আমরা আসলে কী চাই? পি. পারমিতার ‘অ্যাপেটাইট’ যে প্রশ্ন জাগায়

· Prothom Alo

কিছু বই খাবার নিয়ে লেখা হয়, কিছু বই স্বপ্ন নিয়ে, আর কিছু বই মানুষের একাকিত্ব নিয়ে। ‘অ্যাপেটাইট’ এই তিনটিকে একই টেবিলে বসিয়েছে। তার সঙ্গে যোগ করেছে পেশাদার কুস্তি, ইন্টারনেট ফ্যানডম এবং এমন এক সম্পর্ক, যার শুরুটা স্বপ্নের মতো হলেও শেষ পর্যন্ত সেটিই হয়ে ওঠে স্বপ্নপূরণের পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা।

পি.পারমিতার প্রথম উপন্যাস ‘অ্যাপেটাইট’-এর কেন্দ্রীয় চরিত্র জেরিনা, নিউ হ্যাভেনের একটি রেস্তোরাঁয় কাজ করা তরুণ বাংলাদেশি-আমেরিকান নারী। রান্না তার কাছে শুধু পেশা নয়; নিজের পরিচয়, শিকড় এবং ভবিষ্যৎকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করার একটি পথ। তার স্বপ্ন, একদিন যুক্তরাষ্ট্রে নিজের একটি বাংলাদেশি ফিউশন রেস্টুরেন্ট তৈরি করা। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কর্মক্ষেত্রের অবমূল্যায়ন, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং নিজের ভেতরের দ্বিধা—সবকিছুই তাকে টেনে ধরে।
ঠিক তখনই তার জীবনে প্রবেশ করে সিয়েরা মিস্ট, পেশাদার কুস্তির জগতের এক তারকা।

Visit saltysenoritaaz.com for more information.

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এটি রান্না আর কুস্তির এক অদ্ভুত মিশ্রণ। কিন্তু বইটি এগোতে থাকলে বোঝা যায়, লেখক পারমিতা আসলে দুটি আলাদা জগতকে পাশাপাশি রেখে একই প্রশ্ন করছেন—মানুষ আসলে কিসের জন্য ক্ষুধার্ত? খাবারের জন্য? স্বীকৃতির জন্য? ভালোবাসার জন্য? নাকি এমন একজন মানুষের জন্য, যে তাকে অন্য সবার চেয়ে আলাদা করে দেখবে?

উপন্যাসটির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিকগুলোর একটি হলো খাবারকে স্মৃতি ও পরিচয়ের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা। জেরিনা তার শৈশবের বাংলাদেশি খাবারকে শুধু অতীতের কোনো স্মৃতি হিসেবে দেখে না, সেগুলোকে নতুনভাবে তৈরি করতে চায়। ঐতিহ্যকে হুবহু সংরক্ষণ নয়; বরং নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশিয়ে নতুন কিছু তৈরি করাই তার আকাঙ্ক্ষা। এখানেই ‘ফিউশন’ শব্দটি শুধু রান্নার ধরন নয়, জেরিনার নিজের অস্তিত্বেরও রূপক হয়ে ওঠে।

সে দুই সংস্কৃতির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বাংলাদেশের খাবার, পরিবার ও উত্তরাধিকার; অন্যদিকে আমেরিকান কর্মজীবন, জনপ্রিয় সংস্কৃতি ও নিজের মতো করে বাঁচার আকাঙ্ক্ষা। তার স্বপ্নের রেস্তোরাঁটি তাই শুধু ব্যবসা নয়, সেটি নিজের জন্য একটি জায়গা তৈরি করার স্বপ্ন।
কিন্তু জেরিনার জীবনে বড় ক্ষুধা খাবারের নয়, সেটি স্বীকৃতির ক্ষুধা।

একজন সাধারণ ভক্তের তৈরি একটি জিআইএফ যখন সিয়েরা মিস্টের নজরে আসে এবং তারকা নিজেই জেরিনার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন, তখন একটি অসম্ভব কল্পনা বাস্তব হয়ে ওঠে। যে মানুষটিকে জেরিনা দূর থেকে অনুসরণ করত, সে হঠাৎ তাকে ব্যক্তিগতভাবে চিনতে শুরু করে।
এখানেই উপন্যাসটি আধুনিক সময়ের একটি অত্যন্ত পরিচিত অথচ জটিল অভিজ্ঞতার দিকে তাকায়—প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ।

বাংলাদেশি লেখক পি পারমিতার প্রথম উপন্যাস ‘অ্যাপাটাইট’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে আমরা এমন মানুষদের জীবনের সঙ্গে প্রতিদিন যুক্ত থাকি, যাঁরা আমাদের অস্তিত্ব সম্পর্কে কিছুই জানেন না। তাঁদের পোস্ট দেখি, তাঁদের সাফল্যে আনন্দিত হই, তাঁদের ব্যর্থতায় হতাশ হই, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আলোচনা করি। কখনো কখনো মনে হয়, আমরা যেন তাঁদের খুব কাছের মানুষ।
কিন্তু সম্পর্কের এই অনুভূতি একতরফা হলে তার ভেতরে একটি বিপজ্জনক অসমতা থেকেই যায়। ‘অ্যাপেটাইট’ সেই অসমতাকেই ধীরে ধীরে উন্মোচন করে।

জেরিনা প্রথমে মনে করে, সে সিয়েরার বন্ধু হয়ে উঠেছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে প্রশ্ন জাগে—সে কি সত্যিই বন্ধু, নাকি এমন একজন মানুষ, যার শ্রম, মনোযোগ ও আবেগ সিয়েরা বিনা মূল্যে ব্যবহার করছে?
জেরিনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা সম্ভবত সিয়েরাকে সে যেভাবে দেখে, সে একজন মানুষকে দেখছে না; সে নিজের কল্পনার তৈরি একটি চরিত্রকে দেখছে।

কুস্তি নিজেই তো পারফরম্যান্সের শিল্প। রিংয়ের ভেতরের মানুষটি একটি চরিত্র ধারণ করেন, দর্শক সেই চরিত্রকে ভালোবাসেন, অনুসরণ করেন। কিন্তু রিংয়ের বাইরে সেই মানুষটিকে আলাদা মনে হয়।

বাস্তব জীবনে জেরিনার খুব বেশি বন্ধু নেই, কর্মক্ষেত্রে সে যথেষ্ট স্বীকৃতি পায় না, পরিবারের সঙ্গেও তার সম্পর্ক জটিল। ফলে সিয়েরার সামান্য মনোযোগও তার কাছে অসামান্য মূল্যবান হয়ে ওঠে।

এই জায়গায় বইটির একটি গভীর সত্য সামনে আসে—আমরা কখনো কখনো মানুষকে ভালোবাসি না, আমরা ভালোবাসি সেই অনুভূতিটাকে, যা সেই মানুষ আমাদের মধ্যে তৈরি করে।
জেরিনার গল্পের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক হলো—তার স্বপ্নটি কখনোই অসম্ভব ছিল না। সে রান্না জানে, নিজের খাবার নিয়ে ভাবে। সে নতুন কিছু তৈরি করতে চায়। তার সাংস্কৃতিক শিকড়কে সে নিজের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। কিন্তু তার মনোযোগ ধীরে ধীরে সরে যায়।

একসময় নিজের রেস্তোরাঁর পরিকল্পনার চেয়ে সিয়েরার সঙ্গে যোগাযোগ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে এগোনোর বদলে সে তারকার মনোযোগ ধরে রাখার চেষ্টা করে।
এই জায়গায় ‘অ্যাপেটাইট’ একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন করে—আমাদের স্বপ্ন কি সত্যিই সব সময় আমাদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা? নাকি কখনো কখনো অন্য কারও কাছ থেকে পাওয়া সামান্য স্বীকৃতি আমাদের নিজের স্বপ্নের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে?
সম্ভবত এখানেই বইটির ‘হাঙ্গার’ শব্দটি সবচেয়ে অর্থবহ। মানুষের ভেতরে অনেক ধরনের ক্ষুধা থাকে। আর সব ক্ষুধা খাবার দিয়ে মেটে না।

উপন্যাসটির কিছু অংশে চরিত্রগুলো তুলনামূলকভাবে সরল বা একমাত্রিক মনে হতে পারে। জেরিনার মা এবং তার কর্মক্ষেত্রের বস অ্যান্ড্রু অনেক সময় পূর্ণাঙ্গ মানুষের চেয়ে গল্পের প্রতিবন্ধকতা হিসেবেই বেশি কাজ করে। সিয়েরার সঙ্গে জেরিনার যোগাযোগের কিছু ঘটনাও বাস্তবতার তুলনায় বেশ সুবিধাজনক বলে মনে হতে পারে।
কিন্তু জেরিনা যখন ভেঙে পড়ে, তখন চরিত্রটি অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে সিয়েরার সঙ্গে দেখা করার স্বপ্ন যখন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় এবং জেরিনা বুঝতে পারে যে দুজনের কাছে এই সম্পর্কের গুরুত্ব সমান নয়—সেই হতাশা খুব মানবিক হয়ে ওঠে পাঠকের কাছে। কারণ, আমরা সবাই কোনো না কোনোভাবে এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাই।

কখনো কোনো মানুষকে যতটা গুরুত্বপূর্ণ মনে করি, তার কাছে আমরা ততটা গুরুত্বপূর্ণ নই। কখনো কোনো স্বপ্নের কাছে পৌঁছে বুঝতে পারি, আমরা আসলে যে জিনিসটি চেয়েছিলাম, তা সেটি নয়। আর কখনো বুঝতে হয়—যাকে আদর্শ ভেবেছিলাম, সে আসলে কেবল একজন মানুষ।

‘অ্যাপেটাইট’–এর রেসলিং অংশটিকে নিছক বিনোদন হিসেবে দেখলে বইটির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর বাদ পড়ে যায়। কুস্তি এখানে পারফরম্যান্সের প্রতীক। কে কী চরিত্রে অভিনয় করছে? কে দর্শকের জন্য মুখোশ পরে আছে? বাস্তবে চরিত্রটাই কেমন?
এই প্রশ্নগুলো জেরিনার ব্যক্তিজীবনেও ফিরে আসে। সিয়েরার জন্য জেরিনা কে? ভক্ত? বন্ধু, নাকি সহকারী? নাকি কেবল এমন একজন মানুষ, যার কাছ থেকে প্রয়োজনমতো মনোযোগ ও শ্রম পাওয়া যায়?

সদরঘাটের রাত, সাংবাদিকের খুন—কী লুকিয়ে আছে ‘কৃষ্ণ নদীর শহরে’

অন্যদিকে জেরিনার নিজের জীবনেও সে কি নিজের সত্যিকারের পরিচয় নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, নাকি অন্যের স্বীকৃতির অপেক্ষায় নিজের মুখোশ পরে আছে?

এই অর্থে রেসলিং আর রান্না—দুটি আপাতদৃষ্টিতে অসম জগৎ এবং একই বিন্দুতে এসে মেলে; তা হলো শিল্পে। একটিতে রন্ধনশৈলীর মাধ্যমে স্বাদ ও সৌন্দর্য নির্মিত হয়, অন্যটিতে শরীরের শক্তি, কৌশল ও নৈপুণ্য হয়ে ওঠে শিল্পের ভাষা।
প্রচলিত ইংরেজি প্রবাদ—‘ইউ আর হোয়াট ইউ ইট’। ‘অ্যাপেটাইট’ যেন সেই কথাটিকে আরও বিস্তৃত করে জিজ্ঞাসা করে—তুমি যা খাও, তুমি তা-ই নও, তুমি যা ভালোবাসো, যার পেছনে ছোটো, যাকে অনুসরণ করো—সেগুলোও তোমাকে তৈরি করে।

জেরিনার ক্ষেত্রে এই নির্মাণপ্রক্রিয়াটি দ্বন্দ্বপূর্ণ। একদিকে বাংলাদেশি খাবার তাকে নিজের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে। অন্যদিকে রেসলিং ফ্যানডম তাকে একটি নতুন সম্প্রদায় দেয়। একটি তাকে নিজের পরিচয়ের দিকে টানে, অন্যটি তাকে নিজের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

বইটিতে কিছু চরিত্র আরও গভীর হতে পারত, কিছু ঘটনা আরও বিশ্বাসযোগ্যভাবে নির্মিত হতে পারত এবং শেষভাগে কিছু বিষয় দ্রুত এগিয়ে যায়। খাবার ও বাংলাদেশি সংস্কৃতি নিয়ে কিছু ব্যাখ্যাও কখনো কখনো গল্পের স্বাভাবিক প্রবাহের বদলে পাঠকের জন্য তথ্য দেওয়ার মতো মনে হতে পারে। তবে বইটির আবেগগত কেন্দ্রটি শক্তিশালী। কারণ, শেষ পর্যন্ত জেরিনার গল্প সিয়েরা মিস্টের গল্প নয়। এটি নিজের কাছে ফিরে আসার গল্প।

কোনো তারকার কাছ থেকে পাওয়া স্বীকৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হাজারো লাইক, কিংবা প্রিয় মানুষের সামান্য মনোযোগ—এসবের কোনোটিই নিজের জীবনের জায়গা পূরণ করতে পারে না। নিজের জন্য তৈরি করা স্বপ্নের জায়গাটি শেষ পর্যন্ত নিজেকেই তৈরি করতে হয়।
হয়তো এ কারণেই ‘অ্যাপেটাইট’-এর সবচেয়ে সুন্দর দিক তার রান্নার বর্ণনা নয়, রেসলিংয়ের উত্তেজনাও নয়; বরং সেই মুহূর্ত, যখন একজন তরুণী ধীরে ধীরে বুঝতে শেখে—অন্য কারও জীবনে বিশেষ হয়ে ওঠার চেয়ে নিজের জীবনের গল্পে নিজের জায়গাটি তৈরি করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

লিওনার্দ কোহেনের বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি মনে পড়ে—‘দেয়ার ইজ আ ক্র্যাক ইন এভরিথিং, দ্যাটস হাউ দ্য লাইট গেটস ইন।’
জেরিনার জীবনেও ফাটল আছে—ক্যারিয়ারে, পরিবারে, বন্ধুত্বে, নিজের আত্মবিশ্বাসে। কিন্তু সেই ফাটল দিয়েই শেষ পর্যন্ত আলো ঢোকে। আর সেই আলোয় দাঁড়িয়ে ‘অ্যাপেটাইট’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সব ক্ষুধা মেটানোর দরকার নেই। কিছু ক্ষুধা আমাদের পথ দেখানোর জন্যই থাকে।

পি.পারমিতার ‘অ্যাপেটাইট’ তাই শেষ পর্যন্ত খাবার, কুস্তি কিংবা একজন তারকার প্রতি ভক্তির গল্পের চেয়ে বড় কিছু। এটি এমন এক প্রজন্মের গল্প, যারা একই সঙ্গে বাস্তব পৃথিবী এবং ইন্টারনেটের পৃথিবীতে বাস করে, যারা দূরের মানুষকে খুব কাছের মনে করতে পারে; যারা স্বপ্ন দেখতে জানে, কিন্তু কখনো কখনো অন্যের স্বপ্নে হারিয়ে যায়। হয়তো সত্যিকারের ক্ষুধা তখনই শেষ হয়, যখন আমরা বুঝতে পারি—আমরা আসলে কী খুঁজছিলাম।

বন্ধু, ভৈরব বন্ধুসভা

Read full story at source