রাখাইন নামগুলো কে ফিরিয়ে দেবে

· Prothom Alo

বগুড়ার শিবগঞ্জ ও মোকামতলা উপজেলার নবগঠিত তিনটি ইউনিয়নের বিতর্কিত নাম প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু নাম চাপানোর বাহাদুরি থেকে সরে আসার এই রাষ্ট্রীয় দৃষ্টান্ত কী শুধু বগুড়াতেই আটকে থাকবে নাকি দেশের সর্বপ্রান্তে প্রতিষ্ঠিত হবে?

পটুয়াখালী–বরগুনাতে বহু রাখাইন বসতির নামও জোর করে পাল্টানো হয়েছে। কুয়াকাটার রাখাইন নাম ক্যানছাই চোওয়ান। সমুদ্রসৈকতের ধারে এক প্রাচীন রাখাইন গ্রাম নাঙিরি রোওয়া। রাখাইন ভাষায় এর মানে শ্যামলা রঙের মানুষের পাড়া। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার লতাচাপলী ইউনিয়নের এই রাখাইন গ্রামটির বর্তমান নাম নাইওরীপাড়া। নাক্রুরিপাড়ার আদি বসতি স্থাপনকারী ল্যুম ফ্রু মাতবর। রাখাইন ভাষায় ল্যুম ফ্রু মানে লম্বা–ফরসা মানুষ। ল্যুম ফ্রুর ছেলে খো জান মাতবর, তার ছেলে লু মং মাতবর এবং লু মংয়ের মেয়ে মাথেন।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

ল্যুম ফ্রুর পরিবার সৈকতের ধারে আবাদ করত এবং একটি জঙ্গল গড়ে তুলেছিল। একসময় তা ‘ল্যুম ফ্রুর বন’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। বাঙালিরা পরে এর নাম দেয় ‘লেবুর বন’।

হাতে বাদাম নিয়ে কুয়াকাটা সমুদ্রতীরে আলাপ হয় মাথেনের সঙ্গে। জোর চাপে বাদাম ভাঙতে ভাঙতে মাথেন জানান, ‘...সব রাখাইন নাম তারা বদলাইছে। লেবুর বন নাম দিছে কেন, এখানে কি লেবুগাছ আছে, ল্যুম ফ্রুর নাম লেবু হয় কীভাবে, যে মানুষ বনটা রক্ষা করল, তার নামটাও রাখল না?’

দখল হয়েছে রাখাইনদের গ্রাম, কৃষিজমি, পুকুর, ধর্মস্থল, শ্মশান, বিহার ও জাদি (মন্দির)। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশে রাখাইন জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ হাজার। ‘একটি রাখাইন প্রবাদ’ গবেষণায় রাখাইন জনসংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে সাড়ে ১৪ হাজার। আর ২০২২ সালের জনশুমারিতে তা কমে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৬১০।

সৈকতের তীরে কুয়াকাটা পৌরসভার লাগানো সাইনবোর্ড বা সড়ক বিভাগের মাইলস্টোনে মাথেনের কথার প্রমাণ দেখা গেল, লেখা আছে ‘লেবুবন’। ট্যুরিস্ট পুলিশ কুয়াকাটা রিজিয়নও তাদের ওয়েবসাইটে লিখেছে, ‘...কুয়াকাটার ২৫টি ভ্রমণ স্পটের ভেতর লেবুর বন অন্যতম। রাখাইন সম্প্রদায়ের মেয়ে লেম্বুর নাম থেকে লেবুর বন নামটি এসেছে।’

আন্ধারমানিক নদী আর সাগরের মোহনায় লতাচাপলী ইউনিয়নের শেষবিন্দু এই সংরক্ষিত ‘ল্যুম ফ্রু বন’ কেবল নয়; বরিশাল বিভাগের প্রায় সব রাখাইন অঞ্চলের নাম পাল্টে ফেলা হয়েছে। অন্যায়ভাবে দখল হয়েছে রাখাইনদের গ্রাম, কৃষিজমি, পুকুর, ধর্মস্থল, শ্মশান, বিহার ও জাদি (মন্দির)। ১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশে রাখাইনদের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ হাজার। ত্রৈমাসিক প্রতিচিন্তার ২০১৮ সালের জানুয়ারি-মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত ‘একটি রাখাইন প্রবাদ’ গবেষণায় রাখাইনদের জনসংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে সাড়ে ১৪ হাজার। ২০২২ সালের জনশুমারিতে রাখাইনদের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৬১০।

কলাগাছের কলাপাড়া নয়, ক্যউহ্লাপাড়া

প্রতিটি স্থাননাম গড়ে ওঠে স্থানীয় প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে সংস্কৃতির জটিল রসায়নে। রাখাইন জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চলে সব গ্রাম, নদী, বন, জলার একটি রাখাইন স্থাননাম আছে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট থাকার পরেও এই দেশে একের পর এক রাখাইন স্থাননামগুলোর ‘বাঙালীকরণ’ হয়েছে।

...সব রাখাইন নাম তারা বদলাইছে। লেবুর বন নাম দিছে কেন, এখানে কি লেবুগাছ আছে, ল্যুম ফ্রুর নাম লেবু হয় কীভাবে, যে মানুষ বনটা রক্ষা করল, তার নামটাও রাখল না?

বরগুনার আমতলীর নাম হয়েছে অ্যামপ্রুই রাখাইনের স্মৃতি থেকে। তাতলী হয়েছে তালতলী। রাখাইন ভাষায় ‘তা’ মানে সীমানা। সীমানা চিহ্নিত করে রাখাইন বসতি স্থাপন হয়েছিল বলেই এর নাম ‘তাতলী’। কিন্তু বাঙালি ভাষ্যে বলা হয়, তালগাছ থাকার কারণে তালতলী, আমগাছ থেকে আমতলী আর কলাগাছের জন্য কলাপাড়া। মূলত ক্যহ্লাউ ও খ্যাপ্রু দুই সহোদর রাখাইন ভাইয়ের নাম থেকে ক্যহ্লাউপাড়া এবং খ্যাপ্রুপাড়া নাম হলেও আজ নাম হয়েছে কলাপাড়া ও খেপুপাড়া।

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় হ্যুইছেনপাড়ার নাম হয়েছে ‘হোসেনপাড়া’। বিদ্যালয়টির নাম হোসেনপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

মাও প্রু সাই ছিলেন একজন বিখ্যাত রাখাইন কবিরাজ। তাঁর নামে কলাপাড়ার বালিয়াতুলী ইউনিয়নে গড়ে ওঠে রাখাইন গ্রাম মাও প্রু সাই রোওয়া। যার বর্তমান নাম পক্ষিয়াপাড়া। কুয়াকাটা গেলেই সবাই মিশ্রীপাড়া বৌদ্ধবিহার এবং রাখাইন মার্কেট ঘুরতে যান। মিশ্রীপাড়ার রাখাইন নাম ঙে সুয়ে গুং। ঙে মানে পাখি, সুয়ে মানে স্বর্ণ, গুং মানে উঁচু খালি জায়গা।

কলাপাড়ার ধুলাসর ইউনিয়নের অংতেও রোওয়ার নাম এখন অনন্তপাড়া, কলাপাড়ার মেংলা তৌখা রোওয়ার নাম এখন মঙ্গলসুখ। একই ইউনিয়নের বৈতুলী গ্রামের বর্তমান নাম বলতুলী।

লতাচাপলী ইউনিয়নের আধলউখ্যা রোওয়ার নাম হয়েছে আদালতখা। থঞ্চুপাড়ার নাম অঞ্জুপাড়া। দিয়াড় আমখোলার রাখাইন নাম কুং-রে-সং। রাখাইন ভাষায় কুং মানে উঁচু, রে মানে আম এবং সং মানে জায়গা। দিয়াড় আমখোলার একটি অংশের বর্তমান নাম মোহাম্মদপুর ও অন্য অংশের নাম তাহেরপুর। নাচনাপাড়ার নাম হয়েছে ওলামানগর।

জোজিতংব বা ঋষিটিলার নাম এখন জাকিরতবক

বরগুনার তালতলী উপজেলার একটি রাখাইন গ্রামের নাম ছিল জোজিতংব মানে ঋষির টিলা। গ্রামটি রাখাইনশূন্য হওয়ার পর বর্তমানে এর নাম হয়েছে ‘জাকিরতবক’। ডংকুপাড়ার নাম রসুলপুর, কালাচানপাড়ার নাম আলীপুর, ফ্যাথিপাড়ার নাম ফাঁসিপাড়া, পুনামাপাড়ার নাম ইসলামপুর। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় হ্যুইছেনপাড়ার নাম হয়েছে হোসেনপাড়া।

কলাপাড়ার ধুলাসর ইউনিয়নের অংতেও রোওয়ার নাম এখন অনন্তপাড়া, কলাপাড়ার মেংলা তৌখা রোওয়ার নাম এখন মঙ্গলসুখ। একই ইউনিয়নের বৈতুলী গ্রামের বর্তমান নাম বলতুলী। কোনো খেলায় অনেকগুলো দল থাকলে যে দল আগে খেলার সুযোগ পায়, রাখাইন ভাষায় তাদের বৈতুলী বলে। একসময় এখানে বিখ্যাত রাখাইন খেলোয়াড়দের বসবাস ছিল।

দো-কাসীপাড়ার নাম এখন দোভাষীপাড়া। দো-কাসী মানে দাদুর নামে যে পাড়া। রাখাইন ভাষায় খ্রা মানে ছয় এবং রা মানে শতক। জমির দাম ৬০০ বলে নাম রাখা হয়েছিল খ্রাওরাদান রোওয়া, পরে নাম হয়েছিল ছয়ানিপাড়া। বর্তমানে গ্রামটি নেই, পায়রা বন্দরের জমি অধিগ্রহণের কারণে খুন হয়েছে।

নাম ফেরতের সংস্কৃতি

২০১৪ সালে গবেষক ড. জগন্নাথ বড়ুয়া এক প্রবন্ধে লেখেন, ‘কক্সবাজার, পটুয়াখালী ও বরগুনা অঞ্চলে রাখাইন বৌদ্ধদের বসতি হীন থেকে হীনতর হচ্ছে। এমন সময় আসবে, যখন এসব অঞ্চলে কোনো রাখাইন বসতি, বিহার ও সংস্কৃতি থাকবে না।’ বরিশাল বিভাগের প্রাচীন রাখাইন এলাকায় গেলে এই আশঙ্কার সত্যতা পাওয়া যায়। সম্প্রতি পরিদর্শনকালে শ্রীমঙ্গল বৌদ্ধবিহারের ভান্তে জ্ঞানুত্রারা মহাথেরো ও মিশ্রীপড়ার বিহারের ভান্তে উত্তম মহাথেরোও বিহারের ভূমি বেদখলের করুণ কাহিনি শোনান।

পর্যটন–বাণিজ্যের কারণে প্রকৃতি ও স্থানীয় সংস্কৃতির অপরায়ণ, দূষণ এবং দখল নিয়ে বিস্তর তর্ক আছে। কিন্তু স্থাননাম পাল্টে, সম্পদ লুণ্ঠন ও জখম করে কোনোভাবেই রাখাইন অঞ্চলে পর্যটন বিকশিত হতে পারে না। ছিনতাই হওয়া রাখাইন নামগুলো ফেরত আনার ভেতর দিয়ে স্থানীয় সরকার ও প্রশাসন কুয়াকাটার পর্যটনশিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বাংলাদেশের স্থাননাম নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাবেক অধ্যাপক দারা শামসুদ্দীনের কিছু কাজ আছে। বাংলাদেশের স্থাননাম ইতিহাসের পদচিহ্ন (২০১৫) বইতে তিনি লিখেছেন, ‘...ব্যক্তিনাম ব্যক্তিগত হলেও স্থাননাম জাতীয় বিষয়। প্রতিটি স্থাননামের অর্থপূর্ণ নির্ভুল এক ও অনন্য রূপ তৈরি, প্রকাশ এবং জনসাধারণের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জাতীয় প্রয়োজন।’

রাখাইন জনপদের ছিনতাই হওয়া স্থাননামগুলো আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অংশ। রাষ্ট্রকে এসব স্থাননামের ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে হবে।

Read full story at source