বেলিংহামের গোলের পর আলোচনায় স্পাইডারক্যাম: আকাশে উড়ে বেড়ানো এই ক্যামেরা আসলে কী?

· Prothom Alo

স্পাইডারক্যামে লেগেছিল কি না, সেই বিতর্ক এখন বিশ্বকাপে আলোচনার কেন্দ্র। কী এই স্পাইডারক্যাম, কীভাবে কাজ করে, আর কেন এটি এত গুরুত্বপূর্ণ?

নরওয়ে ও ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচে জুড বেলিংহামের গোলের ঠিক আগে বলটি মাঠের ওপরে ঝুলে থাকা স্পাইডারক্যামের সংস্পর্শে এসেছিল বলে দাবি ওঠে। ফুটবলের আইন অনুযায়ী, খেলার সময় বল যদি বাইরের কোনো বস্তুর—যেমন ঝুলন্ত ক্যামেরার—সংস্পর্শে আসে, তাহলে রেফারির খেলা থামিয়ে ড্রপ বলের মাধ্যমে পুনরায় শুরু করার কথা। কিন্তু ওই মুহূর্তে খেলা থামানো হয়নি, আর ইংল্যান্ডও পেয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ গোল।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

এই ম্যাচের পরই শুরু হয়েছে বিতর্ক

ম্যাচ শেষ হওয়ার পর ঘটনাটি ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক। কেউ বলছেন, এটি রেফারির ভুল। আবার কেউ মনে করছেন, বলের গতিপথে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না আসায় খেলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। বিতর্কের চূড়ান্ত বিচার হয়তো ফুটবলবিশ্বই করবে। তবে ঘটনাটি আবারও আলোচনায় নিয়ে এসেছে এক পরিচিত প্রযুক্তির নাম—স্পাইডারক্যাম।

গোলের মুহূর্ত। হাজারো দর্শকের উল্লাসে কেঁপে উঠছে স্টেডিয়াম। বল জালে জড়াতেই টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠে খেলোয়াড়দের উদ্যাপন, কোচের প্রতিক্রিয়া, গ্যালারিতে আবেগে ভেসে যাওয়া সমর্থক কিংবা বাবার কাঁধে বসে বিস্ময়ে খেলা দেখা এক শিশুর মুখ। সবকিছু যেন কোনো বড় বাজেটের সিনেমার দৃশ্য।
এই অসাধারণ দৃশ্যগুলো ধারণ করে মাঠের অনেক ওপরে চারটি শক্ত স্টিলের তারে ঝুলে থাকা একটি ছোট্ট ক্যামেরা। অবিশ্বাস্য গতিতে এটি এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়ায়। কখনো খেলোয়াড়দের মাথার ওপর, কখনো গোলবারের পেছনে, আবার কখনো পুরো মাঠকে দেখায় পাখির চোখে। এই উড়ন্ত ক্যামেরার নামই স্পাইডারক্যাম।

এসবই স্পাইডারক্যামের কেরামতি

আধুনিক ক্রীড়া সম্প্রচারে স্পাইডারক্যাম যেন এক নেপথ্যের গল্পকার। এটি শুধু খেলার দৃশ্য ধারণ করে না, খেলার আবেগও দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয়। গোলের উল্লাস, পরাজয়ের হতাশা, গ্যালারির উন্মাদনা কিংবা ম্যাচের প্রতিটি নাটকীয় মুহূর্ত এমনভাবে তুলে ধরে, যেন টেলিভিশনের পর্দা আর স্টেডিয়ামের দূরত্ব মুহূর্তেই মিলিয়ে যায়।

স্পাইডারক্যাম কী?

স্পাইডারক্যাম যেভাবে কাজ করে

স্পাইডারক্যাম হলো তারের সাহায্যে পরিচালিত একটি অত্যাধুনিক ক্যামেরা ব্যবস্থা। মাঠের চার কোণে স্থাপিত উঁচু খুঁটি অথবা স্টেডিয়ামের ছাদে টানানো থাকে শক্তিশালী স্টিলের তার। সেই তারের ওপর ভর করেই ক্যামেরাটি সামনে, পেছনে, ডানে, বাঁয়ে, ওপরে কিংবা নিচে অবিশ্বাস্য গতিতে চলাচল করতে পারে। ফলে এমন সব কোণ থেকে খেলা দেখা সম্ভব হয়, যা একসময় শুধু কল্পনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল।

ফুটবল মাঠে কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?

ফুটবল এখন শুধু ৯০ মিনিটের একটি খেলা নয়; এটি বিশ্বের অন্যতম বড় বিনোদন শিল্প। কোটি কোটি দর্শকের কাছে ম্যাচকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলতে সম্প্রচারে যুক্ত হয়েছে নানা প্রযুক্তি, যার মধ্যে স্পাইডারক্যাম অন্যতম।

এই ক্যামেরার মাধ্যমে একসঙ্গে পুরো মাঠে খেলোয়াড়দের অবস্থান, আক্রমণ থেকে রক্ষণে দ্রুত রূপান্তর, কর্নার কিংবা ফ্রি-কিকের সময় পেনাল্টি বক্সের নড়াচড়া, গোল উদ্যাপনের আবেগঘন মুহূর্ত এবং ম্যাচ শুরুর আগে জাতীয় সংগীতের সময় স্টেডিয়ামের অনন্য পরিবেশ—সবকিছুই সিনেমার মতো করে তুলে ধরা যায়।
ফিফা বিশ্বকাপ, কোপা আমেরিকা, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, লা লিগাসহ বিশ্বের প্রায় সব বড় ফুটবল টুর্নামেন্টেই এখন স্পাইডারক্যাম নিয়মিত ব্যবহৃত হয়।

স্পাইডারক্যাম মাঠে নানাভাবে কাজ করে

তবে এর কাজ শুধু দর্শকদের বিনোদন দেওয়া নয়। ম্যাচ শেষে কোচিং স্টাফ ও পারফরম্যান্স বিশ্লেষকেরাও এই ফুটেজ ব্যবহার করেন দলের কৌশল বিশ্লেষণে। কোন খেলোয়াড় কোথায় ফাঁকা জায়গা তৈরি করেছেন, কোথায় রক্ষণে ভুল হয়েছে কিংবা কোন পরিকল্পনা সফল হয়েছে—এসব মূল্যায়নে স্পাইডারক্যামের ফুটেজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আধুনিক ফুটবলের ট্যাকটিক্যাল বিশ্লেষণে এটি এখন নির্ভরযোগ্য একটি প্রযুক্তি।

ফুটবলের বাইরেও ব্যবহার

ক্রিকেটে স্পাইডারক্যাম

স্পাইডারক্যামের ব্যবহার শুধু ফুটবলেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্রিকেটে ব্যাটসম্যানের শট, বোলারের রান-আপ কিংবা দুর্দান্ত ক্যাচের মুহূর্তকে আরও আকর্ষণীয়ভাবে তুলে ধরতে এটি ব্যবহৃত হয়। রাগবি, আমেরিকান ফুটবল, টেনিসসহ বিভিন্ন খেলায় পুরো মাঠ বা কোর্টের কৌশলগত বিন্যাস দেখাতেও এর জুড়ি নেই।

কনসার্টেও

শুধু খেলাধুলা নয়, বড় কনসার্ট, উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠান, জাতীয় দিবসের কুচকাওয়াজ, রাজনৈতিক সমাবেশ, মোটর রেসিং, ঘোড়দৌড় এমনকি চলচ্চিত্র নির্মাণেও এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশাল আয়োজনকে গতিশীলভাবে ধারণ করার ক্ষেত্রে এটি নির্মাতাদের নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

নিরাপত্তা নিয়ে কি ঝুঁকি আছে?

অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে, এত দ্রুতগতিতে চলা ক্যামেরাটি খেলোয়াড়দের গায়ে পড়ে যেতে পারে না?

এই সম্ভাবনা মাথায় রেখেই স্পাইডারক্যামের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে। কম্পিউটার নিয়ন্ত্রিত সফটওয়্যার প্রতিনিয়ত ক্যামেরার অবস্থান, উচ্চতা ও গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করে। পাশাপাশি অভিজ্ঞ অপারেটররা ম্যাচের পরিস্থিতি বুঝে ক্যামেরা পরিচালনা করেন, যাতে খেলোয়াড়, বল কিংবা রেফারির সঙ্গে সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি না হয়।

প্রযুক্তি যখন আবেগকে আরও কাছাকাছি আনে

একসময় টেলিভিশনে খেলা দেখা মানেই ছিল দূর থেকে মাঠের একটি দৃশ্য। স্পাইডারক্যাম সেই অভিজ্ঞতাকে আমূল বদলে দিয়েছে। এখন গোলের পর উল্লাসে ভাসা খেলোয়াড়, গোলকিপারের হতাশ মুখ, কোচের প্রতিক্রিয়া কিংবা গ্যালারিতে আবেগে ভেসে যাওয়া সমর্থকের চোখ—সবকিছুই এমনভাবে ধরা পড়ে, যেন দর্শকও মাঠের ভেতরে উপস্থিত।

স্পাইডারক্যাম তাই শুধু একটি সম্প্রচার প্রযুক্তি নয়; এটি আধুনিক ফুটবলের গল্প বলার নতুন ভাষা। মাঠের প্রতিটি মুহূর্তকে আরও জীবন্ত, আরও আবেগময় করে কোটি দর্শকের কাছে পৌঁছে দেয় এই ‘আকাশের চোখ’। ভবিষ্যতে আরও আধুনিক প্রযুক্তি আসবে, কিন্তু ফুটবল দেখার অভিজ্ঞতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ইতিহাসে স্পাইডারক্যামের অবদান আলাদাভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র: ফিফা মিডিয়া সেন্টার।

ছবি: এআই, ইন্সটাগ্রাম, রয়টার্স

Read full story at source