গভীর অনুসন্ধান হওয়া জরুরি

· Prothom Alo

এ বছর ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিচ্ছেন না—এ তথ্য আমাদের সার্বিক শিক্ষাব্যবস্থা যে চূড়ান্ত বিপর্যয়কর অবস্থায় পৌঁছেছে, সেই রূঢ় বাস্তবতাকে আরও একবার সামনে নিয়ে এল। একই সঙ্গে আমাদের নীতিনির্ধারকেরা যে দেশের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতের ব্যাপারে মোটেই মনোযোগী নন, এটা তার প্রতিফলনও। মাধ্যমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর ঝরে পড়া নিশ্চিত করেই সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য একটি অশনিবার্তা। কেননা, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার অর্থ হচ্ছে, তাদের বড় একটি অংশ অদক্ষ মানবসম্পদে পরিণত হবে, যা ব্যক্তি ও রাষ্ট্র উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।

প্রথম আলোর খবর, দুই বছর আগে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় একাদশ শ্রেণিতে নিবন্ধন করেছিলেন প্রায় ১৫ লাখ শিক্ষার্থী। তাঁদের মধ্যে প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করেননি। এ ছাড়া পরীক্ষা শুরুর প্রথম দিনে অনুপস্থিত ছিলেন ২৪ হাজার ৭৮৪ জন শিক্ষার্থী। ফরম পূরণ না করা এবং ফরম পূরণ করেও পরীক্ষা না দেওয়া শিক্ষার্থী যোগ করলে বাস্তবে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ না নেওয়া শিক্ষার্থীর হার বেশি। গত বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরীক্ষা না দেওয়ার হার ছিল ২৯ শতাংশের কিছু বেশি। এক বছরের ব্যবধানে এই হার আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। পরিসংখ্যান থেকে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ৩৩ শতাংশ, মাদ্রাসায় ৪৪ শতাংশ ও কারিগরিতে অনুপস্থিতির হার ৫৪ শতাংশ।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

দুই বছরের ব্যবধানে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন ঝরে পড়লেন, তার সুনির্দিষ্ট কারণ খুঁজে বের করা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। গত বছরে এইচএসসি পরীক্ষায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ না নেওয়ার পর ঢাকা বোর্ড ১ হাজার ৩৫০ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করেছিল। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ৪১ শতাংশের বিয়ে হয়ে গিয়েছিল, অর্থাৎ বাল্যবিবাহই ছিল অনুপস্থিতির প্রধান কারণ। এ ছাড়া প্রস্তুতির অভাব ও দারিদ্র্যই ছিল বড় দুটি কারণ। তবে বিস্তৃত পরিসরে গবেষণা ও অনুসন্ধান না হলে প্রকৃত কারণ বের করা সম্ভব নয়।

আমরা মনে করি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এস এম হাফিজুর রহমান যথার্থই বলেছেন, এ পরিস্থিতির পেছনে বিদ্যমান লেখাপড়ার পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার দুর্বলতা নাকি পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক বা ব্যক্তিগত কোনো কারণ কাজ করছে—তা গভীরভাবে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে শুধু শিক্ষা মন্ত্রণালয় নয়; শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয় পর্যায়ে একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করা উচিত।

গত কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা বলে, শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পরীক্ষা–নিরীক্ষা হয়েছে। এসব পরীক্ষা–নিরীক্ষায় একমাত্র গিনিপিগ হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন সরকারের বাগাড়ম্বরের কমতি কখনো দেখা যায়নি, কিন্তু বাস্তবে শিক্ষার মান ক্রমে কমেছে এবং শিক্ষাকে ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিকীকরণ ও বাণিজ্যিকীকরণ করা হয়েছে। ফলে প্রাথমিক থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পুরো বনিয়াদি শিক্ষাটাই এখন ব্যয়বহুল ও অনেক ক্ষেত্রে বিলাসী পণ্য। একদিকে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের বিপরীতে প্রয়োজনীয় ও মানসম্মত শিক্ষক নেই, অন্যদিকে পাঠদানপ্রক্রিয়াও শ্রেণিকক্ষের বাইরে কোচিং, প্রাইভেট ও গাইড বইনির্ভর।

সুতরাং এইচএসসি পরীক্ষার অনুপস্থিতিকে সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার যে দৈন্য, তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখার সুযোগ নেই। সরকারকে এটা মনে রাখা জরুরি, শিক্ষাব্যবস্থার ওপর শিক্ষার্থীদের যদি একবার আস্থাহীনতা তৈরি হয়, সেই আস্থা ফেরানো অনেক কঠিন। আমরা আশা করি, নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎ রক্ষায় সরকার শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে।

Read full story at source