বিশ্বকাপের নিরাপত্তায় রোবট কুকুর! চার পায়ের এই যান্ত্রিক প্রহরী আসলে কী করে?
· Prothom Alo

বিশ্বকাপ মানেই চোখধাঁধানো ফুটবল, গ্যালারিভর্তি দর্শক আর উৎসবের আমেজ। কিন্তু এই বিশাল আয়োজনকে নিরাপদ রাখতে মাঠের বাইরেও চলে সমান গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তুতি। এবারের ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সেই নিরাপত্তা ব্যবস্থায় নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠেছে চার পায়ের ‘রোবট কুকুর’।
Visit goldparty.lat for more information.
প্রথম দেখায় অনেকের মনে হতে পারে, এগুলো বুঝি সিনেমার কোনো চরিত্র। কিন্তু বাস্তবে এই যান্ত্রিক প্রহরীরা অস্ত্র হাতে টহল দেয় না, কাউকে ধাওয়া করে না কিংবা অপরাধী ধরে না। তাদের কাজ আরও গুরুত্বপূর্ণ, সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে শনাক্ত করে নিরাপত্তা বাহিনীকে দ্রুত সতর্ক করা।
বিশ্বকাপের নতুন প্রহরী
মেক্সিকোর গুয়াদালুপে শহরের বিবিভিএ স্টেডিয়ামে, যেখানে ২০২৬ বিশ্বকাপের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে, নিরাপত্তার দায়িত্বে যুক্ত করা হয়েছে ‘কেএনাইন-এক্স (K9-X)’ নামে একটি বিশেষ রোবোটিক ইউনিট।
চারটি রোবট কুকুর নিয়ে গঠিত এই ইউনিট স্টেডিয়ামের ভেতর ও বাইরে নিয়মিত টহল দেয়। ম্যাচ শুরুর আগে তারা প্রবেশপথ, পার্কিং এলাকা, দর্শক চলাচলের পথ এবং আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ স্থান পর্যবেক্ষণ করে। যদি কোথাও অস্বাভাবিক ভিড়, ফেলে রাখা কোনো ব্যাগ বা সন্দেহজনক পরিস্থিতি চোখে পড়ে, তাহলে সঙ্গে সঙ্গে সেই তথ্য ও ভিডিও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণকক্ষে পাঠিয়ে দেয়। ফলে নিরাপত্তাকর্মীরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
কী আছে এই রোবট কুকুরের ভেতরে?
এই যান্ত্রিক কুকুরগুলো শুধু হাঁটাচলাই করে না। এগুলোতে রয়েছে–
* উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা
* নাইট ভিশন প্রযুক্তি
* বিভিন্ন ধরনের সেন্সর
* ভয়েস কমান্ড ব্যবস্থা
* তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা পাঠানোর সক্ষমতা
শক্তপোক্ত নকশার কারণে এগুলো সিঁড়ি, অসমান রাস্তা কিংবা মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাতেও সহজে চলতে পারে। যেখানে মানুষের পৌঁছানো কঠিন, সেখানে রোবট কুকুর সহজেই তথ্য সংগ্রহ করতে পারে।
মানুষকে সরিয়ে দিচ্ছে না, বরং সাহায্য করছে
রোবট কুকুর নিয়ে অনেকের একটি সাধারণ প্রশ্ন, এগুলো কি নিজেরাই সিদ্ধান্ত নেয়? উত্তর হলো, ‘না’।
রোবটগুলো কোনো অপরাধীকে আটক করে না বা নিজেরা অভিযানও চালায় না। এগুলো পরিচালনা করেন প্রশিক্ষিত অপারেটর। রোবটের কাজ শুধু তথ্য সংগ্রহ করা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকির খবর জানানো। এরপর সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। অর্থাৎ, প্রযুক্তি এখানে মানুষের বিকল্প নয়; বরং মানুষের কাজকে আরও দ্রুত, নিরাপদ ও কার্যকর করে তুলছে।
শুধু বিশ্বকাপেই নয়
রোবট কুকুরের ব্যবহার এখন আর শুধু ক্রীড়াঙ্গনে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজে এগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সন্দেহজনক বস্তু পরীক্ষা, বিস্ফোরক শনাক্ত, বড় জনসমাগমে নজরদারি এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ভেতরে প্রবেশের মতো কাজে রোবট কুকুর ব্যবহার করছে।
সামরিক ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব বাড়ছে। সীমান্ত টহল, দুর্গম এলাকায় গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে আগে প্রবেশ কিংবা প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম বহনের কাজেও চার পায়ের এই রোবট ব্যবহারের পরীক্ষা চলছে।
দুর্যোগে হতে পারে জীবনরক্ষাকারী
ভূমিকম্পে ধসে পড়া ভবন, অগ্নিকাণ্ড কিংবা বিষাক্ত গ্যাসে ভরা এলাকায় মানুষের আগে রোবট কুকুর পাঠানো যায়।
সেখানে গিয়ে এটি ভিডিও ধারণ করে, তাপমাত্রা ও পরিবেশগত তথ্য সংগ্রহ করে উদ্ধারকারী দলের কাছে পাঠায়। এতে উদ্ধারকর্মীরা পরিস্থিতি বুঝে নিরাপদ পরিকল্পনা করতে পারেন এবং তাদের ঝুঁকিও অনেক কমে।
শিল্পকারখানা থেকে হাসপাতাল
শুধু নিরাপত্তা নয়, শিল্প ও স্বাস্থ্য খাতেও রোবট কুকুরের ব্যবহার বাড়ছে। তেল ও গ্যাস প্ল্যাটফর্ম, বিদ্যুৎকেন্দ্র, দীর্ঘ পাইপলাইন কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানা পরিদর্শনের মতো কাজ এখন অনেক প্রতিষ্ঠান রোবটের মাধ্যমে করছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বের কয়েকটি হাসপাতালে রোগীদের কাছে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া, আইসোলেশন ওয়ার্ড পর্যবেক্ষণ এবং দূর থেকে চিকিৎসকদের তথ্য পৌঁছে দিতেও রোবট কুকুর ব্যবহার করা হয়েছিল।
একদিন হয়তো যাবে চাঁদেও
চার পায়ের এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে মহাকাশেও। বিজ্ঞানীরা ভবিষ্যতে চাঁদ কিংবা মঙ্গলের দুর্গম ভূখণ্ডে অনুসন্ধানের জন্য এমন রোবট ব্যবহারের পরিকল্পনা করছেন। মানুষের পক্ষে যেখানে পৌঁছানো কঠিন, সেখানে এই যান্ত্রিক সহকারী হতে পারে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অনুসন্ধানকারী।
নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ
একসময় নিরাপত্তা বাহিনীর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিল প্রশিক্ষিত পুলিশ কুকুর। এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে রোবট কুকুরও। তবে তাদের কাজ মানুষকে প্রতিস্থাপন করা নয়। বরং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে আগে পৌঁছে তথ্য সংগ্রহ করা, সম্ভাব্য বিপদের আগাম সংকেত দেওয়া এবং নিরাপত্তাকর্মীদের আরও দ্রুত ও কার্যকরভাবে কাজ করতে সহায়তা করাই তাদের মূল দায়িত্ব।
২০২৬ বিশ্বকাপে রোবট কুকুরের উপস্থিতি তাই শুধু প্রযুক্তির প্রদর্শনী নয়। এটি ভবিষ্যতের নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি বাস্তব উদাহরণ, যেখানে মানুষ ও প্রযুক্তি একসঙ্গে কাজ করে আরও নিরাপদ, আরও স্মার্ট একটি পৃথিবী গড়ে তুলছে।
ছবি: ইএফই ও রয়টার্স