৩ হাজার কোটি টাকার ‘দ্য অডিসি’ দেখার আগে জানুন এই ১০ তথ্য
· Prothom Alo

সারা দুনিয়ার মতো আজ বাংলাদেশেও মুক্তি পেয়েছে অস্কারজয়ী ব্রিটিশ নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলানের নতুন সিনেমা ‘দ্য অডিসি’। হোমারের প্রায় তিন হাজার বছরের পুরোনো মহাকাব্য অবলম্বনে নির্মিত সিনেমাটি মুক্তির আগে থেকেই সারা দুনিয়ায় সাড়া ফেলেছে। ২৫০ মিলিয়ন ডলার বাজেটের (প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা) ছবিটি দেখার আগে জেনে নিতে পারেন এই ১০ তথ্য—
হোমারের অমর মহাকাব্যের আধুনিক রূপ
সিনেমার গল্পের কেন্দ্রে আছেন ট্রয় যুদ্ধজয়ী বীর ওডিসিয়ুস। যুদ্ধ শেষে নিজ রাজ্য ইথাকায় ফিরতে তাঁর সময় লাগে পুরো ১০ বছর। সমুদ্রদেবতা পোসেইডনের অভিশাপ, সাইক্লোপস পলিফেমাস, জাদুকরি সির্সি, সাইরেনদের প্রলোভন, পাতালপুরী হেডিস ও ক্যালিপসোর দ্বীপ—একটির পর একটি বিপদ পেরিয়ে বাড়ি ফেরার কাহিনিই ‘দ্য অডিসি’।
Visit freshyourfeel.org for more information.
দুই দশকের স্বপ্নপূরণ
২০০৪ সালে ‘ট্রয়’ নির্মাণের ইচ্ছা ছিল নোলানের। কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে তিনি নির্মাণ করেন ‘দ্য ডার্ক নাইট’ ট্রিলজি, ‘ইনসেপশন’, ‘ইন্টারস্টেলার’, ‘ডানকার্ক’, ‘টেনেট’ ও ‘ওপেনহেইমার’। ‘ওপেনহেইমার’-এর বিপুল সাফল্যের পর অবশেষে তিনি হোমারের মহাকাব্য নিয়ে কাজ শুরু করেন।
মহাকাব্যের প্রতি বিশ্বস্ত, তবু কিছু পরিবর্তন
নোলান মূল কাহিনির প্রতি বিশ্বস্ত থাকলেও কিছু চরিত্র ও সম্পর্ককে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছেন। ওডিসিয়ুসের কুকুর আর্গোস এখানে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে পরিণত হয়েছে। ছেলে টেলিমেকাসের সঙ্গে ওডিসিয়ুসের সম্পর্কও আরও বিস্তৃতভাবে দেখানো হয়েছে। সির্সি ও হেলেন অব ট্রয়ের চরিত্রেও যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। নোলানের স্বভাবসুলভ অরৈখিক (নন-লিনিয়ার) গল্প বলার ধরনও রয়েছে ছবিতে।
প্রায় পুরো সিনেমাই বাস্তবে ধারণ
সবচেয়ে বড় চমক, সিনেমাটিতে প্রায় কোনো গ্রিন স্ক্রিন ব্যবহার করা হয়নি। ওডিসিয়ুসের জাহাজ সত্যিকারের জাহাজ। সাইক্লোপস চরিত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়েছে অ্যানিমেট্রনিকস, পাপেট ও সীমিত কম্পিউটার গ্রাফিকস। ফলে ছবিতে বাস্তবতার অনুভূতি আরও বেশি। একচোখা দৈত্য সাইক্লোপস পলিফেমাস চরিত্রটি দেখাতে শুধু কম্পিউটার গ্রাফিকসের ওপর নির্ভর করেননি নির্মাতারা। এর জন্য তৈরি করা হয়েছিল প্রায় ছয় মিটার বাই ছয় মিটার আকারের বিশাল মানবসদৃশ অ্যানিমেট্রনিক পাপেট, যা বাস্তব শুটিংয়েই ব্যবহার করা হয়েছে।
ছয় দেশে ৯১ দিনের শুটিং
মরক্কো, গ্রিস, ইতালি, আইসল্যান্ড, স্কটল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্র—এই ছয় দেশে ৯১ দিনে শেষ হয়েছে শুটিং। আইসল্যান্ডে ধারণ করা হয়েছে হেডিসের দৃশ্য। ইতালির লিপারি দ্বীপে চিত্রায়িত হয়েছে সাইরেনদের অংশ। মরক্কোর সমুদ্রসৈকতে ক্যালিপসোর দৃশ্য ধারণের সময় প্রকৃতির প্রতিকূলতার মুখেও শুটিং চালিয়ে যায় ইউনিট। ছবির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের শুটিং হয়েছে ইতালির ফাভিনিয়ানা দ্বীপে। ধারণা করা হয়, হোমার তাঁর মহাকাব্যে ওডিসিয়ুস ও তাঁর সঙ্গীদের যে দ্বীপে ছাগল শিকার করে খাবারের ব্যবস্থা করার কথা লিখেছিলেন, সেই স্থান কল্পনা করেছিলেন এই দ্বীপকে ঘিরেই।
পুরো সিনেমা আইম্যাক্স ৭০ মিলিমিটার ক্যামেরায়
‘দ্য অডিসি’ ইতিহাসের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র, যা সম্পূর্ণ আইম্যাক্স ৭০ মিলিমিটার ফিল্ম ক্যামেরায় ধারণ করা হয়েছে। বিশাল আকারের এই ক্যামেরা এত ভারী ছিল যে পাহাড়ে তুলতে হেলিকপ্টারের সাহায্য নিতে হয়েছে। ক্যামেরার শব্দ এত জোরে হতো যে ম্যাট ডেমন পরে মজা করে বলেন, ‘মনে হতো পাশেই যেন ব্লেন্ডার চলছে।’
আইম্যাক্স ফিল্ম ক্যামেরায় একবারে মাত্র কয়েক মিনিটের ফুটেজ ধারণ করা যায়। এরপর নতুন ফিল্ম লোড করতে হয়। শুটিংয়ের গতি ধরে রাখতে ফোকাস পুলার কিথ ডেভিস নিজেকে এমনভাবে প্রশিক্ষিত করেন, যাতে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ক্যামেরায় নতুন ফিল্ম বসানো যায়। ফলে পুরো ইউনিট সামান্য বিরতি নিয়ে আবার দ্রুত শুটিং শুরু করতে পেরেছে। ‘দ্য অডিসি’র শুটিং শেষে মজা করে ক্রিস্টোফার নোলান বলেন, ‘এই ছবির শুটিংয়ে আমি কোনো আইম্যাক্স ক্যামেরা ধ্বংস করিনি। অতীতে কয়েকটি ভেঙেছি বটে, কিন্তু “দ্য অডিসি”র ক্যামেরাগুলো বেঁচে গেছে।’ উল্লেখ্য, একটি আইম্যাক্স ক্যামেরার মূল্য প্রায় পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার (ছয় কোটি টাকার বেশি)। নোলানের আগের বিভিন্ন ছবির শুটিংয়ে অন্তত তিনটি আইম্যাক্স ক্যামেরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
‘দ্য অডিসি’ সিনেমায় জেনডায়া। আইএমডিবিভিন্নধর্মী সংগীত
সংগীত পরিচালনা করেছেন তিনবারের অস্কারজয়ী লুডভিগ গোরানসন। নোলানের অনুরোধে তিনি প্রচলিত অর্কেস্ট্রার বদলে ব্যবহার করেছেন ৩৫টি ব্রোঞ্জের গং, সিনথেসাইজার এবং বিশাল আকৃতির একটি লায়ার। এতে সিনেমার শব্দজগৎ পেয়েছে একেবারেই আলাদা মাত্রা। নোলান চেয়েছিলেন, সংগীত যেন তাঁর আগের ছবিগুলোর মতো না হয়। তাই চলচ্চিত্রটির জন্য কোনো প্রচলিত অর্কেস্ট্রা ব্যবহার করা হয়নি। সুরকার লুডভিগ গোরানসন প্রাচীন গ্রিক বাদ্যযন্ত্র—ব্রোঞ্জের গং, লায়ার এবং আউলোস বাঁশিকে কেন্দ্র করে ছবির আবহসংগীত তৈরি করেছেন।
দীর্ঘ সময়ের মহাকাব্যিক অভিজ্ঞতা
১৭২ মিনিট দৈর্ঘ্যের ‘দ্য ওডিসি’ ১৭ জুলাই বিশ্বব্যাপী মুক্তি পাচ্ছে। নির্মাতাদের মতে, সিনেমাটি দেখার আদর্শ মাধ্যম আইম্যাক্স ৭০ মিলিমিটার; কারণ, শুরু থেকেই এই ফরম্যাট মাথায় রেখে নির্মাণ করা হয়েছে পুরো চলচ্চিত্র। মিথ, ইতিহাস, প্রযুক্তি আর বিশাল আয়োজন—সব মিলিয়ে ‘দ্য ওডিসি’ শুধু আরেকটি সাহিত্যনির্ভর চলচ্চিত্র নয়; বরং ক্রিস্টোফার নোলানের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী নির্মাণগুলোর একটি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। দর্শক ও সমালোচকদের প্রত্যাশা, এটি বড় পর্দায় এক অনন্য সিনেম্যাটিক অভিজ্ঞতা হয়ে উঠবে।
ম্যাট ডেমন যে চরিত্রেই অভিনয় করুন না কেন, তাঁর অভিনয়ের বড় শক্তি হলো চরিত্রের ভেতরের ভাবনাকে দর্শকের সামনে স্পষ্ট করে তোলা। ‘দ্য অডিসি’-তে তিনি সেই গুণেরই নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছেন। ট্রয় যুদ্ধের নায়ক ওডিসিয়ুস একদিকে নির্ভীক যোদ্ধা, অন্যদিকে গভীরভাবে দ্বিধাগ্রস্ত একজন মানুষ। যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুকে হত্যা করতে তাঁর দ্বিধা নেই, কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তের নৈতিক মূল্যও তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। কখনো তিনি সত্য গোপন করেন, কখনো নিজের সৈন্যদের বাঁচানোর বদলে কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিতে বাধ্য হন।
‘দ্য অডিসি’ সিনেমায় টম হল্যান্ড। আইএমডিবিএকপর্যায়ে ভবিষ্যদ্দ্রষ্টা টিরেসিয়াস তাঁকে দুটি ভয়াবহ বিকল্প দেন—হয় সব সৈন্যকে নিয়ে ঘূর্ণিস্রোতে মৃত্যুর মুখে যাবেন, নয়তো দানব স্কিলার হাতে ছয়জনকে উৎসর্গ করবেন। ওডিসিয়ুস দ্বিতীয় পথ বেছে নেন, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ভার তাঁকে সারা জীবন বহন করতে হয়। ডেমনের অভিনয় এই নৈতিক দ্বন্দ্বকে অসাধারণ শক্তিতে তুলে ধরে।
তারকাখচিত অভিনয়শিল্পী
নোলান বরাবরের মতোই এমন একদল অভিনেতাকে একত্র করেছেন, যাঁরা ছোট চরিত্রেও বড় প্রভাব ফেলতে পারেন। অ্যান হ্যাথাওয়ে পেনেলোপ চরিত্রে অসাধারণ। তিনি কোনো অসহায় স্ত্রী নন; বরং রাজনৈতিকভাবে সচেতন, দৃঢ়চেতা এক রানি, যিনি স্বামীর দীর্ঘ অনুপস্থিতিতে নিজের রাজ্য ও সম্মান রক্ষার লড়াই চালিয়ে যান।
টম হল্যান্ড ওডিসিয়ুসের ছেলে টেলেমেকাসের চরিত্রে অভিনয় করেছেন। চরিত্রটি তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও তাঁর উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। রবার্ট প্যাটিনসন অহংকারী প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যান্টিনাস হিসেবে দারুণ প্রভাব ফেলেছেন। সামান্থা মর্টন জাদুকরি সির্সি চরিত্রে শীতল ও রহস্যময়, আর জেনডায়া দেবী অ্যাথেনা হিসেবে স্বল্প উপস্থিতিতেই আলাদা ছাপ রেখে যান। এ ছাড়া লুপিতা নিয়োঙ্গো, জন লেগুইজামো, হিমেশ প্যাটেলসহ প্রায় প্রত্যেক শিল্পীই নিজের চরিত্রকে স্মরণীয় করে তুলেছেন।
অপেক্ষা কি সার্থক হবে
এককথায় বলতে গেলে, ‘হ্যাঁ’। মুক্তির পর সমালোচেকরা ইতিবাচক রায় দিয়েছেন। অনেকেই ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, সিনেমাটি চলতি বছরের সব রেকর্ড ওলট-পালট করে দিতে পারে। নোলানের গল্প বলার ধরন বরাবরের মতোই অরৈখিক। স্মৃতি, অতীত, অন্যের বর্ণনা—সব মিলিয়ে সময়কে ভেঙে তিনি নতুন এক বর্ণনাশৈলী তৈরি করেছেন। শুরুর কিছু ব্যাখ্যামূলক সংলাপ ছাড়া ছবির গতি কখনো কমে না। তিন ঘণ্টার দৈর্ঘ্যও খুব একটা অনুভূত হয় না।
ছবির বড় শক্তি এর মানবিক বার্তা। জিউসের নৈতিক শিক্ষা—অন্যের সঙ্গে সেই আচরণ করো, যা তুমি নিজের জন্য প্রত্যাশা করো—পুরো ছবিতে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। ওডিসিয়ুসের ভুল সিদ্ধান্তগুলো শেষ পর্যন্ত তাঁর কাছেই ফিরে আসে। সমালোচকেরা বলছেন, নোলানের আইম্যাক্স ক্যামেরা যেন দর্শককে সরাসরি ওডিসিয়ুসের নৌকায় বসিয়ে দেয়। গভীর নীল সমুদ্র, দিগন্তজোড়া আকাশ আর সুউচ্চ পাহাড়ের সামনে মানুষের ক্ষুদ্রতা বারবার চোখে পড়ে। ট্রয় যুদ্ধের দৃশ্যগুলো নিখুঁতভাবে কোরিওগ্রাফ করা। তরবারি, বর্শা, তীর—প্রতিটি সংঘর্ষ বাস্তব মনে হয়। নোলান যথাসম্ভব বাস্তব লোকেশন ও প্র্যাকটিক্যাল ইফেক্ট ব্যবহার করেছেন কম্পিউটারনির্ভর ভিজ্যুয়াল ইফেক্টের ওপর নির্ভরতা ছিল খুবই সীমিত।
সবচেয়ে ভয়াবহ দৃশ্যগুলোর একটি সাইক্লোপস পলিফেমাসকে ঘিরে। বাস্তব গুহায় ধারণ করা এই অংশে বিশাল এক অ্যানিমেট্রনিক পাপেট ব্যবহার করা হয়েছে। দানবের হাতে সৈন্যদের নির্মম মৃত্যুর দৃশ্য যেমন ভয় জাগায়, তেমনি ওডিসিয়ুসের বুদ্ধিমত্তাও তুলে ধরে।
বিবিসি, ভোগ ও আইএমডিবি অবলম্বনে
‘দ্য অডিসি’ সিনেমায় রবার্ট প্যাটিনসন। আইএমডিবি