ম্যাকাইয়ে অভিষেকের আনন্দে বাংলাদেশের স্টার্ক-বিষাদ
· Prothom Alo

এই মুহূর্তে ম্যাকাইয়ের সবচেয়ে সুখী মানুষটি কে? অবশ্যই মিচেল স্টার্ক। ইনিংসের সপ্তম ওভারের মধ্যেই বাংলাদেশ দলকে প্রায় গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। বিধ্বংসী বোলিংয়ে টেস্ট ক্যারিয়ারের নিজের ১৯তম ৫ উইকেটটি স্টার্ক নিলেন মাত্র ২২টি বল করে।
Visit tr-sport.bond for more information.
নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে পারেননি যদিও। টেস্টের এক ইনিংসে কোনো বোলারের দ্রুততম ৫ উইকেট নেওয়ার রেকর্ড এখনো ১৫ বলে। সেই কীর্তিও স্টার্কেরই। গত বছর ১৪ জুলাই কিংস্টনের স্যাবাইনা পার্কে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে গড়েছিলেন সেই কীর্তি।
ম্যাকাইয়ে আজ আরেকজন সুখী মানুষ আছেন। পিটার কাজাকফ, গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনার পিচ কিউরেটর। গ্যাবার সাবেক এই কিউরেটর একসময়ের ফুটি গ্রাউন্ডকে নিজ হাতে ক্রিকেট মাঠ বানিয়েছেন। কাল তিনি বলেছেন, এখানকার উইকেট অসম্ভব রকমের পেসবান্ধব। ফাস্ট বোলারদের স্বর্গ। কাজাকফের মুখের হাসি চওড়া করে দিয়েছেন স্টার্ক।
ম্যাকাইয়ে আজ আরও সুখী মানুষ আছে। বলতে পারেন অনেক সুখী মানুষ, যারা সকাল সকাল গ্রেট ব্যারিয়ার রিফ অ্যারেনায় চল এসেছেন উৎসব করতে করতে। খেলা শুরুর এক ঘণ্টা আগে মাঠ পৌঁছে দেখা গেল ম্যাকাইয়ের সাবেক ক্রিকেট সংগঠক টেরি হেইসের নামে করা গ্র্যান্ড স্ট্যান্ড থেকে শুরু করে উল্টো দিকের ছাদ দেওয়া গ্যালারি এবং মাটির ঢিবিগুলোও প্রায় কানায় কানায় পরিপূর্ণ।
খেলা শুরুর আগেই গ্যালারি ভরে যায় দর্শকেতখনো মাঠে দর্শক আসছেন। আশপাশে পার্কিং পাওয়া দুষ্কর। অনেকে সেই সিটি সেন্টারে, কিংবা আশপাশের পাড়া-মহল্লার রাস্তায় গাড়ি রেখে বেশ খানিকটা পথ পায়ে হেঁটে আসছেন মাঠে। রাস্তায় স্টেডিয়ামমুখী গাড়ির চাপ। শনিবার সকালটাকে এত বেশি ব্যস্ত সাম্প্রতিক অতীতে দেখেনি ম্যাকাই।
বাংলাদেশের কিশোর ক্রিকেটার তাওহীদ খেলা দেখতে এসেছে বাবা-মা আর ছোট বোনের সঙ্গে। তাওহীদ নিজে ক্রিকেট খেলে, সুযোগ হয়েছে বাংলাদেশ দলের অনুশীলনে নেট বোলার হিসেবে যাওয়ারও। ইবাদত-তাসকিনদের সঙ্গে কথা বলে আপ্লুত এই কিশোর জানাল, সর্বশেষ গত বছর এখানে যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট হয়েছিল, সেই অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়ানডে দেখতেও মাঠে এত মানুষের ঢল নামেনি।
দুঃস্বপ্নের প্রথম সেশন শেষ, সর্বনিম্ন রানের নতুন রেকর্ড এড়াতে পারবে তো বাংলাদেশকারণটা হলো, তখন খেলা দেখতে এসেছিলেন মূলত ম্যাকাইয়ে থাকা অস্ট্রেলিয়ান আর কিছু দক্ষিণ আফ্রিকানই। বাইরে থেকে কেউ আসেনি। কিন্তু এবার যে ম্যাকাইয়ের অভিষেক টেস্ট! অস্ট্রেলিয়ার মানুষের পছন্দের ক্রিকেট, সঙ্গে ম্যাকাইয়ের জন্য টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে পা রাখার দিন। তারওপর খেলাটা শুরু হচ্ছে সাপ্তাহিক ছুটির প্রথম দিনে।
প্রবাসি বাংলাদেশিরা ম্যাকাইয়ে এসেছেন অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকেশহরের ক্রিকেটপ্রেমী মানুষের স্রোত তাই স্টেডিয়ামের দিকে। এখানকার ৩০-৩৫টি বাংলাদেশি পরিবারেরও বোধ হয় কেউ বাকি নেই মাঠে আসার। ডারউইন টেস্ট জয়ের পর উজ্জীবিত প্রবাসী বাংলাদেশিরা খেলা দেখতে এসেছেন এমনকি সিডনি-মেলবোর্ন-ব্রিসবেন থেকে।
স্টার্ক ঝড়ে দিনের শুরুতেই বাংলাদেশের প্রায় উড়ে যাওয়া দেখে নিশ্চয়ই তাঁরা মর্মাহত। খেলা শুরুর আগে এই দর্শকদের অনেকের সঙ্গেই কথা হয়েছে এই প্রতিবেদকের। সবাই বলেছেন, তাঁরা শুধু ভালো ক্রিকেট দেখতে চান বাংলাদেশের কাছে।
ডারউইনের জয়ে মন ভরে গেছে। ম্যাকাইয়েও সেরকম কিছু হলো তো কথাই নেই, তবে না হলেও তারা অখুশি হবেন না। কিন্তু বাংলাদেশ ভালো ক্রিকেট যেন খেলে। দর্শকদের একজন এমনও বলেছেন, ‘সবচেয়ে খারাপ কী হবে—আমরা সিরিজ জিতব না, এই তো! ড্র হবে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া তো সিরিজ জিততে পারবে না। আমার এটাতেই খুশি। শুধু চাই আমাদের দল ভালো খেলুক।’
ম্যাকাই টেস্টের প্রথম দিনের প্রথম সেশনটা ভালো যায়নি বাংলাদেশেরএখন পর্যন্ত তাঁদের সে আশা পূরণ হয়নি। টেস্টের বাকি সময় বা বাকি দিনগুলোতে সেরকম কিছু হবে কিনা কে জানে! প্রথম সেশনে ৩৫ রান তুলতেই ৬ উইকেট হারিয়ে ফেলেছে বাংলাদেশ। ম্যাকাইয়ের টেস্ট এগোচ্ছে অস্ট্রেলিয়ানদের প্রত্যাশামতোই। ম্যাচ শুরুর আগে স্থানীয় আদিবাসীদের প্রতিনিধি হয়ে বক্তব্য দিয়েছেন স্থানীয়ভাবে ‘এল্ডার আন্টি’ হিসেবে পরিচিত ডেব ক্লার্ক। ম্যাকাইয়ে টেস্ট ক্রিকেটকে আমন্ত্রণ জানিয়ে সুন্দর ক্রিকেটের আশা প্রকাশ করেছেন তিনি।
ম্যাকাইয়ের মাঠে এখন সেটাই হচ্ছে, অন্তত অস্ট্রেলিয়ানদের চোখে। সঙ্গে যোগ হয়েছে মাঠের বাইরে টেস্ট ক্রিকেটকে স্বাগত জানানোর বর্ণাঢ্য পরিবেশ। অল্প কিছু বাংলাদেশির বিষাদ বাদ দিলে স্টার্ক, কাজাকফের মতো সুখীই মানুষই বেশি এখানে।