জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই কার্যকর উপস্থাপনার দক্ষতা

· Prothom Alo

শুক্রবার বিকেল। বাইরে তপ্ত রোদের দাবদাহ, ছুটির দিনের অলসতা কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার প্রলোভন—সবকিছু পাশ কাটিয়ে এক ঝাঁক তরুণ-তরুণী ছুটে এসেছেন দিনাজপুর প্রেসক্লাবে। উদ্দেশ্য একটাই—নিজেকে আরও দক্ষ, আরও আত্মবিশ্বাসী উপস্থাপক হিসেবে গড়ে তোলা। শেখার আগ্রহ আর নতুন কিছু জানার উদ্দীপনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো কর্মশালার পরিবেশ; যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত ছিল আত্মবিশ্বাস, যোগাযোগ দক্ষতা ও কার্যকর উপস্থাপনার নতুন নতুন পাঠে সমৃদ্ধ।

Visit somethingsdifferent.biz for more information.

উপস্থাপনার দক্ষতা বিকাশে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করতে ৩ জুলাই, শুক্রবার দিনাজপুর প্রেসক্লাবে উপস্থাপনা–বিষয়ক কর্মশালার আয়োজন করে দিনাজপুর বন্ধুসভা। এতে অংশ নেন বন্ধুসভার বন্ধু, বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং নানা পেশায় নিয়োজিত প্রায় ৫০ জন মানুষ।

কর্মশালার মূল উদ্দেশ্য ছিল অংশগ্রহণকারীদের শুধু মঞ্চে বক্তব্য দেওয়ার কৌশল শেখানো নয়; বরং চাকরির সাক্ষাৎকার, উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের ভাবনা উপস্থাপন, গণমাধ্যমে কথা বলা, একাডেমিক প্রেজেন্টেশন ও দৈনন্দিন পেশাগত জীবনে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেকে কার্যকরভাবে উপস্থাপনের দক্ষতা গড়ে তুলতে সহায়তা করা। কারণ, বর্তমান সময়ে সফলতার জন্য শুধু জ্ঞান অর্জনই যথেষ্ট নয়, সেই জ্ঞান আত্মবিশ্বাস ও দক্ষতার সঙ্গে প্রকাশ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কর্মশালাটি সঞ্চালনা করেন দিনাজপুর বন্ধুসভার সভাপতি শবনম মুস্তারিন।

প্রশিক্ষক মুনিরা শাহানাজ চৌধুরী প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে পাশে বসা ব্যক্তির সঙ্গে দুই মিনিট আলাপ করার নির্দেশ দেন। পরিচয় পর্ব শেষে সবাই একে একে মঞ্চে উঠে নিজেদের নয়; বরং তাঁদের সঙ্গীর পরিচয় তুলে ধরেন

স্বাগত বক্তব্যে বন্ধুসভার উপদেষ্টা ও দিনাজপুর জিলা স্কুলের বাংলা বিভাগের শিক্ষক শাজাহান সাজু বলেন, ‘প্রথম আলো বন্ধুসভা এমন একটি সংগঠন, যারা তরুণদের বই পড়া, সংস্কৃতিচর্চা, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ এবং দক্ষতা উন্নয়নের নানা আয়োজনের মাধ্যমে মানবিক ও সচেতন নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে কাজ করে। এই কর্মশালাও সেই ধারাবাহিক উদ্যোগের একটি অংশ।’

শাজাহান সাজু বলেন, ‘উপস্থাপনার দক্ষতা এক দিনে অর্জিত হয় না। নিয়মিত চর্চা, পর্যবেক্ষণ এবং শেখার মধ্য দিয়েই একজন মানুষ আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। তাই কর্মশালার প্রতিটি সেশন মনোযোগ দিয়ে অনুসরণ করে শেখা বিষয়গুলো বাস্তব জীবনে অনুশীলন করতে হবে।’

প্রথম আলোর দিনাজপুর প্রতিনিধি শৈশব রাজু বলেন, ‘উপস্থাপনা শুধু মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলার বিষয় নয়; বরং এটি নিজের ভাবনা, জ্ঞান, দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বকে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে অন্যের সামনে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বর্তমান সময়ে শিক্ষা, চাকরি, উদ্যোক্তা জীবন কিংবা গণমাধ্যম—প্রতিটি ক্ষেত্রেই কার্যকর উপস্থাপনার দক্ষতা একজন মানুষকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তোলে। তাই এমন কর্মশালা তরুণদের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি এবং যোগাযোগ দক্ষতা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমি আশাবাদী।’ বক্তব্য শেষে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মশালার উদ্বোধন ঘোষণা করেন।

অংশগ্রহণকারীদের একাংশ

সাঁওতাল সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে সাঁওতালি ভাষায় ‘সাগুন দারাম’ অর্থাৎ শুভ আগমন উচ্চারণের মধ্য দিয়ে কর্মশালার সূচনা করেন প্রশিক্ষক মুনিরা শাহানাজ চৌধুরী। তিনি বাংলাদেশ বেতার, রংপুরের সংবাদ উপস্থাপক। মুনিরা শাহানাজ চৌধুরী বলেন, ‘একজন দক্ষ উপস্থাপক হতে হলে শুধু ভালো বক্তা হলেই চলবে না, নিজেকে প্রতিনিয়ত গড়ে তুলতে হবে।’ তিনি গুরুত্ব দেন পাঁচটি মৌলিক বিষয়ে—পড়তে হবে, লিখতে হবে, জানতে হবে, শিখতে হবে এবং বলতে হবে। তাঁর মতে, এই পাঁচটি অভ্যাসই একজন আত্মবিশ্বাসী ও প্রভাবশালী উপস্থাপকের ভিত্তি তৈরি করে।

এরপর প্রশিক্ষক প্রত্যেক অংশগ্রহণকারীকে পাশে বসা ব্যক্তির সঙ্গে দুই মিনিট আলাপ করার নির্দেশ দেন। পরিচয় পর্ব শেষে সবাই একে একে মঞ্চে উঠে নিজেদের নয়; বরং তাঁদের সঙ্গীর পরিচয় তুলে ধরেন। অনেকেই জানান, এটাই ছিল জীবনের প্রথম মঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলার অভিজ্ঞতা। প্রথমে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও মুহূর্তেই সেই সংকোচ কাটিয়ে ওঠেন তাঁরা। পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে উৎসাহ, শেখা আর আত্মবিশ্বাসে ভরপুর।

সঠিক উচ্চারণ, কণ্ঠস্বরের ব্যবহার ও স্পষ্টভাবে কথা বলার গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন প্রশিক্ষক। তিনি অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন ধরনের মুখের ব্যায়াম (ভোকাল ওয়ার্মআপ) করান, যাতে উচ্চারণ আরও স্পষ্ট ও সাবলীল হয়।

দিনাজপুর বন্ধুসভার উপস্থাপনা–বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালা

কর্মশালার আরেকটি সুন্দর মুহূর্ত আসে যখন প্রশিক্ষক মুনিরা শাহানাজ চৌধুরী একজন অংশগ্রহণকারীকে সামনে ডেকে আন্তরিকভাবে বলেন, ‘ইউ আর ওসাম।’ এরপর তিনি উপস্থিত সবাইকে একে অপরের সঙ্গে হাত মিলিয়ে একই বাক্য বলতে উৎসাহিত করেন এবং দেখার চেষ্টা করেন, কে সবচেয়ে বেশি মানুষকে ইতিবাচক এই বার্তাটি পৌঁছে দিতে পারেন। মুহূর্তেই পুরো কক্ষ যেন প্রাণচাঞ্চল্যে ভরে ওঠে।

কর্মশালার শেষে অংশগ্রহণকারী এক মা ও তাঁর মেয়ে তাঁদের অনুভূতি প্রকাশ করে জানান, এই আয়োজন তাঁদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতে মঞ্চে কথা বলার ভয় অনেকটাই দূর করেছে।
সবশেষে আবারও সাঁওতালি ভাষায় ‘আডি আডি সারাহাউ’ অর্থাৎ অনেক অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে প্রশিক্ষক কর্মশালার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

সমাপনী বক্তব্য দেন বন্ধুসভার উপদেষ্টা ও দিনাজপুর সরকারি কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক জলিল আহম্মেদ। তিনি স্মৃতিচারণা করে বলেন, শিক্ষকতা জীবনে তাঁর শিক্ষার্থীরা যেমন মনোযোগ দিয়ে ক্লাস করত, তেমনি এদিনও তিনি অংশগ্রহণকারীদের একাগ্রতা ও শেখার আগ্রহ দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। তিনি হাস্যরসের সঙ্গে বলেন, ‘আজ মনে হলো, উপস্থাপকের ক্লাস আমাকে পর্যন্ত ছুঁয়ে গেছে।’

অধ্যাপক জলিল আহম্মেদ কর্মশালার প্রাণবন্ত পরিবেশ, অংশগ্রহণকারীদের সক্রিয় উপস্থিতি এবং প্রশিক্ষক মুনিরা শাহানাজ চৌধুরীর দক্ষ ও আন্তরিক উপস্থাপনার ভূয়সী প্রশংসা করেন। এমন সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ আয়োজনের জন্য দিনাজপুর বন্ধুসভাকেও ধন্যবাদ জানান। শেষে তিনি প্রশিক্ষকের হাতে সম্মাননা স্মারক তুলে দেন।

Read full story at source