বাঘ আমাদের গর্ব

· Prothom Alo

গেল বছর প্রথম আলো প্রচারিত ‘অভিজ্ঞতার আলো’ অনুষ্ঠান দেখছিলাম। বক্তা আমার প্রিয় মানুষ অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। সঞ্চালক লেখক ও সাহিত্যিক আনিসুল হক। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার বাঘের গল্প বলছিলেন, ‘সেদিন একটা জায়গায় গেছিলাম, শ্রীপুরে। তো সেখানে যেয়ে দেখলাম একটা জায়গার নাম “বাঘের বাজার”। তবে আমাদের দেশে তো সব সময় বাঘ ছিল। ঢাকাতে আমিই প্রায় বাঘ দেখেছি। ঢাকা-টাঙ্গাইল রোডে তো একদম সামনাসামনি দেখেছি। আর সকাল বেলায় আমি যখন পুরানা পল্টনে থাকতাম, প্রতিদিন হাঁটতে বেরোতাম এবং পুরান ঢাকার কাছে যেতেই যাওয়ার রাস্তার দুই পাশে তো জঙ্গল, কেমন একটা ভয় এবং যখন পুরোনো এয়ারপোর্টের কাছে যেতাম, তখন ভয়টা ভীষণভাবে বেড়ে যেত। কারণ, তার মাত্র পাঁচ না ছয় বছর আগে ওখানে একটা বড় বাঘ মারা হইছিল, মানে এক রিয়্যাল (আসল) রয়েল বেঙ্গল টাইগার। তো সুতরাং আমরা বাঘের সঙ্গে পরিচিত।’

Visit saltysenoritaaz.com for more information.

ব্রিটিশ আমলে ঢাকার পুলিশ রেকর্ড থেকে দেখা যায়, ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত ঢাকায় প্রতিবছর কমপক্ষে একজন মানুষ বাঘের আক্রমণে মৃত্যুবরণ করেছে। তখন বাঘ ও চিতা বাঘ মারলে পুরস্কৃত করা হতো। বেঁচে থাকার প্রাকৃতিক আশ্রয় নষ্ট হয়ে যাওয়া এবং অনেকটা নির্বিচার শিকারের কারণে হারিয়ে গেল প্রায় সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা বাঘ ও চিতা বাঘ। ১৯০০ সালের দিকেও জমিদার কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ঢাকার কাছে ভাওয়ালের বনে বাঘ শিকার করেন। বর্তমানে বাংলাদেশের বাঘের শেষ আশ্রয়স্থল সুন্দরবন।

নব্বইয়ের দশকে অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশের বন্য প্রাণীদের ওপর আমার একটি আলোচনা শেষ হতেই নিউজিল্যান্ড থেকে আগত একজন জানতে চাইলেন, আমাদের দেশটা কত বড় এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে কতজন মানুষ বসবাস করে। উত্তর দিতেই বিস্ময়ে বললেন, তবে যে তুমি বললে তোমাদের দেশে হাতি আছে, বাঘ আছে? বললাম, হ্যাঁ আছে। আরও বিস্মিত হয়ে বললেন, তাহলে তোমরা থাকো কোথায় আর ওরা থাকে কোথায়?

১৯৯২ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেশে ফেরার আগে উপাচার্য মহোদয়ের বাসভবনে স্ত্রী-কন্যাসহ দাওয়াতে গেলাম। এক ভদ্রমহিলা আমার স্ত্রীর কাছে জানতে চাইলেন, বাংলাদেশের কোন অঞ্চলে থাকি। ঢাকার কথা শুনে বললেন, ‘ওটা তো তোমাদের রাজধানী!’ আমার স্ত্রী যখন বললেন, ‘ঢাকায় আমার বাবার বাসায় যেয়ে থাকব।’ উনি বললেন, ‘শুনেছি তোমাদের দেশে অনেক মানুষ এবং দেশটা অসচ্ছল, সেখানে ব্যক্তিগত পর্যায়ে রাজধানীতে আলাদা বাড়ি আছে?’ আমি বুঝে নিলাম তিনি কী বলতে চাইলেন।

দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে বন্য প্রাণীর ওপর আলাদাভাবে আইন ছিল না। ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশের মাধ্যমে এর শুরু। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৪, ২০১২ ও সর্বশেষে ২০২৬ সালে এটিকে আইনের আওতায় এনে কার্যকর করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে জীববৈচিত্র্য আইন করা হয়েছে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে উল্লেখ আছে, ‘রাষ্ট্র বন ও বন্য প্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান করিবে।’ এ মাসেই সরকার ওয়াইল্ডলাইফ কমিশন গঠন করেছে। অর্থাৎ বাঘ ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা রয়েছে। প্রয়োজন জনগণকে সম্পৃক্ত করা।

১৯৮১ সালে আমি যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা রাজ্যের একটি প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণ নিতে যাই। পরিচালক ভিক্টর বিরনটাস একদিন বললেন, রাতে ওর এক বন্ধু ডিনারে দাওয়াত করেছেন। ডিনারে ভিকের বন্ধু বললেন, ‘আনোয়ার, আমি আলাস্কা থেকে তোমাকে দেখতে এসেছি।’ আমাকে কেন? উত্তর: ‘সারা জীবন প্রকৃতিতে বাঘ দেখতে চেয়েছিলাম, হয়নি। তুমি বাঘের দেশের মানুষ, ভাবলাম, বাঘ হয়তো জীবনে আর দেখা হবে না, তাই তোমাকে দেখেই সে স্বাদ মেটালাম।’

সম্প্রতি আমাদের বন বিভাগ বাঘ সুরক্ষায় ইতিহাস সৃষ্টি করেছে। একটি আহত বাঘিনীকে গত ৪ জানুয়ারি সুন্দরবন থেকে উদ্ধারের পর সুস্থ করে এ মাসের ১২ তারিখে বনে অবমুক্ত করেছে। অনেকের সঙ্গে আমিও ওই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী। সারা দেশের মানুষের আবেগের সঙ্গে আমার অবচেতন মনেও একটি বাক্যই অনুরণিত হয়েছে—বাঘ আমাদের গর্ব, বাঘ সুরক্ষা করব।

  • মো. আনোয়ারুল ইসলাম: সাবেক অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; প্রধান নির্বাহী, ওয়াইল্ডটিম

Read full story at source