শিক্ষার্থীদের অদৃশ্য মানসিক চাপের খবর কি আমরা রাখি
· Prothom Alo

বিশ্বের প্রায় প্রতিটি মানুষই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়েছে। তবে দীর্ঘস্থায়ী ও অতিরিক্ত চাপ যখন স্বাভাবিক জীবনযাপনকে ব্যাহত করে, ঠিক তখন তা হয়ে উঠতে পারে গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ। বাংলাদেশেও এর প্রভাব স্পষ্ট ও অতি গুরুতর হয়ে উঠছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে, যে বয়সে এমন সমস্যার কথাগুলো অথবা মানসিক চাপের কথা হয়তো কেউ খোলামেলাভাবে জানাতেও পারেন না।
Visit grenadier.co.za for more information.
মানসিক চাপ মানুষের জীবনের স্বাভাবিক একটি অংশ। পরীক্ষা, চাকরি, ভবিষ্যৎ, অর্থনৈতিক সংকট, পারিবারিক প্রত্যাশা, সম্পর্কের বিচ্ছেদসহ জীবনের নানা পরিস্থিতি মানুষকে চাপে ফেলতে পারে ও ফেলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, ‘প্রত্যেক মানুষই জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে মানসিক চাপ অনুভব করে। তবে সব ধরনের চাপ মানসিক রোগ নয়। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন চাপ অতিরিক্ত বা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে মানুষের চিন্তা, আবেগ, ঘুম, মনোযোগ কিংবা দৈনন্দিন কাজকে প্রভাবিত করতে শুরু করে।’
বিশ্বজুড়ে মানসিক স্বাস্থ্যের পরিস্থিতি যে উদ্বেগজনক, তারও প্রমাণ মিলছে বিভিন্ন গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণা অনুসারে, বিশ্বে প্রায় ১১০ কোটি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক রোগ নিয়ে বসবাস করছে। অর্থাৎ বিশ্বের প্রায় প্রতি সাতজন মানুষের একজন এই ধরনের সমস্যার সঙ্গে বসবাস করছে।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন এই মানসিক চাপের প্রভাব শুধু ব্যক্তির মনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং দীর্ঘস্থায়ী চাপ ঘুমের সমস্যা, উদ্বেগ, মনোযোগের ঘাটতি, বিরক্তি, মাথাব্যথা, অকারণে রাগান্বিত হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত চিন্তা ও নানা শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। কর্মক্ষেত্রেও এর প্রভাব রয়েছে বিস্তারভাবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মতে, ‘অতিরিক্ত কাজের চাপ, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, চাকরির অনিশ্চয়তা ও কর্মপরিবেশের বিভিন্ন সাইকোসোশ্যাল ঝুঁকি কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।’
বিশ্বের এই বাস্তবতা থেকে বাংলাদেশও আলাদা নয়। বরং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো এমন পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের ১ হাজার ৬৯৭ শিক্ষার্থীকে নিয়ে পরিচালিত একটি গবেষণায় শিক্ষার্থীদের বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপের বিভিন্ন উপসর্গ পরিমাপ করা হয়। গবেষণায় ৫৬ দশমিক ৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিষণ্নতার উপসর্গ, ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে উদ্বেগ এবং ৩৩ দশমিক ২ শতাংশের মধ্যে মানসিক চাপের উপসর্গ পাওয়া যায়।
গবেষণাটিতে আরও দেখা যায়, নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক চাপের হার তুলনামূলক বেশি। পারিবারিক সম্পর্কের অবনতির সঙ্গেও বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপের সম্পর্ক পাওয়া গেছে এই গবেষণায়। নতুন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে প্রবেশ করা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও চাপের মাত্রা তুলনামূলক বেশি ছিল। আরেকটি গবেষণায় বাংলাদেশের ৭৩৮ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বিষণ্নতা, উদ্বেগ ও মানসিক চাপের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি পাওয়া যায়। গবেষকেরা শিক্ষার্থীদের জন্য আরও কার্যকর ও লক্ষ্যভিত্তিক মানসিক স্বাস্থ্যসেবার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
কেন মানুষ বেঁচে থাকার আশা হারিয়ে ফেলেবিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীর মানসিক চাপকে শুধু পরীক্ষার ফলাফল বা ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। ভালো ফল করার চাপের সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবারের প্রত্যাশা, পেশাগত জীবন নিয়ে অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক সংকট, ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমস্যা ও সামাজিক তুলনাসহ নানা বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একজন শিক্ষার্থীকে একই সময়ে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়। যেমন তিনি কোন বিষয়ে দক্ষতা অর্জন করবেন, কীভাবে চাকরির বাজারে নিজেকে প্রস্তুত করবেন, উচ্চশিক্ষা করবেন কি না, পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব কীভাবে নেবেন, বন্ধুদের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক বহাল রাখবেন—এমন নানা প্রশ্নের কোনো সহজ উত্তর নেই বা তাঁরা খুঁজে পান না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম; যা মানুষকে মানসিকভাবে চাপে ফেলতে অনেক বড় একটি ভূমিকা পালন করে। যেখানে অন্যের সাফল্য, ভ্রমণ, চাকরি কিংবা ব্যক্তিগত জীবনের নির্বাচিত ছবি দেখে নিজের জীবনকে তুলনা করার প্রবণতা অনেকের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। বাস্তবে যেটুকু দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার চেয়ে অনেক বড় অংশই থাকে অদৃশ্য। ফলে বাইরে থেকে স্বাভাবিক দেখালেও একজন শিক্ষার্থী ভেতরে–ভেতরে প্রচণ্ড চাপের মধ্যে থাকেন।
মানসিক চাপের আরেকটি বড় সমস্যা হলো এটি সব সময় চোখে দেখা যায় না। একজন শিক্ষার্থী নিয়মিত ক্লাস করতে পারেন, বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় থাকতে পারেন। তবু তিনি হয়তো ঘুমের সমস্যায় ভুগছেন, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন কিংবা নিজের ব্যর্থতার ভয় নিয়ে একা লড়ছেন। সমাজের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে এই মানুষগুলো মানসিক চাপের এই কথা অন্য কাউকে বলার সাহস করে উঠতে পারেন না। অনেকে হয় সাহস করে নিজের বন্ধু, শিক্ষক বা আপনজনদের কাছে নিজেদের মানসিক চাপের কথা বলেন; তবে এই ক্ষেত্রে অনেকেই অপদস্ত হয়ে বা নিজেকে তুচ্ছ হিসেবে আবিষ্কার করেন। যা সমস্যা আরও বৃদ্ধি করে। যার কারণে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজন এমন একটি পরিবেশ, যেখানে একজন শিক্ষার্থী বিচার বা উপহাসের ভয় ছাড়াই নিজের কথা বলতে পারবেন। প্রত্যেক মানুষেরই হওয়া উচিত অন্যের প্রতি ও অন্যের মতামত, বক্তব্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
জীবন থেকে সব ধরনের চাপ দূর করা সম্ভব নয়। পরীক্ষার চাপ থাকবে, চাকরির প্রতিযোগিতা থাকবে, অর্থনৈতিক সমস্যা থাকবে, সম্পর্কের টানাপোড়ন থাকবে। প্রত্যেক মানুষের মধ্যে এই চাপগুলো নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা গড়ে তোলা উচিত এবং কঠিন সময়ের পর আবার ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা, নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা, প্রয়োজন হলে সাহায্য চাওয়া এবং ব্যর্থতাকে জীবনের শেষ বলে মনে না করা, যা মানসিক শক্তিরই অংশ। মানসিক চাপ হয়তো মানুষের জীবন থেকে কখনো পুরোপুরি চলে যাবে না। কিন্তু একজন মানুষ যেন তার সমস্যার সঙ্গে একা না থাকেন, সেটি নিশ্চিত করা সম্ভব। প্রথম আলো ও প্রথম আলো বন্ধুসভার মতো সংগঠন, যারা সারা বাংলাদেশে মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে প্রতি অঞ্চল, গ্রাম, পাড়া, শহরের স্বেচ্ছাসেবীদের। এগিয়ে আসতে হবে মানুষের মনের কথা জানতে, এগিয়ে আসতে হবে মানুষের পাশে থাকতে।
সভাপতি, ড্যাফোডিল বন্ধুসভা