বাবার ইসলাম গ্রহণে ছেলেদের কৌশল
· Prothom Alo

তিনি ছিলেন মদিনার বনু সালামা গোত্রের প্রধান। অত্যন্ত দানশীল, প্রভাবশালী ও সমাজে সর্বজনশ্রদ্ধেয় এক ব্যক্তি। তবে একটি পা জন্মগতভাবেই কিছুটা দুর্বল ও খোঁড়া ছিল, যার কারণে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারতেন না।
Visit tr-sport.bond for more information.
তৎকালীন আরবের গোত্রপ্রধানদের আভিজাত্যের অংশ হিসেবে ঘরে নিজস্ব মূর্তি রাখার প্রথা ছিল। সেই সুবাদে তাঁর ঘরেও স্থাপিত ছিল কাঠের তৈরি বিশেষ এক মূর্তি, যার নাম ছিল ‘মানাত’। গভীর ভক্তি নিয়ে তিনি ঘরে বসেই সেই মূর্তির পূজা করতেন। তাঁর নাম আমর ইবনুল জামুহ।
এক রাতে ছেলেরা গোপনে পিতার সেই কাঠের মূর্তিটি উঠিয়ে নিয়ে মহল্লার আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমর ইবনুল জামুহ মূর্তিকে বেদিতে না পেয়ে ব্যাকুল হয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
কৌশলী দাওয়াত
নবীজির মদিনায় হিজরতের আগেই তাঁর তিন পুত্র—মুআজ, মুআউয়িজ ও খাল্লাদ এবং স্ত্রী হিন্দ (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন। মহানবী (সা.) মদিনার মানুষদের দ্বীন শেখানোর জন্য যে তরুণ সাহাবি মুসআব ইবনে ওমাইরকে পাঠিয়েছিলেন, তাঁরই উদ্যোগ ও প্রচেষ্টার বরকতে পরিবারটি ইমানের আলো লাভ করে।
গোত্রপ্রধান পিতার সামাজিক প্রভাব ও ক্ষোভের আশঙ্কায় তাঁরা বিষয়টি শুরুতে গোপন রাখেন। তবে পরিবারের সদস্যরা মনেপ্রাণে চাইতেন শ্রদ্ধেয় পিতা যেন জাহেলি যুগের অন্ধকার থেকে ইসলামের মুক্তপথে আসেন।
কিন্তু সরাসরি কিছু বলতে না পেরে তাঁরা এক অভিনব কৌশলের আশ্রয় নেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৪৫২-৪৫৩, দারুল কিতাবিল আরাবি)
সাহাবি খোবাইবের শাহাদত থেকে শিক্ষামূর্তির গলায় তরবারি
এক রাতে ছেলেরা গোপনে পিতার সেই কাঠের মূর্তিটি উঠিয়ে নিয়ে মহল্লার আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে আমর ইবনুল জামুহ মূর্তিকে বেদিতে না পেয়ে ব্যাকুল হয়ে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
অবশেষে নোংরা স্তূপ থেকে উদ্ধার করে পরম যত্নে ধুয়ে-মুছে সুগন্ধি মাখিয়ে আবার যথাস্থানে স্থাপন করেন।
পরপর কয়েক দিন একই ঘটনা ঘটায় এবার তিনি বিরক্ত হয়ে মূর্তির গলায় একটি ধারালো তরবারি ঝুলিয়ে দিয়ে বললেন, ‘যদি তোমার মধ্যে কোনো ক্ষমতা থাকে, তবে এই তরবারি দিয়ে পারলে নিজেকে রক্ষা করো।’
পরদিন সকালে উঠে তিনি দেখলেন মূর্তিটি আবার গায়েব। খুঁজতে খুঁজতে বনু সালামার এক পরিত্যক্ত নোংরা কুয়ায় তিনি আবিষ্কার করলেন এক চরম অবমাননাকর দৃশ্য—তাঁর পরম ভক্তির উপাস্য কাঠের মূর্তিটি একটি মৃত কুকুরের সঙ্গে একই রশিতে বাঁধা অবস্থায় আবর্জনার মধ্যে পড়ে আছে!
গলায় তরবারি ঝুলিয়েও যে নির্জীব কাষ্ঠখণ্ড একটি মৃত পশুর হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারে না, তা কীভাবে বিশ্বজগতের প্রতিপালক বা মানুষের আশ্রয় হতে পারে—এই চরম সত্য সেদিন তাঁর বিবেককে নাড়া দেয়।
তিনি গভীরভাবে লজ্জিত হলেন এবং মূর্তির উপাসনার অসারতা উপলব্ধি করলেন। কালবিলম্ব না করে তিনি সরাসরি নবীজির কাছে গিয়ে পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেন। (ইবনে হিশাম, আস-সিরাতুন নাবাবিয়্যাহ, ১/৪৫৩-৪৫৪)
তাঁর ইমানি উদ্দীপনা দেখে মহানবী (সা.) ছেলেদের ডেকে বললেন, ‘তোমরা তাকে আর বাধা দিয়ো না; হয়তো আল্লাহ তাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করবেন।’
ওহুদের প্রান্তরে
এরপর কেটে গেল তিনটি বছর। ঘনিয়ে এল ওহুদের ঐতিহাসিক যুদ্ধ। মদিনাজুড়ে জিহাদের প্রস্তুতি চলছে। ছেলেরা এসে বৃদ্ধ পিতাকে পরম স্নেহে বললেন, ‘বাবা, আপনার পা দুর্বল এবং ইসলামে আপনার মতো অক্ষম ব্যক্তির জন্য জিহাদ থেকে অব্যাহতির স্পষ্ট বিধান রয়েছে; কাজেই আপনার যুদ্ধে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।’
কিন্তু ইমানের তাপে প্রজ্বলিত সেই বৃদ্ধ সরদার ঘরে বসে থাকতে রাজি হলেন না। তিনি নবীজিকে অনুযোগের সুরে বললেন, ‘আল্লাহর রাসুল, আমার ছেলেরা আমাকে আপনার সঙ্গে বেহেশতে যাওয়ার পথ থেকে আটকে রাখতে চায়। অথচ আল্লাহর কসম, আমি আমার এই দুর্বল পা নিয়েই বেহেশতের সবুজ চত্বরে হেঁটে বেড়াতে চাই!’
বার্ধক্য ও শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তাঁর ইমানি উদ্দীপনা দেখে মহানবী (সা.) ছেলেদের ডেকে বললেন, ‘তোমরা তাকে আর বাধা দিয়ো না; হয়তো আল্লাহ তাকে শাহাদাতের মর্যাদা দান করবেন।’ (বাইহাকি, দালাইলুন নবুওয়াহ, ৩/২৪৬)
৪ ধনী সাহাবি যেভাবে বদলে দেন মদিনার অর্থনীতিযুদ্ধক্ষেত্রে আত্মনিবেদন
অনুমতি পেয়ে তিনি আনন্দচিত্তে ছেলেদের সঙ্গে ওহুদ প্রান্তরে রওনা হলেন। বের হওয়ার সময় কাবার দিকে ফিরে ব্যাকুল হৃদয়ে দোয়া করলেন, ‘আল্লাহ, আমাকে শাহাদাতের অমূল্য নিয়ামত দান করুন এবং হতাশ হয়ে যেন আবার পরিবারের কাছে ফিরে আসতে না হয়!’
ওহুদের ময়দানে পা টেনে টেনেই তিনি অসীম সাহসিকতার সঙ্গে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সেই অসম যুদ্ধের অগ্রবর্তী সারিতে পৌঁছে যান। পাশেই লড়াই করছিলেন তাঁর পুত্র খাল্লাদ (রা.)। বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের একপর্যায়ে অল্প সময়ের ব্যবধানে পিতা-পুত্র উভয়ই শহীদ হন।
সত্যকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বয়স কখনো বাধা হতে পারে না এবং আন্তরিক ইমান থাকলে শারীরিক অক্ষমতাও বেহেশত অর্জনের পথে অন্তরায় হয় না।
সুস্থ পায়ে বেহেশতে বিচরণ
যুদ্ধ শেষে নবীজি শহীদদের দেখতে এসে আমর ইবনুল জামুহের নিথর দেহের পাশে দাঁড়ালেন। পরম মমতায় তাঁর দিকে তাকিয়ে এক ঐতিহাসিক সুসংবাদ দিলেন, ‘আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি, তুমি তোমার এই দুর্বল পা নিয়েই বেহেশতে সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় স্বচ্ছন্দে হেঁটে বেড়াচ্ছ!’ (ইবনে হাজার আসকালানি, আল-ইসাবা ফি তাময়িজিস সাহাবা, ৪/৫০৮, দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত)
নবীজির নির্দেশক্রমে আমর তাঁকে তাঁরই পরম আত্মিক বন্ধু ও আত্মীয় আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে হারামের সঙ্গে একই কবরে দাফন করা হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩৫১)
শারীরিক সীমাবদ্ধতা ইমানের পথে বাধা নয়
সাহাবি আমর ইবনুল জামুহের এই জীবনগাথা নিছক একটি যুদ্ধের ইতিহাস নয়; বরং এটি প্রমাণ করে যে সত্যকে গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বয়স কখনো বাধা হতে পারে না এবং আন্তরিক ইমান থাকলে শারীরিক অক্ষমতাও বেহেশত অর্জনের পথে অন্তরায় হয় না।
ইসলাম যেখানে তাঁকে ঘরে বসে থাকার ছাড় দিয়েছিল, সেখানে তিনি শাহাদাতের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছানোর জন্য নিজের দুর্বলতাকেই শক্তিরূপে পরিণত করেছিলেন।
নূরুল্লাহ মারূফ: লেখক ও গবেষক