কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহার নামে নতুন সামুদ্রিক প্রাণীর নামকরণ

· Prothom Alo

ফুটবল মাঠে দুর্দান্ত ডাইভ দিয়ে গোল বাঁচানোর পর একজন গোলরক্ষক সাধারণত কী পান? হয়তো ম্যান অব দ্য ম্যাচ হন, গ্যালারি ভরা দর্শকের হাততালি কুড়ান, কিংবা বড়জোর সোশ্যাল মিডিয়ায় মিলিয়ন মিলিয়ন ফলোয়ার জুটিয়ে ফেলেন। এর সবগুলো ইতিমধ্যে পেয়ে গেছেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা। কিন্তু ফুটবল খেলে বিজ্ঞানের গবেষণাপত্রে কি ঢোকা যায়? তাও আবার সম্পূর্ণ নতুন আবিষ্কৃত এক সামুদ্রিক প্রাণীর নাম হিসেবে! আপনি হয়তো ফুটবল ও জীববিজ্ঞানের এমন অদ্ভুত মেলবন্ধনের কথা আগে কখনো শোনেননি। ঠিক এমন একটি অভাবনীয় ও মজার ঘটনাই ঘটিয়েছেন স্প্যানিশ জীববিজ্ঞানী জেসুস ওরতিয়া। এবারের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম করা কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহার নামে তিনি সদ্য আবিষ্কৃত একটি সামুদ্রিক প্রাণীর নামকরণ করেছেন।

বিজ্ঞানের গল্পে যাওয়ার আগে ফুটবল মাঠের গল্পটা একটু সেরে নেওয়া যাক। এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম বড় চমক ছিল ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দে। সেই দলের গোলপোস্টের নিচে যেন চীনের মহাপ্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ভোজিনহা। ৪০ বছর ১২ দিন বয়সে খেলতে নেমেছিলেন দেশের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ। বিশ্বকাপ অভিষেকে সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামার রেকর্ডটি এখন তার দখলেই।

Visit extonnews.click for more information.

নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করলেই কি নিজের নামে নাম রাখা যায়
এবারের বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফর্ম করা কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী গোলরক্ষক ভোজিনহার নামে স্প্যানিশ জীববিজ্ঞানী জেসুস ওরতিয়া সদ্য আবিষ্কৃত একটি সামুদ্রিক প্রাণীর নামকরণ করেছেন।

প্রতিপক্ষ ছিল খোদ ইউরো চ্যাম্পিয়ন স্পেন! সেই ম্যাচে স্প্যানিশদের একের পর এক আক্রমণ ঠেকিয়ে দিয়ে ৭টি অসাধারণ সেভ করেন তিনি। ম্যাচটি গোলশূন্য ড্র হয়, আর ভোজিনহা জেতেন ম্যাচসেরার পুরস্কার। টুর্নামেন্টে সৌদি আরবের বিপক্ষেও কোনো গোল হজম করেননি তিনি। তাঁর দল পৌঁছে যায় শেষ ৩২-এ। সেখানে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কাছে অতিরিক্ত সময়ের পর ৩-২ গোলে হারলেও, আরও ৭টি দুর্দান্ত সেভ করে সবার মন জয় করে নেন এই গোলরক্ষক। তার এই জাদুকরী পারফরম্যান্সের প্রভাব কতটা ছিল, তার একটা ছোট পরিসংখ্যান দেওয়া যাক। বিশ্বকাপের আগে ইনস্টাগ্রামে তার ফলোয়ার ছিল মাত্র ৫০ হাজার। আর এখন সেটি ২৮.৫ মিলিয়নের ঘর ছাড়িয়ে গেছে!

কেপ ভার্দের ফুটবল টিমের গোলরক্ষক ভোজিনহা

এবার আসা যাক বিজ্ঞানের দুনিয়ায়। স্পেনের ওভিয়েদো ইউনিভার্সিটির প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং গবেষক জেসুস ওরতিয়া সম্প্রতি ক্যারিবিয়ান সাগর, বিশেষ করে কিউবার হাভানা এবং গুয়াদেলুপ দ্বীপের কাছাকাছি এলাকায় গবেষণা চালাচ্ছিলেন। সেখানে তিনি একেবারেই নতুন প্রজাতির একটি সামুদ্রিক মলাস্ক (সি-স্লাগ) আবিষ্কার করেন। লাল রঙের এই ছোট্ট প্রাণীটির দৈর্ঘ্য মাত্র ৪ মিলিমিটার।

অধ্যাপক ওরতিয়া তাঁর সদ্য প্রকাশিত হিস্টোরিয়াস দে লা বায়োডাইভারসিদাদ বইয়ে এ প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম দিয়েছেন অ্যালডাইসা ভোজিনহাই (Aldisa vozinhai)! বাংলা করলে দাঁড়ায় ভোজিনহার সামুদ্রিক স্লাগ।

যে বোলতার নাম হলো শতবর্ষী ডেভিড অ্যাটেনবরোর নামে
বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার কাছে অতিরিক্ত সময়ের পর ৩-২ গোলে হারলেও, আরও ৭টি দুর্দান্ত সেভ করে সবার মন জয় করে নেন কেপ ভার্দের গোলরক্ষক ভোজিনহা।

আপনার মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, একজন স্প্যানিশ বিজ্ঞানী তার দেশেরই আক্রমণ ঠেকিয়ে দেওয়া এক ভিনদেশি গোলরক্ষকের প্রেমে কেন পড়লেন? আসলে এর পেছনে রয়েছে কৃতজ্ঞতার এক অপূর্ব গল্প।

কেপ ভার্দে একটি দ্বীপরাষ্ট্র হওয়ায় এর সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এই মহাদেশীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন অধ্যাপক ওরতিয়া। তার এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৩ সালে কেপ ভার্দে সরকার তাকে সম্মানজনক মেডেল অব এনভায়রনমেন্টাল মেরিট পদকে ভূষিত করে। সেই দেশের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতেই ওরতিয়া বিশ্বকাপের এই সময়টিকে বেছে নেন। স্পেনের বিপক্ষে ভোজিনহার সেই অতিমানবীয় পারফরম্যান্স দেখার পর, তার সম্মানার্থেই নতুন আবিষ্কৃত প্রাণীটির এই নামকরণ করেন তিনি।

কেপ ভার্দে একটি দ্বীপরাষ্ট্র হওয়ায় এর সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ

মজার ব্যাপার হলো, গোলরক্ষকদের নামে প্রাণীর নামকরণের এই অদ্ভুত শখ অধ্যাপক ওরতিয়ার এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১৯ সালে তিনি একটি ক্ষুদ্র সামুদ্রিক শামুক আবিষ্কার করেছিলেন। সেই সময় রিয়াল মাদ্রিদ ও কোস্টারিকার বিখ্যাত গোলরক্ষক কেইলর নাভাসের নামে তিনি প্রাণীটির নাম রেখেছিলেন! বোঝাই যাচ্ছে, সামুদ্রিক প্রাণী খোঁজার পাশাপাশি ভদ্রলোক ফুটবলেরও দারুণ পোকা, বিশেষ করে গোলরক্ষকদের প্রতি তার আলাদা একটা টান রয়েছে।

সমুদ্রতলের অদ্ভুতুড়ে কিছু প্রাণীর কথা
২০১৯ সালে অধ্যাপক ওরতিয়া একটি ক্ষুদ্র সামুদ্রিক শামুক আবিষ্কার করেছিলেন। সেই সময় রিয়াল মাদ্রিদ ও কোস্টারিকার বিখ্যাত গোলরক্ষক কেইলর নাভাসের নামে তিনি প্রাণীটির নাম রেখেছিলেন!

দীর্ঘ দুই দশকের ক্যারিয়ারে কেপ ভার্দে, মলদোভা, স্লোভাকিয়া, সাইপ্রাস এবং পর্তুগালের বিভিন্ন ক্লাবে খেলেছেন ভোজিনহা। জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নেমেছেন ৯১ বার। ফুটবল ক্যারিয়ার একদিন শেষ হয়ে যাবে, বিশ্বকাপের সেই দারুণ সেভগুলোও হয়তো একসময় মানুষের স্মৃতি থেকে ফিকে হয়ে আসবে। কিন্তু বিজ্ঞানের খাতায় তার নামটি লেখা হয়ে গেল চিরকালের জন্য। ক্যারিবিয়ান সাগরের অতলে ঘুরে বেড়ানো সেই ৪ মিলিমিটারের ছোট্ট লাল প্রাণীটি যতদিন পৃথিবীতে টিকে থাকবে, কেপ ভার্দের এই গোলরক্ষকের নামটিও বিজ্ঞানের পাতায় ঠিক ততটাই জীবন্ত হয়ে থাকবে!

সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমসপ্রাণীর চোখে কেমন দেখায় পৃথিবী

Read full story at source