কেন কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ

· Prothom Alo

মধ্যবিত্ত বাঙালি জীবনের আবেগ, আনন্দ ও বেদনাকে সহজ-সরল ও জাদুকরী লেখনীর মাধ্যমে অনন্য রূপ দিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ। বাংলা কথাসাহিত্যে আধিপত্য বিস্তারকারী এই লেখক পাঠক সমাজকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করেছিলেন। ২০১২ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। আজ ১৯ জুলাই প্রয়াণ দিবসে লেখকের প্রতি শ্রদ্ধা।

Visit grenadier.co.za for more information.

হুমায়ূন আহমেদ সাধারণ মানুষের আটপৌরে জীবন, আবেগ-অনুভূতিকে শব্দ ও অক্ষরের আঁচড়ে স্পর্শ করতে পেরেছিলেন। হয়তো এ কারণেই তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পেরেছেন। আজও যে বইমেলায় তাঁর বই পাঠক–চাহিদার শীর্ষে থাকে, সেখানেও আছে কাগজের কলেবরে নিজের মতো করে মধ্যবিত্ত জীবনকে বাঁধতে পারার অনন্য কৌশল। হ্যাঁ, এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে প্রচুর লেখার কারণে তাঁর সব লেখাকে সমান নম্বর দেওয়া যাবে না। হুমায়ূন নিজেও এ কথা দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে স্বীকার করেছেন। তবে বইবিমুখ একটি শ্রেণির হাতে যে তিনি বই তুলে দিয়েছেন, লাইব্রেরিবিমুখ অনেককে লাইব্রেরিমুখী করেছেন—সমালোচকেরাও এ কথা স্বীকার করবেন।

হুমায়ূন লিখতে এসেছিলেন রসায়ন ছেড়ে দিয়ে। কম সাহসের কাজ নয়। নিশ্চিত ছেড়ে অনিশ্চিতের পথে যাত্রা করতে কতজন পারেন। তা ছাড়া হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের সেরা ছাত্রদের একজন। ডক্টরেট করেছেন। অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করেছেন। রসায়ন নিয়ে গবেষণার দিকে এগোলেও যে ভালো করতেন, এ আশাও অমূলক নয়। কিন্তু বেছে নিয়েছিলেন শব্দ গাঁথার জীবন। বুকের রক্ত দিয়ে ফলাতে চেয়েছিলেন সোনার ফসল। পেরেছেনও। যা করেছেন তাতেই সফল হয়েছেন। সফল বলছি এই অর্থে যে মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন। যে গল্প লিখেছেন মানুষ গ্রহণ করেছে। উপন্যাস, নাটকেও হয়েছেন সফল। সিনেমা বানিয়েছেন, গান লিখেছেন মানুষ গ্রহণ করেছে।

তাঁর সবচেয়ে জনপ্রিয় ও প্রভাব বিস্তারকারী চরিত্রগুলোর মধ্যে অন্যতম হিমু। হলুদ পাঞ্জাবি পরে, খালি পায়ে, পকেটে টাকাপয়সা না রেখে উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়ানো এক ছন্নছাড়া যুবক। সমাজ ও যুক্তির চেনা ছকের বাইরে বেরিয়ে অ্যান্টিলজিক বা যুক্তিহীনতা দিয়ে চারপাশকে যে বিচার করে। হিমুর ঠিক বিপরীত মিসির আলি। যে একই সঙ্গে যুক্তিবাদী ও মানব মনস্তত্ত্বের গভীরে ডুব দিতে পছন্দ করেন। জগতের যেকোনো অতিপ্রাকৃতিক, রহস্যময় কিংবা অলৌকিক ঘটনাকে বিজ্ঞানের যুক্তি ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ দিয়ে বিশ্লেষণ করেন। শুভ্র, তার চোখে চশমা, দৃষ্টিতে শুদ্ধতা, ভাবনায় সরলতা। নাটকের বাকের ভাই। যার ফাঁসি না দিতে মানুষ রাস্তায় মিছিল করেছিল!

চরিত্রকে আপামর মানুষের করে তুলতে পারায় বোধ হয় লেখকের সার্থকতা। হুমায়ূন হেরে যাননি, পেরেছেন। তাঁর এই চরিত্রগুলো পাঠক, দর্শককে ভালোভাবেই আলোড়িত করেছে। হুমায়ূন সহজ করে লিখতে পারতেন। সংক্ষিপ্ত বাক্যে, সরল ভাষায়, জটিল তত্ত্বকথা ছাড়াই রস জুড়ে দিতেন। এ কারণেই হয়তো হুমায়ূনকে গ্রহণ করেছেন পাঠক। কেবল কাল্পনিক চরিত্রই নয়, আত্মজীবনীমূলক ও স্মৃতিকথামূলক রচনাগুলো পড়েও মানুষ আনন্দ পান।

এই যে এত কথকতা, নাটক, সিনেমা লেখালেখি নিয়ে এত কিছু; শুরুর দিকে কিন্তু হুমায়ূনের এ বাসনা ছিল না। হুমায়ূন চেয়েছিলেন কবি হবেন। চেষ্টাও করেছিলেন দেদার। গল্পটা বলি।

লেখালেখি ছেড়ে সন্ন্যাসী হতে চেয়েছিলেন তারাশঙ্কর, ফিরলেন কীভাবে

চেয়ার–টেবিলের যুগেও হুমায়ূন লিখতেন মেঝেতে বসে। বাংলা সাহিত্যের আরও একজন লেখক মেঝেতে বসে লিখতেন। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। তারাশঙ্করের আত্মজীবনীতে আছে। মেঝেতে টুলবক্সের মতো, যাঁরা দলিল লেখকদের সামনে থাকা ছোট টেবিল দেখেছেন, বুঝতে পারবেন, তেমন একটি জলচৌকিতে বসে লিখতেন তারাশঙ্কর। চৌকির ড্রয়ার খোলা যেত। ড্রয়ারে থাকত লেখার কাগজ ও কলম। তবে হুমায়ূন একটি লেখায় বিষয়টি পরিষ্কার করেছেন, তাঁর মেঝেতে বসে লেখার অনুপ্রেরণা তারাশঙ্কর নন। তা ছাড়া হুমায়ূন শুরু থেকেই মেঝেতে বসে লেখেননি। প্রথম জীবনে চেয়ার–টেবিলে বসে লিখতেন। সেই সময়ের কথা বলি। হুমায়ূনের তখন কতই–বা বয়স, কলেজ–বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েন। তার আগে বলে নেওয়া দরকার, হুমায়ূনের প্রথম কবিতা (ইংরেজি ভাষায়) ছাপা হয় স্কুলের ম্যাগাজিনে, তখন তিনি দশম শ্রেণিতে পড়েন। কবিতাটির কয়েকটি লাইন—
লেট দ্য আর্থ মুভ
লেট দ্য সান শাইন
লেট দেম টু প্রুভ
অল আর ইন আ লাইন

তারপর থেকে চেষ্টা চলতে থাকল। কিন্তু অনেক দিন গেলেও কিছুতেই কিছু হয় না। কবিতা পাঠালে কোথাও কবিতা ছাপা হয় না। শেষমেশ উপায় না দেখে নিজের ছোট বোনের নামে কবিতা লিখে পাঠালেন দৈনিক পাকিস্তানের ‘মহিলা পাতায়’। পরের সপ্তাহে কবিতাটি ছাপা হলো। ‘দিতে পারো একশ ফানুস এনে/ আজন্ম সলজ্জ সাধ একদিন আকাশে কিছু ফানুস উড়াই
হ্যাঁ, পরিচিত এই পঙ্‌ক্তির কবিতাটিই ছাপা হয়েছিল ‘দৈনিক পাকিস্তানে’। উৎসাহে আরও লিখে পাঠালেন, লেখা ছাপাও হলো।

কবিতা লেখার চেষ্টার পেছনে হুমায়ূনের ইংরেজি শিক্ষকের অনুপ্রেরণা ছিল। অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন সমারসেট মমের একটি উক্তি দ্বারাও। মম বলেছেন, আগে ইংরেজিটা বলি, ‘দ্য ক্রাউন অব লিটারেচার ইজ পোয়েট্রি। ইট ইজ ইটস এন্ড অ্যান্ড এইম। ইট ইজ দ্য সাবলাইমেস্ট অ্যাক্টিভিটি অব দ্য হিউম্যান মাইন্ড। ইট ইজ দ্য অ্যাচিভমেন্ট অব বিউটি অ্যান্ড ডেলিকেসি। দ্য রাইটার অব প্রোজ স্টেপস অ্যাসাইড হোয়েন দ্য পোয়েট পাসেস।’ ‘সাহিত্যের মুকুট হলো কবিতা। সাহিত্যসাধনার পরিণতি ও লক্ষ্য কবিতাই। এটি মানবমনের সর্বোচ্চ সৃজনশীল প্রকাশ। সৌন্দর্য ও সূক্ষ্মতার অর্জনই কবিতা। একজন কবি যখন যাবেন, গদ্যকার পথ ছেড়ে দিয়ে এক পাশে দাঁড়াবেন।’

বিশেষ করে শেষ লাইনটি, ‘একজন কবি যখন যাবেন তখন একজন গদ্যকার পথ ছেড়ে দিয়ে এক পাশে দাঁড়াবেন।’ হুমায়ূনকে অনুপ্রাণিত করেছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কবিতার পথে থাকতে পারেননি তিনি। তবে কবিতার প্রতি আকর্ষণ সব সময় ছিল। জীবনানন্দের মতো কবিতা লিখতে পারলেই সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন বলেও মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘কবিতা কোনো সস্তা বাজারি বিষয় নয়। কবিতা লিখতে যে মেধা এবং মনন লাগে, তার জন্ম এই ভুবনে না। কবিতার ছন্দ শিখতেই লাগে ১০ বছর।’

হুমায়ূনের কবিতা লেখা ছেড়ে দেওয়ার গল্পটা দিয়ে লেখা শেষ করি। বাংলা একাডেমি থেকে গল্প, প্রবন্ধ এবং কবিতার তিনটি আলাদা সংকলন বের হবে। সংকলনগুলোতে প্রধান লেখকদের পাশাপাশি তরুণ, নতুনদেরও লেখা থাকবে। কবিতা সংকলনটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন অধ্যাপক হুমায়ূন কবির। হুমায়ূন আহমেদের মনে বড় আশা বাংলা একাডেমির কবিতা সংকলনে তাঁর কবিতা ছাপা হবে। একরাতে তিনটি কবিতা লিখে হাজির হলেন অধ্যাপক হুমায়ুন কবিরের কাছে। শুরুতেই হুমায়ূন কবির প্রশ্ন করলেন, ‘আপনার কবিতা কোথাও ছাপা হয়েছে?
‘না।’
‘ছন্দ সম্পর্কে কোনো জ্ঞান আছে?’
‘না।’  
‘কবিতা পড়েন?’
‘না।’

হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘পরপর তিনবার না শোনার পর তিনি (হুমায়ুন কবির) ছোট্ট একটি বক্তৃতা দিলেন। বক্তৃতা শুনে মনে খুব কষ্ট পেলেও তাঁর প্রতিটি কথাই ছিল সত্যি।’

সেদিন বাংলা একাডেমি থেকে ফিরে কবিতা তিনটি ছিঁড়ে ফেলেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। কেমিস্ট্রির বই খুলে মনে মনে পণ করেছিলেন, ‘পড়াশোনা ঠিকমতো করতে হবে, ভালো রেজাল্ট করতে হবে। একসময় সংসারের হাল ধরতে হবে। আমার মতো দরিদ্র পরিবারের একটি ছেলের মহান কাব্যরোগ মানায় না।’ এবং এরপর থেকেই হুমায়ূন আহমেদ কবিতা লেখা ছেড়ে দেন।

Read full story at source