কৈলাস মানস সরোবরে কেন এত মানুষ যায়, কোন পথ ধরে

· Prothom Alo

চীনের তিব্বত সীমান্তসংলগ্ন নেপালের রসুয়া জেলায় কাদামাটি ও পাথর নেমে আসায় সৃষ্ট ভয়াবহ আকস্মিক দুর্যোগের পর অন্তত ১০৮ ভারতীয় নাগরিকসহ প্রায় ৪০০ তীর্থযাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন। এ ঘটনার পর আবার আলোচনায় এসেছে কৈলাস মানস সরোবর যাত্রা।

বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে বলা হয়েছে, সীমান্তের তিব্বত অংশ থেকে কাদা মাটি ও পাথর নেমে আসার ফলে সৃষ্ট দুর্যোগে নেপালে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং কয়েকটি গ্রাম ভেসে গেছে।

Visit afnews.co.za for more information.

এ ঘটনায় নেপাল ও তিব্বতে এখন পর্যন্ত ১৭৭ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। আরও প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।

বন্যায় কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবরগামী তীর্থযাত্রীদের ব্যবহৃত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পথের সড়ক, সেতু ও যোগাযোগব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেছে। সেখানে উদ্ধার অভিযান চলছে।

হিন্দুদের বিশ্বাস, কৈলাস পর্বত তাঁদের দেবতা শিব ও দেবী পার্বতীর আবাসস্থল। আর মানস সরোবরকে পুণ্য হ্রদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই হ্রদের পানিতে স্নান করলে পাপমুক্তি ঘটে এবং মোক্ষলাভ করা যায়। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের আত্মা যখন সংসার ও পুনর্জন্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে পরম সত্য বা ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হয়, তখন তাকে মোক্ষলাভ বলা হয়।

কৈলাস মানস সরোবর যাত্রা কী

কৈলাস মানস সরোবর যাত্রা হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন ও বন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম তীর্থযাত্রা। এই যাত্রায় তীর্থযাত্রীরা চীনের তিব্বতে অবস্থিত কৈলাস পর্বত (৬ হাজার ৬৩৮ মিটার উঁচু) ও মানস সরোবর হ্রদে যান।

যেভাবে দুর্যোগ নেপাল ও তিব্বত সীমান্তে

হিন্দুদের বিশ্বাস, কৈলাস পর্বত তাঁদের দেবতা শিব ও দেবী পার্বতীর আবাসস্থল। আর মানস সরোবরকে পুণ্য হ্রদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বাস করা হয়, এই হ্রদে স্নান করলে পাপমুক্তি ঘটে এবং মোক্ষলাভ করা যায়। হিন্দুধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মানুষের আত্মা যখন সংসার ও পুনর্জন্মের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে পরম সত্য বা ঈশ্বরের সঙ্গে একাত্ম হয়, তখন তাকে মোক্ষলাভ বলা হয়।

কৈলাস মানস সরোবর তীর্থযাত্রা হাজার বছরের বেশি পুরোনো বলে মনে করা হয়। হিন্দুদের পুরাণ, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ ও জৈন ধর্মবিশ্বাসে এই যাত্রার উল্লেখ রয়েছে।

১৯৬২ সালে ভারত-চীন যুদ্ধের পর প্রায় দুই দশক কৈলাস মানস সরোবর যাত্রা বন্ধ ছিল। ভারত ও চীনের মধ্যে একটি চুক্তির পর ১৯৮১ সালে এই তীর্থযাত্রা আবার শুরু হয়। এরপর কোভিড-১৯ মহামারির সময় এটি আবার বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় ছয় বছর পর ২০২৫ সালে আবার এই তীর্থযাত্রা শুরু হয়।

মানস সরোবর

তীর্থযাত্রীরা যেসব পথ ব্যবহার করেন

তীর্থযাত্রীরা তিনটি প্রধান পথ দিয়ে কৈলাস মানস সরোবরে যেতে পারেন। সেগুলোর একটি হলো লিপুলেখ পাস রুট (উত্তরাখণ্ড)। এ পথটি দিল্লি থেকে শুরু হয়ে আলমোড়া ও ধারচুলা হয়ে গুঞ্জি ও লিপুলেখ পাস (৫ হাজার ২০০ মিটার উঁচু) অতিক্রম করে তিব্বতে প্রবেশ করেছে। এই তীর্থযাত্রা আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং উত্তরাখণ্ড রাজ্য সরকারের সরকারি সংস্থা ‘কুমায়ুন মণ্ডল বিকাশ নিগম’–এর সহযোগিতায় এই তীর্থযাত্রার আয়োজন করা হয়। ঐতিহ্যগতভাবে এই পথে বেশি উচ্চতায় হেঁটে যেতে হয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক যোগাযোগ উন্নত হওয়ায় এখন সীমান্তের প্রায় কাছাকাছি পর্যন্ত সড়কপথে যাওয়া যায়।

দ্বিতীয় পথটি হলো, নাথু লা পাস (সিকিম)। এ পথটি দিল্লি থেকে গ্যাংটক হয়ে নাথু লা পাস অতিক্রম করে তিব্বতে প্রবেশ করে। মূলত গাড়িতে করে এই পথে যেতে হয়। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই পথে পায়ে হাঁটার পরিমাণ কম, গাড়িতেই যাতায়াত বেশি। ফলে বয়স্কদের জন্য এটি তুলনামূলকভাবে সহজ। তবে পুরো যাত্রায় ২০ দিনের বেশি সময় লাগে।

অন্য পথটি হলো, কাঠমান্ডু (নেপাল) রুট। তীর্থযাত্রীরা কাঠমান্ডু থেকে উড়োজাহাজ বা সড়কপথে নেপালগঞ্জ অথবা সিমিকোট যান। এরপর হিলসা হয়ে অথবা অন্য স্থলপথে তিব্বতে ঢোকেন। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত অন্য দুটি পথের বিপরীতে, এ পথটি বেসরকারি ট্যুর অপারেটরদের কাছে বেশি জনপ্রিয়।

কারণ, এই পথে যাত্রা তুলনামূলকভাবে খানিকটা সহজ। দুর্গম পথে দীর্ঘ সময় হেঁটে যাওয়ার ঝামেলা এড়াতে এই পথে হেলিকপ্টারেও যাতায়াতের সুযোগ রয়েছে। যদিও গতকাল বুধবারের আকস্মিক বন্যায় এ পথটিই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

৫,২০০ মিটার উঁচুতে হিমবাহধস, আধা ঘণ্টায় নদীর পানি ৩০ ফুট বেড়েই কি নেপালে এ দুর্যোগ

কেন এই তীর্থযাত্রা এত কঠিন

এই তীর্থযাত্রায় পুণ্যার্থীদের ৪ হাজার ৫০০ মিটারের বেশি উচ্চতায় উঠতে হয়, যেখানে বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা কম থাকে। তীর্থযাত্রীদের প্রচণ্ড ঠান্ডা, অনিশ্চিত আবহাওয়া, ভূমিধস ও দুর্গম পথের মতো নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। সবচেয়ে কঠিন অংশ হলো কৈলাস পর্বতকে ঘিরে ৫২ কিলোমিটার প্রদক্ষিণ করা। এটিকে পরিক্রমা বা কোরা বলা হয়। এই প্রদক্ষিণের সময় প্রায় ৫ হাজার ৬৩০ মিটার উচ্চতার দোলমা লা পাস অতিক্রম করতে হয়।

ভয়াবহ বন্যার পর নেপাল-চীন সীমান্তের কাছের উপত্যকাগুলোর উপগ্রহচিত্র। ২৬ আগস্ট ২০২৬

নথিপত্র, ভিসা ও অনুমতিপত্র

কৈলাস মানস সরোবর যেতে হলে ভ্রমণকারীদের চীনের ভিসা, তিব্বত গ্রুপ ভিসা এবং বিশেষ আঞ্চলিক প্রবেশের অনুমতিপত্র নিতে হয়। এসব অনুমতিপত্র কেবল অনুমোদিত ট্যুর অপারেটর বা সরকারি সংস্থার মাধ্যমে প্রক্রিয়া করা যায়। ব্যক্তিগতভাবে বা এককভাবে ভ্রমণের অনুমতি নেই।

সরকারি ব্যবস্থাপনায় (ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে) আবেদন গ্রহণের সময় ভারতীয় নাগরিকেরা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরকারি কৈলাস মানস সরোবর যাত্রা পোর্টালের মাধ্যমে আবেদন করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে বয়সসীমা সাধারণত ১৮ থেকে ৭০ বছর এবং শারীরিক সক্ষমতার নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ করতে হয়।

বেসরকারি ট্যুর অপারেটরের মাধ্যমে যেতে নেপাল বা তিব্বত হয়ে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেলে ভ্রমণকারীদের ৪৫ থেকে ৬০ দিন আগে পাসপোর্টের স্ক্যান কপি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র অনুমোদিত ট্যুর অপারেটরের কাছে জমা দিতে হয়।

নেপালে আকস্মিক বন্যা–ভূমিধসে নিহত বেড়ে ১৫৭, নিখোঁজ চার শতাধিক

Read full story at source