আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু ভয়াবহ হতে পারে, বললেন মশা–গবেষক

· Prothom Alo

২৬ বছর ধরে মশা নিয়ে গবেষণা করছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার। এডিস মশার বদলে যাওয়া আচরণ ও ডেঙ্গু থেকে সুরক্ষার উপায় নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন

বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন প্রায় সারা বছরের রোগ হয়ে গেছে। এই পরিবর্তনকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

Visit h-doctor.club for more information.

যখন কোনো ইনফেকশাস ডিজিজ বা ভাইরাল ডিজিজ শুরু হয়, তখনই সেটাকে থামিয়ে ফেলতে হয়। যদি আমরা থামাতে না পারি, তখন এটা আস্তে আস্তে জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে ঘটেছে ঠিক এই ঘটনা। বাংলাদেশে একটা সময় ডেঙ্গু ছিল ঢাকাকেন্দ্রিক। যখন আমরা ডেঙ্গুকে ঢাকার মধ্যে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারিনি, তখন সেটা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিদিন ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলাতে প্রচুর মানুষ যানবাহনে যাতায়াত করে। সেই যানবাহনে বা বাসে চড়ে মানুষ তো যায়ই, মশাও চলে যায়। এভাবে সারা বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা, উপজেলা শহর এখন এডিস মশার দখলে চলে গেছে।

সামনের মাসগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ে আপনার পূর্বাভাস কী?

আমরা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনসেক্ট রিয়ারিং অ্যান্ড এক্সপেরিমেন্টাল স্টেশন (আইআরইএস) থেকে নিয়মিত সারা দেশের মশা নিয়ে কাজ করি। ঢাকাতেও আমাদের নিয়মিত সার্ভেইল্যান্স চলে। এডিস মশার ঘনত্ব, ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা, বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা—এই কয়েকটি প্যারামিটার মিলিয়ে আমরা সব সময় একটি ফোরকাস্টিং মডেল বা প্রেডিকশন মডেল তৈরি করি। ইতিপূর্বে আমরা যত মডেল তৈরি করেছি, যত ফোরকাস্টিং করেছি, প্রতিটিই সঠিক হয়েছে।

এ বছর আমরা যেটা দেখছি, আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই দুই মাস বেশ ভয়াবহ হতে পারে ডেঙ্গু—যদি আমরা এখনই সেটাকে নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রাখতে না পারি। আমি খুব স্পেসিফিক্যালি বলতে পারি কোন কোন জেলায় ডেঙ্গু বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা আছে।

বরিশাল বিভাগের বেশ কয়েকটি জেলা, যেমন বরিশাল, বরগুনা, পিরোজপুর, পটুয়াখালী। কাছাকাছি আছে বাগেরহাট ও খুলনা। এ ছাড়া চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, চাঁদপুর, কুমিল্লা, ঢাকা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ—এই জেলাগুলো ডেঙ্গুতে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

এখানে অনেক বেশি আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে। অন্যান্য বছরের তুলনায় ঢাকাতে হয়তো অতটা বেশি হবে না। কারণ ঢাকাতে চান্স অব ইনফেকশন অনেকটা কমে গেছে। তাই ঢাকা ছাড়াও ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে এখন ডেঙ্গু মোকাবিলায় আমাদের অনেক বেশি প্রস্তুতি প্রয়োজন।

সাধারণভাবে মানুষ মনে করে, বর্ষাকালেই ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি। আসলেই কি তা–ই?

দীর্ঘদিন ধরে মশা নিয়ে গবেষণা করছেন কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিররুল বাশার

বর্ষাকালে ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি, কথাটি সত্য। কিন্তু শীতকালে ডেঙ্গু হবে না, এ কথা মিথ্যা। আমাদের দেশে এখন সারা বছরই ডেঙ্গু হয়—শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা সব সময়। তবে বর্ষাকালে যেহেতু বৃষ্টি হয়, সেই পানি বিভিন্ন জায়গায় জমে।

ছোট-বড় পাত্রে জমা হয়, যে পাত্রগুলোতে এডিস মশা ডিম পাড়ে এবং সেই ডিম থেকে লার্ভা হয়, লার্ভা থেকে পিউপা হয়, পিউপা থেকে পূর্ণাঙ্গ মশা। যেখানে পূর্ণাঙ্গ মশা থাকে, সেখানে যদি একটা ডেঙ্গু রোগী থাকে, তখন ওই রোগী আর মশার মাধ্যমে এটি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে এবং জ্যামিতিক হারে বাড়তে থাকে।

যে কারণে বর্ষাকালে ডেঙ্গু বাড়ে। বাংলাদেশে বিশেষ করে আগস্ট, সেপ্টেম্বর, অক্টোবর—এই তিনটি মাসে ডেঙ্গুর ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এটাকে আমরা বলি বর্ষা–পরবর্তী সময়। বর্ষায় এডিস মশার প্রজনন হয়। তাই বর্ষা–পরবর্তী সময়ে ডেঙ্গু রোগটা অনেক বেড়ে যায়।

কয়েক বছর আগে আপনারা গবেষণা করে পেয়েছিলেন, এডিস মশা রাতেও কামড়ায় এবং ঘোলা পানিতেও জন্মায়, সেটা তো এখন প্রমাণিত।

এডিস মশাকে আমি বলি খুবই চতুর মশা। যেকোনো পরিবর্তনে সে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। আগে আমরা জানতাম, এডিস মশা পরিষ্কার পানিতে ডিম পাড়ে। এখন দেখি এডিস মশা নোংরা পানিতেও ডিম পাড়ে।

গত পরশুদিন (৯ জুলাই) একটা জাপানিজ টিমের সঙ্গে ঢাকায় মাঠপর্যায়ের কাজে গিয়েছিলাম, সেখানে নোংরা পানিতে এডিস মশার প্রজনন দেখে জাপানি বিজ্ঞানী অবাক হয়ে গেছেন। তিনি বলেছেন, তাঁর পুরো জীবনে এ রকম অভিজ্ঞতা নেই যে নোংরা পানিতে এডিস মশা হয়।

এখন তো ঢাকায় মশা কম, তারপরও কেন ডেঙ্গু হচ্ছে?

কথা সত্যি, বেশির ভাগ নাগরিক বলবেন মশার ঘনত্ব খুবই কম। তবে ডেঙ্গু কিন্তু হচ্ছে। কারণ কী? আমাদের দেশে ৯৯ ভাগই কিউলেক্স মশা। আর কিউলেক্স মশা বর্ষাকালে কমে যায়। এডিস মশা এক ভাগের কম, এটা বর্ষাকালে বাড়ে। যে কারণে এখন মশার সার্বিক ঘনত্বটা কম।

নগরবাসী ভাবছেন, যেহেতু এডিস মশা দিনে কামড়ায়, সেহেতু আমি দিনে সতর্ক থাকলেই হচ্ছে। আবার এডিস মশা তো আমি ঘরে দেখছি না, সুতরাং আমার মশারি টাঙানোর কোনো প্রয়োজন নেই। কিন্তু একটি এডিস মশাই আমাদের ডেঙ্গুর জন্য অনেক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যেতে পারে।

সে জন্য দিনে বা রাতে যখনই একজন নাগরিক ঘুমাবেন, ঘরে মশা কম থাকলে বা না থাকলেও মশারি ব্যবহার করার অভ্যাস করতে হবে। যেহেতু আগামী তিন-চারটি মাস ডেঙ্গুর অনেক ঝুঁকি আছে, সে জন্য এ বিষয়ে অবহেলা করাটা মোটেও উচিত নয়।

মশা নিধনে সিটি করপোরেশনগুলোর কার্যক্রমকে আপনি কতটা কার্যকর মনে করেন?

দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশে মশা নিয়ন্ত্রণ বা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রচুর টাকা খরচ করা হচ্ছে। কিন্তু ডেঙ্গু কমছে না, প্রতিবছরই হচ্ছে। আমাদের খুঁজে বের করা দরকার ডেঙ্গু কেন কমছে না। আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি, কিন্তু কমছে না। দীর্ঘ ২৬ বছরের গবেষণায় আমি গ্যাপগুলো আইডেন্টিফাই করার চেষ্টা করেছি। মনে হয়েছে, মশা নিয়ন্ত্রণে সিটি করপোরেশন যে কাজটি করে, সেটি মূলত কিউলেক্স মশাকে টার্গেট করে।

কিউলেক্স মশা হয় ড্রেন, ডোবা বা নর্দমার পচা পানিতে। আপনি দেখবেন যে একজন স্প্রে-ম্যান ড্রেনে, ডোবায়, রাস্তার দুই ধারে ফগার মেশিন চালিয়ে যাচ্ছে বা স্প্রে করছে। এসবের একটি জায়গাতেও কিন্তু সেভাবে এডিস মশার প্রজনন হয় না।

এডিস মশার প্রজনন হয় বিভিন্ন বাড়িতে, বেজমেন্টে জমা পানি, পার্কিংয়ে জমা পানি, ড্রামে–বালতিতে–ঘরে জমা পানিতে, ফুলের টব বা জলকান্দায় জমা পানিতে। কিন্তু আমরা যে কন্ট্রোল মেজারটা করছি, সেটা এডিস মশাকে টার্গেট করে না, হচ্ছে কিউলেক্স মশাকে টার্গেট করে। যে জায়গাটাতে ভুল হচ্ছে। আমরা যদি এডিস মশাকে টার্গেট করে কন্ট্রোলের চেষ্টা করি, তখনই ডেঙ্গুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে।

ফগার মেশিনের যে ধোঁয়া, এই ধোঁয়াতে কি মশা নিরোধ সম্ভব?

জাপানি ওই দল গত কয়েক দিন আমাদের সঙ্গে ছিল। তাঁরা ঢাকা ঘুরে দেখেছেন, ফগার মেশিন দিয়ে ধোঁয়া দিচ্ছে। তাঁরা অবাক হয়ে গেছেন, মানুষের সামনে কীভাবে ধোঁয়া দেয়! এটা তো কোনোভাবেই অনুমোদিত নয়।

পৃথিবীর বহু দেশ আছে, যারা আইন করে এই ফগিং বা ফিউমিগেশন বন্ধ করেছে। এটি কোনো কার্যকর পদ্ধতি নয়। এই পদ্ধতিতে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে, পরিবেশের ঝুঁকি তৈরি করে, পরিবেশে যে পরাগায়নকারী পোকামাকড়গুলো আছে, সেগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

পৃথিবীর কোনো ভালো দেশে কিন্তু এই জিনিস নেই। কিন্তু আমরা প্রচুর পরিমাণে টাকা একদম অকার্যকর একটি পদ্ধতিতে নষ্ট করছি। তবে লার্ভিসাইড প্রয়োগ করা যেতে পারে, যেটা একোয়াটিক। পানিতে যে লার্ভাগুলো থাকে, সেই লার্ভা মারার জন্য। তবে সেটিও পরিবেশের জন্য উপযোগী, মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়—এ রকম দেখে বেছে নিতে হবে।

ডেঙ্গু হলে কখন অ্যান্টিজেন, অ্যান্টিবডি আর সিবিসি পরীক্ষা করাবেন

বাসাবাড়িতে এডিস মশার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার ব্যাপারে আপনার পরামর্শ কী?

এডিস মশা থেকে সুরক্ষা পেতে বাসায় ফুলের টবে পানি জমতে দিবেন না

আমাদের নাগরিকদের একটি জিনিস নিশ্চিত করতে হবে, আমার বাড়িতে কোনো পাত্রে কোনো পানি জমে থাকবে না। আমার আঙিনায়, বেজমেন্টে, গাড়ির পার্কিংয়ে কোথাও যদি কোনো পাত্রে পানি জমা থাকে, সেখানে ওই লার্ভা হতে পারে।

সে জন্য প্রত্যেক নাগরিকের নিশ্চিত করতে হবে তাঁর বাড়িতে কোনো জমানো পানি নেই। যদি এমন পানি হয় যে সেটা ফেলে দেওয়া যাচ্ছে না, সেই পানিতে দরকার হলে আইজিআর বা লার্ভিসাইড প্রয়োগ করতে হবে, সিটি করপোরেশনের সহায়তা নিতে হবে। যেভাবেই হোক নিশ্চিত করতে হবে যে আমার বাড়িতে কোনো জমা পানি নেই।

এখনই কোন তিনটি পদক্ষেপ নেওয়া সবচেয়ে জরুরি?

এই মুহূর্তে যে তিনটি কাজ সবচেয়ে জোরেশোরে করা দরকার সেটা হচ্ছে, কমিউনিটিকে সম্পৃক্ত করে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের কার্যক্রম জোরদার; সঙ্গে এডিস মশার লার্ভা নিয়ন্ত্রণে আইজিআর বা বায়োলার্ভিসাইড প্রয়োগ; আর ৩ নম্বর হচ্ছে, হাসপাতালগুলোতে বিশেষভাবে ডাক্তার ও নার্সদের সঠিক প্রশিক্ষণ দিয়ে ডেঙ্গু মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত রাখা, যেন রোগীর সংখ্যা বাড়লে চাপটি তাঁরা মোকাবিলা করতে পারেন।

বদলে গেছে ডেঙ্গুর ধরন, বিপদগুলো জানুন

Read full story at source