ত্রাণ নিতে আশ্রয়শিবিরে নিবন্ধন, পাসপোর্ট করতে গিয়ে যা হলো বাংলাদেশি মিজানুরের
· Prothom Alo

কক্সবাজারের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে থাকা বেশ কিছু বাংলাদেশি পরিবার ত্রাণের আশায় নিবন্ধন করিয়েছিলেন। ত্রাণ নিতে গিয়ে রোহিঙ্গা তথ্যভান্ডারে নাম উঠিয়েছেন তাঁরা। ফলে জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেও পাসপোর্ট করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ছেন তাঁরা। জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভান্ডারের সঙ্গে রোহিঙ্গা ডেটাবেইস যুক্ত হওয়ায় এসব আবেদনকারীর নাম রোহিঙ্গা তথ্যভান্ডারেও শনাক্ত হচ্ছে। উখিয়ার লাম্বাশিয়া ক্যাম্পে বসবাসকারী বাংলাদেশি তরুণ মিজানুর রহমানও এমন জটিলতায় পড়েছেন। মিজানুরের মতো এমন কত বাংলাদেশি এমন জটিলায় পড়েছেন, কীভাবে এই সমস্যার সমাধান, অনুসন্ধান করেছে প্রথম আলো।
Visit mchezo.life for more information.
চাকরি নিয়ে সৌদি আরবে যাবেন বলে পাসপোর্ট করাতে গিয়েছিলেন কক্সবাজারের উখিয়ার তরুণ মিজানুর রহমান। তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্রসহ সব কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকলেও পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে বিপত্তিতে পড়েন। সেখানে মিজানুর আঙুলের ছাপ দিলে তাঁর তথ্য রোহিঙ্গাদের নিবন্ধিত তথ্যভান্ডারে শনাক্ত হয়। এ জন্য স্থগিত হয়ে যায় তাঁর আবেদন।
পাসপোর্ট পাওয়া নিয়ে মিজানুর রহমানের (২১) এমন বিপত্তির কথা জানা গেল উখিয়ার লম্বাশিয়া রোহিঙ্গা আশ্রয়কেন্দ্রের (ক্যাপ-৪) স্থানীয় বাংলাদেশি বাসিন্দাদের একটি পাড়ায় গিয়ে। মিজানুরের বাবা মোস্তাক মিয়া (৫০) বাংলাদেশি হলেও ক্যাম্প গড়ে ওঠার আগেই ওই পাড়ায় বসবাস করছেন। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের সময় তিনি তাঁর বাড়িতে তিনটি শরণার্থী পরিবারকে আশ্রয়ও দিয়েছিলেন। এরপর জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে নিবন্ধন করলে সেখানে মোস্তাক মিয়া পরিবারের সবাইকে নিয়ে নিবন্ধিত হন। দিনমজুর মোস্তাক মিয়া, তাঁর স্ত্রী ও চার ছেলেমেয়ের নাম এভাবে রোহিঙ্গা তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত হয়। সরকার বর্তমানে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ডেটাবেজকে জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ কারণে মোস্তাকের ছেলে মিজানুর আঙুলের ছাপ দিলে রোহিঙ্গা তথ্যভান্ডারে তাঁর নাম শনাক্ত হয়। আর কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসও তাঁকে ফেরত পাঠায়।
গত জুলাইয়ের শুরুতে মোস্তাক মিয়ার বড় ছেলে মিজানুর রহমান পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে এমন জটিলতায় পড়েন। এরপর ইউএনএইচসিআরের শরণার্থী ডেটাবেইস থেকে নাম বাতিল করতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধির কাছে গেছেন তিনি। আবেদন করলেও এ ব্যাপারে এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। মিজানুরের বাবা মোস্তাক মিয়া বলেন, ৯ বছর ধরে তাঁর পরিবার ত্রাণ সহায়তা পেয়ে আসছে। এ জন্য যে নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট নিয়ে জটিলতায় পড়তে হবে, তিনি জানতেন না।
উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য হেলাল উদ্দিন বলেন, মিজানুরের বিষয়টি তিনি জানেন। মিজানুরের মতো তাঁর ওয়ার্ডের অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশি নাগরিক এমন জটিলতায় পড়েছেন। তাঁদের নাম শরণার্থী তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য তিনি নিজে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে সুপারিশ করেছেন। জাতীয় পরিচয়পত্র ও রোহিঙ্গা তথ্যভান্ডার একীভূত হওয়ার কারণে বাংলাদেশিরা পাসপোর্ট বা ভোটার নিবন্ধন করতে পারছেন না।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গাদের ত্রাণ দিতে নিবন্ধন করলে সেখানে মোস্তাক মিয়া পরিবারের সবাইকে নিয়ে নিবন্ধিত হন। দিনমজুর মোস্তাক মিয়া, তাঁর স্ত্রী ও চার ছেলেমেয়ের নাম এভাবে রোহিঙ্গা তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত হয়। সরকার বর্তমানে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ডেটাবেজকে জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। এ কারণে মোস্তাকের ছেলে মিজানুর আঙুলের ছাপ দিলে রোহিঙ্গা তথ্যভান্ডারে তাঁর নাম শনাক্ত হয়। আর কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসও তাঁকে ফেরত পাঠায়।
উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের ইউপি চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, তাঁর ইউনিয়ন থেকে ইতিমধ্যে ৫০ থেকে ৬০টি আবেদন জেলা প্রশাসন এবং শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের যাঁরা ২০১৭ সালে শিশু ছিলেন, এখন প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে পাসপোর্ট করতে গিয়ে তাঁরা জানতে পারছেন, সরকারি নথিতে তাঁরা রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত।
কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মো. মোবারক হোসেন বলেন, ত্রাণের আশায় অনেক বাংলাদেশি আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করেছেন। এ কারণে পাসপোর্ট করতে এসে ফিঙ্গারপ্রিন্টের সময় তাঁদের নাম রোহিঙ্গাদের তথ্যভান্ডারে প্রদর্শিত হয়। তখন সেই বাংলাদেশিকে পাসপোর্ট না দিয়ে রোহিঙ্গা তথ্যভান্ডার থেকে নাম বাদ দিয়ে প্রমাণপত্র আনার পরামর্শ দেওয়া হয় তাঁদের।
মোবারক হোসেন আরও বলেন, ‘আবার রোহিঙ্গারা যদি কোনোভাবে বাংলাদেশি জাল এনআইডি বানিয়ে পাসপোর্ট করতে আসেন, তাঁরাও সার্ভারে ধরা পড়ে যাচ্ছেন। বাংলাদেশি প্রমাণের জন্য নিয়ম অনুযায়ী আমরা সবকিছু অনুসরণ করছি।’
মো. আ. মান্নান, জেলা প্রশাসক কক্সবাজারত্রাণ পাওয়ার আশায় নিজেকে রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত করা বেআইনি কাজ। বর্তমানে এ ধরনের প্রায় এক হাজার আবেদন তাঁর দপ্তরে জমা পড়েছে। প্রতিটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শহিদ উল্লাহও একই কথা বলেন। তিনি জানান, জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেও যেসব বাংলাদেশি পাসপোর্ট করতে চান, তাঁদের আগে রোহিঙ্গা ডেটাবেইস থেকে নিজেদের নাম ও তথ্য মুছে ফেলতে হবে। অন্যথায় পাসপোর্ট পাওয়া সম্ভব নয়।
উখিয়ার বালুখালী, থাইংখালী, টেকনাফের হ্নীলা, হোয়াইক্যং ও নয়াপাড়া, বাহারছড়ার শীলখালী এলাকায় কয়েক শ বাংলাদেশি ত্রাণ নিতে গিয়ে রোহিঙ্গাদের তথ্যভান্ডারে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। রোহিঙ্গাদের মতো পরিবারগুলো ত্রাণসহায়তা নিচ্ছে। জানা গেছে, ক্যাম্পের কিছু অসাধু রোহিঙ্গা মাঝি (নেতা) ও বায়োমেট্রিক সেন্টারে দায়িত্বরত কিছু কর্মী মাথাপিছু এক থেকে দেড় হাজার টাকা নিয়ে বাংলাদেশিদের নিবন্ধিত করেছেন। অনুসন্ধানে জানা গেছে, উখিয়ার কুতুপালং ও লম্বাশিয়া আশ্রয়শিবির এলাকার প্রায় ৫০০টি বাঙালি পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৪২০টি পরিবার রোহিঙ্গাদের ডেটাবেজে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছে।
উখিয়ার লম্বাশিয়া আশ্রয় শিবিরতথ্যভান্ডার থেকে নাম কাটাতে এক হাজার আবেদন
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ের তথ্যমতে, এত দিন রোহিঙ্গাদের বায়োমেট্রিক ডেটাবেইস ইউএনএইচসিআরের একক নিয়ন্ত্রণে ছিল। আরআরআরসি কেবল সেই তথ্য দেখার সুযোগ পেত। সরকার বর্তমানে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) প্রযুক্তির মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ডেটাবেজকে জাতীয় পরিচয়পত্রের সার্ভারের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) সহায়তায় তৈরি এই নতুন ব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের আঙুলের ছাপের তথ্য এনআইডি ডেটাবেজের সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিলছে। ফলে বাংলাদেশি পরিচয় দিয়ে রোহিঙ্গাদের কেউ পাসপোর্ট বা ভোটার হওয়ার চেষ্টা করলে ধরা পড়ছেন।
মো. মোবারক হোসেন, সহকারী পরিচালক, কক্সবাজার আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসত্রাণের আশায় অনেক বাংলাদেশি আশ্রয়শিবিরে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করেছেন। এ কারণে পাসপোর্ট করতে এসে ফিঙ্গারপ্রিন্টের সময় তাঁদের নাম রোহিঙ্গাদের তথ্যভান্ডারে প্রদর্শিত হয়। তখন সেই বাংলাদেশিকে পাসপোর্ট না দিয়ে রোহিঙ্গা তথ্যভান্ডার থেকে নাম বাদ দিয়ে প্রমাণপত্র আনার পরামর্শ দেওয়া হয় তাঁদের।শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) ও অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘ত্রাণের জন্য অনেক বাংলাদেশি শরণার্থীদের তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। তথ্যভান্ডার থেকে নাম দেওয়ার জন্য অনেকে আবেদন করছেন। আমরা যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সেই আবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে পাঠাচ্ছি। সেখান থেকে যাচাই করে যেসব আবেদন আমাদের কাছে পাঠানো হচ্ছে, তাদের নাম তথ্যভান্ডার থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করে আমরা ইউএনএইচসিআরের কাছে পাঠাচ্ছি।’
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ত্রাণ পাওয়ার আশায় নিজেকে রোহিঙ্গা হিসেবে নিবন্ধিত করা বেআইনি কাজ। বর্তমানে এ ধরনের প্রায় এক হাজার আবেদন তাঁর দপ্তরে জমা পড়েছে। প্রতিটি আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিচয় ও নাগরিকত্ব যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশের পাসপোর্ট, জাতীয় পরিচয়পত্রযা বলছে ইউএনএইচসিআর
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইউএনএইচসিআর-বাংলাদেশের যোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বলেন, সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নতুন আগত রোহিঙ্গাদের প্রাথমিক বায়োমেট্রিক নিবন্ধন সম্পন্ন করে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তথ্য বিনিময়-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই তথ্য ইউএনএইচসিআরের কাছে হস্তান্তর করে। এরপর ২০১৮ সালের জুন থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকার ও ইউএনএইচসিআরের যৌথ যাচাইকরণ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
বাংলাদেশ সরকার ও ইউএনএইচসিআর শরণার্থীদের তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের কাজ যৌথভাবে করে বলে তিনি জানান। শারি নিজমিন বলেন, শরণার্থী নন এমন ব্যক্তিরা যাতে নিবন্ধিত না হন সে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। এসব ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও সীমিতসংখ্যক মানুষ ভুলবশত নিবন্ধিত হয়ে যান। এমন ঘটনা শনাক্ত হলে তা পর্যালোচনা ও সংশোধনের জন্য সরকার ও ইউএনএইচসিআরের একটি সুস্পষ্ট প্রক্রিয়া রয়েছে। বিষয়টি তাঁরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আবেদনগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার যাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করবে, তাদেরই কেবল শরণার্থী নিবন্ধন থেকে বাদ দেওয়া হবে।