ত্রিশঙ্কু অবস্থার চালচিত্র
· Prothom Alo

স্বাধীন ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার রূপকল্প ও দৃষ্টিভঙ্গিটি বোঝা যায় ভারতের গণপরিষদে প্রদত্ত সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের এই কথায়: ‘ভারত রাষ্ট্র কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের সঙ্গে নিজেকে চিহ্নিত করবে না বা কোনো ধর্ম দ্বারা পরিচালিত হবে না। আমরা বিশ্বাস করি, কোনো ধর্মকে বিশেষ মর্যাদা বা অনন্য স্বীকৃতি দেওয়া উচিত নয় এবং কোনো ধর্মকে জাতীয় জীবনে বা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা দেওয়াও অনুচিত, কারণ তা গণতন্ত্রের মৌলিক নীতিমালার লঙ্ঘন এবং ধর্ম ও সরকারের সর্বোত্তম স্বার্থের পরিপন্থী।’
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতালাভের পর ১৯৪৯ সালেই প্রণীত রিপাবলিক অব ইন্ডিয়ার প্রথম সংবিধানের প্রধান তত্ত্বগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে গৃহীত হয় ‘সেক্যুলারিজম’। কিন্তু ব্যাপারটি হলো, তখন ভারতীয় সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অনুচ্ছেদ ২৫(২)(খ)-এ ধর্মনিরপেক্ষতাকে বোঝাতে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’, ‘ধর্মপালনে নিরপেক্ষতা’, ‘বিধিবদ্ধ ও সংস্কারিত বিচার’ ইত্যাদি বিষয়কে নিশ্চিত করা হয়েছিল। এ সংবিধানের ২৫ থেকে ২৮ অনুচ্ছেদে ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছিল—নিজের ধর্ম মানা, পালন করা ও প্রচার করার অধিকার, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজেদের ধর্মের প্রসারের জন্য কাউকে বিশেষ কর দিতে বাধ্য না করা, ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিজেদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকার, সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় শিক্ষার নিয়ম নির্ধারণের বিষয়ে নির্দেশনা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৭৬ সালের ৪২তম সংশোধনীর প্রস্তাবে বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করা হয় এ ঘোষণা দিয়ে যে ভারত একটি ‘সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’। কিন্তু কোথাও ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি, যেমন ফ্রান্সের সংবিধানেও ‘লায়িসিতে’র (ধর্মনিরপেক্ষতা বা রাষ্ট্রের ধর্মীয় নিরপেক্ষতার নীতি) কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ধরে নেওয়া হয়েছে যে এর ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে জনমানসে, যা রাজনৈতিক ব্যাখ্যা হিসেবেও একই অর্থকে বোঝায়। আমরা ইতিমধ্যে আমেরিকা (যুক্তরাষ্ট্র) ও ফ্রান্সের ধর্মনিরপেক্ষতাকে দুটি বর্গে ভাগ করে দেখেছি : আমেরিকার সেক্যুলারিজমকে আমরা বলেছি পৃথক্করণ (সেপারেশন), যা বোঝায় প্রতিষ্ঠাহীনতা বা নিরপেক্ষতা, আর ফ্রান্সের ক্ষেত্রে দেখেছি রাষ্ট্রীয় আধিপত্যবাদ। ভারত ঠিক এ দুটির কোনোটাকেই গ্রহণ না করে এমন একটি পদ্ধতিকে গ্রহণ করে, যাকে বলা যায় অভিযোজনবাদ (অ্যাকমোডেশনিজম), যেখানে ধর্মের প্রতি রাষ্ট্রের আগ্রহ ব্যক্ত থাকে। যেহেতু ধর্ম মানুষের জন্য ইতিবাচক, সেহেতু রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। সুতরাং একে বলা যায় ধর্মবাস্তব সেক্যুলার কাঠামো। এটি আমেরিকা ও ফ্রান্সের সেক্যুরারিজম থেকে আলাদা। সব ধর্ম–মতকে রক্ষার মাধ্যমে তা সকল নাগরিকের আধ্যাত্মিক অধিকারকে নিশ্চিত করতে চায়। এই সেক্যুলারিজম সমতা, সহনশীলতা, বিবেকের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতাকে একই সঙ্গে গুরুত্ব দেয়। যেহেতু ভারত নানা পথ ও মতের সম্মিলনস্থল এবং এ বাস্তবতা রয়েছে ভারতের ইতিহাসে, তাই সবার অধিকারকে সংরক্ষণ করা ভারতীয়ত্বের ঐতিহাসিক দায়। তাই লায়িসিতের যে অহংকার ফরাসিদের মধ্যে জারিত, তা ভারতীয়দের কাছে অপ্রয়োজনীয়। সে কারণেই ভারতে ধর্মকে নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং সহায়তার মাধ্যমে ধর্মনিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন রাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজনীয়। এ বিবেচনা থেকেই সরকারি সমর্থনে ও প্রশাসনে ধর্মীয় বিদ্যালয়, মন্দির, কেন্দ্রীয় ইসলামি ওয়াক্ফ কাউন্সিল, খ্রিষ্টীয় প্রতিষ্ঠান, শিখদের গুরুদুয়ারা ইত্যাদি পরিচালিত হয়। এমনকি ব্যক্তিগত আইনের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, মুসলমানদের জন্য ক্ষেত্রবিশেষে শরিয়াহ আইনও প্রচলিত রয়েছে। সুতরাং ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা অভিযোজনবাদী, তা সবাইকে ধরে রাখতে চায় তাদের নিজ নিজ ধর্মীয় বৈশিষ্ট্য বজায় রেখে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের নীতি কেমন ছিল, তা দেখা জরুরি।
Visit sport-tr.bet for more information.
এআইয়ের সহযোগিতায় প্রতীকী ছবিস্যার সৈয়দ আহমেদ কলকাতার আর্চবিশপ ফাদার এডমন্ডের জারি করা একটি পরিপত্রের কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে সরকারি কর্মচারীদের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। স্যার সৈয়দ আহমেদ, যিনি নিজেও ছিলেন সরকারি কর্মচারী, লিখেছেন, ‘এসব পরিপত্র আমাদের হাতে আসার পর চোখ ঘোরগ্রস্ত হয়ে পড়ল, পায়ের নিচের মাটি কাঁপতে লাগল আর আমরা সবাই একমত হলাম যে সময় দ্বারপ্রান্তে এসে গেছে, যখন প্রথমে সরকারি কর্মচারীদের, তারপর প্রজাগণকেই খ্রিষ্টান বানানো হবে।’
শুরুতেই মনে রাখা দরকার, ব্রিটিশ আমলে ভারত কোনো রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল না, ছিল উপনিবেশ। আরও মনে রাখা দরকার, খোদ ব্রিটেন কোনো সেক্যুলার রাষ্ট্র নয় বা কোনোকালে ছিলও না। ১৫৩৪ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এখন পর্যন্ত চার্চ অব ইংল্যান্ড নামে ধর্মের সংগঠন রয়েছে সেখানে এবং অষ্টাদশ শতাব্দে এর প্রভাব ছিল মারাত্মক। একই রকম রয়েছে স্কটল্যান্ডে; চার্চ অব স্কটল্যান্ড নামে, ষোড়শ শতাব্দ থেকে। ওয়েলশ চার্চ অ্যাংলিকানপন্থী। জেফারসন ও ম্যাডিসনের সমতুল্য কোনো সেক্যুলারমনা নেতা তখন ইংল্যান্ডে ছিলেন না। যদি ব্রিটেনে এমন ধরনের সমমানের সমান্তরাল ব্যক্তিত্ব থাকতেন, তাঁরাও ‘বিশ্বাসী উনিশ’ শতকে ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক ধর্মনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্র যে ধর্মীয় প্রতিরোধের মুখোমুখি হয়েছিল, তাতে একইভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়তেন—এমনটাই বলেছেন বার্লিনারব্লাউ তাঁর সেক্যুলারিজম গ্রন্থে। তিনি আরও বলেছেন, তবু ব্রিটিশরা তাদের নিজ দেশে নয়, দক্ষিণ এশীয় উপনিবেশে, একটি অশুভ মোচড়ে রাষ্ট্রীয় শাসনকার্যে এ ধর্মনিরপেক্ষতাকে চাপিয়ে দিয়েছিল। এর মধ্যে মনে হয় একটি ধর্মীয় স্বার্থ লুক্কায়িত ছিল: কোনো দেশে নতুন ধর্ম বিকাশের ক্ষেত্রে ধর্মনিরপেক্ষতা একটি অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি করে। ব্রিটিশরা ভারতবর্ষে খ্রিষ্টানিটিকে প্রতিষ্ঠা ও প্রসারের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার বাতাবরণকে প্রয়োজনীয় মর্মে বোধ করেছিল। কারণ, নতুন ধর্মের বীজ বপন ও বৃদ্ধির জন্য তার দরকার ছিল। ধর্মান্তরকরণের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার প্রয়োজন ছিল আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তো তাদের হাতেই ছিল।
১৮৫৮ সালে, সিপাহি বিদ্রোহের এক বছর পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে সরিয়ে ব্রিটিশরাজ ব্রিটিশ ভারতের দায়িত্বভার গ্রহণ করে। তখনকার গর্ভনর লর্ড ক্যানিং রানি ভিক্টোরিয়ার পক্ষে একটি সংযোজনী ঘোষণা করেন, যা ছিল এরূপ—‘খ্রিষ্টধর্মের সত্যের ওপর দৃঢ়ভাবে নির্ভর করে এবং ধর্মের অভয়কে প্রশংসাসহকারে মেনে নিয়ে, আমরা আমাদের বিশ্বাস কোনো অনুগতদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার বা ইচ্ছা, উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করি। আমরা ঘোষণা করছি, আমাদের রাজকীয় সদিচ্ছা ও অভিলাষ এই যে কেউ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস বা উপাসনার কারণে কোনোভাবেই উৎপীড়িত হবে না বা অশান্তিতে পড়বে না; বরং সবাইকে সমান ও নিরপেক্ষ আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার দেওয়া হবে এবং আমরা আমাদের অধীন সকল কর্তৃপক্ষকে কঠোরভাবে নির্দেশনা প্রদান করছি যে আমাদের সর্বোচ্চ অসন্তুষ্টির শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কার আওতায় তারা আমাদের কোনো প্রজার ধর্মীয় বিশ্বাস বা উপাসনায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে।’ তারও আগে ১৮৩৫ সালে লর্ড ম্যাকলের প্রস্তাব গ্রহণ করে ইংরেজিকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন এবং ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে ইংরেজিকে নির্ধারণ করেন গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেনটিঙ্ক। নতুন ফৌজদারি আইন প্রণয়ন করা হলো। শিক্ষাকে ধর্মনিরপেক্ষ রাখা হলো। এ ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষানীতি হিন্দু-মুসলমান সবার কাছেই আদ্রিত হলো, কারণ তারা মিশনারিদের কার্যকলাপে আতঙ্কিত ছিল, যা ছিল খ্রিষ্টধর্মভিত্তিক ধর্মপ্রচারণা ও প্রসারের মাধ্যম। স্যার সৈয়দ আহমেদ খান এ নিরপেক্ষ নীতিকে সমর্থন জানিয়ে বললেন, ‘ভারত সরকারের প্রজাকুল বিভিন্ন ধর্মের। এদের একটি অন্যটিকে মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করে; সুতরাং সরকার কোনো রকম ধর্মীয় শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারে না; আমরা সকল আন্তরিকতাসহকারে বলি যে সরকার পুরোপুরি পক্ষপাতশূন্যভাবে প্রশাসনকে গ্রহণ করেছে, যা ধর্মীয় পক্ষপাত থেকে মুক্ত এবং শিক্ষা প্রদানের জন্য সকল সক্ষমতাকে সৃষ্টি করছে; কোনোটাই আগে কখনো দেখা যায়নি।’
দুটি দৃষ্টান্তেই ধর্মনিরপেক্ষতার কথাই বলা হয়েছে। এতে সেক্যুলার বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী প্রতিষ্ঠাহীনতা বা নিরপেক্ষতার কথা প্রতিধ্বনিত—‘আমরা ঘোষণা করছি, এটি আমাদের রাজকীয় সদিচ্ছা ও অভিলাষ যে কেউ তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস বা উপাসনার কারণে কোনোভাবেই উৎপীড়ন বা অশান্তিতে পড়বে না।’ সমতার বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘সকলকে সমান ও নিরপেক্ষ আইনি সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার দেওয়া হবে;’ সহনশীলতা বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘আমরা আমাদের অধীন সকল কর্তৃপক্ষকে কঠোরভাবে নির্দেশনা প্রদান করছি যে আমাদের অসন্তুষ্টির সর্বোচ্চ শাস্তির সম্মুখীন হওয়ার আশঙ্কার আওতায় তারা আমাদের কোনো প্রজার ধর্মীয় বিশ্বাস বা উপাসনায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবে।’ ফ্রান্সে যেমন রাষ্ট্রীয় প্রাধান্য বা শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে, তেমন কোনো কথা এখানে নেই, কারণ এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রই নেই, আছে উপনিবেশ। উপনিবেশে নাগরিক থাকে না, থাকে প্রজা।
লর্ড ম্যাকলের সাবধান বাণীকে অবজ্ঞা করে ব্রিটিশ ভারতীয় সরকার মিশনারিদের পৃষ্ঠপোষকতা করা বাড়িয়ে দিল নানাভাবে। সিবতে হাসান তাঁর দ্য ব্যাটল অব আইডিয়াস ইন পাকিস্তান গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, স্যার সৈয়দ আহমেদ তাঁর কজেস অব ইন্ডিয়ান মিউটিনি গ্রন্থে সরকারি কর্মকর্তাদের সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি স্পষ্ট উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন, কীভাবে দুর্ভিক্ষাক্রান্ত শিশুদের খ্রিষ্টান বানানো হতো, কীভাবে সরকারি বেতনভুক যাজকেরা মান্য হিন্দু-মুসলমান ব্যক্তিদের ভাষা দিয়ে আক্রমণ করত, কীভাবে সরকারি ব্যয়ে পরিচালিত মিশনারি বিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েরা খ্রিষ্টীয় লিপিতে পরীক্ষা দিতে বাধ্য থাকত। স্যার সৈয়দ আহমেদ কলকাতার আর্চবিশপ ফাদার এডমন্ডের জারি করা একটি পরিপত্রের কথাও উল্লেখ করেন, যেখানে সরকারি কর্মচারীদের খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। স্যার সৈয়দ আহমেদ, যিনি নিজেও ছিলেন সরকারি কর্মচারী, লিখেছেন, ‘এসব পরিপত্র আমাদের হাতে আসার পর চোখ ঘোরগ্রস্ত হয়ে পড়ল, পায়ের নিচের মাটি কাঁপতে লাগল আর আমরা সবাই একমত হলাম যে সময় দ্বারপ্রান্তে এসে গেছে, যখন প্রথমে সরকারি কর্মচারীদের, তারপর প্রজাগণকেই খ্রিষ্টান বানানো হবে।’
এআইয়ের সহযোগিতায় প্রতীকী ছবিস্বাধীন ভারতে এ-জাতীয় বিভাজনিক অবস্থা রাখার কারণ বোধ হয় ধর্মের প্রতি অহেতুক স্পর্শকাতরতা। গান্ধীর ‘সর্ব ধর্ম সমভাব’ নীতি এ ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছে বলে মনে করা যায়। ভারতীয় নতুন সংবিধানে তিনটি প্রধান নীতিকে রাখা হয়েছে, যা সেক্যুলারিজমকে উচ্চতা দিয়েছে; সকল বিশ্বাসীর সমানাধিকার, সংখ্যালঘুর অধিকার প্রশ্নে সহনশীলতা, নিরপেক্ষতা। ধর্মের কারণে এবং চাকরিক্ষেত্রে সকল পর্যায়ে সকল বৈষম্যকে নিষেধ করা হয়েছে।
১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পরও খ্রিষ্টান মিশনারিদের পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত ছিল; কিন্তু রাষ্ট্রের আইনকানুন ধর্মনিরপেক্ষ করার বিষয়ে নজর ও গরজ দেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করা হলো। ১৮৫৯ সালে দেওয়ানি আইন, তার পরের বছর ফৌজদারি আইন এবং ১৮৮২ সালে সাক্ষ্য আইন পাস করা হয়। ১৮৬৪ সালে দেওয়ানি আদালত থেকে কাজি ও হিন্দু পুরোহিতদের বাদ দেওয়া হয়। সুতরাং বলা যায়, ব্রিটিশরাজত্ব কার্যত সেক্যুলার ছিল না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও বেপোরোয়া ধর্মীয় কর্মতৎপরতা কমানোর ক্ষেত্রে এর সার্থকতা ছিল না। ধর্মীয় দ্বন্দ্ব ব্রিটিশরা আসার আগেও ছিল, কিন্তু ব্রিটিশ আমলে তা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। বেড়ে গিয়েছিল জোর করে ধর্মান্তরকরণের কার্যক্রম। সরকারি প্রতিষ্ঠানে, যোগাযোগবাহনে, সামাজিকতায় স্বদেশিদের প্রতি ঘৃণা ছিল মারাত্মক, যা জাতিগত ও ধর্মীয়, দুটি কারণেই হয়েছিল। ফলে শাসকদের এ ধরনের ঘোষণা ছিল একধরনের ছদ্ম-ধর্মনিরপেক্ষতা। বরং ব্রিটিশ ভারতে কৌশল অবলম্বন করা হয়েছিল ‘ভাগ করো আর শাসন করো’ নীতির, যাকে লাতিনে বলা হয় ডিভিদে এত ইমপেরা (divide et impera), বা ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’, যা মোরাদাবাদের কমান্ড্যান্ট লে. কর্নেল কুকের কথায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল—‘বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মধ্যে বিরাজিত বিচ্ছিন্নতাকে জোরদার করা (যা আমাদের জন্য মঙ্গলজনক), তাদের একত্রকরণের কোনো চেষ্টা নয়। “ডিভিদে এত ইমপেরা”ই ভারতীয় সরকারের নীতি।’ এ নীতির সফল প্রয়োগ তারা করেছিল হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের ক্ষেত্রেও।
বহু ধর্ম–ভাষা–জাতির ভারতে সেক্যুলারিজম ঠিক নির্দেশাত্মক নয়, হতেও পারে না। কারণ, ধর্ম এখানে প্রাকৃতিক ন্যায্যতা, নৈতিক দায় ও বণ্টনমূলক ন্যায় বলে বিবেচিত। তাই পাশ্চাত্যের কিছু নীতি ও তত্ত্বকে নিজেদের মতো স্বনির্ধারণ বা স্বীকরণ করে ভারতের সেক্যুলারিজম বিকশিত, যাকে বার্লিনারব্লাউ বলেছেন ‘হাইব্রিড সেক্যুলারিজম’ বা বলা যায় রাষ্ট্রীয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ।
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতালাভের পর মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, বি আর আম্বেদকরের হাত দিয়ে নতুনভাবে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ শুরু হয়। ১৯৫০ সালে সংবিধান কার্যকর হয়। ধর্মনিরপেক্ষতাকে বিবেচনা করা হয় ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় অধিকার সংরক্ষণের রক্ষাকবচ হিসেবে। ধর্মনিরপেক্ষতার তিনটি মূলনীতিকে সংবিধানে সন্নিবেশিত করা হয়—ধর্মীয় স্বাধীনতা, ধর্ম উদ্যাপনের নিরপেক্ষতা, নিয়ন্ত্রিত ও সংস্কারিত বিচার। এসবের মাধ্যমে ধর্মীয় বৈষম্যহীনতা, অংশগ্রহণমূলক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রগঠন, সামাজিক সংস্কারের নিশ্চয়তা পাওয়ার চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু তাতে অনেক কিছু রয়ে যায় যা সাবেকি, যার সংস্কার হওয়া উচিত ছিল। যেমন ১৯৩৭ সালের মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) বলবৎ রাখা হয়, তার মানে মুসলিমরা শরিয়াহ আইন দ্বারা পরিচালিত হতে পারবে। এর ফলে সমরূপী সিভিল কোড করা কঠিন হয়ে যায়। মুসলিমরা দুটি আইনে পরিচালিত হতে থাকে। একে উপযোজনবাদী সেক্যুলারিজম বলা হলেও এতে সমস্যা বেড়েই চলে। স্বাধীন ভারতে এ-জাতীয় বিভাজনিক অবস্থা রাখার কারণ বোধ হয় ধর্মের প্রতি অহেতুক স্পর্শকাতরতা। গান্ধীর ‘সর্ব ধর্ম সমভাব’ নীতি এ ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করেছে বলে মনে করা যায়। ভারতীয় নতুন সংবিধানে তিনটি প্রধান নীতিকে রাখা হয়েছে, যা সেক্যুলারিজমকে উচ্চতা দিয়েছে; সকল বিশ্বাসীর সমানাধিকার, সংখ্যালঘুর অধিকার প্রশ্নে সহনশীলতা, নিরপেক্ষতা। ধর্মের কারণে এবং চাকরিক্ষেত্রে সকল পর্যায়ে সকল বৈষম্যকে নিষেধ করা হয়েছে। অনুচ্ছেদ ২৮-এ ঘোষণা করা হয়েছে যে পুরো সরকারি অনুদানে পরিচালিত কোনো বিদ্যালয়েই ধর্মশিক্ষা দেওয়া যাবে না। ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে সকল নাগরিকের বিবেকের স্বাধীনতা এবং ধর্মচর্চা, প্রকাশ ও প্রচার করার স্বাধীনতার কথা বলা হয়েছে যতক্ষণ না তা জনশৃঙ্খলা, নৈতিকতা ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকির কারণ হয়। অনুচ্ছেদ ৩০-এ সংখ্যালঘুদের নিজস্ব বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। যখন রাষ্ট্র কোনো বিদ্যালয়কে অনুদান দেয়, তখন ধর্ম বা ভাষা যা-ই হোক না কেন, সংখ্যালঘু দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠান বলে কোনো বৈষম্য করা যাবে না।
এআইয়ের সহযোগিতায় প্রতীকী ছবিভারতে ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত দাঙ্গার ওপর টাইম ম্যাগাজিনের বিশেষ প্রতিবেদনে ভারতের হিন্দু-মুসলমানের গোলমেলে বিভক্তির বিষয়ে বলা হয়েছে, ভারতে হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের সহিংস আক্রমণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা বেশি। পুলিশ রেকর্ড অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে সংঘটিত সকল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মোট জীবনহানি ও সম্পত্তি-ক্ষয়ক্ষতির তিন-চতুর্থাংশই হয়েছিল মুসলমান সম্প্রদায়ের, যা ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার সময় শতকরা ৮৫–তে পৌঁছেছিল।
ভারতে যে ধরনের ধর্মনিরপেক্ষতা বিদ্যমান, তাকে বলা যায় ধর্মবান্ধব সমঝোতামূলক বা উপযোজনবাদী সেক্যুলারিজম। এ ব্যবস্থায় ধর্মকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হয়, যার মাধ্যমে সমাজ ও রাষ্ট্রকল্যাণ নিশ্চিত হতে পারে বলে মনে করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ-জাতীয় ইতিবাচকতা নেতিবাচকতায়ও পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা খোদ ভারতেই দেখা দিয়েছে। আরএসএস ও বিজেপির হিন্দুত্ববাদ শুধু হিংসা ছড়ানোতেই আবদ্ধ থাকেনি, বরং সক্রিয় হানাহানিতে মেতে উঠেছে দিন দিন। ধর্মকে উদারকরণের প্রচেষ্টা রাজনীতিকরণের মধ্যেই তার শেষ অস্তিত্বকে জিইয়ে রেখেছে।
ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতা পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেয় যে ধর্ম ও রাজনীতির মধ্যে একটি যোগ রয়েছে, কিন্তু এ যোগকে ব্যাখ্যা প্রদান করা হয় না। সম্পর্কের ইতিবাচকতা বা ধরনকে তা স্পষ্ট করতে চায় না, ফলে ধর্মকে নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে রাষ্ট্রের ভূমিকা স্পষ্ট নয়। এ আলোকে বলা যায়, রাষ্ট্র, রাজনীতি ও ধর্মের সীমারেখাগুলো অস্পষ্ট থাকার কারণে তারা প্রায়ই সংঘাতে লিপ্ত হয়ে পড়ে। এর কারণে ধর্মনিরপেক্ষতা একটি সাংবিধানিক নীতি ও সামাজিক মূল্য হিসেবে নাগরিক যুক্তির ভিত্তি হিসেবে কাজ করলেও তা সব ভারতীয় নাগরিককে অন্তর্ভুক্তিমূলক বা সমতার আলোকে নাগরিক যুক্তিতে প্রবেশাধিকার দেয়নি। ফলে এই ধর্মনিরপেক্ষতার রূপ স্পষ্ট হয়নি, যা কার্যকরভাবে ভূমিকাশীল হতে পারে। বরং বলা যায়, তা কল্যাণের পরিবর্তে একটি ধূম্রকুণ্ডলির জন্ম দিয়েছে, যা থেকে বিপর্যয় জন্ম নিতে থাকে।
এদিক থেকে বিবেচনা করলে বর্তমান ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা ভুল পথে চলা এক রাজনৈতিক বাস্তবতা, যাকে হাতসাফাই করছে ধর্মীয় রাজনৈতিক দলগুলো। ধর্মনিরপেক্ষতা ও সহিংসতা সেখানে হাত–ধরাধরি করে চলে। দেশভাগের পর এই হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক পর্যায়ক্রমে সহিংসতা ও দাঙ্গায় গড়িয়ে চলেছে অমীমাংসিত পথে। ১৯৬১ সালে জব্বলপুরে, ১৯৬৯ সালে আহমেদাবাদে, ১৯৭০ সালে বিহানন্দি জালগাঁওয়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়। ১৯৭০-এর শেষ ও ১৯৮০ সালের প্রথম দিকে অনেক স্থানে দাঙ্গা হয়। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১৯৫৪-৮২ সময়কালে ৬ হাজার ৯৩৩টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮০-৮৯ এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৫০০টি সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে, যাতে ৭ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে। এ সংখ্যা আগের সত্তরের দশকের সংখ্যার প্রায় চার গুণ বেশি। জেলার বিবেচনায়ও তা ক্রমবর্ধমান ছিল: ১৯৬১ সালে যেখানে ৬১টি জেলায় সংঘর্ষ ঘটে, সেখানে ১৯৮৬-৮৭ সময়ে তা বেড়ে হয় ২৫০টি জেলায়। ১৯৮৮ সালেই ৬১১টি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘটনা ঘটে, যার ৫৫ শতাংশই গ্রামীণ এলাকায়। এসব দাঙ্গা ছিল অতি স্পর্শকাতর কিছু জেলায়।১ ১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে অযোধ্যার বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা, যা নির্মিত হয়েছিল ১৫২৮ সালে প্রথম মোগল সম্রাট বাবরের দ্বারা। এটা যেন এক ভারতের ‘মনোলিথিক’ সমাজ নির্মাণের পাটাতনটিকে ধসিয়ে দিল।
২০০২ সালে গুজরাটে ঘটে ভয়াবহ মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা, যা ছিল ইতিহাসের এক নির্মমতা, যাতে দুই হাজারের বেশি মুসলমান মারা যায়। যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান-এর তথ্যমতে, ২৩০টি ইসলামি মনুমেন্ট ধ্বংস করে দেওয়া হয়, যেগুলোর মধ্যে ছিল ৪০০ বছরের বেশি পুরোনো একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নান্দনিক মসজিদ। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে মুম্বাইয়ে ঘটে জিহাদিদের আক্রমণ, যাতে দুই হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৯৫ সালে ইউএস লাইব্রেরি অব কংগ্রেস প্রণীত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতে সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষের কারণ ‘প্রাচীন ঘৃণা’ বা ধর্মীয় মৌলবাদ নয়; বরং ১৯৮০ সাল থেকে আর্থসামাজিক সমস্যা এবং ভারতীয় রাজনীতিবিদদের দায়িত্বহীন কৌশল গ্রহণের কারণে হয়েছে এ সংঘর্ষ। কাশ্মীরে মুসলিম গেরিলা দলগুলোর এবং পাঞ্জাবে শিখ গেরিলাদের তৎপরতাও সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের আবেগকে আক্রান্ত করেছে এভাবে যে ‘ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা সরকারের কাছ থেকে বিশেষ সুবিধালাভের জন্য আগ্রাসী যুদ্ধকৌশল প্রয়োগ করে থাকে’। সমীক্ষাটি বিষয়টির ইতি টানে এভাবে যে ভারতের সন্ত্রাসী, অপরাধী ও রাজনীতিবিদদের দ্বারা ভারতের ধর্মীয় উত্তেজনাকে দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করা হয়, যাতে ধর্মীয় আবেগ একটি শোষণের বস্তু হয়ে উঠেছে। ভারতে ২০০৩ সালে অনুষ্ঠিত দাঙ্গার ওপর টাইম ম্যাগাজিনের বিশেষ প্রতিবেদনে ভারতের হিন্দু-মুসলমানের গোলমেলে বিভক্তির বিষয়ে বলা হয়েছে, ভারতে হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের সহিংস আক্রমণের শিকার হওয়ার আশঙ্কা বেশি। পুলিশ রেকর্ড অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর থেকে সংঘটিত সকল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মোট জীবনহানি ও সম্পত্তি-ক্ষয়ক্ষতির তিন-চতুর্থাংশই হয়েছিল মুসলমান সম্প্রদায়ের, যা ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার সময় শতকরা ৮৫–তে পৌঁছেছিল।২
এআইয়ের সহযোগিতায় প্রতীকী ছবিধর্মীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে মুসলমান আলেমরা বারবার মুসলমান জনগণকে বোঝাতে চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন যে ভারতে তাদের ধর্ম বিপন্ন। পুরোনো ‘নিপীড়িত হওয়ার বোধ’ জাগিয়ে তুলে তাঁরা মুসলমানদের মধ্যে একটি মানসিকতা তৈরি করেন, ফলে তাঁরা সরকারের কাছে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক চাপে পরিণত হন। তাঁদের এ অবস্থান প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বারবার প্রভাব ফেলে, যার কারণে কেবল হিন্দুদের জন্য নয়, দীর্ঘ মেয়াদে তা মুসলমানদের জন্যও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
শশী থারুর তাঁর হোয়াই আই অ্যাম আ হিন্দু গ্রন্থে সমাজবিজ্ঞানী টি এন মদনের কথাকে পরোক্ষ উল্লেখ করে বলেছেন, আধুনিক ভারতীয় জীবনযাপনে ক্রমবর্ধমান সেক্যুলাইরাইজেশন ধর্মান্ধতা বৃদ্ধির জন্য দায়ী। কারণ, যেহেতু এতে বিশ্বাসের প্রান্তিকীকরণ ঘটে যা সেক্যুলারিজমের উদ্দেশ্য, ফলে ধর্মের বিকৃতিরও আবির্ভাব ঘটে। প্রথাগত সমাজে মৌলবাদী বা পুনর্জাগরণবাদী নেই, সেক্যুলারিজম তাই ভারতীয়দের তাদের মূল নৈতিক ভিত্তি থেকে বঞ্চিত করে, এর কারণে সেক্যুলারিজম প্রকল্পের অ্যান্টিথিসিস বা প্রতিচিন্তা হিসেবে ধর্মীয় উগ্রবাদের জন্ম হয়। এ ছাড়া রয়েছে ব্যবহৃত শব্দের অর্থগত বিপত্তির কথা। ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটির অর্থ যদি হয় ‘ধর্ম থেকে সরিয়ে রাখা’, তবে তা ভারতীয়দের জন্য অগ্রহণীয়। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে বিজেপি বলে, ভারত সরকার এ ধর্মনিরপেক্ষতাকে অনুসরণ করতে পারে না, বরং পন্থনিরপেক্ষতাকে অনুসরণ করতে পারে যা বোঝায় কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা বিশ্বাসকে প্রাধান্য না দেওয়া। এ জন্যই শশী থারুর বলেন, ‘ভারতে প্রচুর ধর্মীয়তা থাকা সত্ত্বেও সেক্যুলারিজম একটি ভুল শব্দ এবং আমাদের আসলে যা বলা উচিত, তা হলো বহুত্ববাদের কথা।’
১ হাজার ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে ভারতবর্ষে হিন্দু-মুসলমান একসঙ্গে বসবাস করে আসছে; কিন্তু এ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও অসহনশীলতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আধুনিক ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থাও এর কোনো উন্নতি করতে পারেনি; ‘ভারতীয়’ থেকে ‘হিন্দু’ পরিচয়কে বড় করার দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। কিন্তু কেন ভারতে এত দিনেও প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতা আসেনি, এ বিষয়ে ভাবনার অবকাশ রয়েছে। সালমান আখতারের সম্পাদিত ফ্রয়েড : অ্যালং দ্য গাঙ্গেস-এ এ বিষয়ের ওপর আলো ফেলা হয়েছে। তাঁর মতে, এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো, ভারতে প্রকৃত সেক্যুলার মানুষের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ভারতীয় মুসলমানরাও মনে করেন যে ভারতে তাঁরা কখনোই কোনো প্রগতিশীল, উদারপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ নেতৃত্ব লাভ করেনি। বিংশ শতাব্দের প্রথম দিকে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে যে ভাঙন শুরু, তার ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে বেশির ভাগ ধর্মনিরপেক্ষ মুসলমান কংগ্রেস দলের সঙ্গেই থেকে যান, কেউবা কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গেও থাকেন। ফলে ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষ মুসলমানরা একটি পৃথক, রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেননি। এর একটি দুঃখজনক পরিণতি হলো, ধর্মীয় মুসলমানরাই তখন পুরো মুসলিম সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক মুখপাত্র হয়ে ওঠেন। ফলে একটি সামাজিক বিপর্যয়ের বীজ রোপিত হয়। ধর্মীয় ব্যাখ্যার সঙ্গে যুক্ত হয়ে মুসলমান আলেমরা বারবার মুসলমান জনগণকে বোঝাতে চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন যে ভারতে তাদের ধর্ম বিপন্ন। পুরোনো ‘নিপীড়িত হওয়ার বোধ’ জাগিয়ে তুলে তাঁরা মুসলমানদের মধ্যে একটি মানসিকতা তৈরি করেন, ফলে তাঁরা সরকারের কাছে একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক চাপে পরিণত হন। তাঁদের এ অবস্থান প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বারবার প্রভাব ফেলে, যার কারণে কেবল হিন্দুদের জন্য নয়, দীর্ঘ মেয়াদে তা মুসলমানদের জন্যও ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।৩
এআইয়ের সহযোগিতায় প্রতীকী ছবিহিন্দু-মুসলমানের ১ হাজার ৩০০ বছরের (৭০০ থেকে ২০০০) সম্পর্ক বা সহাবস্থানে হিন্দুর বিরুদ্ধে মুসলমানদের এবং মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুদের বিদ্বেষ ও ঘৃণা সবকালেই দেখা গেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, আধুনিক ভারতীয় গণতন্ত্র বা এর হাত ধরে আবির্ভূত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এ বিদ্বেষকে তো সারাতে পারেইনি; বরং তার তীব্রতাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।
ভারতে হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে যেসব মনস্তাত্ত্বিক কারণকে সালমান আখতার চিহ্নিত করেছেন, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, ‘প্যাথলজিক্যাল নস্টালজিয়া’৪, ‘পোস্ট পার্টিশন ট্রমা’৫, ‘পোস্ট পার্টিশন ভিলেন হাঙ্গার’৬, ‘পোস্ট মাইগ্রেশন হাইপারন্যাশনালিজম’৭ ইত্যাদি। ‘সোনালি অতীত’ দ্বারা দুই সম্প্রদায়ই মোহগ্রস্ত: হিন্দুরা আর্যত্বে, মুসলমানরা মোগলত্বে। হিন্দুদের আর্যপ্রীতিকে সমালোচকেরা বলে থাকেন ‘সোশ্যাল নিউরোসিস’ যা মুসলমানদের সঙ্গে বসবাসের ক্ষেত্রে তাদের মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দেয়। এ ছাড়া সালমান আখতার আরেকটি কারণকে এ ক্ষেত্রে চিহ্নিত করেছেন, যাকে তিনি বলেছেন ‘হিন্দু কনট্রিবিউশনস টু দ্য হিন্দু-মুসলিম টেনশন’।৮ এটাকে বোঝানোর জন্য তিনি প্রচলিত একটি কথা উল্লেখ করেছেন, যা হলো, ভারতে একদিন মুসলমানরা সংখ্যায় হিন্দুদের ছাড়িয়ে যাবে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়, মুসলমানরা বহুগামী, ফলে তাদের মধ্যে জন্মহার বেশি। অথচ বাস্তবতা হলো, ১৯৯২ সালের জনগণনায় ভারতে মোট মুসলমান পুরুষ অপেক্ষা মোট মুসলমান নারীর সংখ্যা ২ দশমিক ৫ মিলিয়ন কম, সুতরাং সাধারণ একটি প্রশ্ন ওঠে যে কীভাবে চারটি বিয়ে সম্ভব? এটাও দেখা গেছে, মুসলমানদের মধ্যে জন্মহার হিন্দুদের তুলনায় খুব সামান্যই (শূন্য দশমিক শূন্য ১ শতাংশ) বেশি। সুতরাং মুসলমান বৃদ্ধির আশঙ্কা যে একটি সাজানো খেলা, একটা জুজুবুড়ির ভয় দেখানো, তা সহজেই অনুমেয়।
হিন্দু-মুসলমানের ১ হাজার ৩০০ বছরের (৭০০ থেকে ২০০০) সম্পর্ক বা সহাবস্থানে হিন্দুর বিরুদ্ধে মুসলমানদের এবং মুসলমানের বিরুদ্ধে হিন্দুদের বিদ্বেষ ও ঘৃণা সবকালেই দেখা গেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, আধুনিক ভারতীয় গণতন্ত্র বা এর হাত ধরে আবির্ভূত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ এ বিদ্বেষকে তো সারাতে পারেইনি; বরং তার তীব্রতাকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে দিয়েছে।
গ্রন্থনির্দেশ ও টীকা
১. আবদুল্লাহি আহমেদ আন-না’ইম, ইসলাম অ্যান্ড দ্য সেক্যুলার স্টেট (হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি স্টেট, ২০০৮, পৃষ্ঠা : ১৬২।)
২. এ বিষয়ে গ্রাহাম ই ফুলারের আ ওয়ার্ল্ড উইদআউট ইসলাম-এর ‘ইসলাম অ্যান্ড ইন্ডিয়া’ অধ্যায়টি দেখা যেতে পারে।
৩. ফ্রয়েড: অ্যামোং দ্য গাঙ্গেস: সাইকোঅ্যানালাইটিক রিফ্লেকশনস অন দ্য পিপল অ্যান্ড কালচার অব ইন্ডিয়া, সম্পাদনা: সালমান আখতার; প্রকাশক: আদার প্রেস, নিউইয়র্ক; ২০০৫।
৪. ‘প্যাথলজিক্যাল নস্টালজিয়া’: এটা একধরনের অতীতচারণা, যা অনেকটা দুরারোগ্য রোগের মতো। ভারতের মুসলমানরা এই গোপন আত্মগৌরবে ভুগে থাকে, যা অতীতের বিশাল মুসলিম/ইসলামি সাম্রাজ্যের সঙ্গে তাদের এক মানসিক সংযোগ তৈরি করে, যা তাদের আত্মপ্রতারণামূলক জাতিগত উচ্চতাবোধের আচরণে ফুটে ওঠে। সালমান আখতার তাঁর বই ফ্রয়েড : অ্যামোং দ্য গাঙ্গেস : সাইকোঅ্যানালাইটিক রিফ্লেকশনস অন দ্য পিপল অ্যান্ড কালচার অব ইন্ডিয়ায় ভারতীয় মুসলমানদের মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করতে গিয়ে এ ধারণাকে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেছেন, ভারতীয় মুসলমানরা বহু শতাব্দ আগের তুর্কি সুলতানদের সঙ্গে তাদের আত্মীয়তার কল্পনাবিলাসে রপ্ত রয়েছে এখনো, যার মাধ্যমে তারা তাদের দৈনন্দিন কষ্টের ওপরে গৌরবময় বংশপরিচয়ের একটি ব্যান্ড-এইড (সাময়িক উপশম) রাখতে পারে। তবে এই প্রতিরক্ষামূলক কৌশল বাস্তবতাকে একটি স্বপ্নময় রূপ দেয় এবং কল্পনার শক্তিকে প্রচেষ্টার বাস্তব আলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে।
৫. ‘পোস্ট পার্টিশন ট্রমা’: ভারত বিভাজনের পর বিভক্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে যে গভীর সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও মানসিক আঘাতের সৃষ্টি হয়েছিল, তার দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত, যা তারা বয়ে বেড়ায় এখনো।
৬. ‘পোস্ট পার্টিশন ভিলেন হাঙ্গার’: একধরনের জাতিগত বিদেশিবিদ্বেষ (এথনিক জেনোফোবিয়া), যা আগ্রাসনকে বাইরের দিকে প্রকাশ করার একটি সাধারণ প্রবণতা হিসেবে দেখা দেয়। এ প্রবণতা মানুষের পক্ষে তাদের নিজস্ব গোষ্ঠীসীমানা নির্ধারণ করতে সাহায্য করে এবং জীবনের কষ্টের মুখে দুর্বল ও অসহায় অনুভব করা থেকে তাদের রক্ষা করে। সাধারণত কাউকে দোষারপ করতে পারলে রাগ কমে যায় এবং দুঃখ ও শোক প্রশমিত হয়। এটিকে সালমান আখতার বলেছেন ‘ভিলেন হাঙ্গার’। তাঁর মতে, এ ক্ষুধা তখনই জেগে ওঠে, যখন একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর পরিচয় কোনো বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ পরিচয়-উৎস থেকে হুমকির সম্মুখীন হয়। সালমান আখতার, ভারতে দেশভাগের পর হিন্দু-মুসলমান সমস্যাকে বোঝানোর জন্য এ রূপক ব্যবহার করেন।
৭. ‘পোস্ট মাইগ্রেশন হাইপারন্যাশনালিজম’: বিদেশে পাড়ি দেওয়ার পর একটি শক্তিশালী এবং প্রায়ই অতিরঞ্জিত একজাতীয় গর্ববোধ, যা মাতৃভূমির প্রতি একধরনের গর্ব ও আবেগকে প্রকাশ করে। লেখক বুঝিয়েছেন, অনেক প্রবাসী ভারতীয় হিন্দু যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনের পর এমন একটি পরিবেশে পড়েন, যেখানে তাঁরা সংখ্যালঘু এবং তাঁরা প্রথমবারের মতো নিজেদের অন্য রকম ভাবতে থাকেন। এমন অবস্থায় অনেকেই ভারতীয় পরিচয়কে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে থাকতে চান, যেটা এমনকি ভারতে থাকলেও তাঁরা করতেন না। এটা তাঁরা করেন নিজেদের স্থানিক বিচ্ছিন্নতা, বৈষম্য ও নিরাপত্তাহীনতা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য।
৮. সালমান আখতার সম্পাদিত ফ্রয়েড : অ্যালোং দ্য গাঙ্গেস : সাইকোঅ্যানালাইটিক রিফ্লেকশনস অন দ্য পিপল অ্যান্ড কালচার অব ইন্ডিয়া, আদার প্রেস, নিউইয়র্ক, ২০০৫; অধ্যায় : ‘হিন্দু-মুসলিম রিলেশনস ইন ইন্ডিয়া : পাস্ট, প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার’, লেখক : সালমান আখতার।