ঋণ করে গিয়েছিলেন রাশিয়ায়, এক বছর পর জানা গেল তিনি ইউক্রেনে বন্দী

· Prothom Alo

‘সাত নাখ ট্যাকা দ্যানা করি ব্যাটাক রাশিয়া দ্যাশোত পাটাচিনো। বিদেশ থাকি ট্যাকা কামাই করি বাড়িত আসপে। দ্যানা শোদ করি ঘরবাড়ি করবে। ধুমধাম করি ব্যাটাক বিয়া করামো। একন ব্যাটারই খবর পাচ্চিনে। ওদিকে সুদ বাড়ি দ্যানা সাত থাকি নয় নাখ হচে। একন হামরা কী করমো—এই চিনতাত নিন্দ (ঘুম) ধরে না।’

Visit newssport.cv for more information.

কথাগুলো বলছিলেন ইউক্রেনের বন্দিশিবিরে আটক গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ছাপরহাটি ইউনিয়নের উত্তর মরুয়াদহ গ্রামের রিমেল মিয়ার (২২) বাবা সৈয়দ আলী। গতকাল শুক্রবার রাতে সৈয়দ আলীর সঙ্গে কথা বলার সময় পাশে নির্বাক হয়ে ছোট্ট নাতিকে নিয়ে বসে ছিলেন রিমেলের মা রেখা বেগম।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রেখা বেগম বলেন, ‘সুকের আশায় ব্যাটাক বিদোশোত পাটিচিনো। হামার ঘরে কষ্ট থাকপ্যার নোয়ায়। সুক তো হলোই না, একন কষ্ট আরও বাড়ি গ্যালো। ব্যাটা ক্যামন আচে, জানি না। হামরা ট্যাকা চাইনে, সোরকার জানি হামার বুকের ধন বুকোত ফিরি দ্যায়।’

নির্মাণশ্রমিকের চাকরি নিয়ে ২০২৫ সালে রাশিয়ায় যান রিমেল মিয়া। পরে কাজ হারিয়ে আইনি জটিলতায় পড়লে তিনি রাশিয়ার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হন। পরে অল্প কয়েক দিনের প্রশিক্ষণ দিয়ে তাঁকে ইউক্রেনে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়। সেখানে ইউক্রেনের বাহিনীর হাতে আটক হয়ে যুদ্ধবন্দী হিসেবে তিনি এখন একটি বন্দিশিবিরে আছেন। শুক্রবার তাঁকেসহ তিন বাংলাদেশির সাক্ষাৎকার নিয়ে ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করলে বিষয়টি জানাজানি হয়। পরে স্বজনেরাও বিষয়টি জানতে পারেন।

গাইবান্ধা শহর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে উত্তর মরুয়াদহ গ্রাম। সুন্দরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোভাগঞ্জ বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা ধরে রিমেলদের বাড়িতে যেতে হয়। তাঁর বাবার বসতভিটা কিংবা জমিজমা নেই। রিমেলের নানার বসতভিটায় জরাজীর্ণ একটি ঘর তুলে বসবাস করেন তাঁর মা–বাবা।

শুক্রবার রাতে রিমেলদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, স্থানীয় লোকজন ভিড় করছেন। রিমেলের আটক হওয়ার খবর শুনে তাঁরা খোঁজখবর নিতে এসেছেন। রিমেলের মা–বাবা তাঁদের নাতিকে নিয়ে ঘরে বসে ছিলেন। মা রেখা বেগম রিমেলের ছবি দেখিয়ে বলছেন, ‘এই হামার ছেলে।’ এখন ছেলের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তিনি।

ইউক্রেনের বন্দিশিবিরে আটক ছেলে রিমেল মিয়ার ছবি হাতে মা রেখা বেগম ও বাবা সৈয়দ আলী। গতকাল শুক্রবার রাতে

স্বজনেরা জানিয়েছেন, ২০২২ সালে সুন্দরগঞ্জের শোভাগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করার টাকার অভাবে আর পড়ালেখা হয়নি রিমেলের। এরপর তিনি রাশিয়ায় যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। ২০২৫ সালের মার্চে গাইবান্ধা শহরের এক দালালের মাধ্যমে তিনি রাশিয়ায় যান। বাবার পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমি বিক্রি করে এবং চড়া সুদে সাত লাখ টাকা ঋণ নিয়ে তিনি রাশিয়ায় যান। রাশিয়ায় যাওয়ার পর প্রথম তিন মাসে দেশে বাবা-মায়ের কাছে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা পাঠান রিমেল। এরপর তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

রিমেলের বাবা সৈয়দ আলী প্রথম আলোকে বলেন, ১০ থেকে ১১ মাস ধরে ছেলের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ নেই। মুঠোফোনেও কথা হয় না। কোথায় আছে, কীভাবে আছে, তাঁরা জানেন না। অনেক মানুষকে বলেছেন; কিন্তু কেউ ছেলের সন্ধান দিতে পারেননি। শুক্রবার এলাকার একজন মোবাইলে ছেলেকে দেখিয়ে জানান, সে ইউক্রেনের বন্দিশিবিরে আটক। কিন্তু রাশিয়া থেকে কীভাবে ইউক্রেনে গিয়ে বন্দী হলো, তাঁরা জানেন না। এখন ছেলের আটক হওয়ার খবর জানাজানির পর অনেকে বাড়িতে খোঁজ নিতে আসছেন।

সৈয়দ আলী বাড়ির অদূরে শোভাগঞ্জ বাজারে খিলি পান বিক্রি করেন। তাঁর চার ছেলে। বড় ছেলে ও তাঁর স্ত্রী ঢাকার একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। তাঁদের দুই ছেলে দাদা-দাদির কাছে উত্তর মরুয়াদহ গ্রামে থাকে। রিমেলের আরেক ভাই রুবেল মিয়া (২০) দুই বছর আগে সৌদি আরবে যান। বর্তমানে সেখানে একটি কোম্পানিতে চাকরি করেন। সবার ছোট সোহেল মিয়া স্থানীয় একটি মাদ্রাসায় সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে।

এখন সৌদিপ্রবাসী ছেলের পাঠানো টাকা দিয়ে ধারদেনা শোধ করছেন সৈয়দ আলী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ছোট ছেলের পাঠানো টাকা ঋণ শোধ করতে করতে শেষ হয়ে যাচ্ছে। পানের দোকান দিয়ে মাসে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকার বেশি আয় হয় না। এতে কোনোমতে সংসার চলছে। এর মধ্যে ইউক্রেনে ছেলের বন্দী হওয়ার খবর শুনে দুশ্চিন্তায় ঘুম আসছে না।

Read full story at source