আজ এসএসসির ফল প্রকাশ, পরীক্ষার্থী সন্তানের ভালো চাইলে মা–বাবারা ভুলেও এই ৫টি কাজ করবেন না

· Prothom Alo

অনেক সময় মা-বাবার অতিরিক্ত চাপ বা তুলনা সন্তানকে হতাশ ও হতোদ্যম করে। তাই ফল প্রকাশের দিনে সংযম, সহানুভূতি ও সমর্থনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

Visit afnews.co.za for more information.

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের ফল শুধু নম্বরের খাতা নয়, বরং শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা ও ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ করে। অনেক সময় মা-বাবার অতিরিক্ত চাপ বা তুলনা সন্তানকে হতাশ ও হতোদ্যম করে। তাই ফল প্রকাশের দিনে সংযম, সহানুভূতি ও সমর্থনই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

অনেকে সফলতার হাসি হাসলেও সবার গল্প এক হয় না

আমাদের দেশে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি পাবলিক পরীক্ষা। প্রতিবছর কয়েক লাখ শিক্ষার্থী অংশ নেন শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা দুটিতে। অনেকে সফলতার হাসি হাসলেও সবার গল্প এক হয় না। সাফল্যের বিপরীতে থাকে না পাওয়ার গল্প আর এক বুক হতাশা। এই পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন ছাত্রছাত্রীরা যেমন উত্তেজনা, আনন্দ বা চাপ অনুভব করে, ঠিক তেমনি মা-বাবার মনেও থাকে নানা অনুভূতি। অনেক সময় অভিভাবকেরা সর্বোচ্চ চেষ্টার পরও সন্তানের ফলাফল নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া দেখান, যা শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করতে পারে।

ফল প্রকাশের মুহূর্তে মা-বাবাদের আচরণ শিক্ষার্থীর মনের সরাসরি প্রভাব ফেলে। সন্তানের কৃতিত্বে গর্বিত হওয়া স্বাভাবিক; কিন্তু হতাশার মুখোমুখি হলে ধৈর্য হারানো বা রাগ দেখানো সন্তানের আত্মবিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিতে পারে। অনেক অভিভাবকই ফলকে কেবল নম্বরের আলোকে বিচার করেন, তবে আসল মূল্যায়ন হওয়া উচিত শিক্ষার্থীর প্রচেষ্টা, অধ্যবসায় ও শেখার মনোভাবের ভিত্তিতে। তাই এই সময় মা-বাবাদের উচিত সংযমী হওয়া, সন্তানের পাশে দাঁড়ানো এবং ইতিবাচক সমর্থন প্রদান করা। প্রতিবছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের পাসের হার ৭৫-৮০ শতাংশ। আর এ প্লাসের সংখ্যা থাকে দেড় লাখের ঘরে। পরিসংখ্যানই বলে প্রতিবছর এক বড় অংশ থেকে যায় এ প্লাসের বাইরে। এ প্লাস বা জিপিএ–৫ পাওয়াই কি এখনকার দিনে মূল সফলতা? অনেকেই যদিও তা–ই মনে করে থাকেন, যেটা এখনকার শিক্ষার্থীদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকেই একটুর জন্য এ প্লাস না পেয়ে ভেঙে পড়ে। নানা ধরনের দুশ্চিন্তায় ঘিরে ফেলে নিজেকে। অনেকে আবার আত্মঘাতী সিদ্ধান্তও নিয়ে বসে।আজ এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফল প্রকাশ হবে। আর এ সময় পরীক্ষার্থী সন্তানের ভালো চাইলে মা–বাবারা ভুলেও এই ৫টি কাজ করবেন না।

এই সময়টা হওয়া উচিত সহানুভূতি ও বোঝাপড়ার

ফল দেখার সঙ্গে সঙ্গেই প্রতিক্রিয়া দেখানো

ডিজিটাল দুনিয়ায় ফল এসে যায় আমাদের মোবাইল ফোনে। ফলে অনেক মা–বাবা খারাপ ফল দেখেই সন্তানের ওপর চড়াও হন। খারাপ ফলের নানা ব্যাখ্যা চান। অনেক ক্ষেত্রে বকাঝকা করেন; কটুকথাও শোনান। এতে সন্তানের মস্তিষ্কে একধরনের চাপ পড়ে। এই মুহূর্তে সন্তানের মানসিক অবস্থা সবচেয়ে নাজুক থাকে। সে নিজেও ফল দেখে হতাশ হয়, মন খারাপ বা ভয় পেতে পারে। ঠিক তখনই মা-বাবার রাগ, প্রশ্ন বা দোষারোপ তাকে আরও ভেঙে দেয় ভেতর থেকে। বরং এই সময়টা হওয়া উচিত সহানুভূতি ও বোঝাপড়ার। সন্তানের পাশে বসে শান্তভাবে কথা বলা, তাকে আশ্বস্ত করা, সব ঠিক হয়ে যাবে—এই কয়েকটি শব্দই পারে তার ভয় কমাতে। মনে রাখবেন, ফল তাৎক্ষণিকভাবে বদলানো না গেলেও, সন্তানের আত্মবিশ্বাস ও আগ্রহ আপনি চাইলেই ফিরিয়ে আনতে পারেন আপনার আচরণের মাধ্যমেই।

অন্যের ফলের সঙ্গে তুলনা করা

অনেক মা–বাবার মধ্যেই এই তুলনার প্রবণতা থাকে। ‘পাশের বাসার অমুক এ প্লাস পেল, তুই পেলি না কেন?’ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অভিভাবকদের এ এক কমন ডায়ালগ। এটা সন্তানদের মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এ ধরনের তুলনা সন্তানের আত্মসম্মানকে গভীরভাবে আহত করে। সে নিজেকে অযোগ্য মনে করতে শুরু করে, মনে হয় তার সব পরিশ্রমই যেন বৃথা। অনেক সময় এমন তুলনা থেকে জন্ম নেয় হীনম্মন্যতা, মানসিক অবসাদ এমনকি পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ। তুলনা না করে বরং সন্তানের নিজের সাফল্য ও অগ্রগতির দিকেই নজর দিন; সে কোথায় ভালো করেছে, কোথায় আরও উন্নতি করতে পারে, সে বিষয়ে ভেবে দেখে তাকে আশ্বস্ত করেন। আর সে যাতে আশাহত না হয়, সেটা নিশ্চিত করেন।

আপনার উৎসাহই হতে পারে তার পরবর্তী সফলতার প্রথম পদক্ষেপ

হতাশাসূচক কথা বলা

অনেক মা–বাবাই খারাপ ফলাফলের পর কথা দিয়ে হতাশ করে দেন। তাকে পরবর্তী যেকোনো কাজের জন্য অযোগ্য মনে করা হয়। সন্তানকে আরও নানা প্রকার কথার মাধ্যমে তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় সে অযোগ্য। যেমন ‘তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না’, ‘তুই আমাদের বোঝা’ ইত্যাদি। এই ধরনের কথাগুলো সন্তানের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। মা-বাবার কাছে তার কোনো মূল্য নেই, এই ধারণা তার মধ্যে বদ্ধমূল হলে সে নিজের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। অনেক সময় এমন হতাশাবাচক কথা থেকেই জন্ম নেয় ভয়, অপরাধবোধ কিংবা আত্মঘৃণা। এর প্রভাব শুধু পড়াশোনায় নয়, ভবিষ্যতের প্রতিটি সিদ্ধান্তেও দেখা যায়। তাই এমন মুহূর্তে রাগ বা হতাশার বদলে সন্তানের পাশে থাকাই সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তাকে বোঝানো উচিত একটা খারাপ ফল মানে জীবনের শেষ নয়, বরং পরের ধাপে আরও ভালো করার সুযোগ আছে। আপনার উৎসাহই হতে পারে তার পরবর্তী সফলতার প্রথম পদক্ষেপ।

সন্তানকে একা সমাধান খুঁজতে দেওয়া

এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর অনেকেরই জীবনের নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে। অনেক শিক্ষার্থীই উপযুক্ত ফলের অভাবে নিজের লক্ষ্য থেকে ছিটকে পড়ে। যোগ্যতা হারায় নিজের লক্ষ্যের দিকে। এরপর অনেক মা–বাবাই সন্তানকে তিরস্কার করে। সন্তানের এ ব্যর্থতায় তাকে একা ছেড়ে দেন। এটি সন্তানের মনে আরও হতাশা তৈরি করে। বরং এ সময় বাবা–মার উচিত সন্তানকে আরও বেশি সহযোগিতা করা। তাকে বিকল্প নানা সঠিক পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করা উচিত। এ পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কোনটি তার জন্য বেশি উপযুক্ত হবে, সে পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করা উচিত।

এসএসসির ফলাফল জীবনের এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র—পুরো জীবন নয়

আনন্দের সুযোগ কেড়ে নেওয়া

অনেক মা–বাবাই সন্তানের খারাপ ফলের পর তার যাবতীয় আনন্দের মাধ্যম বন্ধ করে দেন। মোবাইল কেড়ে নেওয়া, টিভি দেখতে না দেওয়া বা বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে না দেওয়া—এমন সব বিধিনিষেধ আরোপ করে থাকেন। এসবে সন্তান আরও বেশি হতাশা বা একাকিত্বে ভোগে। ফলের পরপরই সব আনন্দের পথ বন্ধ করে দিলে সন্তান আরও নিঃসঙ্গ হবে ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে; বরং তাকে কিছুটা সময় দিন, মন হালকা করার সুযোগ দিন। তার ফল যেমনই হোক, সেটাই উদ্‌যাপন করেন। এতে সে মানসিকভাবে স্থিতিশীল হয়ে পরের ধাপের জন্য নতুন করে প্রস্তুত হতে পারবে।

এসএসসির ফলাফল জীবনের এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র—পুরো জীবন নয়। একটা খারাপ ফল কখনো সন্তানের সামর্থ্য, মেধা বা ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। মা-বাবা হিসেবে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো সন্তানের পাশে থাকা, তার প্রতি বিশ্বাস রাখা এবং তাকে নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর সাহস দেওয়া। আপনার একটুখানি সহানুভূতি, বোঝাপড়া ও ইতিবাচক মনোভাব সন্তানের ভেতরের হতাশা মুছে দিতে পারে। মনে রাখবেন, আজ যে সন্তান ব্যর্থ হয়েছে, আগামীকাল হয়তো সেই সন্তানই অন্যভাবে সফলতার গল্প লিখবে—যদি সে পায় আপনার ভালোবাসা আর সমর্থনের হাত।

ছবি: প্রথম আলো

Read full story at source