‘একক সরকার নেই’ ধারণা যেভাবে মিয়ানমারের জান্তার পক্ষে কাজ করছে

· Prothom Alo

মিয়ানমারের সামরিক শাসক মিন অং হ্লাইং ৩ জুলাই লাওসে যান। এটি ছিল নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করার পর তাঁর প্রথম কোনো আসিয়ান দেশ সফর। এ সফরের পর আবার একটি পুরোনো আলোচনা সামনে আসে।

অনেকে বলছেন, মিয়ানমারে এখন একক কোনো সরকার নেই। সেখানে কয়েকটি শক্তি একসঙ্গে আছে। একটি হলো সামরিক জান্তা। আরেকটি হলো জাতিসংঘে থাকা প্রতিরোধপন্থীদের প্রতিনিধিত্ব। আছে নির্বাসিত জাতীয় ঐক্য সরকার। এ ছাড়া বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী ও স্থানীয় মিলিশিয়াও রয়েছে।

Visit esporist.org for more information.

এ অবস্থায় অনেকে মনে করেন, বাইরের দেশগুলোর উচিত যাকে যেখানে দরকার, তার সঙ্গে কাজ করা। যেমন সীমান্তনিরাপত্তার জন্য এক পক্ষ, সম্পদের জন্য আরেক পক্ষ, আবার অপরাধ দমনে অন্য কোনো পক্ষ।

ফিলিপাইন প্রকাশ্যে অং সান সু চির সঙ্গে দেখা করার দাবি জানিয়েছে। তিমুর-লেসতে যুদ্ধাপরাধের বিচার চেয়েছে। এ জন্য তাদের কূটনীতিক বহিষ্কৃত হয়েছেন। সিঙ্গাপুরও তার অবস্থান পরিবর্তন করেনি। এ অবস্থানগুলো চরম নয়; বরং এগুলো একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখে।

এ যুক্তি শুনতে সহজ। কিন্তু এটি ভুল; বরং এটি জান্তার পক্ষেই কাজ করে। কারণ, তাদের হাতেই দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের সুযোগ বেশি। এ ধারণার তিনটি বড় সমস্যা আছে।

প্রথমত, মিয়ানমার কোনো বিশৃঙ্খল দেশ নয়। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, জান্তার নিয়ন্ত্রণ খুব সীমিত। তারা দেশের প্রায় ২১ শতাংশ এলাকা ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। কিছু এলাকায় তাদের সঙ্গে যুদ্ধ চলছে। আর অনেক জায়গায় তাদের নিয়ন্ত্রণ কেবল নামমাত্র।

অন্যদিকে দেশের বড় অংশ খালি নেই। প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা বিভিন্ন সংগঠনের অধীন আছে। এসব সংগঠনের নিজস্ব প্রশাসন, আইন ও রাজনৈতিক কাঠামো রয়েছে। অনেকে এ পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধবাজদের দখল’ বলেন। কিন্তু এটি পুরো সত্য নয়। এখানে আসলে ফেডারেল রাজনীতির একটি রূপ গড়ে উঠছে।

দ্বিতীয়ত, এ ধারণা একটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনকে অগ্রাহ্য করে। ২০২৬ সালের ৩০ মার্চ একটি গুরুত্বপূর্ণ জোট গঠিত হয়। এতে জাতীয় ঐক্য সরকার, পিদাউংসু হ্লুত্তাও প্রতিনিধিত্বকারী কমিটি এবং চারটি বড় জাতিগত সংগঠন যুক্ত হয়।

এ জোটের নাম ফেডারেল গণতান্ত্রিক ইউনিয়ন গঠনের স্টিয়ারিং কাউন্সিল। তাদের লক্ষ্য খুব স্পষ্ট। তারা চায় সামরিক শাসনের অবসান। তারা চায় সব বাহিনীকে বেসামরিক নিয়ন্ত্রণে আনতে। তারা চায় ২০০৮ সালের সংবিধান বাতিল করতে। তারা চায় নতুন ফেডারেল সংবিধান তৈরি করতে। তারা চায় একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে এবং অতীতের অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে।

এ জোটের অধীন সামরিক সমন্বয় কমিটি কাজ করছে। পাশাপাশি সংবিধান, বিচার ও কূটনীতি নিয়েও কাজ চলছে। তারা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। ব্যাংকক, টোকিও, অটোয়া—সব জায়গায় তাদের যোগাযোগ চলছে।

এটি ভাঙন নয়; বরং যুদ্ধের মধ্যেই একটি নতুন রাষ্ট্র গড়ার চেষ্টা।

তৃতীয়ত, এ ধারণা আন্তর্জাতিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ভুলে যায়। বাস্তব কারণে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। যেমন চীন ও ভারত করছে। কিন্তু স্বীকৃতি দেওয়া আলাদা বিষয়। স্বীকৃতি মানে অনেক কিছু। যেমন জাতিসংঘে আসন, দূতাবাস, চুক্তি করার অধিকার।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী স্বীকৃতি পেতে হলে দুটি বিষয় জরুরি। একটি হলো সাংবিধানিক বৈধতা, আরেকটি হলো আন্তর্জাতিক আইন মানার ইচ্ছা। মিয়ানমারের সামরিক সরকার এ দুই ক্ষেত্রেই ব্যর্থ। তাদের বৈধতা নেই। কারণ, ২০২০ সালের নির্বাচিত সরকারকে তারা সরিয়ে দিয়েছে। ২০২৫ সালের নির্বাচনও গ্রহণযোগ্য ছিল না।

অন্যদিকে ন্যায়বিচার ও সুরক্ষার সম্ভাবনা আছে স্টিয়ারিং কাউন্সিল এবং তাদের সহযোগীদের মধ্যে। তারা এখনো পুরোপুরি সফল নয়। কিন্তু তাদের মধ্যে সেই সম্ভাবনা আছে।

যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় দুই পক্ষকে সমানভাবে দেখে, তাহলে এ সম্ভাবনাও দুর্বল হয়ে যাবে। কিছু দেশ এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছে। তিমুর-লেসতে, সিঙ্গাপুর ও ফিলিপাইন সে অবস্থান ধরে রেখেছে।

ফিলিপাইন প্রকাশ্যে অং সান সু চির সঙ্গে দেখা করার দাবি জানিয়েছে। তিমুর-লেসতে যুদ্ধাপরাধের বিচার চেয়েছে। এ জন্য তাদের কূটনীতিক বহিষ্কৃত হয়েছেন। সিঙ্গাপুরও তার অবস্থান পরিবর্তন করেনি। এ অবস্থানগুলো চরম নয়; বরং এগুলো একটি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখে।

তাই মূল প্রশ্ন হলো, মিয়ানমারে একক সরকার আছে কি না, তা নয়; আসল প্রশ্ন হলো, দেশটি যে নতুন সরকার গড়ছে, তা কি বিশ্ব দেখছে এবং তারা কি সেই শক্তির পাশে দাঁড়াবে, যারা জনগণের জন্য কাজ করতে পারে?

  • জেমস শোয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় বসবাসকারী মিয়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াবিষয়ক স্বাধীন বিশ্লেষক ও লেখক

  • এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনূদিত।

Read full story at source