এক কদমও এগোতে না পারার গোলকধাঁধা

· Prothom Alo

সকালে অ্যালার্মের শব্দে আপনার ঘুম ভাঙল। বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে যাওয়ার জন্য পা বাড়াবেন, ঠিক এমন সময় কেউ একজন আপনাকে বলল—'দাঁড়ান! বাথরুমে যেতে হলে তো আপনাকে আগে রাস্তার অর্ধেকটা পার হতে হবে, তাই না?’ আপনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তা তো বটেই।’

Visit truewildslot.com for more information.

লোকটা এবার হেসে বলল, ‘কিন্তু ওই অর্ধেক রাস্তায় পৌঁছানোর আগে আপনাকে তার অর্ধেকটা, মানে চার ভাগের এক ভাগ পার হতে হবে। আর সেই চার ভাগের এক ভাগে পৌঁছানোর আগে পার হতে হবে তারও অর্ধেকটা, মানে আট ভাগের এক ভাগ...’

একটু ভেবে দেখুন তো! এভাবে যদি যেকোনো দূরত্বকে আপনি অর্ধেক, তারপর তার অর্ধেক, তারপর তার অর্ধেক—এভাবে ভাঙতেই থাকেন, তাহলে তো আপনি প্রথম কদমটাই ফেলতে পারবেন না! যেহেতু এই ভাঙার কোনো শেষ নেই, তাই বাথরুম পর্যন্ত পৌঁছাতে আপনাকে অসীম সংখ্যক ধাপ পার হতে হবে। তার মানে, আপনি জীবনেও বাথরুমে পৌঁছাতে পারবেন না! পাঠক, এতটা পড়ে অনেকে আমাকে পাগল ভাবতে পারেন!

কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এটি আসলে জেনোর আরেকটি বিখ্যাত প্যারাডক্স। এর নাম ডিকোটমি। আগের একটি পর্বে আমরা অ্যাকিলিস ও কচ্ছপের প্যারাডক্স নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। এটাও তেমনি একটা প্যারাডক্স। এই প্যারাডক্সের মূল দাবিটি আরও ভয়ংকর। এটি বলছে, আপনি যেহেতু যাত্রাই শুরু করতে পারবেন না, এবং অসীম ধাপ পার হয়ে তা কখনোই শেষও করতে পারবেন না, তার মানে পৃথিবীতে গতি বা চলাফেরা বলে আসলে কিছুই নেই! পুরোটাই আমাদের চোখের ভুল!

অ্যাকিলিস ও কচ্ছপের দৌড়
গ্রিসের অন্য দার্শনিকেরা জেনোর এই গতি একটি বিভ্রম তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করার জন্য একটু ভিন্ন এবং সরাসরি পথ বেছে নিলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন সিনিক দার্শনিক ডায়োজিনিস।

প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল খুব ভালো করেই জানতেন, জেনোর এই কথা একেবারেই গাঁজাখুরি। কারণ আমাদের চোখের সামনেই তো সবকিছু চলছে, মানুষ হাঁটছে। কিন্তু জেনো তাঁর তর্কে এমন এক পদ্ধতি ব্যবহার করেছিলেন, যাকে দর্শনের ভাষায় বলে রিডাকটিও অ্যাড অ্যাবসার্ডাম। মানে কোনো ধারণাকে এমন একটা চরম যৌক্তিক বিন্দুতে নিয়ে যাওয়া, যেখানে গিয়ে সেটাকে পুরোপুরি উদ্ভট বা অসম্ভব মনে হয়। জেনো গণিতবিদ ছিলেন না। তাই তিনি শুধু নিখুঁত যুক্তির ওপর ভর করেই এই গোলকধাঁধা তৈরি করেছিলেন।

কিন্তু গ্রিসের অন্য দার্শনিকেরা জেনোর এই ‘গতি একটি বিভ্রম’ তত্ত্বকে ভুল প্রমাণ করার জন্য একটু ভিন্ন এবং সরাসরি পথ বেছে নিলেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন সিনিক দার্শনিক ডায়োজিনিস।

আজকাল সিনিক বলতে আমরা একটু নেতিবাচক কিছু বুঝলেও, প্রাচীন গ্রিসে এই সিনিক দার্শনিকেরা ছিলেন দারুণ আদর্শবাদী। তাঁরা ধন-সম্পদ, ক্ষমতা, খ্যাতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একদম সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। তাঁদের ধারণা ছিল, পৃথিবীর সব মানুষ সমান। খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর দিকে, প্লেটোর সময়ে এই ডায়োজিনিস ছিলেন সবচেয়ে আলোচিত মানুষ। তাঁর জীবনযাপন ছিল এতই চরম যে, তিনি বছরের পর বছর এথেন্সের বাজারের ভেতর একটা পরিত্যক্ত ড্রাম বা পিপার ভেতরে বাস করেছেন!

ডায়োজিনিসের কিছু বিখ্যাত উক্তি শুনলে চমকে যেতে হয়। তিনি বলতেন, ‘লজ্জায় গাল লাল হয়ে যাওয়াটা হলো সততার রং’, কিংবা ‘কুকুর এবং দার্শনিকেরা মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে, কিন্তু বিনিময়ে সবচেয়ে কম পুরস্কার পায়।’

জুতার ফিতা বাঁধার জ্যামিতি!
দূরত্ব যত ছোট হবে, তা পার হতে সময়ও তত কম লাগবে। কিন্তু আপনি দূরত্বকে যতই ক্ষুদ্র ভাগে ভাগ করুন না কেন, সময় কিন্তু থেমে থাকে না। সময় তার নিজের নিয়মে সমানে বয়ে চলে।

ডায়োজিনিস যখন জেনোর এই ডিকোটমি বা গতির বিভ্রমের প্যারাডক্সটি শুনলেন, তখন তিনি জেনোর সঙ্গে কোনো গালভরা দার্শনিক তর্কে গেলেন না। তিনি শুধু চুপচাপ উঠে দাঁড়ালেন এবং সেখান থেকে হেঁটে চলে গেলেন! কোনো কথা না বলে, শুধু নিজের হেঁটে যাওয়ার দৃশ্যটা দিয়েই তিনি বুঝিয়ে দিলেন, জেনোর যুক্তিটা কতটা হাস্যকর!

ডায়োজিনিসের এই কাণ্ড দারুণ উপভোগ্য হলেও, পদার্থবিজ্ঞানের চোখে কি এটা যথেষ্ট? মোটেও না! শুধু সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে এমন যুক্তির ফাঁদ কাটালে পদার্থবিজ্ঞানের মন ভরে না। এর জন্য চাই নিশ্ছিদ্র বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা। চলুন দেখি বিজ্ঞান কী বলে।

আমাদের আসল কাজ হলো, জেনোর এই দূরত্বের হিসাবটাকে সময়ের হিসাবে পাল্টে ফেলা। জেনো গতির ধারণাটা ঠিকমতো বুঝতেন না। গতি মানেই একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রম করা। আপনি যখন আপনার গন্তব্যের দূরত্বকে অর্ধেক, তারপর তার অর্ধেক করে ভাঙছেন, তখন আসলে সেই দূরত্বটুকু পার হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময়টাও অর্ধেক, তারপর তার অর্ধেক হয়ে যাচ্ছে।

দূরত্ব যত ছোট হবে, তা পার হতে সময়ও তত কম লাগবে। কিন্তু আপনি দূরত্বকে যতই ক্ষুদ্র ভাগে ভাগ করুন না কেন, সময় কিন্তু থেমে থাকে না। সময় তার নিজের নিয়মে সমানে বয়ে চলে। আমরা চাইলেই সময়ের স্রোত থেকে নিজেদের বাইরে বের করে আনতে পারি না। আর সময় যেহেতু বয়ে যায়, তাই আমরাও সামনের দিকে এগিয়ে যাই।

প্যারাডক্স লস্ট
আপনি যখন আপনার গন্তব্যের দূরত্বকে অর্ধেক, তারপর তার অর্ধেক করে ভাঙছেন, তখন আসলে সেই দূরত্বটুকু পার হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সময়টাও অর্ধেক, তারপর তার অর্ধেক হয়ে যাচ্ছে।

তা ছাড়া, কোনো কিছু যখন স্থির অবস্থা থেকে যাত্রা শুরু করে, তখন সেখানে বিজ্ঞানের আরেকটি সাধারণ নিয়ম কাজ করে। স্কুলে পড়া নিউটনের গতির দ্বিতীয় সূত্রের কথা মনে আছে? কোনো স্থির বস্তুকে গতিশীল করতে হলে তার ওপর বল প্রয়োগ করতে হয়। বল প্রয়োগ করলে বস্তুর ত্বরণ হয় এবং সেটি চলতে শুরু করে। একবার চলতে শুরু করলে তখন শুধু গতির হিসাব। তাই জেনোর এই ডিকোটমি প্যারাডক্স শুধুই একটা বিমূর্ত যুক্তির খেলা, বাস্তব দুনিয়ার গতির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।

তবে হ্যাঁ, আধুনিক বিজ্ঞানের যুগে এসে আলবার্ট আইনস্টাইন কিন্তু আমাদের শিখিয়েছেন, জেনোর কথাকে একেবারে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেওয়াও ঠিক নয়! আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, সময়কে স্থানের মতোই বিবেচনা করা যায়। তিনি সময়কে স্থান-কালের চতুর্থ মাত্রা বলেছেন। সেই হিসাবে, সময়ের এই বয়ে চলাটাও হয়তো একধরনের বিভ্রম! আর সময় যদি বিভ্রম হয়, তবে গতিও বিভ্রম হতে পারে!

কিন্তু আপেক্ষিকতার এসব থিওরি কাজ করে যখন কোনো কিছু আলোর বেগের কাছাকাছি গতিতে ছোটে। আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সাধারণ গতির ক্ষেত্রে আপেক্ষিকতার এসব নিয়ম নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো দরকারই নেই।

যে সহজ ধাঁধাগুলো আমাদের মগজ ধোলাই করে দেয়
আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, সময়কে স্থানের মতোই বিবেচনা করা যায়। তিনি সময়কে স্থান-কালের চতুর্থ মাত্রা বলেছেন। সেই হিসাবে, সময়ের এই বয়ে চলাটাও হয়তো একধরনের বিভ্রম!

আবার জেনোর যুক্তিকে যদি একদম চরম সীমায় নিয়ে যাই, তবে স্থান ও সময়কে অসীমভাবে ছোট ছোট টুকরোতে ভাগ করাটাও কিন্তু ভুল। কারণ, ভাঙতে ভাঙতে কোনো কিছু যখন অতিপারমাণবিক বা কোয়ান্টাম পর্যায়ে চলে যায়, তখন স্থান ও সময় নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে এমন এক অদ্ভুত রূপ নেয়, যাকে আর ছোট টুকরো করা সম্ভব নয়। কোয়ান্টাম দুনিয়ায় গতির ধারণাটাও সত্যিই বেশ গোলমেলে।

তবে জেনো তো আর এত কিছু ভেবে তাঁর প্যারাডক্স বানাননি! তাই জেনোর এই সাধারণ যুক্তির ধাঁধা মেটানোর জন্য আমাদের কোয়ান্টাম মেকানিকস বা আপেক্ষিকতার মতো তত্ত্বের কোনো দরকার নেই। শুধু দূরত্ব ও সময়ের সাধারণ হিসাবটুকু বুঝলেই এই ডিকোটমি প্যারাডক্সের গোলকধাঁধা থেকে খুব সহজেই বেরিয়ে আসা যায়!

সূত্র: জিম আল খলিলি, প্যারাডক্স: দ্য নাইন গ্রেটেস্ট এনিগমাস ইন ফিজিক্স অবলম্বনেমন্টি হল প্যারাডক্স: যে গাণিতিক ধাঁধা বিজ্ঞানীদেরও বোকা বানিয়েছিল

Read full story at source