার্যক্রম ও শিক্ষকদের সঙ্গে সহজে যোগাযোগের কথা বলেছেন। বাড়তি খরচের চাপ থাকলেও বাধ্য হয়েই সন্তানকে কিন্ডারগার্টেনে পড়াচ্ছেন।

ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থা পড়ে আছে। সম্প্রতি সোনাপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে

বিষয়টি নিয়ে পাঁচটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১০ জন শিক্ষকেরও মতামত নেওয়া হয়েছে। তাঁরা বলছেন, সরকারি স্কুল সম্পর্কে অনেক অভিভাবকের নেতিবাচক ধারণা রয়েছে। তবে এটা সত্য, শিক্ষকসংকট রয়েছে। এর পাশাপাশি অবকাঠামোর দুরবস্থার পাশাপাশি স্কুলে সহায়ক কর্মীর ঘাটতি আছে।

খুলনা নগরের নিরালা এলাকার অভিভাবক সোনিয়া আক্তারের মতে, কিন্ডারগার্টেনে শেখানোর পরিবেশ আনন্দদায়ক। শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখাও সহজ। সন্তান চাইলেই স্কুল গেট দিয়ে বের হতে পারে না।

খুলনা বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের ২০২৬ সালের প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিভাগের ১০ জেলায় প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থীসংখ্যা ১৭ লাখ ৯৭১। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে ১১ লাখ ৮২ হাজার ৭২৯ জন। কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষার্থী আছে ৩ লাখ ৪৪৯ জন। শিশুদের আরেকটি বড় অংশ মাদ্রাসায় পড়ছে। বিভাগের ১০ জেলায় স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী রয়েছে ৪১ হাজার ৪২৩ জন। উচ্চ মাদ্রাসার (দাখিল পর্যন্ত) সঙ্গে সংযুক্ত ইবতেদায়ি শাখায় পড়ছে আরও ৬১ হাজার ৩৩২ জন। এই দুই ধরনের প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মাদ্রাসায় প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থী ১ লাখ ২ হাজার ৭৫৫ জন।

এর আগে ২০২৫ সালে বিভাগের ১০ জেলায় প্রাথমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থী ছিল ১৭ লাখ ৮৪ হাজার ২৫৫ জন। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ত ১২ লাখ ৭৭ হাজার ৯২৩ জন, অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনের মধ্যে প্রায় ৭২ জন সরকারি প্রাথমিকে পড়ত।

রুকাইয়া বেগম, অভিভাবক, জোহরা খাতুন শিশু বিদ্যানিকেতন, খুলনা নগরশুধু পড়াশোনার জন্য সন্তানকে কিন্ডারগার্টেনে পাঠাইনি। আচরণ, নিয়ম-শৃঙ্খলা শেখার পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছি।

২০২৫ ও ২০২৬ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এক বছরে প্রাথমিক স্তরে শিক্ষার্থী কমেছে ৮৩ হাজার ২৮৪ জন। তবে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই এক বছরে শিক্ষার্থী কমেছে ৯৫ হাজার ১৯৪ জন। বিপরীতে কিন্ডারগার্টেন ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী বেড়েছে মোট ৩৬ হাজার ৫০৯ জন। ২০২৫ সালে কিন্ডারগার্টেনে পড়ত ২ লাখ ৭৫ হাজার ৬৯২ জন। মাদ্রাসায় শিক্ষার্থী ছিল ৯১ হাজার ৩ জন।

একদিকে জরাজীর্ণ ভবন, অন্যদিকে বাড়তি তদারকি
খুলনা শহরের সোনাপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন জরাজীর্ণ হয়ে পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। যে কারণে বিদ্যালয়–সংলগ্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি কার্যক্রম চলে। সেখানে সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ১০টা পর্যন্ত ক্লাস করাতে হয় শিক্ষার্থীদের। এই বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১০৭ জন, শিক্ষক ১০ জন।

এই বিদ্যালয়ের ১০০ মিটার দূরে জোহরা খাতুন শিশু বিদ্যানিকেতন নামের একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থী ১ হাজার ৩০০ জন। ৬৯ জন শিক্ষকের পাশাপাশি সহায়ক কর্মচারী আছেন ১৮ জন। পাঁচতলা ভবনে রয়েছে ১৮টি শ্রেণিকক্ষ। প্রতিষ্ঠানটি সিসিটিভির আওতায় রয়েছে। সেখানে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়।

এই প্রতিষ্ঠানের এক শিক্ষার্থীর মা রুকাইয়া বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুধু পড়াশোনার জন্য সন্তানকে কিন্ডারগার্টেনে পাঠাইনি; আচরণ, নিয়ম-শৃঙ্খলা শেখার পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নিয়েছি।’

খুলনা শহরের নজরুল নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ১০২ জন। শিক্ষক রয়েছেন ১১ জন। পুরোনো বিদ্যালয় ভবনের শ্রেণিকক্ষের দেয়াল স্যাঁতসেঁতে, কক্ষগুলোও ছোট আকারের। শৌচাগারের পরিবেশও নোংরা।

এই বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, যাঁদের সামর্থ্য আছে, তাঁরা সন্তানদের সরকারি প্রাথমিকে দিতে চান না—এই প্রবণতা আগের চেয়ে বেড়েছে। শিক্ষার্থীদের সকাল নয়টা থেকে বিকেল সোয়া চারটা পর্যন্ত লম্বা সময় স্কুলে থাকাও একটি বিষয়। তা ছাড়া অনেক অভিভাবক এখন সন্তানদের স্কুলে না দিয়ে মাদ্রাসায় পড়াচ্ছেন।

নগরের শেখপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ৮৬ জন। শিক্ষক রয়েছেন ৮ জন। বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সঞ্জয় কুমার গাইন বলেন, তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত মোটামুটি শিক্ষার্থী থাকে। এরপর অনেকে উচ্চবিদ্যালয়-সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলে যায়। কারণ, সেখানে একবার ভর্তি হলে এসএসসি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ থাকায় অভিভাবকেরা সুবিধাজনক মনে করেন। এ ছাড়া সরকারি প্রাথমিক স্কুলে দপ্তরি বা আয়া নেই। শিক্ষার্থীদের দেখভালসহ সব কাজও শিক্ষকদের করতে হয়।

শিক্ষক ও অভিভাবকেরা বলছেন, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে আনা ও ধরে রাখার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহি করতে হয় কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষকদের। চাকরি টিকিয়ে রাখতে তাঁরা দায়িত্ব পালনে বেশি আন্তরিক থাকেন। অন্যদিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্তৃপক্ষের নজরদারি কম থাকায় কোনো কোনো শিক্ষকের মধ্যে দায়িত্ব পালনে গাফিলতি তৈরি হতে পারে।

মো. শফিকুল ইসলাম, উপপরিচালক, বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়, খুলনা কিন্ডারগার্টেনগুলোর চাকচিক্যও অনেক সময় অভিভাবকদের আকৃষ্ট করে। সুন্দর পোশাক, পরিচ্ছন্নতা দেখে অনেকে মনে করেন, সেখানে পড়াশোনার মান ভালো।

খুলনার বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, কিন্ডারগার্টেনগুলোর চাকচিক্যও অনেক সময় অভিভাবকদের আকৃষ্ট করে। সেখানে সুন্দর পোশাক, বইপত্র ও পরিচ্ছন্নতা দেখে অনেকে মনে করেন পড়াশোনার ভালো মানও ভালো। আবার দরিদ্র পরিবারের সন্তান বেশি পড়ায় কোনো কোনো অভিভাবক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে কম গুরুত্ব দেন। তবে এখনো বেশির ভাগ অভিভাবক শিক্ষকদের মান ও শিক্ষার্থীদের সফলতার হার বিবেচনা করে সন্তানকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই পড়ান।

কিন্ডারগার্টেনে বেশি শিক্ষার্থী কুষ্টিয়ায়, কম নড়াইলে
প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ১০ জেলায় এ বছর কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষার্থী রয়েছে ৩ লাখ ৪৪৯ জন। সবচেয়ে বেশি কুষ্টিয়ায়, ৫৪ হাজার ১০৩ জন। এরপর ঝিনাইদহে ৫৩ হাজার ৮০৮, যশোরে ৪৯ হাজার ৮২০, খুলনায় ৪১ হাজার ৭১৮, সাতক্ষীরায় ২৫ হাজার ৯৬৯, মেহেরপুরে ১৯ হাজার ৯৭৪, চুয়াডাঙ্গায় ১৮ হাজার ৩৫০, বাগেরহাটে ১৭ হাজার ৬৭৫, মাগুরায় ৯ হাজার ৮৮৫ এবং নড়াইলে ৯ হাজার ১৪৭ জন।

নড়াইল পৌর শহরের ভাটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একমাত্র ভবনটি ২০২২ সালে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। কিন্তু পরিত্যক্ত ভবন কিছু সংস্কার করেই এখন চলছে পাঠদান। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমছে জানিয়ে বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সঞ্জিত কুমার কুন্ডু প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের পুরোনো ভবনের তিনটি কক্ষে পাঠদান চলে। সিঁড়িঘরের মতো একটু জায়গায় অফিস কক্ষ। শিক্ষক আছেন মাত্র চারজন। তার মধ্যে একজন রয়েছেন প্রশিক্ষণে। ফলে ক্লাস নিতে তিন শিক্ষকের হিমশিম খেতে হয়।’

সঞ্জিত কুমার কুন্ডু বলেন, করোনার আগে বিদ্যালয়ে ১৩০ থেকে ১৩৫ জন শিক্ষার্থী ছিল। এখন আছে মাত্র ৭২ জন। শিক্ষার্থীরা চলে যাচ্ছে পাশের মাদ্রাসা ও শহরের সরকারি ও বেসরকারি স্কুলে।

৫৪ শতাংশ বিদ্যালয়েই নেই প্রধান শিক্ষক
বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ৮ হাজার ১৬৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪ হাজার ৪০৫টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ বিভাগের প্রায় ৫৪ শতাংশ বিদ্যালয় চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। প্রধান শিক্ষক না থাকার হার সবচেয়ে বেশি নড়াইলে, ৬৪ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এরপর চুয়াডাঙ্গায় ৬৪ দশমিক ৪৯ শতাংশ।

দীর্ঘদিন ধরে পদগুলো শূন্য থাকায় শিক্ষার্থীদের পাঠদান তদারকির পাশাপাশি দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। অনেক বিদ্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে একই সঙ্গে পাঠদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।

এর প্রভাব বোঝা যায় খুলনার দাকোপ উপজেলার সুতারখালী পূর্বপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ২০১৮ সাল থেকে বিদ্যালয়টিতে প্রধান শিক্ষক নেই। পাঁচজন সহকারী শিক্ষকের মধ্যে দুজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে। একজন চিকিৎসাজনিত ছুটিতে আছেন। বর্তমানে দুজন শিক্ষকের একজনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।

বিদ্যালয়টির ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিকাশ গাইন প্রথম আলোকে বলেন, পাঠদানের পাশাপাশি দাপ্তরিক নানা কাজেও তাঁকে সময় দিতে হয়। তিনি দাপ্তরিক কাজে বিদ্যালয়ের বাইরে গেলে পাঠদান চালিয়ে নেওয়ার মতো শিক্ষকও থাকেন না। তখন একজন শিক্ষককেই পুরো বিদ্যালয় সামলাতে হয়।

বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ৮ হাজার ১৬৫টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪ হাজার ৪০৫টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ বিভাগের প্রায় ৫৪ শতাংশ বিদ্যালয় চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে।

সহকারী শিক্ষক পদেও সংকট
প্রধান শিক্ষকের পাশাপাশি সহকারী শিক্ষক পদেও সংকট রয়েছে। বিভাগের ১০ জেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ ৪৪ হাজার ৫২৩টি। এর মধ্যে কর্মরত আছেন ৪১ হাজার ৯০ জন। শূন্য রয়েছে ৩ হাজার ৪৩৩টি পদ।

জেলা অনুযায়ী সহকারী শিক্ষকের শূন্য পদের সংখ্যা হলো খুলনায় ৫১০, বাগেরহাটে ৪৬৩, সাতক্ষীরায় ৪৬১, যশোরে ৬১৫, ঝিনাইদহে ৩১৪, মাগুরায় ১৭৭, কুষ্টিয়ায় ৩০৯, চুয়াডাঙ্গায় ১৭৬, নড়াইলে ২৫৪ এবং মেহেরপুরে ১৫৪টি। শিক্ষক-সংকটসহ নানা কারণে শিখনঘাটতি নিয়েই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বড় হচ্ছে বলে মনে করেন অনেক অভিভাবক।

গত ৭ মে ইউনিসেফ ‘ফ্রম এভিডেন্স টু অ্যাকশন: স্ট্রেনদেনিং লার্নিং, ইনক্লুশন অ্যান্ড ইনোভেশন ইন ক্লাসরুম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী পঞ্চম শ্রেণির মৌলিক দক্ষতাই অর্জন করতে পারেনি। জরিপে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ৯১ শতাংশ পঞ্চম শ্রেণির সক্ষমতার ওপর নেওয়া গণিত পরীক্ষায় অর্ধেক প্রশ্নেরও সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। বাংলায় এই সংখ্যা ৬৫ শতাংশ। এর বাইরে ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের শ্রেণি অনুযায়ী পড়তে পারে না। এ ছাড়া ৯০ শতাংশ শিক্ষক পাঠ্যসূচি (সিলেবাস) শেষ করার চাপের কারণে তুলনামূলক ‘পিছিয়ে থাকা’ শিক্ষার্থীদের যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না।
‘টাকার হিসাব করলে তো চলবে না’

খুলনা জেলায় ৪১ হাজার ৭১৮ শিক্ষার্থী কিন্ডারগার্টেনে পড়ছে। নগরের বাইতিপাড়া এলাকার অভিভাবক ঝর্ণা খাতুন তাঁর ছেলেকে কিন্ডারগার্টেনে পড়ান। ভর্তি করার আগে কয়েকটি স্কুল ঘুরে দেখেছেন তিনি। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়া শিশুদের সঙ্গেও কথা বলেছেন।

ঝর্ণা খাতুন বলেন, সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষকেরা তেমন তদারকি করেন না। তাঁর পরিচিত অনেক সরকারি প্রাথমিকের শিক্ষক আছেন, যাঁদের সন্তানও কিন্ডারগার্টেনে পড়ে। সন্তানের যাতায়াতসহ স্কুলে মাসে প্রায় ৩ হাজার টাকা খরচ হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সন্তানের ভালো ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে টাকার হিসাব করলে তো চলবে না।’
অভিভাবকেরা বলছেন, সরকারি প্রাথমিকে গান, আবৃত্তি, অঙ্কন, হাতের লেখা—এসব ভালোভাবে শেখার ব্যবস্থা নেই। কিন্ডারগার্টেনে আয়া ও গার্ড থাকায় সন্তানের কোনো অসুবিধা হলে কর্তৃপক্ষ দেখভাল করে। অথচ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এ ধরনের সমস্যা হলে অভিভাবককে ডেকে পাঠানো হয়।

খুলনার সরকারি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির প্রথম আলোকে বলেন, রাষ্ট্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনেক খরচ করলেও বেশ কিছু সংকট রয়েছে। তবে কিন্ডারগার্টেনের তুলনায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা তুলনামূলকভাবে উচ্চশিক্ষিত ও প্রশিক্ষিত। শিশুর সুস্থ বিকাশ এবং মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

Read full story at source