বৃষ্টির চিঠি
· Prothom Alo

১.
Visit hilogame.news for more information.
শহরের পুরোনো বইয়ের দোকানটার নাম ছিল ‘অক্ষরকুঞ্জ’। রোজ বিকেলে অফিস শেষে অন্বেষা সেখানে আসত, শুধু একটু সময় কাটানোর জন্য। বইয়ের গন্ধ তার ভালো লাগত, আর তার চেয়েও ভালো লাগত দোকানের কোণের চেয়ারটায় বসে জানালা দিয়ে রাস্তার মানুষ দেখা।
সেদিনও বৃষ্টি নেমেছিল হঠাৎ করে। অন্বেষা দৌড়ে দোকানে ঢুকতেই দেখল, তার প্রিয় চেয়ারটায় আগে থেকেই কেউ বসে আছে। একটা ছেলে, হাতে পুরোনো একটা কবিতার বই, মাথা নিচু করে পড়ছে।
‘এক্সকিউজ মি,’ অন্বেষা একটু ইতস্তত করে বলল, ‘ওই চেয়ারটা... মানে, আমি রোজ ওখানেই বসি।’
ছেলেটা মুখ তুলে তাকাল। চোখে চশমা, ঠোঁটে হালকা হাসি। ‘ওহ্, দুঃখিত। আমি তো জানতাম না এটা কারও সংরক্ষিত আসন।’ সে উঠে দাঁড়াতে গেল।
‘না না, থাক,’ অন্বেষা তাড়াতাড়ি বলল, নিজের কথায় নিজেই একটু লজ্জা পেয়ে। ‘আজকে না হয় ভাগ করে নিলাম।’
সেই বৃষ্টির বিকেলে তারা কথা বলেছিল প্রায় দুই ঘণ্টা। ছেলেটার নাম ছিল আরিয়ান। সে শহরে নতুন এসেছে, একটা প্রকাশনী সংস্থায় কাজ করে। কবিতা তার নেশা, চা তার দুর্বলতা।
দুই
এর পর থেকে বিকেলগুলো বদলে গেল। অন্বেষা আর আরিয়ান রোজ ওই একই চেয়ারের আশপাশে দেখা করত। কখনো বই নিয়ে তর্ক, কখনো চুপচাপ পাশাপাশি বসে পড়া, কখনো শুধু জানালার বাইরে বৃষ্টি দেখা।
আরিয়ান একদিন বলেছিল, ‘জানো, আমার মনে হয় প্রত্যেক মানুষের জীবনে একটা ঋতু থাকে, যেটা তাকে সবচেয়ে বেশি মানায়। তোমাকে বর্ষার মতো লাগে। হঠাৎ আসা, সব কিছু ভিজিয়ে দেওয়া, তারপর আকাশ পরিষ্কার করে দেওয়া।’
অন্বেষা হেসেছিল। ‘আর তোমাকে?’
‘আমাকে শীতের সকালের মতো। একটু দেরিতে জেগে ওঠা, কিন্তু যখন ওঠে, রোদ্দুরটা বেশ আরামদায়ক লাগে।’
মাসগুলো এভাবেই কেটে গেল। ছোট ছোট মুহূর্ত জমতে জমতে একটা গল্প তৈরি হচ্ছিল, যেটা কেউ জোর করে লেখেনি, নিজে থেকেই লেখা হয়ে যাচ্ছিল।
তিন
কিন্তু জীবন তো গল্পের মতো সোজা রাস্তায় চলে না।
একদিন আরিয়ান জানাল, তার প্রকাশনী সংস্থা তাকে অন্য শহরে বদলি করছে। বড় সুযোগ, না করার উপায় নেই। অন্বেষা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর বলল, ‘ভালো তো। তোমার স্বপ্নের কাজ।’
‘তুমি রাগ করছ না?’
‘না,’ অন্বেষা মিথ্যে হাসি হাসল। ‘শুধু... অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল তোমাকে এখানে দেখার।’
যাওয়ার আগের দিন তারা শেষবারের মতো ‘অক্ষরকুঞ্জ’-এ দেখা করল। বৃষ্টি সেদিনও ছিল, যেন প্রথম দিনের প্রতিধ্বনি। আরিয়ান একটা খাম এগিয়ে দিল।
‘এটা কী?’
‘একটা চিঠি। এখনই পোড়ো না। বাড়ি গিয়ে পোড়ো।’
চার
বাড়ি ফিরে অন্বেষা খামটা খুলল। ভেতরে একটা ছোট কবিতা লেখা—আরিয়ানের নিজের হাতে লেখা, নিজের কথায়। কবিতাটার শেষ লাইনে লেখা ছিল, দূরত্ব যদি মনের কাছাকাছি থাকার একটা নতুন উপায় হয়ে ওঠে, তাহলে বিদায় বলে কিছু নেই, শুধু অপেক্ষার একটা নতুন অধ্যায় আছে।
চিঠির নিচে একটা লাইন যোগ করা—‘অক্ষরকুঞ্জের ওই চেয়ারটা তোমার জন্যই থাক। আমি ফিরে আসব, ঠিক আরেকটা বৃষ্টির দিনে।’
অন্বেষা চিঠিটা বুকের কাছে চেপে ধরল। কান্না পাচ্ছিল, কিন্তু সেই কান্নায় দুঃখের চেয়ে বেশি ছিল একটা শান্ত বিশ্বাস।
সে জানত না আরিয়ান কবে ফিরবে। হয়তো ছয় মাস, হয়তো এক বছর। কিন্তু প্রতি বৃষ্টির দিনে সে ‘অক্ষরকুঞ্জ’-এ যেত, ওই একই চেয়ারে বসত, আর জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকত।
কারণ, কিছু কিছু বিরহ দুঃখের হয় না। কিছু কিছু বিরহ শুধু অপেক্ষার একটা সুন্দর নাম।
* লেখা: মো. তন্ময় হাসান সিয়াম
নাগরিক সংবাদে জীবনের গল্প, নানা আয়োজনের খবর, ভিডিও, ছবি ও লেখা পাঠাতে পারবেন পাঠকেরা। ই-মেইল: [email protected]