মণিপুর–নাগাল্যান্ডে নাগা-কুকি সংঘর্ষে জটিল হচ্ছে পরিস্থিতি, তিন সেনাসদস্য নিহত

· Prothom Alo

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অন্তত দুটি রাজ্য নাগাল্যান্ড এবং মণিপুরের পরিস্থিতি ক্রমশ নাজুক হয়ে উঠছে। গত ফেব্রুয়ারি থেকে কুকি-জো সম্প্রদায় ও নাগাদের মধ্যে সংঘাত বাড়ছে। বাড়ছে মৃতের সংখ্যাও। দুপক্ষের সংঘর্ষে এ পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গেছে।

দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষের পাশাপাশি আক্রমণ হচ্ছে উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রধান নিরাপত্তা বাহিনী আসাম রাইফেলসের ওপর। গত সাত দিনে দুটি আক্রমণে আসাম রাইফেলসের অন্তত তিনজন সেনা নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন বেশ কয়েকজন। দুই সম্প্রদায়ের সংঘাতের জেরেই নিরাপত্তারক্ষীদের মৃত্যু হচ্ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

Visit bettingx.bond for more information.

নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মী

স্থানীয় প্রশাসন বলছে, সর্বশেষ আক্রমণের ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল মঙ্গলবার রাত ৯টার দিকে। মণিপুরের সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে, উত্তর মণিপুরের সেনাপতি শহরে সশস্ত্র উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযানে বাধা দেওয়া হয়েছে। আসাম রাইফেলস যাতে উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে না পারে, সেই লক্ষ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি শিবিরে মঙ্গলবার দিবাগত রাতে হামলা চালিয়েছে ‘মব’ বা উত্তেজিত জনতা। তারা আসাম রাইফেলসের ক্যাম্পে পাথর ছোড়ে, ভাঙচুর করে ও আগুন দেয়।

উত্তেজিত জনতা সেনাবাহিনীর বেশ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে এবং অন্তত দুটি ট্রাক উল্টে দেয়। আক্রান্ত হন স্থানীয় বাসিন্দারাও। আসাম রাইফেলস, ভারতের সেনাবাহিনী এবং রাজ্য প্রশাসন বিষয়টিকে ‘রাষ্ট্রের ওপর হামলা’ হিসেবে দেখছে।

সেনাপতি জেলায় ​নাগা সম্প্রদায়ের একটি গোষ্ঠী লিয়াংমাই নাগাদের গ্রাম ওক্লং। আসামের প্রধান বিদ্রোহী সংগঠন ন্যাশনাল সোসালিস্ট কাউন্সিল অব নাগাল্যান্ড-আইজাক-মুইভার (এনএসসিএন-আইএম) সংগঠন ওই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে।

স্থানীয় প্রশাসনের ভাষ্যমতে, মঙ্গলবার রাতে এনএসসিএন-আইএমের ক্যাম্পের কাছে তাদের সশস্ত্র ক্যাডারদের উপস্থিতি সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আসে। আসাম রাইফেলস সেখানে তল্লাশি অভিযান চালানোর চেষ্টা করে। আসাম রাইফেলসের দলটি ওক্লং গ্রামের দিকে এগোনোর সময় নারীসহ বহু মানুষ তাদের আটকায়। অবশ্য তাঁদের কেউ সশস্ত্র ছিলেন না। এ কারণে আসাম রাইফেলস গুলি চালায়নি। আসাম রাইফেলস তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নিলেও উত্তেজিত জনতা বড় ধরনের হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের চেষ্টা চালায়।

নাগাল্যান্ডে আসাম রাইফেলসের সেনাসদস্যের মৃত্যু

এ ঘটনার ২৪ ঘণ্টা আগে অজ্ঞাতপরিচয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় নাগাল্যান্ডে প্রাণ হারান আসাম রাইফেলসের এক সেনাসদস্য। গত সোমবার দুপুরের নাগাদ নাগাল্যান্ডের পশ্চিম অংশে চুমৌকেডিমা ‘এ’ জেলায় আসাম রাইফেলসের প্রশিক্ষণকেন্দ্রের কাছে সন্দেহভাজন এক বিস্ফোরণে আসাম রাইফেলসের অন্তত এক সদস্য নিহত হন। একজন বেসামরিক নাগরিকসহ আরও অন্তত পাঁচজন আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।

পুলিশ সূত্রের খবর, আসাম রাইফেলসের কর্মীরা একটি খোলা গাড়িতে করে রাজধানী ডিমাপুরের দিকে যাওয়ার পথে বেলা দুইটা নাগাদ বিস্ফোরণ ঘটে। প্রাথমিক তদন্তে অনুমান করা হচ্ছে, রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অটোরিকশার ভেতরে বিস্ফোরক রাখা ছিল, যা দূর নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয়। বিষয়টি নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্বেগের। কারণ, এটিকে একটি আন্তর্জাতিক মানের নাশকতা বলে মনে করা হচ্ছে, যা দীর্ঘ সময় নাগাল্যান্ডে দেখা যায়নি। বিস্ফোরণের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে অটোরিকশাটি দুমড়েমুচড়ে যায়। দুর্ঘটনাস্থলে কেবল দুমড়ানো ধাতব অংশ ও ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে, যা বিস্ফোরণের ভয়াবহতার ইঙ্গিত।

মুখ্যমন্ত্রী নেইফিউ রিও, রাজ্যপাল নন্দকিশোর যাদব এবং বিদ্রোহীদের সঙ্গে সরকারের আলোচনায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করা নাগাল্যান্ডের নাগরিক সংগঠন ‘নাগাল্যান্ড পিস সেন্টার’ এই হামলার নিন্দা করেছে।

মণিপুরে সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় নিহত সেনাসদস্য বলবন্ত সিং খেতওয়ালের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্পন্ন করা হয়। ৯ জুলাই ২০২৯, নৈনিতাল

গত সপ্তাহের হামলা

তবে উত্তর-পূর্ব ভারতে আসাম রাইফেলসের ওপর সাম্প্রতিক সময়ে এগুলোই একমাত্র আক্রমণ নয়। সোমবার দুপুরের আক্রমণের এক সপ্তাহ আগে ৬ জুলাই মণিপুরের উখুরুল জেলায় সন্দেহভাজন উগ্রপন্থীরা আসাম রাইফেলসের এক গাড়িবহরে অতর্কিত হামলা চালায়। এ ঘটনায় আসাম রাইফেলসের ৪০ ব্যাটালিয়নের অন্তত দুই কর্মী নিহত হন। ঘটনাস্থলে উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি চলে। পরে ওই এলাকায় বড় আকারের তল্লাশি অভিযান চালায় নিরাপত্তা বাহিনী।

মণিপুরের এক সাংবাদিক এই হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, যেভাবে হামলা চালানো হয়ে, তা অবিশ্বাস্য। আসাম রাইফেলসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সশস্ত্র গোষ্ঠী পাল্টাহামলা চালায়। সবচেয়ে বড় কথা, তারা দীর্ঘক্ষণ লড়াই চালিয়েছে। তাদের কাছে অস্ত্রের যে বিপুল সম্ভার ছিল, তা অভাবনীয়।

সংঘর্ষে মৃতের সংখ্যা বাড়ছে

নাগাল্যান্ড ও মণিপুরে পুলিশের বিবৃতি এবং স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মণিপুরে নাগা এবং কুকি-জোদ সম্প্রদায়ের মধ্যে চার-পাঁচ মাস ধরে চলা সংঘর্ষে অন্তত ৩০ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ১৫ জন কুকি-জো সমাজের মানুষ, ১১ জন নাগা গোষ্ঠীর। বাকিরা অন্য সম্প্রদায়ের এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য।

পর্যবেক্ষকেরা বলছেন, কুকি-জো এবং নাগা সম্প্রদায়ই গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে। তাই ওই অঞ্চলের বিভিন্ন অংশে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। দুপক্ষের এই লড়াইয়ে স্বাভাবিকভাবেই নিরাপত্তা বাহিনী জড়িয়ে পড়ছে এবং হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। উত্তর–পূর্ব ভারতে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আসাম রাইফেলসের সদস্যদেরও মৃত্যু হচ্ছে।

এ ছাড়া দুপক্ষের লড়াইয়ের জেরে নাগাল্যান্ডের রাজধানী ডিমাপুরের সঙ্গে মণিপুরের রাজধানী ইম্ফলের সংযোগকারী ২ নম্বর জাতীয় সড়কের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ ৮৭ দিন ধরে অবরুদ্ধ রয়েছে।

মণিপুরের লিয়াংমাই তাফৌ-এ অবস্থিত নাগা পিপলস ফ্রন্টের (এনপিএফ) প্রধান কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনার পর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ। গত ১৩ মে লেইলোন ভাইপেই গ্রাম থেকে ৬ নাগা সদস্যকে অপহরণ ও হত্যার প্রতিবাদে এই হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। ১১ জুন ২০২৬, সেনাপতি জেলা

নাগা-কুকি সংঘর্ষের পটভূমি

মণিপুরের উখুরুল জেলায় গত ফেব্রুয়ারিতে মদ্যপানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া ঝগড়াঝাঁটি থেকে নাগা-কুকি সংঘাতের সূত্রপাত হয়, যা পরবর্তী সময়ে ভয়াবহ রূপ নেয়। গত ১৩ মে কুকিরা নাগা সম্প্রদায়ের ছয়জনকে অপহরণ করে বলে অভিযোগ। পরে ১১ জুন তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

ওই ঘটনার প্রতিবাদে মণিপুরে নাগাদের শীর্ষ সংগঠন ইউনাইটেড নাগা কাউন্সিল (ইউএনসি) গত ১৭ মে থেকে সেনাপতি জেলার ওপর দিয়ে যাওয়া ২ নম্বর মহাসড়কে ‘অর্থনৈতিক অবরোধ’ শুরু করে। ফলে কুকি–প্রধান কাংপোকপি জেলায় জরুরি পণ্যের সরবরাহব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। কাংপোকপি জেলায় এক পাশে মেইতেই-প্রধান ইম্ফল পশ্চিম এবং অন্য পাশে সেনাপতি জেলা অবস্থিত। এই অবরোধ স্বাভাবিকভাবেই দুই জনগোষ্ঠীর সম্পর্ককে আরও নাজুক করে তুলেছে।

​কুকিদের শীর্ষ সংগঠন কুকি ইনপি মণিপুর (কেআইএম) জানিয়েছে, কাংপোকপিতে ইতিমধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। সরকারের কাছে বারবার আবেদন করেও কোনো সমাধান সূত্র মেলেনি। কেআইএম জানিয়েছে, খাদ্য সরবরাহ না থাকায় বহু গ্রামবাসী বুনো ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত শাকসবজি, মিষ্টি কুমড়া, ভুট্টা এবং শিকড় খেতে বাধ্য হচ্ছেন। নাগা-কুকিদের মধ্যে চলা এই নতুন ‘সংঘাত’ বাংলাদেশ ও মিয়ানমার লাগোয়া উত্তর-পূর্ব ভারতের এই অঞ্চলে চরম অস্থিরতা তৈরি করছে।

মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায়ও নাগাদের এই আন্দোলনকে সমর্থন জানিয়ে যৌথ প্রতিবাদ শুরু করেছে। তারা নাগা হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার, কুকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে চুক্তি বাতিল এবং কুকি সম্প্রদায়ের উপমুখ্যমন্ত্রী নেমচা কিপজেনের পদত্যাগ দাবি করেছে।

পাশাপাশি, ২০২৩ সাল থেকে চলা মেইতেই-কুকি সংঘাতের স্থায়ী সমাধানের জন্য মেইতেই গোষ্ঠীগুলো ১৯৫১ সালকে ভিত্তি বছর ধরে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) বাস্তবায়নের দাবিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানিয়েছে।

২০২৩ সালের মে মাস থেকে মেইতেই এবং কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ২৬০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ৬০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

Read full story at source