ক্যাটারিং ট্রাকে চড়ে উড়োজাহাজ পাল্টে ট্রাম্পের তুরস্ক ত্যাগের নাটকীয় ঘটনা কীভাবে জানা গেল
· Prothom Alo

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফাঁকি দেওয়ার কৌশল বা চাল হিসেবে গত ৮ জুলাই ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’-এ উঠেছিলেন।
তুরস্কে ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের শেষ দিনে, ট্রাম্প সেই উড়োজাহাজের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠেন। যুক্তরাষ্ট্রে ফেরার জন্য তাঁর স্বাভাবিকভাবে এই উড়োজাহাজে ওঠার কথা ছিল। তিনি সিঁড়ি বেয়ে উঠে উড়োজাহাজের দরজায় দাঁড়িয়ে ক্যামরার দিকে তাকিয়ে সংক্ষেপে হাত নাড়েন।
Visit sweetbonanza.qpon for more information.
ট্রাম্প কয়েক দশক ধরে ‘এয়ারফোর্স ওয়ান’ হিসেবে ব্যবহৃত আইকনিক, হালকা নীল রঙের ৭৪৭ উড়োজাহাজের ভেতরে অদৃশ্য হয়ে যান। এরপর একটি ক্যাটারিং কনটেইনারের ভেতরে লুকিয়ে গোপনে সেই উড়োজাহাজ থেকে বের হয়ে যান তিনি।
তুরস্ক থেকে গোপন ফ্লাইটে নিয়ে যেতে ট্রাম্পকে এরপর একটি সামরিক উড়োজাহাজে তুলে দেওয়া হয়।
বলা হচ্ছে, ইরান থেকে এয়ারফোর্স ওয়ানের ওপর হামলার ‘বিশ্বাসযোগ্য’ হুমকি থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিক, হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তা ও সহযোগীদের নিয়ে ট্রাম্প যথারীতি ৭৪৭ উড়োজাহাজে ওঠেন।
কয়েক বছর ধরে ইরানের কথিত নিশানায় থাকা এক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে রক্ষার জন্য এই কৌশল নেওয়া হয়েছিল।
নিউইয়র্ক ট্রাইমসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, তুরস্কে ট্রাম্পের শেষ দিন শুরু হওয়ার সময় এই নতুন হুমকি সামনে আসে। এই হুমকির বিষয়ে জানেন এমন দুই কর্মকর্তার মতে, মার্কিন গোয়েন্দারা রাতেই একাধিক সূত্রে খবর পান, ট্রাম্প ঠিক কোথায় এবং কোন তলায় থাকছেন, তা ইরানিরা হুবহু জানেন এবং ন্যাটো সম্মেলনের কাছাকাছি এলাকায় কাঁধে রেখে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রসহ একজনকে দেখা গেছে।
ইরানের হামলার হুমকিতে তুরস্ক থেকে গোপনে উড়োজাহাজ বদলের ঘটনা নিশ্চিত করলেন ট্রাম্পমার্কিন কর্মকর্তারা সঙ্গে সঙ্গেই পরিকল্পনা আঁটতে শুরু করেন। হুমকি পর্যালোচনা এবং কীভাবে এর জবাব দেওয়া হবে, তা ঠিক করার ক্ষেত্রে জয়েন্ট চিফ অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন ছিলেন অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। এ ধরনের কৌশলের বিষয়ে জেনারেল কেইনের বেশ ভালো অভিজ্ঞতা আছে।
কেইনের আগের কাজ ছিল সিআইএর সঙ্গে পেন্টাগনের যোগাযোগ রক্ষা করা। ২০২৫ সালের জুনে মার্কিন বাহিনী যখন ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রগুলোয় হামলা চালায় (অপারেশন মিডনাইট হ্যামার), তখন তিনি এই নজর ঘোরানোর বা বিভ্রান্ত করার কৌশল তৈরিতে সাহায্য করেছিলেন।
ট্রাম্পকে ছাড়া যাঁরা উড়োজাহাজে উঠেছিলেন, তাঁদের সবাই কিন্তু এই বিষয়টি সম্পর্কে পুরোপুরি অন্ধকারে ছিলেন না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই হুমকির বিষয়টি জানতেন। স্পর্শকাতর একটি বিষয় নিয়ে আলোচনার স্বার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্পকে নিরাপদে তুরস্ক থেকে বের করে আনার পরিকল্পনা তৈরিতে সাহায্য করার পর রুবিও সেই পুরোনো উড়োজাহাজটিতেই ভ্রমণ করেছিলেন।
কাতারের দেওয়া উপহারের নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে জয়েন্ট অ্যান্ড্রুস বিমানঘাঁটিতে নামছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ৯ জুলাই ২০২৬, মেরিল্যান্ডঊর্ধ্বতন এক মার্কিন কর্মকর্তার তথ্যমতে, প্রেসিডেন্টকে ছাড়া ভ্রমণ করা অন্য জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট, হোয়াইট হাউসের যোগাযোগ পরিচালক স্টিভেন চিউং, ট্রাম্পের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলার এবং হোয়াইট হাউসের আরও বেশ কয়েকজন কর্মী। তবে তাঁরা সবাই এই হুমকির কথা জানতেন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
এই বিস্তৃত ও বিভ্রান্তিকর কৌশল নিয়ে প্রথম প্রথম প্রতিবেদন করেছিল ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’। শেষ পর্যন্ত এয়ারফোর্স ওয়ানের কিংবা ট্রাম্পকে বহনকারী সামরিক জেটের কোনো ক্ষতি না হলেও কমান্ডার ইন চিফের (প্রেসিডেন্ট) নিরাপত্তায় ঝুঁকিমুক্ত রাখার এই কৌশল নিয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন উঠেছে।
ইরানের হামলার ভয়ে গোপনে খাবারের ট্রাকে, পরে ছোট উড়োজাহাজে তুরস্ক ছেড়েছিলেন ট্রাম্পট্রাম্প পেছনে ফেলে আসা উড়োজাহাজটির যাত্রীরা হুমকির কথা জানুন বা না জানুন, তাঁরা এমন এক ঝুঁকির মধ্যে পড়েছিলেন, যা গোয়েন্দা সংস্থা প্রেসিডেন্টের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে মনে করেছিল।
গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় নিজের এই গোপন স্থানান্তর বা নিরাপদে সরে যাওয়া নিয়ে প্রথম প্রকাশ্য মন্তব্য করেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তটি তাঁর নিজের ছিল না।
ওহাইও থেকে ফেরার পর সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘এটি পুরোপুরি গোয়েন্দা সংস্থার ওপর নির্ভর করে। তারা যা করতে বলেছিল, আমি শুধু সেটাই মেনে চলেছি। তাই, আমি গোয়েন্দা সংস্থা এবং সেনাবাহিনীর নির্দেশ মতো চলি। নিরাপত্তার স্বার্থেই তারা চেয়েছিল আমি যেন অন্য একটি ফ্লাইটে, অন্য একটি উড়োজাহাজে যাই।’
পুরো ঘটনাটি যেভাবে ঘটেছিল
ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তিনি পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানেই যাবেন।
ন্যাটো সম্মেলন থেকে বিদায় নেওয়ার আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘পুরোনো দিনের স্মৃতি মনে করে’ তিনি কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া বিলাসবহুল ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজে না চড়ে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানেই ভ্রমণ করবেন।
পরে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, উপহার পাওয়া উড়োজাহাজটিকে তিনি ইউরোপের ‘দুই বা তিনটি বড় ঘাঁটিতে’ পাঠাচ্ছেন, যাতে সেখানকার সামরিক বাহিনীকে এটি দেখানো যায়।
এরপর ট্রাম্প ক্যামেরা এবং সংবাদমাধ্যমগুলোর সামনে দৃশ্যমানভাবে পুরোনো উড়োজাহাজটির সামনের দিক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করেন। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের ফটোগ্রাফার ডগ মিলসসহ যেসব সাংবাদিক তাঁর সঙ্গে ভ্রমণ করছিলেন, তাঁরা উড়োজাহাজের পেছনের অংশে ওঠেন। তাঁদের সবাইকে জানালার পর্দা নামিয়ে রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়।
তখন যা জানা যায়নি তা হলো, ট্রাম্পকে সম্ভবত উড়োজাহাজের বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ক্যাটারিং কনটেইনার ট্রাকের মাধ্যমে দ্রুত বাইরে বের করে আনা হয়েছিল। এরপর তাঁকে তৃতীয় আরেকটি উড়োজাহাজে নিয়ে যাওয়া হয়। সেই উড়োজাহাজে চেপে তিনি গোপনে যুক্তরাজ্যে যান।
কেন তুরস্ক থেকে ফেরার পথে কাতারের উপহারের বিমান ছাড়তে বাধ্য হলেন ট্রাম্পএই তৃতীয় উড়োজাহাজটি ছিল বোয়িং ৭৫৭-এর একটি সামরিক সংস্করণ, যা ‘সি-৩২ এ’ নামে পরিচিত। তুরস্কে এই উড়োজাহাজটি রানওয়েতে ৭৪৭ এয়ারফোর্স ওয়ানের ঠিক পাশেই পার্ক করা ছিল।
ট্রাম্পের তুরস্ক ত্যাগের প্রক্রিয়ার ভিডিওতে দেখা যায়, পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানের উল্টো পাশে থাকা একটি ক্যাটারিং কনটেইনারবাহী ট্রাক পিছিয়ে আসে এবং তারপর সি-৩২এ উড়োজাহাজের পাশাপাশি চলতে থাকে।
নিউইয়র্ক টাইমসের পর্যালোচনা করা ফুটেজে ক্যাটারিং কনটেইনারটির নিরবচ্ছিন্ন স্পষ্ট দৃশ্য পাওয়া যায় না। তবে মনে হয়, কনটেইনারবাহী ট্রাকের পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানের সামনের অংশ থেকে সরিয়ে সি-৩২এ–এর পেছনের অংশে নেওয়া হচ্ছে।
পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানের পেছনে আরেকটি ক্যাটারিং কনটেইনারবাহী ট্রাক ছিল। তবে ফুটেজে দেখা যায়, সেটিকে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এই ট্রাক সি-৩২এ-এর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেছে বলে মনে হয়নি। সি-৩২এ উড়োজাহাজ উড্ডয়ন করার আগেই পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান আকাশে ওড়ে।
তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলন শেষে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশে উড়োজাহাজে উড্ডয়নের প্রাক্কালে এয়ারফোর্স ওয়ানের পাশে একটি ক্যাটারিং ট্রাক দাঁড়িয়ে আছে। ৮ জুলাই ২০২৬, আঙ্কারাউড়োজাহাজগুলো ইংল্যান্ডে পৌঁছায়
ট্রাম্পের নতুন এয়ারফোর্স ওয়ান (কাতারের দেওয়া উপহারের উড়োজাহাজ) অন্য দুটি উড়োজাহাজের কয়েক ঘণ্টা আগেই যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ডের মিলডেনহল সামরিক ঘাঁটিতে পৌঁছায়। উড়োজাহাজপ্রেমীদের ধারণ করা সেই রাতের লাইভস্ট্রিম ও ছবি (যা দ্য টাইমস পর্যালোচনা করেছে) অনুযায়ী, উড়োজাহাজটি স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ২৬ মিনিটে পৌঁছায়। সি-৩২এ উড়োজাহাজ পৌঁছায় রাত ১০টা ২০ মিনিটে। পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ান ঠিক ৯ মিনিট পর রাত ১০টা ২৯ মিনিটে পৌঁছায়।
সি-৩২এ উড়োজাহাজের কোনো রেকর্ড করা ফ্লাইট ডেটা নেই। কারণ, উড়োজাহাজটির ট্রান্সমিটারগুলো থেকে ফ্লাইটের পথ এবং স্থানাঙ্ক সম্প্রচার করা হচ্ছিল না। সেই রাতে এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের সম্প্রচার শোনা উড়োজাহাজ পর্যবেক্ষণকারীরা ফ্লাইট মনিটরিং মেসেজ বোর্ড এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খেয়াল করেন, উড়োজাহাজেটি ‘আরসিএইচ১৮’ (রিচ ১৮) কল সাইন ব্যবহার করছিল।
হ্যারি মল্টন নামের উড়োজাহাজ সংশ্লিষ্ট ফটোগ্রাফার ৮ জুলাই মিলডেনহলে উপস্থিত ছিলেন। ওই সময় তিনি এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের বার্তা শুনছিলেন। তিনি নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, এয়ারফোর্স ওয়ান ট্রাফিক কন্ট্রোলারদের নির্দেশ দিয়েছিল, যেন তারা সি-৩২এ উড়োজাহাজটিকে আগে ল্যান্ড করতে দেন।
তুরস্ক থেকে ট্রাম্প কেন তড়িঘড়ি উড়োজাহাজ বদলে দেশে ফিরলেনমিলডেনহলে পৌঁছানোর পর ট্রাম্পকে গোপনে আবার পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। গত সোমবার একজন মার্কিন কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প যে সামরিক উড়োজাহাজে চড়ে যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে তাঁকে একটি গাড়িতে করে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানে নেওয়া হয়।
এরপর ট্রাম্প অন্য একটি প্রবেশপথ দিয়ে উড়োজাহাজে ওঠেন এবং সাংবাদিকদের সামনে স্বাভাবিকভাবে তিনি উড়োজাহাজ থেকে নেমে আসেন।
ট্রাম্পকে রানওয়েতে হেঁটে যেতে দেখা যায়। সেখান থেকে তিনি কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া নতুন এয়ারফোর্স ওয়ানে চড়েন। সেখান থেকে তিনি ওয়াশিংটনে ফিরে যান।