রিপোর্টার চোখে যা দেখবে, তা লেখার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে: সুহাসিনী হায়দার

· Prothom Alo

গণমাধ্যমের ওপর জন–আস্থা ফিরিয়ে আনতে মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদকেরা নিজেদের চোখে যা দেখেন, তা নির্ভয়ে লেখার অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি বলে উল্লেখ করেছেন ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় পত্রিকা দ্য হিন্দুর কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাসিনী হায়দার। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় সংকট সরাসরি সরকারি সেন্সরশিপ নয়, বরং সাংবাদিকদের মধ্যে বেড়ে ওঠা স্ব-সেন্সরশিপ।

আজ শুক্রবার রাজধানীর একটি হোটেলে ঢাকা ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিটিকস (দায়রা) আয়োজিত বেঙ্গল ডেল্টা কনফারেন্স-২০২৬ এ ‘মিডিয়া রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটিজ’ শীর্ষক এক প্যানেল আলোচনায় এসব কথা বলেন সুহাসিনী হায়দার। তিনি বলেন, অতীতে গণমাধ্যমের ওপর চাপ ছিল প্রকাশ্য। সরকার নিষিদ্ধ করত, সাংবাদিকদের কারাগারে পাঠাত কিংবা মালিকপক্ষের রাজনৈতিক অবস্থান সংবাদ পরিবেশনকে প্রভাবিত করত। কিন্তু এখন অনেক ক্ষেত্রেই সাংবাদিকেরা নিজেরাই নানা কারণে সংবাদের সীমা টেনে দিচ্ছেন।

Visit catcross.biz for more information.

সুহাসিনী হায়দার, কূটনৈতিক সম্পাদক, দ্য হিন্দুএখন সবার হাতে ক্যামেরা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থাকলেও পেশাদার সাংবাদিকতার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়নি। বরং মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য গণমাধ্যমকে নির্ভরযোগ্য তথ্য, বিশ্লেষণ ও প্রেক্ষাপট দিতে হবে

সুহাসিনী আরও বলেন, গণমাধ্যমের প্রথম কাজ হওয়া উচিত মাঠের প্রতিবেদকদের নিজেদের দেখা বাস্তবতা তুলে ধরার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। প্রশিক্ষিত সাংবাদিকের সঙ্গে একজন সাধারণ নাগরিকের পার্থক্য এখানেই যে সাংবাদিক তথ্য যাচাই করেন, সব পক্ষের বক্তব্য নেন, ঘটনাকে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা করেন এবং ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির আওতায় আনেন। তাঁর ভাষায়, একজন সাংবাদিক জনগণের পক্ষে দাঁড়িয়ে সত্যকে ক্ষমতার সামনে তুলে ধরেন।

সুহাসিনী হায়দার বলেন, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের পর বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয়তাবাদী ও কর্তৃত্ববাদী নেতৃত্বের উত্থান ঘটেছে। একই সঙ্গে বহুত্ববাদ, মানবাধিকার, বেসরকারি সংস্থা ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর চাপ বেড়েছে। এ পরিস্থিতি শুধু একটি দেশের নয়, বিশ্বের অনেক দেশের সাংবাদিকদের অভিন্ন বাস্তবতা।

গণমাধ্যমের ভবিষ্যৎ নিয়ে সুহাসিনী বলেন, এখন সবার হাতে ক্যামেরা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থাকলেও পেশাদার সাংবাদিকতার প্রয়োজন শেষ হয়ে যায়নি। বরং মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য গণমাধ্যমকে নির্ভরযোগ্য তথ্য, বিশ্লেষণ ও প্রেক্ষাপট দিতে হবে। তাঁর মতে, গণমাধ্যমের কাজ তথ্য দেওয়া, শিক্ষিত করা ও ঘটনার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করা—বিনোদন দেওয়া নয়।

সুহাসিনী হায়দার আরও বলেন, গণমাধ্যমকে টেকসই করতে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুবিধা কাজে লাগিয়ে ব্যয় কমাতে হবে। একই সঙ্গে বিজ্ঞাপননির্ভরতার পরিবর্তে পাঠকনির্ভর রাজস্ব মডেলের দিকে যেতে হবে। তাঁর মতে, আয়ের বড় অংশ পাঠকের কাছ থেকে এলে গণমাধ্যম সরকার, করপোরেট বা অন্য কোনো স্বার্থগোষ্ঠীর কাছে কম জবাবদিহি থাকবে এবং স্বাধীনভাবে সাংবাদিকতা করতে পারবে।

‘পশ্চিমা মডেল আর আদর্শ নয়’

নেপালের জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক কনক মানি দিক্ষিত বলেন, ‘আমরা আগে পশ্চিমা মিডিয়াকে আদর্শ হিসেবে গণ্য করতাম। কিন্তু এখন আমাদের এই সিদ্ধান্তে আসা উচিত যেকোনো নির্দিষ্ট আদর্শ বা উদাহরণ বলতে কিছু নেই। উদাহরণস্বরূপ, গাজা ইস্যুতে নিউইয়র্ক টাইমসের অবস্থান অত্যন্ত দুর্বল ছিল। একইভাবে পশ্চিমা মিডিয়ার আরও অনেক দুর্বলতা আমরা দেখেছি। তাই ঢাকা, কাঠমান্ডু, দিল্লি, ইসলামাবাদ বা কলম্বো আমাদের প্রত্যেককেই নিজেদের মানদণ্ড নিজেরা নির্ধারণ করতে হবে, অন্য কাউকে আদর্শ মানার প্রয়োজন নেই।’

কনক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইনফ্লুয়েন্সার সংস্কৃতির উত্থানে প্রচলিত সংবাদমাধ্যমের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা এবং সংবাদমাধ্যমকে রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণমুক্ত রাখা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।

আরও বেশি করে সাংবাদিকতা করতে হবে

গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ও ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের কনসাল্টিং এডিটর কামাল আহমেদ প্যানেল আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, সংবাদপত্রের প্রচার সংখ্যা কমছে। ড্রয়িংরুমে থাকা টিভি মাসের পর মাস কেউ সুইচ অন করে না। পাঠকেরা কই, দর্শক-শ্রোতারা কই?

কামাল আহমেদ বলেন, ‘এর উত্তর হলো আমরা এখন কম সাংবাদিকতা করছি। আমাদের আরও বেশি সাংবাদিকতা করা উচিত। আমরা এখন যা করছি তা হলো কথার দোকান (টকিং শপ)। টিভি খুললেই টক শো আর টক শো। এগুলো সাংবাদিকতা নয়। সাংবাদিকরা যা দেখবেন, তা রিপোর্ট করবেন। বাস্তবে তা হয় না।’

সেশনটি পরিচালনা করেন ঢাকা ট্রিবিউনের সাবেক সম্পাদক জাফর সোবহান।

Read full story at source