কম্পিউটারের সঙ্গে মস্তিষ্কের নতুন যোগাযোগ

· Prothom Alo

চেয়ারে হেলেদুলে বসে আছেন। দুই হাত পকেটে। ল্যাপটপের স্ক্রিনে খোলা একটি অনলাইন দাবার বোর্ড। আপনি কোনো মাউস ধরলেন না, কি-বোর্ডেও হাত দিলেন না; শুধু মনে মনে ভাবলেন ‘ঘোড়াটাকে এবার e4 ঘরে নিয়ে যাই’। সঙ্গে সঙ্গে অলৌকিক কোনো জাদুবলে স্ক্রিনের ঘোড়াটি e4 ঘরে বসে গেল!

Visit moryak.biz for more information.

শুনে কি কোনো সায়েন্স ফিকশনের রূপকথা মনে হচ্ছে? বিজ্ঞানের দুনিয়ায় এটি এখন আর কল্পকাহিনি নয়; বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্নায়ুবিজ্ঞানের এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছে এই প্রযুক্তি। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হচ্ছে ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস বা সংক্ষেপে বিসিআই।

সহজ ভাষায় বললে, মাথার ভেতরের মগজ ও বাইরের কম্পিউটারের মধ্যে কোনো তার বা মাউস ছাড়াই সরাসরি একটি যোগাযোগের সাঁকো তৈরি করে দেওয়া! বিসিআই কীভাবে কাজ করে, তা বোঝার জন্য আমাদের বেশি দূর যেতে হবে না, নিজেদের মাথার ভেতরের কার্যক্রম নিয়ে একটু গবেষণা করলেই হবে।

বিসিআই কীভাবে কাজ করে?

আমাদের মস্তিষ্কে প্রায় ৮ হাজার ৬০০ কোটি নিউরন রয়েছে। আমরা যখনই কোনো কিছু ভাবি—যেমন হাত নাড়ানোর ইচ্ছা, কোনো শব্দ শোনার চেষ্টা কিংবা দাবার চাল দেওয়ার চিন্তা—তখনই আমাদের নিউরনগুলোর মধ্য দিয়ে অতি সূক্ষ্ম বিদ্যুৎতরঙ্গ প্রবাহিত হয়।

মস্তিষ্কে মাইক্রোচিপ ঢুকিয়ে কি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব
ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস বলতে বোঝায়, মাথার ভেতরের মগজ ও বাইরের কম্পিউটারের মধ্যে কোনো তার বা মাউস ছাড়াই সরাসরি একটি যোগাযোগের সাঁকো তৈরি করে দেওয়া!

নিউরনগুলোকে কোটি কোটি ছোট ছোট লাইট বাল্ব হিসেবে কল্পনা করুন। আপনি যখনই কোনো নতুন চিন্তা করেন, নির্দিষ্ট কিছু বাল্ব একসঙ্গে জ্বলে ওঠে। বিজ্ঞানীরা ভাবলেন, এই বিদ্যুৎতরঙ্গকে যদি আমরা বাইরে থেকে মেপে দেখতে পারি, তবেই তো মানুষের মনের ইচ্ছাটি কম্পিউটারকে বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব!

মস্তিষ্কের এই সূক্ষ্ম সংকেতগুলোকে পড়ার জন্য মূলত দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। প্রথমটি হলো নন-ইনভেসিভ (বাইরে থেকে ধরা)। এ ক্ষেত্রে মাথায় একটি বিশেষ ক্যাপ বা হেডব্যান্ড পরে নিতে হয়। এটি চামড়ার ওপর থেকেই মস্তিষ্কের তরঙ্গ মেপে নেয়। এটি নিরাপদ, তবে মাথার খুলি ও চামড়া ভেদ করে সিগন্যাল স্পষ্ট বোঝা একটু কঠিন। দ্বিতীয় পদ্ধতিটি হলো ইনভেসিভ। নিউরালিংকের মতো বিশ্বখ্যাত নিউরোটেক কোম্পানিগুলো এই পদ্ধতি ব্যবহার করছে। মানুষের চুলের চেয়েও কয়েক গুণ সূক্ষ্ম কিছু তার সরাসরি মস্তিষ্কের সেই অংশে বসিয়ে দেওয়া হয়, যা আমাদের নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করে। এই চিপ নিউরনের সিগন্যালগুলো ধরে ব্লুটুথের মাধ্যমে কম্পিউটারে পাঠিয়ে দেয়।

এরপর বাকি কাজটুকু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। এআই অ্যালগরিদম সেই হিজিবিজি বিদ্যুৎ সিগন্যাল বিশ্লেষণ করে বুঝতে পারে, মানুষটি ঠিক কী করতে চাইছে। মানুষটি যদি ভাবে ‘কার্সরটি ডানে সরাও’, এআই নিমেষে সেই চিন্তাকে ডিজিটাল কমান্ডে রূপান্তর করে স্ক্রিনে কার্সরটি ডানে সরিয়ে দেয়!

মানুষের মস্তিষ্কের সমতুল্য নিউরোমরফিক চিপ বাণিজ্যিকীকরণ কি সম্ভব
মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম সংকেতগুলোকে পড়ার জন্য মূলত দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। প্রথমটি হলো নন-ইনভেসিভ। এ ক্ষেত্রে মাথায় একটি বিশেষ ক্যাপ বা হেডব্যান্ড পরে নিতে হয়।

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে সুন্দর ও মানবিক দিকটি হলো চিকিৎসাক্ষেত্রে এর ব্যবহার। দুর্ঘটনায় পড়ে কিংবা জটিল রোগের কারণে যাঁদের শরীর ঘাড়ের নিচ থেকে অবশ হয়ে গেছে, যাঁরা হাত-পা নাড়াতে পারেন না বা কথা বলতে পারেন না, বিসিআই প্রযুক্তি তাঁদের জীবন পুরোপুরি বদলে দিচ্ছে। ইতিমধ্যে বহু পক্ষাঘাতগ্রস্ত মানুষ মাথার চিপ ব্যবহার করে কেবল চিন্তার শক্তিতে কম্পিউটারে দাবা খেলছেন, সমাজমাধ্যমে বার্তা পাঠাচ্ছেন, এমনকি রোবোটিক হাত নিয়ন্ত্রণ করে নিজেই কফির কাপে চুমুক দিচ্ছেন! ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইলন মাস্কের নিউরালিংক কোম্পানি নোল্যান্ড আরবো নামে এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কে প্রথমবারের মতো সফলভাবে এই চিপ স্থাপন করে। এই চিপের সাহায্যে তিনি শুধু ভেবেই কম্পিউটারে গেম খেলতে সক্ষম হন।

২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইলন মাস্কের নিউরালিংক পক্ষাঘাতগ্রস্ত নোল্যান্ড আরবোর মস্তিষ্কে প্রথমবারের মতো সফলভাবে তাদের ব্রেন-চিপ স্থাপন করে

সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা বিসিআইয়ের সঙ্গে স্পিচ-এআই যুক্ত করে এমন এক প্রযুক্তি তৈরি করেছেন, যা একজন বাক্‌প্রতিবন্ধী মানুষের মস্তিষ্কের চিন্তা থেকে সরাসরি তাঁর হারিয়ে যাওয়া কণ্ঠস্বর ফিরিয়ে আনতে পারছে। পাঠকেরা নিশ্চয়ই ভাবছেন, কম্পিউটার যদি আমার মাথার চিন্তা পড়ে ফেলতে পারে, তবে আমার মনের গোপন কথা কি আর গোপন থাকবে?

প্রশ্নটি অত্যন্ত যুক্তিসংগত। বিসিআই প্রযুক্তির এই অভাবনীয় অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে উঠে আসছে এক নতুন নৈতিক প্রশ্ন—ব্রেন প্রাইভেসি বা মস্তিষ্কের গোপনীয়তা।

নিউরালিংকের ব্রেইন চিপ কীভাবে কাজ করে?
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ইলন মাস্কের নিউরালিংক কোম্পানি নোল্যান্ড আরবো নামে এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কে প্রথমবারের মতো সফলভাবে এই চিপ স্থাপন করে।

আমরা ইন্টারনেটে কী সার্চ করি বা ফেসবুকে কী লিখি, তা প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো জানতে পারে। কিন্তু আমরা মাথার ভেতরে কী ভাবছি, আমাদের রাজনৈতিক মতামত, ভয় বা ব্যক্তিগত অনুভূতি—তা যদি কোনো চিপের মাধ্যমে ডিজিটাল ডেটায় রূপান্তরিত হয়, তবে সেই ডেটা হ্যাক হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়। সে কারণেই আন্তর্জাতিক আইনপ্রণেতা ও বিজ্ঞানীরা এখন থেকেই নিউরো-রাইটস বা চিন্তার স্বাধীনতার সুরক্ষা নিয়ে নতুন আইন তৈরির তাগিদ দিচ্ছেন।

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে প্রযুক্তির সীমানা প্রতিদিন নতুন করে লেখা হচ্ছে। চ্যাটবট আমাদের হয়ে কোড লিখে দিচ্ছে, এআই এজেন্ট আমাদের হয়ে প্রজেক্ট সামলাচ্ছে, আর ব্রেন-কম্পিউটার ইন্টারফেস আমাদের চিন্তা ও যন্ত্রের মাঝের দেয়ালটিকে একেবারে মুছে দিচ্ছে।

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে প্রযুক্তির সীমানা প্রতিদিন নতুন করে লেখা হচ্ছে। যেমন, এআই এজেন্ট আমাদের হয়ে প্রজেক্ট সামলাচ্ছে

তবে মনে রাখতে হবে, চিপ কিংবা এআই হাজার গুণ শক্তিশালী হলেও আসল শক্তি কিন্তু আমাদের ওই তিন পাউন্ড ওজনের মানবমস্তিষ্কেই! প্রযুক্তি কেবল আমাদের চিন্তার বিস্তার ঘটাতে পারে, কিন্তু সেই চিন্তার জন্মদাতা আমরাই। তাই বিজ্ঞানের এই বিস্ময়কর যাত্রায় প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে, এর পেছনের মূল বিজ্ঞানকে জানা এবং একে মানবতার কল্যাণে ব্যবহার করাই হোক আমাদের তরুণ প্রজন্মের অঙ্গীকার!

লেখক: শিক্ষার্থী, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকসূত্র: নিউরালিংক ক্লিনিক্যাল স্টাডি আপডেট, এমআইটি টেকনোলজি রিভিউ এবং আইইইই স্পেকট্রামমস্তিষ্কে চিপ বসানো সেই রোগী শুধু চিন্তা করে মাউস নাড়াতে পারছেন: ইলন মাস্ক

Read full story at source