নজর কেড়েছে অর্পিতার নাচ, প্রশংসা করেছেন নোরা ফাতেহি ও সঞ্জয়ও

· Prothom Alo

২৪ জুন ভিডিওটা পোস্ট করার পর রাতে আর ফোন হাতে নেননি অর্পিতা পাল। ভোরে ব্রাজিলের খেলা ছিল, ঘুম থেকে উঠে দেখেন এলাহি কারবার! ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে তাঁর নাচের ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে দ্রুত। বন্ধুরা মেসেজ করছে একের পর এক। কমেন্ট আর শেয়ারের সংখ্যা বাড়ছে প্রতি মিনিটে!

Visit newsbetting.club for more information.

ক্যাম্পাসের ছোট বোন তর্না পাটোয়ারীকে সঙ্গে নিয়ে ‘সির সির’ গানের সঙ্গে নেচেছিলেন অর্পিতা। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর অফিশিয়াল সাউন্ডট্র্যাক অ্যালবামের এই গান যৌথভাবে তৈরি করেছেন বাংলাদেশি-মার্কিন ডিজে ও সংগীতশিল্পী সঞ্জয় দেব ও ফরাসি গায়ক ভেজেড্রিম। মিউজিক ভিডিওতে নেচেছেন বলিউড তারকা নোরা ফাতেহি। অর্পিতা বলেন, ‘আমাদের দেশের একজন শিল্পী বিশ্বের এত বড় মঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরছেন, তাঁকে উদ্‌যাপন করার দায়িত্বটা আমাদেরও। তবে গানটি কভার করার সময় বুঝতেই পারিনি, এত তাড়াতাড়ি এভাবে ছড়িয়ে যাবে।’

অর্পিতা পাল

এই লেখা যখন লিখছি, ততক্ষণে ভিডিওটির ভিউ ইনস্টাগ্রামে ছয় লাখ ছাড়িয়েছে। কমেন্টে প্রশংসা করেছেন খোদ নোরা ফাতেহি ও সঞ্জয়ও। অবশ্য এবারই প্রথম নয়। আগেও ‘শৃঙ্গার’, ‘চুল কালো আঁখি কালো’সহ বেশি কিছু গানের সঙ্গে অর্পিতার নাচের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে।

খেলোয়াড়দের ছবি জমানো ছেলেটিই এখন ক্যামেরা হাতে বিশ্বকাপের মাঠে

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির এই স্নাতক পড়েছেন বায়োকেমিস্ট্রি ও বায়োটেকনোলজির মতো খটমট একটা বিষয়ে। ল্যাব আর ক্লাসের ফাঁকেই শুরু হয়েছিল তাঁর কনটেন্ট তৈরির যাত্রা। চার বছর বয়সে যে মেয়েটি প্রথম নূপুর পরেছিলেন, আজ তাঁরই নাচের প্রশংসা করেন দেশ-বিদেশের হাজারো মানুষ।

View this post on Instagram

A post shared by Arpita Paul (@oniyetra)

কক্সবাজারের রামুর মেয়ে অর্পিতার পরিবারে আগে কেউ নাচের সঙ্গে যুক্ত ছিল না। আশপাশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও ছিল বেশ রক্ষণশীল। কিন্তু মায়ের ইচ্ছাশক্তির কাছে সেসব বাধা টেকেনি। চার বছর বয়সেই মেয়েকে নাচের ক্লাসে ভর্তি করে দেন তিনি। রামুর নৃত্যশিক্ষক ঝিল্লি বড়ুয়া, জয়শ্রী বড়ুয়া, অনন্য বড়ুয়া—একে একে তাঁদের কাছে অর্পিতা শেখেন রবীন্দ্রনৃত্য, সৃজনশীল নৃত্য, লোকনৃত্য, ভরতনাট্যম আর ওডিশি।

অর্পিতার লক্ষ্য—শুদ্ধ ও দেশীয় নাচকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা

সপ্তম-অষ্টম শ্রেণিতে পা রাখার পর শুরু হয় আসল লড়াই। ‘মেয়ে বড় হয়ে যাচ্ছে, এখন আর নাচ চালিয়ে যাওয়ার সময় নয়’—এমন মন্তব্য আসছিল চারপাশ থেকে। কিন্তু মা ছিলেন অটল। মেয়েকে স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন, সে যেন শুধু নিজের স্বপ্ন পূরণেই মন দেয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর এই লড়াইয়ে বড় অনুপ্রেরণা ও ভরসার জায়গা হয়ে ওঠেন বড় ভাই অর্ণব পাল। অর্ণবও নর্থ সাউথের ছাত্র, লোকগান করেন। অর্ণবই অর্পিতাকে পরিচয় করিয়ে দেন নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে। বৃত্তি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া, সংগঠনের নানা দায়িত্ব সামলানো, সব মিলিয়ে যাত্রাটা সহজ ছিল না। কিন্তু ভাই-ই সে সময় বলতেন, ‘তুই শুধু চোখ খুলে স্বপ্ন দেখ, বাকিটা আমি দেখব।’ অর্পিতার কনটেন্ট তৈরির যাত্রাও শুরু হয় তাঁর হাত ধরে। ভাইয়ের জোরাজুরিতেই পোস্ট করেন প্রথম ভিডিও। তাই আজকের পথচলার পুরো কৃতিত্বই মা ও বড় ভাইকে দেন অর্পিতা।

এখন পর্যন্ত বহুবার মঞ্চে নেচেছেন। অনেক মঞ্চ যেমন করতালিতে ভরিয়ে দিয়েছে, তেমনি কিছু কিছু মঞ্চ রেখে গেছে ব্যথার দাগও। এমনই এক অভিজ্ঞতার কথা শোনালেন অর্পিতা। ২০২২ সালে এক বান্ধবীর গায়ে-হলুদের অনুষ্ঠানে সপ্তাহখানেক অনুশীলনের পর নাচতে গিয়ে হঠাৎ পায়ের নূপুর জড়িয়ে মঞ্চেই পড়ে গিয়েছিলেন। চারপাশে হাসির রোল উঠেছিল। হেসেছিলেন অর্পিতা নিজেও। কিন্তু পরদিন চিকিৎসকের কাছে গিয়ে জানতে পারেন, হাঁটুর ক্যাপ সরে গেছে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছিল নাচ বন্ধ রাখার। কিন্তু অর্পিতার জবাব, ‘নাচ ছাড়া বাঁচব কীভাবে!’ ঢাকায় ফিরেই আবার অনুশীলন শুরু করেন। ব্যথা কমাতে অনেক সময় বরফে পা ডুবিয়ে রাখতেন, তবে প্রতিদিন সকালের অনুশীলন ছাড়েননি।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্নাতক অর্পিতা পাল

অর্পিতার লক্ষ্য—শুদ্ধ ও দেশীয় নাচকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরা। তিনি বলছিলেন, ‘বর্তমান প্রজন্মের আমরা নিজেদের শিকড় থেকে এতটাই দূরে সরে যাচ্ছি যে নিজেদের ভাষায় নিজেদের সংস্কৃতিকে বিকশিত করতে পারছি না।’ তাঁর স্বপ্ন, তরুণ প্রজন্ম যেন নাচ আর সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরে; যেন প্রমাণ করে, বাংলাদেশের সংস্কৃতি পশ্চিমা সংস্কৃতির চেয়ে পিছিয়ে নেই।

এই স্বপ্নের পথেই লড়তে চান সমাজের কিছু প্রচলিত মানসিকতার বিরুদ্ধেও। তিনি বলছিলেন, ‘এখনো কোনো ছেলে নাচলে তাঁকে “মেয়েলি” বলা হয়, মেয়েদের বলা হয় নাচনেওয়ালি। এতটাই স্বাভাবিকভাবে এসব বলা হয়, যেন এতে কিছু ভুল নেই।’ অর্পিতার বিশ্বাস, নাচ কোনো নির্দিষ্ট বয়স, লিঙ্গ অথবা শ্রেণির জন্য বরাদ্দ নয়। বরং এটি এমন এক ভাষা, যা যে কেউ, যেকোনো বয়সে রপ্ত করতে পারে।

চার বছর বয়সে ছোট ছোট পা ফেলে একদিন নাচের জগতে প্রবেশ করেছিল যে–ই ছোট্ট অর্পিতা, তার সঙ্গে যদি দেখা হতো, কী বলতেন? জানতে চাইলে একটু ভেবে জবাব দেন অর্পিতা, ‘প্রশ্নটা বেশ কঠিন। হয়তো বলতাম, তুমি দুই চোখ ভরে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখেছিলে। কিছুটা পেয়েছ, তবে সব সময় মনে রেখো, পথ এখনো অনেক বাকি।’

কীভাবে দুশ্চিন্তামুক্ত থেকেছেন পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম তানভীর

Read full story at source