গন্তব্য মিরপুর পাখির হাট

· Prothom Alo

রূপা গিয়েছিল মিরপুর পাখির হাটে। সেখানে নানান ধরনের পাখি বিক্রি হয়। রূপা সানকনুর নামের এক পাখি দেখে এসেছে। পাখির মালিকের ফোন নম্বর নিয়ে এসেছে। আমাকে পাঠিয়েছে সেই পাখি কিনতে। 

Visit freshyourfeel.org for more information.

অনেক দিন পর লোকাল বাসে উঠেছি। প্রচণ্ড ভিড় বাসে। আক্ষরিক অর্থেই নিশ্বাস বন্ধ করে শরীর সরু বানিয়ে সুচ হয়ে বাসের ভেতর ঢুকতে হয়। আর বাস থেকে নামার সময় দুই হাত প্রসারিত করে মুখে ইয়াহু বলে বুকের ছাতি ফুলিয়ে ফাল হয়ে বেরোতে হয়। বলতে হয়, ‘ভাই, জায়গা দিন, ভূমিষ্ঠ হব।’

বাসে বসার জায়গা পাইনি। বাসের ভেতরে তিলধারণের জায়গা নেই। কন্ডাক্টর কোনোমতে দাঁড়িয়ে পেছনের যাত্রীদের উদ্দেশে বারবার চেঁচাচ্ছে, ‘ভাই, ভাড়া হাতে নেন! ভাঙতি দেবেন।’ 

আমার পাশে যে লোক দাঁড়িয়ে আছে, তাকে দেখে অবাক হয়েছি। বিশাল লম্বা। তার মাথা গিয়ে ঠেকেছে বাসের ছাদে। নড়ে উঠে সিটের দিকে সরে যেতেই খেয়াল করলাম, সেই লোক মোটেও লম্বা নয়, বাসের সিটের ওপর দাঁড়িয়ে আছে।

মানুষ ঢুকতে পারছে না, কীভাবে যেন বাসের কন্ডাক্টর ভাড়া আদায় করতে ভেতরে ঢুকে পড়ছে। আমার কাছে ভাড়া চাইল। বললাম, ‘ভাই, পকেটে হাত ঢুকাতেই তো পারছি না। মানুষের ভিড়ে দুই হাত ফিক্সড হয়ে গেছে।’

তখন আচমকা সিটের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি চিৎকার করে উঠেছে, ‘পকেটমার, পকেটমার। কেউ আমার পকেট মেরে দিয়েছে। পকেটে মানিব্যাগ নেই।’

আমি চমকে উঠেছি। তার প্যান্টের হিপ পকেটের কাছে আমার মুখ। গণপিটুনি কী, টেলিভিশনে দেখেছি। দোয়া পড়ার চেষ্টা করলাম। বিপদ থেকে বাঁচার দোয়া মনে পড়ছে না। অন্য আরেকটা দোয়া পড়তে শুরু করলাম। তখন দেখি, এক দোয়া আরেক দোয়ার ভেতর ঢুকে যাচ্ছে।

সেই লোক ‘পকেটমার পকেটমার’ বলে চিৎকার করেই যাচ্ছে আর আমার শার্টের বুক পকেটে হাত ঢুকিয়ে গুঁতাচ্ছে। বিরক্ত হয়ে বললাম, ‘ভাই, এটা আপনার প্যান্টের হিপ পকেট না। আমার শার্টের বুক পকেট!’

রস+আলোর পক্ষ থেকে একটি জরুরি (এবং সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়) বিজ্ঞপ্তি

পরের স্টপেজে ভাড়া দিয়ে খুব কষ্টে বাস থেকে নামলাম। বাকি পথ যাব বলে অটোরিকশা ভাড়া করেছি। খানিক পথ যাওয়ার পর খেয়াল করলাম, অটোরিকশাচালক একবারও হর্ন বাজাননি। ভালো লাগল। জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই, আপনার নাম কী?’

অটোরিকশাচালক বললেন, ‘জুয়েল।’

‘জুয়েল ভাই, আমি খুব খুশি হয়েছি। আপনি রিকশার হর্ন বাজান না।’

জুয়েল ভাই গম্ভীর মুখে বললেন, ‘হর্ন নষ্ট।’ 

বললাম, ‘সাবধানে যাবেন। এখন তো হর্ন না দিলে কেউ খেয়াল করতে চায় না।’

জুয়েল ভাই বললেন, ‘সাবধানেই যাওয়া লাগতেছে। রিকশার ব্রেক কাজ করতেছে না।’

নেমে অন্য রিকশা নেব কি না, ভাবছি। জুয়েল ভাই মাঝেমধ্যে ঘাড় ঘুরিয়ে রিকশার পেছনের বাঁ পাশের চাকার দিকে তাকাচ্ছেন। শুকনা গলায় জিজ্ঞেস করলাম, ‘চাকায় কোনো অসুবিধা?’

জুয়েল ভাই বললেন, ‘অসুবিধা না। চাকার নাট পড়ে গেছে। খ্যাপ মেরে গ্যারেজে যাব।’

মিরপুর পাখির হাটের কাছাকাছি আসতেই রিকশার পেছনের বাঁ পাশের চাকায় কট করে আওয়াজ হলো। রিকশা আচমকা থেমে গেছে। তখনই পাশ থেকে লাফিয়ে আসা মাইক্রোবাস জুয়েল ভাইয়ের রিকশার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। জুয়েল ভাই ছিটকে পড়েছেন। আমি গিয়ে পড়েছি জুয়েল ভাইয়ের ওপর। জুয়েল ভাইয়ের কানের সঙ্গে আমার বুক লেগে আছে। সেখানে রক্ত। জুয়েল ভাইয়ের কানের রক্ত নাকি আমার বুকের রক্ত, বুঝতে পারলাম না।

মুহূর্তের মধ্যে অজস্র পথচারী জমে গেছে। তাদের চেহারায় করিতকর্মা ভাব। জুয়েল ভাইকে আমার বুকের নিচ থেকে কয়েকজন টেনে বের করেছে।

অতি উৎসাহী পথচারীদের কেউ গেছে মাইক্রোবাসের চালকের কাছে আমাদের চিকিৎসার টাকা আদায় করতে আর কেউ এসেছে আমার কাছে। 

যারা আমার কাছে এসেছে তারা বলল, ‘রিকশাওয়ালা গুরুতর আহত। তাঁকে হাসপাতালে নিতে হবে। আপনি রিকশার প্যাসেঞ্জার। রিকশাওয়ালার চিকিৎসার টাকা আপনি দেবেন।’

আমার বুকের রক্ত কেউ আমলে নিল না। তাদের চোখমুখের ভাব ক্রুদ্ধ। মনে হচ্ছে, আমার কান কামড়ে দিতে পারে। পকেট থেকে এক হাজার টাকার একটা নোট বের করে দিলাম। পথচারী এক হাজার টাকার নোট নিয়ে বলল, ‘এক হাজার টাকায় কিছু হইব? পাঁচ হাজার টাকা দেন।’ 

এবার মনে হলো সে আমার শরীরের স্পর্শকাতর জায়গা চেপে ধরতে পারে। আমি তাড়াতাড়ি পথচারীর হাতে আরও এক হাজার টাকা দিলাম। তারা আমাকে কৃপণ, কঞ্জুস আরও কী সব বলতে বলতে জুয়েল ভাইকে আরেক রিকশায় তুলে দিয়ে চলে গেল।

আমি উদাস মনে হেঁটে হেঁটে মিরপুর পাখির হাটের দিকে রওনা হলাম।

Read full story at source