দ্য অডিসি: ক্ষমতার মানচিত্রে ঠিকানাহীন দর্শকের খোঁজ
· Prothom Alo

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ একবার লিখেছিলেন ‘জনতার মাঝেই আছে নির্জনতা’। ঢাকার মতো এত জনবহুল শহরকে এত সহজ করে তিনি চিনিয়েছিলেন তাঁর পাঠকদের। গণমাধ্যম অধ্যয়নের একটা বড় আলোচনার জায়গা দখল করে আছে এই জনতা, এই নির্জনতা। তবে বিদ্যায়তনে একে আমরা বলি লোনলি ক্রাউড।
অষ্টাদশ শতাব্দীর পর, শিল্পায়ন, নগরায়ণ আর আধুনিকায়ন হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে আর মানুষের বহুদিনের যাপিত জীবনের জ্ঞান-বিজ্ঞান, উৎসব, আনন্দ, কষ্ট, প্রেম, বিরহ, আবেগ কিংবা আবেগের মুক্তি সবকিছুর হিসাব–নিকাশ পাল্টে দেয়। ঘুরেফিরে আমাদের লেখায় আসবে মার্ক্স, তিনি দেখাবেন কীভাবে উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে আচার অনুষ্ঠান, পরিবারকাঠামো এমনকি মানুষ কোন গান কীভাবে শুনবে বা উদ্যাপন করবে তার ধরনও। সঙ্গে থাকবেন মার্শাল ম্যাকলুহান, যিনি বলে গেছেন যোগাযোগের মাধ্যম বদলে গেলে বদলে যায় সংস্কৃতির ভূগোল। গোটা দুনিয়া বনে যেতে পারে বৈশ্বিক গ্রাম।
Visit truewildgame.com for more information.
‘দ্য অডিসি’র পোস্টারকৃষি কিংবা কুটিরশিল্পের ওপর ভর করে গড়ে ওঠা গ্রামীণ জীবনে সাধারণত প্রত্যেকেরই কিছু সাংস্কৃতিক ভাষা এবং যোগাযোগের ধরন তৈরি হয়। থাকে নানা ধরনের আনন্দ–বেদনার উপলক্ষ। যা ওই নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা এলাকার মানুষের মগজে লেপ্টে থাকে, যাবতীয় শোক, ভীতি কিংবা ক্রোধের মতো নেতিবাচক শক্তি থেকে সুরক্ষা দেয়, নিউরনে স্বস্তির নিত্যনতুন সংযোগ তৈরি করে দেয়। শিল্পায়নের চাকা ঘুরলে সেই মানুষই গ্রামীণ সহজ সরল জীবন থেকে ছিটকে পড়ে কংক্রিটের জঙ্গলে। জীবনে সেখানে এসে ভর করে একাকিত্ব। কারখানার জাঁতাকলে পিষ্ট যান্ত্রিক জীবন আর নর্দমা ও বস্তির ঘিঞ্জিতে মানুষগুলো পরিণত হয় ‘লোনলি ক্রাউড’। শিকড়হীন মানুষগুলো সারা দিন একসঙ্গে কাজ করে ঠিকই, কিন্তু তাদের দূরত্বটা থেকেই যায়। খাবার খেয়ে পেট ভরে ঠিকই, কিন্তু মন তো ভরে না।
আর ঠিক তখনই আবির্ভাব ঘটে গণমাধ্যমের। বিচ্ছিন্ন, শিকড়হীন মানুষ গোগ্রাসে খেল, বিশ্বাস করল ধারণ করল। গণমাধ্যম সব কথা তারা বিশ্বাস করত বেদ বাক্যের মতো করে। প্রথম মানুষ যখন লুমিয়ের ব্রাদার্সের সিনেমা দেখল, মানুষ মনে করল সত্যি একটা ট্রেন তাদের দিকে ছুটে আসছে। তখন মনে করা হতো দর্শক যা দেখে তা–ই করে। দর্শককে নিষ্ক্রিয় এক পরাধীন সত্তা মনে করা হতো। কিন্তু ধীরে যোগাযোগ কিংবা মিডিয়া বদলেছে, বদলে গেছে দর্শকের ধরন। নানান তাত্ত্বিক আলোচনায় উঠে এসেছে সিনেমা, সংবাদ বা গণমাধ্যমের যেকোনো অনুষ্ঠানের দর্শক এখন আগের থেকেও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে, অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, এমনকি অনেক কিছু তৈরি করতে পারে নয়া মাধ্যমের নিত্যনতুন প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করে।
তবে অডিয়েন্স নিয়ে গবেষণায় নতুন নতুন পালক সংযোজনের পেছনে প্রযুক্তির লম্বা হাতখানাই বারবার সামনে এসেছে। তবে এ আলাপ আরও এগিয়ে নিতে চাইলে মার্শাল ম্যাকলুহানের টেকনোলজিক্যাল ডিটারমিনিজম তত্ত্ব প্রযুক্তির শক্তিশালী প্রভাবের বয়ান বুঝতে সব থেকে বেশি সহায়ক। ‘প্রযুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের চিন্তাভাবনা, আচরণ এবং সমাজের বিকাশকে প্রভাবিত ও রূপান্তরিত করবে’, যোগাযোগ ও গণমাধ্যম দার্শনিক ম্যাকলুহানের এ হক কথা, এখনো দর্শকের নাড়ি নক্ষত্র ঠাওর করতে ফলদায়ী। বলা যেতে পারে এটাই আজকের আলাপের প্রাণ-ভোমরা।
গুটেনবার্গ থেকে হালের এআই। নতুন প্রযুক্তি, মিডিয়া কনটেন্টের বলন-চলনে যেমন পরিবর্তন এনেছে তেমনি অডিয়েন্সের মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতাকে করেছে প্রসারিত। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, বিটিভিতে মনের মুকুরে, মুভি অব দ্য উইক কিংবা ছায়াছন্দ দেখেই তৃপ্ত ছিল বাঙালি অডিয়েন্স। ভিসিআর কিংবা ভিসিপির প্রাদুর্ভাব, অডিয়েন্সকে ‘ইচ্ছেমতো’ শব্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। কনটেন্ট নির্বাচন থেকে শুরু করে কখন দেখবেন, কীভাবে দেখবেন সবকিছুতেই অডিয়েন্সের মর্জি প্রাধান্য পেতে শুরু করে। এ ধারাবাহিকতায়, ‘রিমোট কন্ট্রোল’ আর কেবল টিভি অডিয়েন্সকে হরেকরকম বিকল্প থেকে নিজের পছন্দমতো কনটেন্ট বাছাই করার অবাধ স্বাধীনতা এনে দেয়। আর সোশ্যাল মিডিয়া আসার পর তো অডিয়েন্স শুধু কনজিউমার নন, নিজেই কনটেন্ট তৈরি করে প্রজিউমার বনে গেছেন। আর এআই টুলস প্রজিউমার হওয়ার পথে যুক্ত করে চলেছে একের পর এক নতুন নতুন সব চমক।
‘দ্য অডিসি’র দৃশ্যএকসময় দর্শকের সঙ্গে কনটেন্ট ও সেলিব্রিটিদের সম্পর্ক ছিল সম্পূর্ণ একপক্ষীয়। পছন্দের তারকাদের ভিউকার্ড, পোস্টার, স্টিকার সংগ্রহ করা, ম্যাগাজিনজুড়ে প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের কাটিং জমানোসহ নানা ধরনের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্যারাসোশ্যাল রিলেশনশিপ এগিয়ে যেত। ডিজিটাল মিডিয়া আসার পর একপক্ষীয় সম্পর্কে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। পছন্দের সেলিব্রিটিদের ইনস্টাগ্রাম, টুইটার কিংবা ফেসবুকে অনুসরণ করা, চাইলে সেলিব্রিটিদের করা পোস্টে রি-অ্যাকশন, কমেন্ট, শেয়ার করাসহ নানামুখী যোগাযোগের মাধ্যমে ট্রান্সপ্যারাসোশ্যাল সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আধুনিক অডিয়েন্স এখন কেবল মুভি, সোপ-সিরিয়াল দেখেই ক্ষান্ত নন। নিজেদের ভালো লাগা কিংবা মন্দ লাগার প্রকাশ ঘটাতে মুভি কিংবা সিরিয়ালের চরিত্র, গল্প বা সিকোয়েন্সকে কেন্দ্র করে হরহামেশাই তৈরি করছেন নানা ধরনের রিল, মিমস, কার্টুন, ফটোকার্ড ইত্যাদি। অভিনব কায়দায় বানানো এসব কনটেন্টের মাধ্যমে আবেগীয় মুক্তি বা ক্যাথারসিস ঘটাচ্ছেন নেটিজেনরা। কনটেন্টের মূল উপজীব্য—গল্প, চরিত্র, সিনেমাটোগ্রাফি নিয়ে সিরিয়াস, কখনো–বা স্যাটায়ারধর্মী কথন। এসবের ভিউ, শেয়ার আর বাহারি মন্তব্যে ঠাসা কমেন্ট বক্স দেখলেই বোঝা যায়, তুমুল জনপ্রিয়তার পাশাপাশি, অডিয়েন্সের সোশ্যাল কারেন্সি বা নিজেদের মধ্যে গাল-গপ্পের তালিকায় শীর্ষ অবস্থান এ কনটেন্টগুলোর। এবারের ২০২৫ সালে ‘উৎসব’ ছবিটি ঠিক এভাবেই ধীরে ধীরে দর্শকপ্রিয়তা পায়, এবং বক্স অফিসে বিস্ময় তৈরি করে। বিষয়টি অনেকটা ‘বেদের মেয়ে জোছনা’র (১৮৮৯) সাফল্যকে মনে করিয়ে দেয়। ছিবিটি সে সময় মানুষের মুখে মুখে ঘুরতে ঘুরতে এক অসম্ভব জনপ্রিয়তা স্পর্শ করেছিল, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এখনো মাইলফলক হয়ে রয়েছে। তেমনি ডিজিটাল স্ফিয়ারে মানুষের কিবোর্ড আর বাটনের স্পর্শে উৎসব ছবি নিয়ে তৈরি হয় নব্বই দশকের নস্টালজিয়া। সে থেকেই ছবিটি ধীরে ধীরে সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে। অথচ মুক্তির সময় তেমন কোনো প্রচার–প্রচারণাই করতে দেখা যায়নি উৎসব নির্মাতা দলের। এই ঈদে ‘রইদ’ (২০২৬) মুক্তি পাওয়ার আগেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রুটস নামের একটি পেজ বুক অব জেনেসিস, কিংবা আদি পাপ নিয়ে নিয়মিত লেখা আপলোড করতে থাকে। এবং চলচ্চিত্র নিয়ে আগ্রহ রয়েছে এমন চলচ্চিত্র নিয়ে যারা নিয়মিত কনটেন্ট তৈরি করেন তারা চলচ্চিত্রটি মুক্তি পাওয়ার পর নানা রকম মিথ বা লোকজ মেটাফর নিয়ে নানা বিশ্লেষণী লেখা লিখতে থাকেন।
তবে সবকিছু ছাপিয়ে ক্রিস্টোফার নোলানের অডিসি নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় যে উন্মাদনা তৈরি হয়েছে তার ব্যাপ্তি দৃষ্টি কেড়েছে সবার। টেলারি নামের একটি পেজেও করেছে সম্প্রতি গ্রিক মিথোলজিকে উপজীব্য করে ক্রিস্টোফার নোলানের ‘অডিসি’ মুভিকে ঘিরে। পেজটি মুক্তির আগমুহূর্ত পর্যন্ত অডিসি মহাকাব্য নিয়ে ছোট ছোট রিলস বানিয়ে ছেড়েছিল। মূলত ট্রয় যুদ্ধ শেষে রাজা অডিসিউসের তাঁর রাজ্য ইথাকায় ফিরে আসা নিয়েই মুভির গল্প আবর্তিত। এ মুভির উসিলায় সোশ্যাল মিডিয়া এখন সরগরম এ মিথোলজির চুলচেরা বিশ্লেষণে। অডিসি দেখার আগে বা পরে যারা মূল গল্পটি জানতে চেয়েছেন তাঁদের জন্য এ ধরনের অসংখ্য পেজ তৈরি হয়েছে নানান ভাষায়। কেউ কেউ অডিসি অবলম্বনে পুরোনো পেইন্টিং আর অডিসির স্টিল ব্যবহার করে তুলনামূলক আলোচনা করেছে। বিহাইন্ড দ্য সিন নিয়ে হয়েছে বিস্তর আলোচনা। আর মজা বা ট্রল করা তো ছিলই। যেমন সবার কাছে মোটা মোটা স্ক্রিপ্ট গেলেও এথিনার কাছে গিয়েছিল একটা কাগজ। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এআই দিয়ে নির্মিত কিছু মিমস আর রিল নজর কেড়েছে, যেখানে অডিয়েন্সরা অডিসির চরিত্রগুলোকে নিজেদের কনটেক্সটের সঙ্গে মিলিয়ে বিনির্মাণ করে চলেছেন। যেমন—একটি মিমসে দেখা যাচ্ছে ট্রয় নগরীর দরজা খুলে দেওয়ার পর একদল সৈন্য যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু একজন বেশ লম্বা-সুঠামদেহী আগামেমননকে দেখা যাচ্ছে যুদ্ধে অংশ না নিয়ে, ধীর পায়ে হেঁটে এসে এক জায়গায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে। ঠিক তখনই ভিডিও স্টিল করে বেসলাইনে লেখা হলো ‘কেউ কেউ বিনা পরিশ্রমে এভাবেই মুফতে এ প্লাস পেয়ে যায়!’ আবার একটি রিলের বেসলাইনে লেখা, ‘অডিসিয়াসের ইথিকায় পৌঁছতে ১০ বছর লাগার আসল কারণ! রিলে দেখানো হয়, ম্যাট ডেমন (অডিসিয়াস) ম্যাপ বাদ দিয়ে গুগল ম্যাপের আশ্রয় নিচ্ছেন। গুগল ম্যাপের কাছে ইথাকায় যাওয়ার দিকনির্দেশনা চাচ্ছেন। যথারীতি গুগল ম্যাপ ভুল লোকেশন দেখিয়ে যাচ্ছে একটার পর একটা। অর্থাৎ অডিসিয়াস যদি বর্তমান সময়ে ইথাকায় ফিরতেন আর গুগল ম্যাপের সাহায্য নিতেন তাহলে কী ধরনের বিড়ম্বনায় পড়তেন তাই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এআই ব্যবহার করে মিথোলজিক্যাল মুভির সঙ্গে বর্তমান প্রেক্ষিতের দারুণ সংমিশ্রণ, যা একদিকে, অডিয়েন্স রিলেট করতে পেরে আনন্দ পাচ্ছে, আবার অন্যদিকে একসময় যে মানুষের কেবল মুভি দেখে ক্যাথারসিস বা আবেগীয় মুক্তি হতো, তা এখন মুভিকেন্দ্রিক নানা রকম রিলস দেখে হচ্ছে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে কিন্তু সেই ব্যবসা আরও খানিকটা প্রমোশনই মাথা চাড়া দিচ্ছে। কীভাবে! অ্যালগরিদমের কাঁধে ভর করে এসব কনটেন্ট পৌঁছে যাচ্ছে টার্গেট অডিয়েন্সের ফিডে আর ওই একই টার্গেট অডিয়েন্সকে প্রজিউমার বানিয়ে মুফতে সিনেমার প্রমোশন হয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের ইউজিসির মাধ্যমে কিছু প্রজিউমার রাতারাতি কনটেন্ট ক্রিয়েটর বনে গিয়ে ইন্টিগ্রেটেড মার্কেটিংয়ের অংশ হয়ে যাচ্ছেন বটে আর আখেরে ব্যবসা বা ক্ষমতার পাল্লা ওদিকেই ভারি হচ্ছে।
‘দ্য অডিসি’র দৃশ্যফলে দর্শকের সেই ‘লোনলি ক্রাউড’ দশা থেকে আজকের এই যে ‘প্রজিউমার’ দশায় উপনীত হওয়া সেখানে কতটুকু দর্শকের ক্ষমতায়ন ঘটল নাকি হলিউডের মতো দাপুটে ইন্ডাস্ট্রির দখল বাড়ল, সেই হিসেবের অঙ্কে আকাশ–পাতাল ফারাক। ‘অডিসি’ মুক্তি পেতে না পেতেই তার আয় ছাড়িয়ে গিয়েছিল ওপেনহেইমারের মোট বক্স অফিস কালেকশন। আর তার পরপরই বের হয় ‘স্পাইডারম্যান’, যেটা আবার মাত্র এক সপ্তাহেই অডিসির আয়কে ছাড়িয়ে যায়। মজার বিষয় হলো, ‘স্পাইডারম্যান’ ছবিতে স্পাইডারম্যানসহ খল চরিত্র ফ্র্যাংক ক্যাসল এবং লিড ফিমেল রোল মিশেল জোন্সের চরিত্রে আছেন টম হল্যান্ড, জন বার্থনাল এবং জেনডায়া। অডিসিতে এরা যথাক্রমে টেলিমেকাস, মেনেলাউস এবং যুদ্ধের দেবী এথিনা চরিত্রে অভিনয় করেছেন। এবং অডিসিতে টেলিমেকাসের সঙ্গে মেনেলাউসকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু দৃশ্যে দেখা যায়। এই পুরো বিষয়টি স্পাইডারম্যানের এই নতুন ছবির প্রমোশনে এক রকম টিজার হিসেবে কাজ করেছে। ফলে অডিসির টার্গেট অডিয়েন্স যারা ছিল, বা অডিসি নিয়ে বানানো ইউজিসির যারা টার্গেট অডিয়েন্স ছিল তাদের কাছে ধীরে ধীরে পৌঁছাতে শুরু করল টম, জেনডায়া এবং স্পাইডারম্যান নিয়ে বানানো নানা প্রমোশনাল রিলস, বিহাইন্ড দ্য সিন, ইন্টারভিউগুলো।
অর্থাৎ বড় ইন্ডাস্ট্রির এই বিপুল আয়োজন এবং তাকে ঘিরে দর্শকের ডিজিটাল উদ্যাপন একদিকে যেমন দর্শকের সক্রিয়তা ও সৃজনশীল ক্ষমতার বিস্তারকে দৃশ্যমান করে, অন্যদিকে তেমনি উন্মোচন করে ক্ষমতার আরও সূক্ষ্ম এক বিন্যাস। দর্শক আজ আর নিছক ‘লোনলি ক্রাউড’ নয়; সে কনজিউমার, ক্রিয়েটর, এমনকি প্রজিউমারও। কিন্তু তার তৈরি কনটেন্ট, আবেগ, মনোযোগ ও সামাজিক যোগাযোগ শেষ পর্যন্ত কার স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে—সেই প্রশ্নটি থেকেই যায়। ‘উৎসব’ কিংবা ‘রইদ’কে ঘিরে বাংলাদেশের ডিজিটাল পরিসরে যে ইতিবাচক উন্মাদনা তৈরি হয়েছে, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কিন্তু একই সঙ্গে মনে রাখা জরুরি, বৈশ্বিক বড় ইন্ডাস্ট্রিগুলো যখন অ্যালগরিদম, ইউজার-জেনারেটেড কনটেন্ট এবং দর্শক মনস্তত্ত্বকে একীভূত করে তাদের বাজার ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য আরও বিস্তৃত করছে, তখন আমাদের মতো ছোট ইন্ডাস্ট্রির জন্য দর্শকের এই নতুন ক্ষমতাকে কেবল উদ্যাপন করাই যথেষ্ট নয়। বরং প্রয়োজন নিজেদের গল্প, মিথ, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতাকে কেন্দ্র করে এমন এক শক্তিশালী যোগাযোগ-পরিসর তৈরি করা, যেখানে দর্শক শুধু অন্যের কনটেন্টের ভোক্তা বা বিনা মূল্যের প্রচারক হয়ে থাকবে না; বরং নিজের সংস্কৃতির নির্মাতা ও প্রতিনিধিও হয়ে উঠবে। ক্ষমতার মানচিত্রে তাই প্রশ্নটি আর শুধু দর্শকের ঠিকানা কোথায়—তা নয়; বরং সে কার গল্প বলছে, কার সংস্কৃতিকে দৃশ্যমান করছে এবং শেষ পর্যন্ত সেই গল্পের ক্ষমতা কার হাতে তুলে দিচ্ছে।