নিজের বাড়িতেই আটকা! রুদ্ধশ্বাস সেই গল্পে মজেছে নেট–দুনিয়া
· Prothom Alo

একটি বাড়ি। বাইরে অবিরাম বৃষ্টি। দরজা খোলা যাচ্ছে না, জানালা খোলা যাচ্ছে না। ফোন, ইন্টারনেট—কোনো কিছুই যেন স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে না। চারজন মানুষ বুঝতে পারছে, তারা শুধু নিজেদের বাড়িতে আটকাই পড়েনি, সম্ভবত পুরো পৃথিবী থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ভয়টা তখন আর ভূতের নয়। ভয়টা হয়ে ওঠে—বের হওয়ার কোনো পথ নেই।
Visit rhodia.club for more information.
এ ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে তৈরি নেটফ্লিক্সের নতুন হরর-সায়েন্স ফিকশন ছবি ‘দ্য লাস্ট হাউস’। ৭ আগস্ট মুক্তির পর থেকেই ছবিটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা চলছে। কেউ বলছেন, এর অস্বস্তিকর পরিবেশ ও রহস্য জমিয়ে রাখার কৌশল বেশ কার্যকর; আবার কেউ মনে করছেন, চমৎকার একটি ধারণাকে দুর্বল চিত্রনাট্য শেষ পর্যন্ত নষ্ট করেছে।
ছবির প্রধান চরিত্রে আছেন ‘পাস্ট লাইভস’ ও ‘দ্য মর্নিং শো’র অভিনেত্রী গ্রেটা লি এবং ‘নার্কোস’ দিয়ে পরিচিতি পাওয়া ওয়াগনার মৌরা। পরিচালক লুই লেতেরিয়ের, যিনি ‘দ্য ইনক্রেডিবল হাল্ক’, ‘নাউ ইউ সি মি’, ‘ফাস্ট এক্স’-এর মতো বড় বাজেটের ছবির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চিত্রনাট্য লিখেছেন ম্যাথিউ রবিনসন।
গল্পটা কী
গল্পের কেন্দ্রে রয়েছেন রাইলি ও জেসন দম্পতি; তাঁদের দুই সন্তানকে নিয়ে একটি বাড়িতে বসবাস করেন। শুরুতে সবকিছু স্বাভাবিকই মনে হয়। কিন্তু হঠাৎ এক অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে পরিবারটি বুঝতে পারে, বাড়ির দরজা-জানালা কোনোভাবেই খোলা যাচ্ছে না। বাইরে চলছে অদ্ভুত এক বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির সঙ্গে যুক্ত অজানা কোনো শক্তি যেন বাড়িটিকে ঘিরে ফেলেছে।
প্রথমে তাঁরা ভাবেন, এটি হয়তো সাময়িক কোনো ঘটনা। কিন্তু সময় যত গড়ায়, পরিস্থিতি তত ভয়ংকর হয়ে ওঠে। খাবার কমে আসে, বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বাড়তে থাকে আতঙ্ক। পরিবারটিকে নিজেদের বাড়ির ভেতর রহস্যজনকভাবে আটকে দেওয়া হয়েছে। সীমিত হয়ে আসা সম্পদ নিয়ে তাদের একসঙ্গে টিকে থাকতে হবে, পাশাপাশি বুঝতে হবে—কোন শক্তি তাদের বন্দী করে রেখেছে।
এখানেই ছবিটির মূল আকর্ষণ। দর্শককে শুরু থেকেই বলা হয় না বাইরে আসলে কী ঘটছে। এটি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ, নাকি কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনা? এ প্রশ্নগুলোই ধীরে ধীরে ছবির উত্তেজনা তৈরি করে। কয়েক দিন নয়, কয়েক বছর! ছবির সবচেয়ে বড় চমকগুলোর একটি আসে গল্পের মাঝামাঝি। পরিবারটির আটকে থাকার সময় কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহে সীমাবদ্ধ থাকে না। গল্প একসময় কয়েক বছর সামনে এগিয়ে যায়। এই সময়ের ব্যবধানই চরিত্রগুলোর মানসিক পরিবর্তন এবং পরিস্থিতির ভয়াবহতা বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
একসময় বাইরে থেকে একজন অপরিচিত মানুষের আগমন ঘটে। তখন প্রশ্নটা আরও বড় হয়ে দাঁড়ায়—যদি সত্যিই পৃথিবীর বাকি মানুষ হারিয়ে যায়, তাহলে এই মানুষ এল কোথা থেকে? সে কি সত্যিই সাহায্য করতে এসেছে, নাকি তার আগমনই নতুন বিপদের শুরু? এ রহস্যই ছবির দ্বিতীয়ার্ধকে এগিয়ে নেয়।
‘দ্য লাস্ট হাউস’–এর দৃশ্য। আইএমডিবিহরর নাকি পারিবারিক ড্রামা
‘দ্য লাস্ট হাউস’–কে শুধু হরর ছবি বললে হয়তো এর ধরন পুরোপুরি বোঝা যাবে না। নেটফ্লিক্স নিজেই ছবিটিকে সায়েন্স ফিকশন, হরর ও থ্রিলারের মিশ্রণ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। তবে সমালোচকদের একটি অংশের মতে, ছবিটি ভয় দেখানোর চেয়ে পরিবারের ভেতরের সম্পর্ক ও মানসিক চাপকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
বাইরের অজানা ভয় যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে চারজন মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক। ক্ষুধা, ভয়, অনিশ্চয়তা ও দীর্ঘদিনের বন্দিত্ব—সব মিলিয়ে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কেও চাপ পড়ে। সন্তানদের সামনে শক্ত থাকার চেষ্টা করতে গিয়ে মা–বাবার নিজেদের ভয় লুকাতে হয়। অর্থাৎ বাড়িটি শুধু বাইরের বিপদের বিরুদ্ধে আশ্রয় নয়, সময়ের সঙ্গে সেটিই হয়ে ওঠে মানসিক বন্দিশালা। এ জায়গাই ছবিটিকে ‘আ কোয়াইট প্লেস’, ‘১০ ক্লোভারফিল্ড লেন’ বা ‘লিভ দ্য ওয়াল্ড বিহাইন্ড’ ইত্যাদি বিপর্যয়ধর্মী সিনেমার সঙ্গে তুলনার সুযোগ দিয়েছে।
গ্রেটা লি: মায়ের চরিত্রে অন্য রকম অভিনয়
ছবির অন্যতম বড় আকর্ষণ গ্রেটা লি। ‘পাস্ট লাইভস’ দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক প্রশংসা পাওয়া এই অভিনেত্রী এখানে রাইলি চরিত্রে অভিনয় করেছেন। রাইলি একজন মা, যাঁকে একই সঙ্গে সন্তানদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, স্বামীর সঙ্গে সম্পর্ক সামলাতে হবে এবং নিজের ভয় নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এ চরিত্রে বড় কোনো অ্যাকশন দৃশ্যের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুখের অভিব্যক্তি, নীরবতা ও আতঙ্ক।
ছবির প্রশংসনীয় অংশ হিসেবে কয়েকজন সমালোচক গ্রেটা লি ও ওয়াগনার মৌরার অভিনয় এবং পরিবারের মধ্যকার সম্পর্ককে উল্লেখ করেছেন। দ্য হলিউড রিপোর্টার ও ভ্যারাইটির সমালোচকেরাও ছবিটির ঘরোয়া সম্পর্কের দিকটি এর শক্তির জায়গা হিসেবে দেখেছেন। অবশ্য দর্শকদের প্রতিক্রিয়া একেবারেই একমুখী নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ গ্রেটা লির অভিনয় পছন্দ করেছেন আবার কেউ তাঁর অভিনয় ও সংলাপ বলার ধরন নিয়ে সমালোচনা করেছেন।
‘দ্য লাস্ট হাউস’–এর দৃশ্য। আইএমডিবিওয়াগনার মৌরার ওপরও ছিল বড় দায়িত্ব
ব্রাজিলিয়ান অভিনেতা ওয়াগনার মৌরা আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ‘নার্কোস’-এর পাবলো এসকোবার চরিত্রে অভিনয়ের জন্য। এবার তিনি জেসন চরিত্রে। জেসন এমন একজন বাবা, যিনি শুরুতে পরিস্থিতির ব্যাখ্যা খুঁজতে চান। কিন্তু সময় যত এগোয়, বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর লড়াই তত কঠিন হয়ে ওঠে।
মৌরার অভিনয়ের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল আতঙ্ককে অতিনাটকীয় না করে বিশ্বাসযোগ্য রাখা। ছবির বড় অংশেই তিনি চার দেয়ালের মধ্যে আটকে থাকা একজন বাবার অসহায়ত্ব তুলে ধরেছেন। কিন্তু এখানেও সমালোচনা আছে। কেউ মনে করেছেন, এত শক্তিশালী দুই অভিনেতাকে আরও গভীর চরিত্র দেওয়া যেত।
পরিচালক লুই লেতেরিয়ের
ছবিটির পরিচালক লুই লেতেরিয়েরের নামও আলোচনার অন্যতম কারণ। তিনি বড় বাজেটের অ্যাকশন ও ফ্যান্টাসি ছবিতে কাজ করেছেন। ‘দ্য ইনক্রেডিবল হাল্ক’, ‘নাউ ইউ সি মি’, ‘ফাস্ট এক্স’ তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে। ‘দ্য লাস্ট হাউস’-এ তিনি বিপরীত পথে হেঁটেছেন। বড় অ্যাকশন সেটের বদলে প্রায় পুরো গল্পকে আটকে দিয়েছেন একটি বাড়ির মধ্যে। এ সীমাবদ্ধতাই তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জ। একটি বাড়ি দিয়ে কীভাবে প্রায় দুই ঘণ্টা দর্শককে আটকে রাখা যায়?
কখনো দরজার শব্দ, কখনো জানালার বাইরে অস্বাভাবিক কিছু, কখনো বিদ্যুৎ চলে যাওয়া—ছোট ছোট বিষয় দিয়ে আতঙ্ক তৈরি করার চেষ্টা করেছেন পরিচালক।
প্ল্যাটফর্মের প্রচারণাতেও এই ‘বাড়ি থেকে বের হতে না পারা’র ধারণাটিই সামনে রাখা হয়েছিল। ট্রেলার প্রকাশের সময় লেতেরিয়ের বলেছিলেন, ছবিটি দেখার পর দর্শক যেন নিজেদের বাড়ি ও পরিবারকে আগের মতো দেখতে না পারেন।
কিন্তু সমালোচনা এত বেশি কেন
ছবির ধারণা প্রশংসা পেয়েছে। অভিনেতা দুজনই প্রতিষ্ঠিত। পরিচালকও অভিজ্ঞ। প্রচারণাও ছিল জোরালো।
তারপরও সমালোচকদের বড় একটি অংশ ছবির চিত্রনাট্য নিয়ে হতাশ। সিনেমাবিষয়ক সাইট ডিসাইডার ছবিটিকে দুর্বল সায়েন্স ফিকশন থ্রিলার হিসেবে দেখেছে। তাদের সমালোচনায় বলা হয়েছে, শক্তিশালী অভিনয়শিল্পীদের ব্যবহার করেও ছবিটি চরিত্রগুলোর যথেষ্ট বিকাশ ঘটাতে পারেনি। রহস্যময় ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা এবং গল্পের শেষ অংশও সমালোচিত হয়েছে।
আরও কয়েকজন সমালোচকের মতে, প্রথম দিকে যে রহস্য তৈরি করা হয়, দ্বিতীয়ার্ধে গিয়ে সেটির অনেকটাই হারিয়ে যায়। শুরুতে প্রশ্ন যত বড়, শেষ পর্যন্ত তার উত্তর ততটা সন্তোষজনক নয়। এ অভিযোগই ছবিটির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে সামনে এসেছে।
অসমাপ্ত প্রেমের গল্প ‘মুসাফির ক্যাফে’ কতটা জমলদর্শকের প্রতিক্রিয়া: একেবারে দুই মেরু
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, দর্শকের প্রতিক্রিয়া প্রায় দুই ভাগে বিভক্ত। একদল মনে করছে, এটি দুর্দান্ত। অন্য দলের অভিযোগ, ছবিটি অনেক জায়গায় যুক্তিহীন, চরিত্রগুলো অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত নেয় এবং শেষটা হতাশাজনক। রেডিটের অফিশিয়াল আলোচনায় দর্শকদের মন্তব্যেও এ বিভক্তি স্পষ্ট। কেউ ছবিটিকে উপভোগ্য বলেছেন আবার কেউ চিত্রনাট্য ও শেষ অংশ নিয়ে তীব্র হতাশা প্রকাশ করেছেন।
আর আর/হরর মুভিজে মুক্তির পরপরই ছবিটি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। পোস্টটিতে কয়েক শ ভোট ও মন্তব্য জমেছে, যা অন্তত হররপ্রেমী অনলাইন দর্শকের মধ্যে ছবিটি নিয়ে আগ্রহের ইঙ্গিত দেয়। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এসব প্রতিক্রিয়াকে কোনোভাবেই পুরো দর্শকসমাজের চূড়ান্ত মতামত হিসেবে দেখা উচিত নয়।
রিভিউ স্কোরও খুব উজ্জ্বল নয়
মুক্তির পর সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া মোটেও একতরফা প্রশংসার নয়। রটেন টমোটোজে ছবিটির সমালোচক স্কোর মুক্তির প্রথম কয়েক দিনের মধ্যে ৩০-৩৫ শতাংশের আশপাশে ছিল; মেটাক্রিটিকে স্কোর ছিল ৪৫/১০০-এর কাছাকাছি। দর্শকদের প্রতিক্রিয়াও ছিল মিশ্র। তবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, এসব স্কোর এখনো পরিবর্তিত হতে পারে। কারণ, ছবিটি মাত্র ৭ আগস্ট মুক্তি পেয়েছে।
সমালোচনা যদি এত বেশি হয়, তাহলে ‘দ্য লাস্ট হাউস’ নিয়ে এত কথা হচ্ছে কেন? এর কয়েকটি কারণ আছে। প্রথমত, ধারণাটি সহজেই দর্শকের কৌতূহল তৈরি করে। নিজের বাড়িতেই যদি আটকা পড়তে হয়? দ্বিতীয়ত, গ্রেটা লি ও ওয়াগনার মৌরা—দুজনই এমন অভিনেতা, যাঁদের নতুন ছবি নিয়ে দর্শকের আলাদা আগ্রহ আছে। তৃতীয়ত, পরিচালক লুই লেতেরিয়েরের নাম ছবিটির প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে। চতুর্থত, নেটফ্লিক্স ছবিটির প্রচারণায় বেশ অভিনব কৌশল নিয়েছে।
ছবির প্রচারণায় প্ল্যাটফর্মটি এমন একটি স্টান্ট করেছে, যা নিজেই সংবাদ হয়ে গেছে। হলিউডের সানসেট বুলেভার্ডের একটি কার্যকর বিলবোর্ডের ভেতর একজন মানুষকে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিলবোর্ডটি দেখতে ছিল লতাপাতায় ঢাকা একটি বাড়ির মতো। জানালা দিয়ে সেই মানুষকে দেখা যাচ্ছিল, আর তিনি পথচারীদের সঙ্গে একটি হোয়াইটবোর্ডের মাধ্যমে যোগাযোগ করছিলেন।
৬ থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত এই অভিনব প্রচারণা চালানো হয়, ঠিক ছবিটির ৭ আগস্ট মুক্তির সময়কে ঘিরে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ প্রচারণার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় ছবিটির প্রতি কৌতূহল আরও বেড়েছে।
ডেডলাইন, ভ্যারাইটি ও আইএমডিবি অবলম্বনে