বিজ্ঞান–সাধনার ধ্যানমগ্ন পরিসরে

· Prothom Alo

আমাদের ছোটবেলায় ঢাকাসহ অন্য শহরগুলোতে যেসব প্রতিবন্ধী মানুষ, ভিখারি, বিশেষ করে শিশু দেখতাম, তাদের বেশি ভাগেরই শারীরিক সংকটের কারণ ছিল পোলিও। তখন বলতে গেলে পোলিওর কোনো চিকিৎসাই ছিল না। গত শতাব্দীর মাঝামাঝি পোলিওর টিকা আবিষ্কারের আগপর্যন্ত এ রোগে বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর পাঁচ লাখের বেশি মানুষ মারা যেত অথবা চিরতরে প্রতিবন্ধী হয়ে যেত; তাদের সিংহভাগই ছিল শিশু। খোদ যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশে প্রতিবছর ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার শিশু পোলিও রোগে আক্রান্ত হতো।

Visit sport-newz.biz for more information.

তবে কিছু কিছু মহান ও মেধাবী মানুষের কারণে পৃথিবীর ইতিহাস চিরকালই হঠাৎ হঠাৎ বদলে যায়। এভাবেই ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের চিকিৎসক ও বিজ্ঞানী ডা. জোনাস সাল্ক প্রথম পোলিওর সফল টিকা (আইপিভি) উদ্ভাবন করেন। ১৯৫৩ সালে মানবতার স্বার্থে সাহস করে নিজের ও নিজের পরিবারের ওপর পরীক্ষামূলকভাবে তাঁর সদ্য উদ্ভাবিত টিকার পরীক্ষা চালান। ১৯৫৫ সালে পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়। জোনাস সাল্কের উদ্ভাবিত পোলিও টিকা আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়। গভীর মানবতাবাদী মানুষটি সারা পৃথিবীর অসহায় মানুষের স্বার্থে তাঁর এই আবিষ্কারের ওপর কোনো পেটেন্ট দাবি করেননি। পেটেন্ট দাবি করলে ১৯৫৫ সালের হিসাবেই তিনি সাত বিলিয়ন ডলারের মালিক হয়ে যেতে পারতেন।

লুই কানের নকশায় সাল্ক ইনস্টিটিউট, লা জোলা, সান দিয়াগো, ক্যালিফোর্নিয়া
মোটামুটি একই সময়ে লুই কান আমাদের জাতীয় সংসদ ভবনের নকশা করেন এবং স্রষ্টাকে এক ও অবিভাজ্য সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করা ও ট্রিনিটিকে (পিতা–পুত্র–পবিত্র আত্মা) প্রত্যাখ্যান করা খ্রিষ্টীয় ভাবধারার রচেস্টারের ফার্স্ট ইউনিটারিয়ান চার্চের কাজও শুরু করেন। ভাবতে অবাক লাগে, একই সময়সীমার মধ্যে তিন–তিনটি বিপুল কর্মযজ্ঞের সমান্তরাল সৃষ্টিশীল ও দার্শনিক ভাবনাগুলো তিনি কীভাবে সামলাতে পারতেন।

জোনাস সাল্ক শুধু যে পরম নির্লোভ এবং সত্যিকারের মানবতাবাদী ছিলেন, তা-ই নয়, তিনি ছিলেন গভীর শিল্পবোধসম্পন্ন এবং আধ্যাত্মিকতায় নিমগ্ন একজন পরিশীলিত মানুষ। পোলিও টিকার সফল উদ্ভাবনের পর জোনাস সাল্ক সিদ্ধান্ত নেন যে মূলত টিকা গবেষণা, অণুজীবতত্ত্ব, জিনতত্ত্ব, স্নায়ুবিজ্ঞান, ক্যানসার, ইমিউনোলজি, মলিকুলার বায়োলজিসহ চিকিৎসা–সম্পর্কিত নানা রকম গবেষণার জন্য একটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করবেন।

সে উদ্দেশ্যে ১৯৫৯ সালে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, সান দিয়েগোর (ইউসিএসডি) পাশেই সারা পৃথিবীর বায়োটেক রাজধানী হিসেবে খ্যাত লা জোলা এলাকায় (পরে জেনেছি সত্যিকারের উচ্চারণ হবে ‘লা হোয়া’) তিনি সাল্ক ইনস্টিটিউট ফর বায়োলজিক্যাল স্টাডিজ প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করেন। স্থপতি হিসেবে নির্বাচন করা হয় স্থপতি লুই কানকে। মোটামুটি একই সময়ে লুই কান আমাদের জাতীয় সংসদ ভবনের নকশা করেন এবং স্রষ্টাকে এক ও অবিভাজ্য সত্তা হিসেবে বিশ্বাস করা ও ট্রিনিটিকে (পিতা–পুত্র–পবিত্র আত্মা) প্রত্যাখ্যান করা খ্রিষ্টীয় ভাবধারার রচেস্টারের ফার্স্ট ইউনিটারিয়ান চার্চের কাজও শুরু করেন। ভাবতে অবাক লাগে, একই সময়সীমার মধ্যে তিন–তিনটি বিপুল কর্মযজ্ঞের সমান্তরাল সৃষ্টিশীল ও দার্শনিক ভাবনাগুলো তিনি কীভাবে সামলাতে পারতেন।

জোনাস সাল্ক
জোনাস সাল্ক চেয়েছিলেন এমন একটি আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে, যেটি হবে সারা পৃথিবীর মেধাবী বিজ্ঞানীদের জন্য একটি আধ্যাত্মিক আশ্রম বা অভয়ারণ্যের মতো। সেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশি সামনে রেখে বিজ্ঞান, মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতা একটি একক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়ে পরম প্রশান্তিতে গবেষকদের ধ্যানমগ্ন করতে পারবে।

স্থপতি লুই কান ও জোনাস সাল্কের পারস্পরিক সৃষ্টিশীল নন্দনতাত্ত্বিক উপলব্ধি এবং প্রায় সমকেন্দ্রিক আধ্যাত্মিকতার মিথস্ক্রিয়াময় অংশীদারত্বের একটি অতি চমৎকার উদাহরণ হয়ে আছে এই প্রকল্প। দুজনেরই গভীর মানবিক দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা তাঁদের মেধা ও সৃষ্টিশীল কল্পনা নিয়ন্ত্রণ করত। তাঁরা উভয়েই জন্মগতভাবে ইহুদি পরিবারের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও রক্ষণশীল ধর্মীয় অনুশাসনের বাইরে গিয়ে ধর্মীয় আচার-অনুশাসনের চেয়ে মানবকল্যাণ, নৈতিকতা ও বিজ্ঞানকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাঁরা চাইতেন, স্থাপত্য ও বিজ্ঞানচিন্তার মধ্যে যেন একটি উচ্চতর নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক শৃঙ্খলা বজায় থাকে। তাঁরা উভয়েই বিশ্বাস করতেন, বিজ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতা একে অপরের বিরোধী নয়; বরং একে অপরকে সমৃদ্ধ করে। মানুষের দায়িত্ব হলো জ্ঞান ব্যবহার করে মানবজাতির কল্যাণ সাধন করা। বিজ্ঞান ও স্থাপত্যকে কেবল প্রযুক্তিগত প্রচেষ্টা হিসেবে নয়; বরং শিল্প, আধ্যাত্মিকতা ও মানবতার প্রকাশ হিসেবে দেখার একটি সফল যৌথ প্রচেষ্টা হচ্ছে এই কাজ। এ কারণে বিজ্ঞান ও স্থাপত্য—দুই ক্ষেত্রেই এই কর্ম একটি কালজয়ী নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আছে।

জোনাস সাল্ক চেয়েছিলেন এমন একটি আধুনিক বিজ্ঞান গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে, যেটি হবে সারা পৃথিবীর মেধাবী বিজ্ঞানীদের জন্য একটি আধ্যাত্মিক আশ্রম বা অভয়ারণ্যের মতো। সেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশি সামনে রেখে বিজ্ঞান, মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতা একটি একক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়ে পরম প্রশান্তিতে গবেষকদের ধ্যানমগ্ন করতে পারবে। এই লক্ষ্য সামনে রেখেই লুই কান আর জোনাস সাল্কের যৌথ পরিকল্পনায় ১৯৬৫ সালে প্রকল্পটি শেষ হয়।

লুই কান
জোনাস সাল্ক লুই কানকে বলেছিলেন, ‘আই ওয়ান্ট আ স্পেস ওয়ার্দি অব আ ভিজিট বাই পিকাসো।’ ‘আমি এমন একটি স্থান চাই, যা হবে পিকাসোর দেখতে আসার যোগ্য।’ কত উঁচু নান্দনিক মাত্রার স্থাপত্য তিনি লুই কানের কাছে আশা করেছিলেন, সেটা বোঝানোর জন্য পিকাসোর নাম আসতেই পারে। তবে এর অন্য একটি কারণও থাকতে পারে।

অনেক বোদ্ধার মতে, এটি বিশ শতকের আধুনিক স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন এবং কানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য কীর্তি। কংক্রিটের বিশাল ক্যানভাসের সঙ্গে বার্মাটিকের সংযত অথচ শক্তিশালী ব্যবহারে ডিজাইন করা এ প্রতিষ্ঠান দিগন্তহীন প্রশান্ত মহাসাগরের কাছে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞান, প্রকৃতি ও নীরবতার এক গভীর সংলাপ সৃষ্টি করেছে, যা বিজ্ঞানী ও শিল্পী—উভয়কেই বিমুগ্ধ ও সাধনায় ধ্যানমগ্ন করবে।

প্রকল্পটির মাঝখানের খোলা প্রাঙ্গণের সরু জলধারা দৃষ্টি টেনে নেয় অসীম সমুদ্র-আকাশের যৌথ চিত্রকল্পের দিকে। অন্যদিকে লুই কানের শক্তিশালী, পরিশীলিত ও দৃশ্যমান জ্যামিতি গবেষণাকে রূপ দেয় ধ্যানমগ্ন এক অভিজ্ঞতায়। পরিসরের বাস্তব প্রেক্ষাপট, বিরাজমান টপোগ্রাফির পরিপূর্ণ সৃষ্টিশীল সদ্ব্যবহার এবং পশ্চিম দিগন্তের সীমাহীন প্রশান্ত মহাসাগরীয় নীল জলরাশির আধ্যাত্মিক আহ্বান অপূর্ব রসায়ন সৃষ্টি করে সমগ্র ডিজাইনের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে এক ভিন্নতর আবহ সৃষ্টি করে, যা যেকোনো দর্শককে ধীরে ধীরে গ্রস্ত করে ফেলবে।

জীবনের এই বেলায় এখানে উপস্থিত হতে পারা আমার জন্য ছিল গভীর আনন্দময়তার পূর্ণ এক অনুভূতি। দীর্ঘদিন ধরে ছবিতে দেখা স্থাপনাটি বাস্তবে ধরা দিল খুবই নীরব ও মহিমান্বিত বিস্ময় হয়ে। কানের স্থাপত্যের ভেতরে দাঁড়িয়ে মনে হলো, আমি কেবল একটি স্থাপত্য দেখছি না; বরং ক্রমে গভীর মানবিক মেধা, সৃজনশীলতা ও সময়ের সঙ্গে কথোপকথনরত এক জীবন্ত কবিতার অংশ হয়ে উঠছি।

জোনাস সাল্ক লুই কানকে বলেছিলেন, ‘আই ওয়ান্ট আ স্পেস ওয়ার্দি অব আ ভিজিট বাই পিকাসো।’ ‘আমি এমন একটি স্থান চাই, যা হবে পিকাসোর দেখতে আসার যোগ্য।’ কত উঁচু নান্দনিক মাত্রার স্থাপত্য তিনি লুই কানের কাছে আশা করেছিলেন, সেটা বোঝানোর জন্য পিকাসোর নাম আসতেই পারে। তবে এর অন্য একটি কারণও থাকতে পারে। এটা আমি কোনো বই পড়ে জানতে পারিনি, জেনেছি আমার এক সান দিয়োগোপ্রবাসী চিকিৎসক বন্ধুর কাছ থেকে, যে আমাকে এই স্থাপত্যকর্ম দেখাতে নিয়ে এসেছে।

গোল্ফ-জুয়ানের সৈকতে ফ্রাঁসোয়া জিলো ও পাবলো পিকাসো, ১৯৪৮।
এই স্থাপত্যকর্মের বিস্ময়কর শৈল্পিক প্রকাশভঙ্গি, আধ্যাত্মিকতার সফল মিশ্রণ এবং সর্বজনীন মানবিকতাকে আত্মস্থ করার সফল প্রয়াস দেখে পিকাসো নিশ্চয়ই মুগ্ধ হতেন। কিন্তু জোনাস সাল্কের স্ত্রী ও পিকাসোর প্রেমিকা ফ্রাঁসোয়া জিলোর বাঙালি ডাক্তার, আমার বাল্যবন্ধু, বিখ্যাত বিপ্লবী হাজী দানেশের নাতি ডা. আবু নাসেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাকে এই বিস্ময়কর ও সুখময় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করিয়ে দেওয়ার জন্য।

জানতে পারলাম, জোনাস সাল্কের স্ত্রী ফ্রাঁসোয়া জিলো বহু বছর ধরে আমার এই চিকিৎসক বন্ধুর নিয়মিত রোগী। ফ্রাঁসোয়া জিলো জোনাস সাল্ককে বিয়ে করেন ১৯৭০ সালে। তাঁর বয়স তখন প্রায় ৫০ বছর। এই বিয়ের বহু বছর আগে তিনি ছিলেন পাবলো পিকাসোর দীর্ঘদিনের প্রেমিকা এবং দুই সন্তানের মা। তিনি নিজেও ছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী। জোনাস সাল্ককে বিয়ে করার পর তাঁরা সাল্ক ইনস্টিটিউটেই বাস করতেন।

ফ্রাঁসোয়া জিলোর সঙ্গে পিকাসোর সম্পর্কের কারণেও ‘আই ওয়ান্ট আ স্পেস ওয়ার্দি অব আ ভিজিট বাই পিকাসো’—এই ইঙ্গিতপূর্ণ বাক্যটি জোনাস সাল্ক উচ্চারণ করে থাকতে পারেন বলে অনেকে ধারণা করেন; অন্তত পিকাসোর সাবেক প্রেমিকা ও জোনাস সাল্কের স্ত্রী ফ্রাঁসোয়া জিলোর নাকি এমনটাই ধারণা ছিল। তবে আমার নিজের কাছে ধারণাটি দুর্বল বলেই মনে হয়েছে। এই দুটো মতের যেটাই সত্য হোক না কেন, এই স্থাপত্যকর্মের বিস্ময়কর শৈল্পিক প্রকাশভঙ্গি, আধ্যাত্মিকতার সফল মিশ্রণ এবং সর্বজনীন মানবিকতাকে আত্মস্থ করার সফল প্রয়াস দেখে পিকাসো নিশ্চয়ই মুগ্ধ হতেন।

কিন্তু জোনাস সাল্কের স্ত্রী ও পিকাসোর প্রেমিকা ফ্রাঁসোয়া জিলোর বাঙালি ডাক্তার, আমার বাল্যবন্ধু, বিখ্যাত বিপ্লবী হাজী দানেশের নাতি ডা. আবু নাসেরকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাকে এই বিস্ময়কর ও সুখময় অভিজ্ঞতার মুখোমুখি করিয়ে দেওয়ার জন্য।

Read full story at source