মাঠের খেলা ভুলে মাঠের বাইরে খেলছে পাকিস্তান
· Prothom Alo

টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে এমন ঘটনা কি আগে ঘটেছে? মনে করা কঠিন।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
সিরিজের মাঝপথে কোচ ছাঁটাই, সাত খেলোয়াড়কে দেশে পাঠিয়ে দেওয়া, নতুন সাতজনকে দলে নেওয়া—কোনটা রেখে কোনটা আগে বলা উচিত, তা ঠিক করাই মুশকিল। এই দেখুন না, দলে আসা নতুন সাতজনের মধ্যে পাঁচজনেরই যে এখনো টেস্ট অভিষেক হয়নি, তা লেখাই হয়নি!
বেচারা সরফরাজ আহমেদের কথাই ধরুন। কত আশা নিয়ে পাকিস্তান টেস্ট দলের প্রধান কোচ হয়েছিলেন! সেই অধ্যায় শেষ হলো মাত্র ৬ টেস্টেই। অথচ চলতি বছরের মার্চে অবসর নেওয়া সরফরাজকে অনেক দিন ধরেই তৈরি করছিল পাকিস্তান।
ক্রিকেট ছাড়ার আগেই গত নভেম্বরে তাঁকে পাকিস্তান শাহিনস (‘এ’ দল) ও অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে তদারকির দায়িত্ব দেয় পিসিবি। তাঁর কাজের আওতায় ছিল দলের কার্যক্রম পরিচালনা, খেলোয়াড়দের উন্নয়নের পথ তৈরি, কোচিং স্টাফদের সঙ্গে সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রতিভা অন্বেষণ ও পরিচর্যা।
পিসিবি তখন সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে লিখেছিল, পাকিস্তানের ক্রিকেটীয় কাঠামোর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং যুব দল, ‘এ’ দল ও জাতীয় সিনিয়র দলের মধ্যে ধারাবাহিকতা আরও জোরদার করার একটি ব্যাপক প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
একই বছরের ডিসেম্বরে অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপে পরামর্শক করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাঠানো হয় সরফরাজকে। পাকিস্তানের দলটি ফাইনালে ভারতকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হলে সরফরাজের কোচিং-দক্ষতা নিয়ে আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে পিসিবি।
সরফরাজ আহমেদ এখন আর পাকিস্তানের টেস্ট দলের কোচ নন!এরই ধারাবাহিকতায় গত মে মাসে বাংলাদেশ সফরে টেস্ট দলের কোচের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় তাঁর কাঁধে। সেই সরফরাজই এখন বরখাস্ত। পাকিস্তান ক্রিকেটে কখন কী হয় বলা মুশকিল, তার আরেকটি উদাহরণ পাকিস্তানকে ২০১৭ চ্যাম্পিয়নস ট্রফি জয়ী সরফরাজ।
উদাহরণ আছে আরও অনেক। সালমান আগার কথাই ধরা যাক। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম টেস্টে পাকিস্তানকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরের টেস্টেই বাদ, আর এবার দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া ক্রিকেটারদের তালিকাতেও তাঁর নাম।
গত মে মাসেই বাংলাদেশের বিপক্ষে সিলেট টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসেই খেলেছেন ৭১ রানের ইনিংস। এরপর মাত্র ৫টি টেস্ট ইনিংসে রান পাননি। তাতেই বাদ তো পড়লেন, সঙ্গে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে দেশেও।
সালমান তো তবু সান্ত্বনা পাবেন, বাঁহাতি স্পিনার আলী উসমানের মনের মধ্যে কী চলছে, কে জানে! ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে পোর্ট অব স্পেনে সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে নিয়েছেন ৬ উইকেট। এরপর হেডিংলিতে ইংল্যান্ড সিরিজের প্রথম টেস্টে এক ইনিংসে বোলিংয়ের সুযোগ পেয়েই শিকার করেছেন ৫ উইকেট। এর আগে প্রস্তুতি ম্যাচেও এক ইনিংসে নিয়েছিলেন ৫ উইকেট।
তাঁর দোষ একটাই—লর্ডস টেস্টটা ভালো যায়নি। পেয়েছেন মাত্র ১ উইকেট। অথচ পুরো টেস্টেই যেখানে ছিল পেসারদের দাপট, ইংল্যান্ড খেলেছে চার পেসার নিয়ে, সেখানে একজন স্পিনারের কাছ থেকে আর কতটাই-বা আশা করা যায়! কিন্তু পাকিস্তান ক্রিকেটে এসব যুক্তি চলে না।
শোয়েব মালিক, পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়কদল থেকে বাদ পড়া খেলোয়াড়েরাও আমাদের জাতীয় দলের ক্রিকেটার, তাঁরা পাকিস্তানের হয়ে খেলেছেন এবং অবদান রেখেছেন। “প্রথম ফ্লাইটেই দেশে পাঠিয়ে দেওয়া”—এ ধরনের কথা অসম্মানজনক।পাকিস্তানের এই যুক্তিহীন সিদ্ধান্ত আলোড়ন তুলেছে ক্রিকেট বিশ্বেও। ইংল্যান্ডের সাবেক ক্রিকেটার কেভিন পিটারসেন তো বিশ্বাসই করতে পারছেন না। এক্সে তিনি লিখেছেন এভাবে, ‘পাকিস্তান এতগুলো পরিবর্তন করছে এবং খেলোয়াড়দের দেশে পাঠিয়ে দিচ্ছে, আমি এই গ্রহে বসে কী পড়ছি! এটা সত্যি হতে পারে না! নিশ্চয়ই না!’
পাকিস্তানের সাবেক কোচ মিকি আর্থারের কথাতেও অবিশ্বাস। তিনি এটাকে বলছেন হাস্যকর সিদ্ধান্ত, ‘পিসিবির হাস্যকর সিদ্ধান্ত, আর এই কারণেই পাকিস্তান সমস্যার মধ্যে আছে। কারণ, তারা নিয়মিত খেলোয়াড়, কোচ এবং নির্বাচকদের বদলাতে থাকে। কোনো স্থিতিশীলতা নেই!’
পাকিস্তানের সাবেক ক্রিকেটার শোয়েব মালিক বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ক্রিকেটারদের অসম্মান করা হয়েছে। এক্সে শোয়েব লিখেছেন, ‘দল থেকে বাদ পড়া খেলোয়াড়েরাও আমাদের জাতীয় দলের ক্রিকেটার, তাঁরা পাকিস্তানের হয়ে খেলেছেন এবং অবদান রেখেছেন। “প্রথম ফ্লাইটেই দেশে পাঠিয়ে দেওয়া”—এ ধরনের কথা অসম্মানজনক। জবাবদিহি শুরু হওয়া উচিত যারা সিস্টেমটা নষ্ট করেছে, তাদের দিয়ে। বিশেষ করে সেই খেলোয়াড়দের দিয়ে নয়, যারা বেঞ্চে বসে ছিল কিংবা মাত্র ২-৩টি টেস্ট খেলেছে। আর জবাবদিহি হওয়া উচিত একটি সফর শেষ হওয়ার পর, সফরের মাঝপথে নয়।’
সিরিজের প্রথম দুই টেস্টেই নিজেদের হারিয়ে খুঁজেছে পাকিস্তান, দাপট দেখিয়েছেন রবিনসনরাপাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদি তো নতুন নেওয়া ক্রিকেটারদের নিয়েও আলোচনা তুলেছেন। এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘এই সিদ্ধান্তের যুক্তি বা কারণ কী, সেটাই বুঝতে পারছি না! এমনকি যারা বদলি হিসেবে এসেছে, তাদেরও নেওয়ার কোনো মানে হয় না—ইংল্যান্ডে একটি টেস্ট ম্যাচের জন্য টি-টুয়েন্টির খেলোয়াড়দের নেওয়া হয়েছে। এই চিন্তাভাবনা কেন? মাত্র ৫টি টেস্টের (আসলে ৬টি) পর কোচকে কেন বাদ দেওয়া হলো? এত অভিজ্ঞ নির্বাচকদের নিয়ে গঠিত নির্বাচক কমিটির নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে এটিই সবচেয়ে হতবাক করা সিদ্ধান্ত।’