জ্ঞান কখন মানুষকে ধর্মভীরু করে

· Prothom Alo

আজকের বিশ্ব তথ্যের বিপুল সাগরে ভাসছে। ইন্টারনেটের এক ক্লিকেই মিলছে দুনিয়ার যেকোনো বিষয়ের অগণিত তথ্য ও উপাত্ত। কিন্তু এই অসীম তথ্যের ভিড়েও মানুষের অন্তরের হাহাকার ও আত্মিক শূন্যতা মোটেও কমেনি, বরং দিন দিন বেড়েছে।

Visit casino-promo.biz for more information.

এর একটি বড় কারণ, আমরা ‘তথ্য’ ও প্রকৃত জ্ঞানকে (ইলম) এক করে ফেলছি। ইসলামে জ্ঞান অর্জন শুধু মস্তিষ্ককে তথ্যে সমৃদ্ধ করার বিষয় নয়; বরং তা হলো আত্মাকে পরিচ্ছন্ন করার, জীবনকে সুন্দর করার এবং মহান আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের প্রধানতম আত্মিক মাধ্যম।

নবীজির ওপর হেরা গুহায় ওহির সূচনালগ্নে সর্বপ্রথম যে শব্দটি নাজিল হয়, তা হলো ‘ইকরা’—যার অর্থ ‘পড়ো’ (সুরা আলাক, আয়াত: ১)। এই একটিমাত্র নির্দেশের মধ্য দিয়ে ইসলামে জ্ঞানার্জনের মৌলিক গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

সুরা ফাতির, আয়াত: ২৮)বান্দাদের মধ্যে তারাই আল্লাহকে ভয় করে যারা জ্ঞানী।

আমরা পড়ার মাধ্যমেই জ্ঞান অর্জন করি। কিন্তু ইসলামে জ্ঞান অর্জন করাকে কেন এত উচ্চে স্থান দেওয়া হয়েছে? কারণ প্রজ্ঞা ও ধর্মীয় ইলম ছাড়া একজন মানুষ কখনই তার সৃষ্টির আসল উদ্দেশ্য ও পৃথিবীতে তার ভূমিকার কথা সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে পারে না।

মহান আল্লাহ যেভাবে ইবাদত পছন্দ করেন, সঠিক প্রজ্ঞা ছাড়া সেভাবে ইবাদত করা সম্ভব নয়। আর জ্ঞান ছাড়া মানুষ কখনো সত্যিকারের আত্মিক বা আধ্যাত্মিক মানবে পরিণত হতে পারে না।

তথ্য ও জ্ঞানের পার্থক্য

যেকোনো তথ্য পেলেই তা ‘জ্ঞান’ হয়ে যায় না। তথ্যের সঙ্গে যখন আন্তরিক অনুধাবন, সঠিক নিয়ত এবং সৎকর্ম যুক্ত হয়, তখনই তা প্রকৃত ইলম বা প্রজ্ঞায় পরিণত হয়। জ্ঞান যখন একজন মানুষের অন্তরে স্থান করে নেয়, তখন তা তার স্বভাব ও আচরণের অংশ হয়ে দাঁড়ায়।

নতুন কোনো ভালো কথা শেখার পর তার ওপর আমল করাই হলো তথ্যকে জ্ঞানে রূপান্তর করার একমাত্র উপায়।  আমরা যখন অর্জিত জ্ঞানের আলোকে জীবন পরিচালনা করি, তখন মহান আল্লাহ আমাদের প্রজ্ঞার দরজা আরও বাড়িয়ে দেন।

যে ৪ ধরনের ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা করা সবার জন্য ফরজ

মহানবী (সা.) বলেছেন, “আল্লাহ–তাআলা যার কল্যাণ চান, তাকে ধর্মের প্রজ্ঞা বা গভীর বোঝাপড়া দান করেন” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭১)। আর এজন্যই কোরআনে দোয়া শেখানো হয়েছে, “হে আমার প্রতিপালক আমার জ্ঞানে সমৃদ্ধ করুন।” (সুরা ত্বাহা, আয়াত: ১১৪)

ধর্মীয় প্রজ্ঞা ছাড়া আধ্যাত্মিকতা অসম্ভব

অনেকে জ্ঞানচর্চা বা ইসলামের মৌলিক হুকুম-আহকাম শেখা ছাড়াই আত্মিক প্রশান্তি বা আধ্যাত্মিকতা অর্জনের কথা বলেন। কিন্তু ইসলামি জীবনদর্শনে প্রজ্ঞা ছাড়া আধ্যাত্মিকতা শুধু এক ধরনের বিভ্রম মাত্র। 

আমরা যদি আল্লাহর প্রিয় বান্দা হতে চাই, তবে আমাদের শিখতে হবে কীসে আমাদের স্রষ্টা সন্তুষ্ট হন এবং কীসে অসন্তুষ্ট হন। কীভাবে নিজের অন্তর থেকে হিংসা, অহংকার ও পাপাচারের পঙ্কিলতা ধুয়ে-মুছে সাফ করা যায়—তা জানার নামই প্রকৃত জ্ঞান।

হৃদয়ে জ্ঞানের এই আলো প্রজ্জ্বলিত হলে তা ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, সমাজ ও আশপাশের মানুষের মধ্যে। সমাজ আল্লাহমুখী হয় এবং খোদার বিধান মানার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি দৃপ্ত হতে থাকে।

আত্মিক উন্নতির যাত্রা সবসময় মৌলিক বিষয়গুলো দিয়ে শুরু করতে হয়। পাপ থেকে মুক্ত না হয়ে কিংবা ফরজ ইবাদতগুলো শক্তভাবে পালন না করে উচ্চমার্গীয় আধ্যাত্মিক অনুভূতি আশা করা যায় না।

এ পথে একজন সৎ ও প্রজ্ঞাবান আত্মিক শিক্ষক বা শাইখের দিকনির্দেশনা জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে দারুণ ভূমিকা রাখে।

জ্ঞানার্জনের অবিনাশী যাত্রা

মৌলিক ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের পর বাধ্যতামূলক দায়িত্বগুলো পালনে যখন একজন মানুষ স্থিতু হয়, তখন তাঁর উচিত নিজের আত্মিক সৌন্দর্য বাড়াতে আরও গভীর জ্ঞান অর্জন করা। এটি জীবনের নির্দিষ্ট কোনো বয়সে থেমে যাওয়ার বিষয় নয়; বরং এটি দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন যাত্রা

জ্ঞানার্জনের তৃষ্ণা সজীব রাখার অর্থই হলো বান্দা বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করছে যে সে এখনও নিখুঁত হতে পারেনি, তার আরও উন্নতির সুযোগ রয়েছে। এই সহজাত তাগিদ মানুষের মূল কাঠামোর ভেতরেই বুনে দেওয়া হয়েছে।

‘যে বিষয়ে আপনার জ্ঞান নেই, তাতে ধৈর্য রাখবেন কীভাবে?’

মহান আল্লাহ যখন প্রথম মানব নবী  আদমকে সৃষ্টি করলেন, তখন তিনি তাঁকে সকল বস্তুর নাম ও মৌলিক জ্ঞান শিক্ষা দিলেন। (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩১)

মুফাসসিরদের মতে, এতে জাগতিক বস্তুর জ্ঞানের পাশাপাশি স্রষ্টার গুণাবলি ও আত্মিক জ্ঞানও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এটি প্রমাণ করে যে মানুষকে তৈরিই করা হয়েছে শেখার জন্য এবং সত্যকে জানার জন্য।

জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করে

মহানবী (সা.) জ্ঞানকে ‘নুর’ (জ্যোতি) বলে আখ্যায়িত করেছেন। যখন পবিত্র জ্ঞান মানুষের হৃদয়ে প্রবেশ করে, তখন তা জীবনের সব সংশয় ও পাপাচারের অন্ধকার দূর করে দেয়। মানুষ নিজেকে আল্লাহর আরও কাছাকাছি অনুভব করে।

তখন নামাজের মধ্যে গভীর মনোযোগ তৈরি হয় এবং কোরআন পাঠ করলে তা সরাসরি হৃদয়ে গিয়ে দোলা দেয়। প্রকৃতির বৈচিত্র্য ও সৃষ্টির সৌন্দর্যের মাঝে মানুষ তখন তার প্রতিপালকের অসীম ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার স্পর্শ দেখতে পায়। ফলে অসৎ বা অপছন্দনীয় কাজে লিপ্ত হওয়া তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।

সুরা আনফাল, আয়াত: ২–৪আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় কেঁপে এবং যখন তাঁর আয়াত তাদের সামনে পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ইমান বৃদ্ধি করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপরই ভরসা করে।

হৃদয়ে জ্ঞানের এই আলো প্রজ্জ্বলিত হলে তা ছড়িয়ে পড়ে পরিবার, সমাজ ও আশপাশের মানুষের মধ্যে। সমাজ আল্লাহমুখী হয় এবং খোদার বিধান মানার প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি দৃপ্ত হতে থাকে।

কোরআনে তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহকে স্মরণ করা হলে তাদের হৃদয় কেঁপে এবং যখন তাঁর আয়াত তাদের সামনে পাঠ করা হয়, তখন তা তাদের ইমান বৃদ্ধি করে এবং তারা তাদের প্রতিপালকের ওপরই ভরসা করে।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ২–৪)

এই সবকিছুর মূলে আছে জ্ঞান। তাই আল্লাহ বলেছেন, ‘বান্দাদের মধ্যে তারাই আল্লাহকে ভয় করে যারা জ্ঞানী।’ (সুরা ফাতির, আয়াত: ২৮) 

মোট কথা, প্রকৃত জ্ঞান মানুষকে অহংকারী করে না, বরং বিনয়ী ও খোদাভীরু করে তোলে। জ্ঞানচর্চা আর আধ্যাত্মিকতা আলাদা কোনো পথ নয়; বরং সত্য জ্ঞানের পথ ধরেই মানুষ পৌঁছায় পরম আত্মিক প্রশান্তিতে।

জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য নবীজির দেখানো ১০ উপায়

Read full story at source