অপমানের জবাব দিতে নির্মাণ করা হয় যে প্রাসাদ

· Prothom Alo

‎পুরান ঢাকার সরু অলিগলি, যানজট, কোলাহল আর রাস্তার পাশের টংদোকানের ব্যস্ততা। এই চেনা নগরচিত্র পেরিয়ে টিকাটুলীর এক প্রান্তে হঠাৎ চোখে পড়ে শ্বেতশুভ্র এক দৃষ্টিনন্দন ভবন। মূল ফটকে লেখা—‘রোজ গার্ডেন’। নামের সঙ্গে যেন মিশে আছে পুরান ঢাকার এক টুকরা অভিজাত ইতিহাস। নাম গার্ডেন বা বাগান হলেও এটি মূলত একটি ঐতিহাসিক ও দৃষ্টিনন্দন জমিদারবাড়ি। এটি ১৯ শতকের শেষ ভাগে নির্মিত হয়। স্থানীয়ভাবে হুমায়ূন সাহেবের বাড়ি নামেও পরিচিত।

Visit sweetbonanza-app.com for more information.

‎ইতিহাস
‎রোজ গার্ডেনের গল্প শুরু উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে। নির্মাণ করেন ঋষিকেশ দাস। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ আমলের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। তবে সাধারণ পরিবারে বড় হওয়ার কারণে ঢাকার সম্ভ্রান্ত শ্রেণিতে তাঁর তেমন কদর ছিল না। একবার জমিদার নরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরীর বাগানবাড়িতে (বলধা গার্ডেনে) জলসায় গিয়ে অপমানিত হয়ে ফিরে আসেন ঋষিকেশ দাস। অপমানের প্রতিশোধ নিতে তিনি প্রতিজ্ঞা করেন, বলধা গার্ডেনের চেয়ে সুন্দর বাগানবাড়ি তৈরি করে দেখাবেন। সেই অপমানের জবাব দিতেই গড়ে তোলেন নিজের স্বপ্নের বাগানবাড়ি—রোজ গার্ডেন।

প্রায় ২২ বিঘা জমির ওপর বাগানবাড়িটি নির্মিত হয়। দোতলা বাড়ির চারপাশ বিভিন্ন দেশ থেকে আনা দুর্লভ প্রজাতির গোলাপের বাগানে সাজিয়ে তোলেন ঋষিকেশ দাস। গোলাপ ফুল সংগ্রহ করতে চীন, ভারত, জাপান ও ইউরোপের নানা দেশে লোক পাঠান। সেখান থেকে মাটিসহ গোলাপের চারা এনে রোপণ করেন বাগানবাড়িতে। বাগান তৈরির প্রায় এক বছর পর শুরু হয় বাড়ি তৈরির কাজ। গোলাপের সৌন্দর্যে সাজানো সেই বাগানবাড়ির নাম হয়ে যায় ‘রোজ গার্ডেন’।

‎‎নাম বদলালেও হারায়নি পরিচয়
সময়ের সঙ্গে বদলেছে বাড়িটির মালিকানা ও নাম। ‎ঋষিকেশ দাস ১৯৩৬ সালের দিকে ব্যবসায়ী খান বাহাদুর কাজী আবদুর রশীদের কাছে বাড়িটি বিক্রি করেন। তখন এটির নাম রাখা হয় ‘রশীদ মঞ্জিল’। কিন্তু ‘রোজ গার্ডেন’ নামটি মানুষের মুখে মুখে থেকেই যায়। পরবর্তী সময়ে বাড়িটির মালিকানা পান তাঁর বড় ছেলে কাজী হুমায়ূন বশীর।

‎তবে রোজ গার্ডেনের ইতিহাস শুধু জমিদারি কিংবা অভিজাত জীবনযাপনের গল্পে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়েরও সাক্ষী এই ভবন। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন এখানেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (বর্তমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ) গঠিত হয়। ১৯৭০ সালে বেঙ্গল স্টুডিও ও মোশন পিকচার্স লিমিটেড রোজ গার্ডেনের ইজারা নেয়। ১৯৮৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে সংরক্ষিত ভবন হিসেবে ঘোষণা করে। কিন্তু আদালতে মামলা করে ১৯৯৩ সালে মালিকানা স্বত্ব ফিরে পান কাজী আবদুর রশীদের মেজ ছেলে কাজী আবদুর রকীব।

এরপর ভবনটির মালিকানা যায় তাঁর স্ত্রী লায়লা রকীবের কাছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার ভবনটি ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ ২ হাজার ৯০০ টাকায় কিনে নেয়।

‎স্থাপত্য
‎সাত হাজার বর্গফুট আয়তনের দোতলা প্রাসাদে দেখা যায় করিন্থীয় ও গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর ব্যবহার। বাড়ির প্রতিটি কলামে বা স্তম্ভে রয়েছে করিন্থীয় মোটিভ। ‎বাড়িটিতে শ্বেতপাথরের মূর্তি, কৃত্রিম ফোয়ারা, শানবাঁধানো পুকুর, বিশাল বাগান, গোলাপগাছের সারি রয়েছে। সাদা দেয়ালের পাশে সবুজের আভা, তার সঙ্গে হরেক রঙের গোলাপের শোভা এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি করেছে। মার্বেল পাথরের মেঝে, ছাদে ইউরোপীয় শৈলীর কারুকাজ আর খিলান আকৃতির দরজা, দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতি, প্রশস্ত সিঁড়ি, জানালায় খোদাই করা কাজ আর সুবিশাল নাচঘর ভবনটির সৌন্দর্য ও আভিজাত্যকে করেছে আরও অনন্য। ভবনের প্রতিটি দরজা–জানালায় রয়েছে জ্যামিতিক নকশা; যার বেশির ভাগই কাঠ, রঙিন বেলজিয়ান কাচ ও লোহার কারুকার্য দিয়ে সাজানো।

‎প্রতিটি কক্ষে সাজানো আসবাবগুলো জানান দিচ্ছে পুরোনো দিনের আভিজাত্যের। ভবনের ডান পাশেই গোলাপের বাগান রয়েছে। বর্তমানে ফুল না থাকলেও মৌসুমে এর সৌরভে ছড়িয়ে পড়ে চারদিক।
‎প্রতিদিন দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীর পদচারণে মুখরিত হয় রোজ গার্ডেন। মূল ভবনের সামনেই রয়েছে একটি পুকুর। পুকুরের দুই পাশে ঠিক মাঝামাঝি জায়গায় রয়েছে শানবাঁধানো পাকা ঘাট।

ছয় শতাব্দীর ইতিহাসের সাক্ষী বিনত বিবির মসজিদ

কীভাবে যাবেন
রোজ গার্ডেনে নানা উপায়ে যাওয়া যায়। গুলিস্তান, পল্টন থেকে রিকশাযোগে ৫০-১০০ টাকায় যেতে পারবেন সেখানে। অথবা মেট্রোরেলে মতিঝিল থেকে রিকশা নিয়েও যাওয়া যাবে। তবে রিকশাওয়ালাদের চেনানোর জন্য হুমায়ূন সাহেবের বাড়ির কথা বলতে হবে। ভবনটিতে প্রবেশ করতে পারবেন বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত। তবে এটি রোববার পুরো দিবস এবং সোমবার অর্ধদিবস বন্ধ থাকে। ভবনটিতে প্রবেশে ৩০ টাকার টিকিট কিনতে হয়।

‎রোজ গার্ডেন কেবল একটি পুরোনো ভবন নয়; এটি পুরান ঢাকার ইতিহাস, স্থাপত্য, সংস্কৃতি ও রাজনীতির এক অনন্য মিলনস্থল। পুরান ঢাকার বদলে যাওয়া শহুরে দৃশ্যপটের মধ্যেও রোজ গার্ডেন মনে করিয়ে দেয়—একটি শহরের ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় লেখা থাকে না; কখনো কখনো তা ইট-পাথর, স্থাপত্য আর একটি বাগানের গোলাপের সুবাসেও বেঁচে থাকে।

‎শিক্ষার্থী, ‎জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়‎‎

Read full story at source