উত্তরাধিকার সম্পদে নারীর অংশ: ইসলাম যেভাবে ন্যায্যতা নিশ্চিত করে

· Prothom Alo

যখন পৃথিবীর অধিকাংশ সমাজে নারীকে সম্পত্তির মালিক তো দূরের কথা, অনেক ক্ষেত্রে সম্পত্তিরই অংশ মনে করা হতো, তখনই ইসলাম উত্তরাধিকার সম্পদে নারীর নির্ধারিত অংশ নিশ্চিত করে দিয়েছে। এটি মানুষের রচিত কোনো আইন নয়, বরং মহান আল্লাহর নির্ধারিত বিধান।

Visit freshyourfeel.com for more information.

দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজে এখনো বহু নারী পৈতৃক সম্পত্তির উত্তরাধিকার পান না। কোথাও সামাজিক চাপ, কোথাও লোকলজ্জা, কোথাও ভাইদের প্রভাব, আবার কোথাও ধর্মীয় বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে নারীরা তাদের প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন।

জাহেলি যুগ থেকে ন্যায়বিচারের পথে

ইসলাম আগমন-পূর্ব আরব্য জাহেলি সমাজে উত্তরাধিকার ছিল শক্তিশালীদের একচেটিয়া অধিকার। নারী, শিশু এবং দুর্বলদের উত্তরাধিকার পাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। স্ত্রীকে অনেক সময় মৃত স্বামীর সম্পদের অংশ হিসেবেই গণ্য করা হতো। এমনকি মৃত ব্যক্তির ছেলে চাইলে সৎমাকেও নিজের অধিকারে নিয়ে নিতে পারত। এটি ছিল নারীর প্রতি চরম অবমাননা। (তাফসিরে ইবনে কাসির, ২/১৭৯, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১)

এ অবস্থার আমূল পরিবর্তন আনে ইসলাম। মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়রা যে সম্পদ রেখে যায়, তাতে পুরুষের অংশ রয়েছে এবং পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়রা যে সম্পদ রেখে যায়, তাতে নারীরও অংশ রয়েছে, সে সম্পদ কম হোক বা বেশি। এটি (আল্লাহর পক্ষ থেকে) নির্ধারিত অংশ।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ৭)

এই আয়াত ইতিহাসের এক যুগান্তকারী ঘোষণা। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো নারীকে উত্তরাধিকারের স্বতন্ত্র ও নির্ধারিত অধিকার প্রদান করা হয়। এটি কারও দয়া বা অনুগ্রহ নয়, বরং আল্লাহপ্রদত্ত অধিকার। ফলে কোনো ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্র আল্লাহপ্রদত্ত এ অধিকার বাতিল বা সংকুচিত করার বৈধতা রাখে না।

কোরআনে নির্ধারিত নারীর অংশ

ইসলামের উত্তরাধিকারব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, এটি মানুষের ইচ্ছানির্ভর নয়। কোরআনেই উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে সুরা নিসার ১১, ১২ ও ১৭৬ নম্বর আয়াতে মা, স্ত্রী, কন্যা ও বোনের অংশ বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।

ইসলামে পরিবারের ভরণপোষণ, স্ত্রী-সন্তানের ব্যয়, দেনমোহর প্রদান এবং বহু আর্থিক দায়িত্ব পুরুষের ওপর অর্পিত। পক্ষান্তরে, নারীর ব্যক্তিগত সম্পদের ব্যয়ভার তার ওপর বাধ্যতামূলক নয়। ফলে উত্তরাধিকারের অংশ নির্ধারণে এই সামগ্রিক দায়িত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
কীভাবে অনিশ্চয়তার মাঝেও সুস্থ ও সতেজ থাকবেন

কন্যার উত্তরাধিকার: মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের সম্পর্কে এ নির্দেশ দিচ্ছেন যে একজন পুত্রের অংশ দুজন কন্যার অংশের সমান।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১১)

একই আয়াতে আরও বলা হয়েছে, একজন কন্যা থাকলে তিনি অর্ধেক সম্পদের অধিকারী হবেন। আর দুই বা ততোধিক কন্যা থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ সম্পদ লাভ করবেন। (সুরা নিসা, আয়াত: ১১)

মায়ের উত্তরাধিকার: মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে মা সম্পদের এক-ষষ্ঠাংশ পাবেন। আর সন্তান না থাকলে এবং মৃত ব্যক্তির একাধিক ভাই-বোনও না থাকলে মা এক-তৃতীয়াংশের অধিকারী হবেন। তবে একাধিক ভাই-বোন থাকলে তার অংশ এক-ষষ্ঠাংশ হবে। (সুরা নিসা, আয়াত: ১১)

স্ত্রীর উত্তরাধিকার: যদি স্বামীর সন্তান না থাকে, তবে স্ত্রী এক-চতুর্থাংশ সম্পদের অধিকারী হবেন। আর সন্তান থাকলে তিনি এক-অষ্টমাংশ পাবেন। (সুরা নিসা, আয়াত: ১২)

বোনের উত্তরাধিকার: মৃত ব্যক্তি যদি সন্তান এবং পিতা (বা দাদা) না রেখে মারা যান এবং তার কেবল একজন বোন থাকে, তাহলে তিনি মৃতের সম্পদের অর্ধেক পাবেন।

শুধু দুই বা ততোধিক বোন থাকলে এবং তাদের সঙ্গে কোনো ভাই না থাকলে তারা সম্মিলিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশ সম্পদের অধিকারী হবেন। আর ভাই-বোন উভয়ই উত্তরাধিকারী হলে একজন ভাইয়ের অংশ হবে দুই বোনের অংশের সমান। (সুরা নিসা, আয়াত: ১৭৬)

অর্থাৎ একজন নারী কন্যা, স্ত্রী, মা কিংবা বোন—জীবনের প্রতিটি পরিচয়েই কোরআন তার ন্যায্য উত্তরাধিকার নিশ্চিত করেছে।

নারী কি শুধু পুরুষের অর্ধেক পায়

সমাজে বহুল প্রচলিত একটি ভুল ধারণা হলো, ইসলামে নারী সব সময় পুরুষের অর্ধেক সম্পত্তি পায়। বাস্তবে এই ধারণা সঠিক নয়। কোরআনের উত্তরাধিকার আইন গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, কোথাও নারী পুরুষের অর্ধেক পান, আবার কোথাও সমান অংশও পান।

যে ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে একই সঙ্গে উত্তরাধিকারী হয়, সেখানে একজন ছেলের অংশ দুজন মেয়ের অংশের সমান নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পেছনে ইসলামি অর্থনৈতিক দায়িত্বের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। 

ইসলামে পরিবারের ভরণপোষণ, স্ত্রী-সন্তানের ব্যয়, দেনমোহর প্রদান এবং বহু আর্থিক দায়িত্ব পুরুষের ওপর অর্পিত। পক্ষান্তরে, নারীর ব্যক্তিগত সম্পদের ব্যয়ভার তার ওপর বাধ্যতামূলক নয়। ফলে উত্তরাধিকারের অংশ নির্ধারণে এই সামগ্রিক দায়িত্ব বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

আবার এমন কিছু ক্ষেত্রও রয়েছে, যেখানে নারী ও পুরুষ সমান অংশ পান। যেমন মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে মা ও বাবা উভয়েই এক-ষষ্ঠাংশ করে পান। এটি প্রমাণ করে যে সব ক্ষেত্রে নারীর অংশ পুরুষের চেয়ে কম নয়।

তাই ‘নারী শুধু অর্ধেক পায়’—এ বক্তব্য কোরআনের সামগ্রিক উত্তরাধিকার আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

মূল কথা হলো, নারী-পুরুষের উত্তরাধিকার সম্পদের অধিকার ইসলাম মর্যাদার ভিত্তিতে নয়, বরং পারিবারিক দায়িত্ব এবং আর্থিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে নির্ধারণ করেছে। তাই উত্তরাধিকার আইনের কোনো একটি দিক বিচ্ছিন্নভাবে তুলে ধরে ইসলামকে অভিযুক্ত করা সঠিক নয়। বরং পুরো ব্যবস্থাটি একসঙ্গে বিচার করলে এর ন্যায়বিচার ও ভারসাম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

নারীর উত্তরাধিকার আত্মসাৎ ভয়াবহ পাপ

অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা মহাপাপ (কবিরা গুনাহ)। আর যদি সেই সম্পদ এমন কারও হয়, যার অধিকার স্বয়ং আল্লাহ কোরআনে নির্ধারণ করে দিয়েছেন, তবে অপরাধের ভয়াবহতা আরও বেড়ে যায়।

উত্তরাধিকার বণ্টনে কারচুপি, বোন বা কন্যাকে কৌশলে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা, জোরপূর্বক লিখিত ছাড়পত্র নেওয়া কিংবা বিভিন্ন অজুহাতে তাদের প্রাপ্য অংশ আটকে রাখা, এসব কেবল সামাজিক অন্যায় নয়, আল্লাহর বিধানের প্রকাশ্য লঙ্ঘন।

মানুষকে দেওয়া আল্লাহর অমূল্য আমানতসহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৫৩যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও এক বিঘত জমিও দখল করবে, কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত স্তর জমিনের বোঝা ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৮)

উত্তরাধিকারও এই নির্দেশনার অন্তর্ভুক্ত। কারও অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রাখা মানে তার হক নষ্ট করা।

উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত বিধান বর্ণনার পরপরই আল্লাহ বলেন, ‘এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করবে, তিনি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন… আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্য হবে এবং তাঁর সীমারেখা লঙ্ঘন করবে, তিনি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৩–১৪)

এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে উত্তরাধিকার আইন কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়, এটি আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা। তাই এ ক্ষেত্রে অবহেলা বা প্রতারণা অত্যন্ত ভয়াবহ পরিণতির কারণ হতে পারে।

রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে কারও এক বিঘত জমিও দখল করবে, কিয়ামতের দিন তার গলায় সাত স্তর জমিনের বোঝা ঝুলিয়ে দেওয়া হবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪৫৩)

যদি সামান্য জমি দখলের শাস্তি এত কঠিন হয়, তাহলে উত্তরাধিকারীদের বৈধ অংশ আত্মসাৎ করার পাপ কতটা ভয়াবহ হবে, তা সহজেই অনুমেয়। তাই উত্তরাধিকার বণ্টনে সামান্য অবিচারকেও হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।

সমাজে নারীরা এখনো কেন বঞ্চিত

ইসলাম নারীর অধিকার নিশ্চিত করলেও বাস্তব সমাজে বহু নারী আজও সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত। এর অন্যতম কারণ শরিয়তের বিধান সম্পর্কে অজ্ঞতা ও অতিরিক্ত লোভ।

কোথাও কোথাও বোনদের মানসিক চাপ দিয়ে সম্পত্তির দাবি থেকে বিরত রাখা হয়। বলা হয়, ‘সম্পত্তি চাইলে ভাইদের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে না’, ‘মেয়েরা পরের বাড়ির মানুষ’, কিংবা ‘সম্পত্তি নিয়ে গেলে বাপের বাড়ির সম্মান নষ্ট হবে’। আবেগকে পুঁজি করে এভাবে নারীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করাকে ইসলাম সমর্থন করে না।

আরও একটি সমস্যা হলো, অনেক পরিবারে উত্তরাধিকার বণ্টন বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। ফলে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে জটিলতা বাড়ে, মামলা-মোকদ্দমা সৃষ্টি হয় এবং প্রকৃত উত্তরাধিকারীরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন। তাই মৃত ব্যক্তির সম্পদ বণ্টনে অযথা বিলম্ব না করে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী দ্রুত হিস্যা নির্ধারণ করা জরুরি।

নারীর অধিকার বুঝিয়ে দিতে করণীয়

নারীর উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে হলে প্রথমেই পরিবারে ইসলামের বিধান সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। উত্তরাধিকার বণ্টনের ক্ষেত্রে অনুমান বা প্রচলিত রীতির ওপর নির্ভর না করে ফারায়েজ (উত্তরাধিকার আইন) বিষয়ে অভিজ্ঞ আলেম বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

কারণ, উত্তরাধিকার আইন অত্যন্ত সূক্ষ্ম, সামান্য ভুলের কারণেও কারও অধিকার নষ্ট হতে পারে।

একই সঙ্গে নারীদেরও নিজেদের শরয়ি অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। প্রাপ্য অধিকার দাবি করা মানে আল্লাহপ্রদত্ত হক গ্রহণ করা। এটিকে কখনো লোভ বলে আখ্যায়িত করা যাবে না। তবে দাবিটা অবশ্যই সৌহার্দ্য, প্রজ্ঞা ও শরিয়তের নির্দেশনা মেনে হওয়া উচিত।

আসুন, সামাজিক প্রথা বা ব্যক্তিগত স্বার্থকে নয়, কোরআনের নির্দেশনাকেই প্রাধান্য দিই। প্রত্যেক নারীকে তার প্রাপ্য উত্তরাধিকার বুঝিয়ে দিই। কারণ, আল্লাহর নির্ধারিত অধিকার আদায় করাই প্রকৃত মুমিনের বৈশিষ্ট্য, আর এই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্যেই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের কল্যাণ নিহিত।

  • ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা

কোরআনে পুরুষকে কেন নারীর ‘তত্ত্বাবধায়ক’ বলা হয়েছে

Read full story at source