বাংলাদেশি পাটপণ্যে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক বহাল রাখতে পারে ভারত, চাপের মুখে অনেক রপ্তানিকারক

· Prothom Alo

ভারতে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আবারও বড় ধরনের অনিশ্চয়তায় পড়েছে। দেশটি বিদ্যমান অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক বহাল রেখে প্রতিষ্ঠানভেদে নতুন শুল্কহার নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। এর ফলে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের আওতায় থাকা ৫৫টি রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের বাইরে যারা আছে, তাদের ওপরও নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে। তাদের ওপর অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপের শঙ্কা আছে।

ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ (ডিজিটিআর) গত ২৫ জুন এ বিষয়ে ৯৮ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ ও নেপাল থেকে আমদানি হওয়া পাট সুতা, হেসিয়ান কাপড়, পাটের বস্তা এবং বাংলাদেশের স্যাকিং ক্লথের ওপর আরোপিত অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের মধ্যবর্তী পর্যালোচনা শেষে এ সুপারিশ করা হয়। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করলে নতুন শুল্কহার কার্যকর হবে।

Visit bettingx.bond for more information.

বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির একই সঙ্গে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী। জানতে চাইলে আজ শনিবার বিকেলে মুঠোফোনে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ। বাকি থাকে পাটপণ্য। এ পণ্য কেউ কম দামে ভারতে রপ্তানি করছেন, তা অবিশ্বাস্য।

বাংলাদেশ এখন কী করবে—এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত সরকারের সঙ্গে আমরা আলোচনা করব। অনুরোধ করব যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাধা হতে পারে, এমন কোনো পদক্ষেপ যাতে তারা না নেয়।’

অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক কী, কীভাবে বসে

অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক হলো এমন একটি অতিরিক্ত আমদানি শুল্ক, যা কোনো দেশ তখন আরোপ করে। যখন ওই দেশের কর্তৃপক্ষের ধারণা হয় বিদেশি প্রতিষ্ঠান অস্বাভাবিক কম দামে পণ্য বিক্রি করে তাদের দেশের শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ভারতের নতুন উদ্যোগে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে শুল্কের কাঠামোয়। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের তদন্তে অন্তর্ভুক্ত কিছু প্রতিষ্ঠানের শুল্ক কমানো বা শূন্য করার সুপারিশ করা হলেও তালিকার বাইরে থাকা অনেক বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য তুলনামূলক বেশি শুল্ক বহাল রাখা হয়েছে। ফলে বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকেরা বেশি চাপে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় এ নিয়ে কিছু করছে না। ভারতের নতুন প্রজ্ঞাপন জারির আগেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু অভিজ্ঞতা বলছে, অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক ও কাউন্টারভেইলিং শুল্ক নিয়ে কাজ করতে ভারতসহ অন্য দেশগুলোর যেমন নির্দিষ্ট ডেস্ক আছে, বাংলাদেশের তা নেই। বাংলাদেশের এ সক্ষমতার ঘাটতিকে ভারত কাজে লাগাচ্ছে।

ভারত বাংলাদেশের পাট সুতা, হেসিয়ান কাপড় ও পাটের বস্তার অন্যতম বড় বাজার। নতুন শুল্ক কার্যকর হলে রপ্তানিকারকদের খরচ বাড়বে, কমবে ভারতীয় বাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা। অনেক প্রতিষ্ঠানকে বিকল্প বাজারের দিকে যেতে হবে। এর প্রভাব দেশের পাটকল, পাটচাষি, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও পড়তে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজেএসএ) সভাপতি তাপস প্রামাণিক প্রথম আলোকে বলেন, ‘পাটপণ্যে ভারতের অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আমাদের জন্য গলার ফাঁস হয়ে আছে। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে আমরা এখন ভারতীয় বাজারকে প্রায় হিসাবের বাইরেই রেখে পরিকল্পনা করছি। সরকার কূটনৈতিক ও আইনি উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে পারে।’

কারও শুল্ক কমছে, কারও বাড়ছে

প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ট্রেড রেমেডিজ (ডিজিটিআর) শুল্ক প্রত্যাহারের সুপারিশ করেনি। বরং বিদ্যমান ব্যবস্থা বহাল রেখে প্রতিষ্ঠানভেদে নতুন শুল্কহার নির্ধারণ করেছে। এতে কারও শুল্ক কমেছে, কারও বেড়েছে। তবে চারটি প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে শুল্ক শূন্য করার সুপারিশ করা হয়েছে।

২০১৭ সালে ভারত বাংলাদেশের ৫৫টি উৎপাদক ও রপ্তানিকারকের জন্য অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছিল। নতুন পর্যালোচনায় সেই তালিকার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তুলনামূলক বেশি শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে যেসব প্রতিষ্ঠান তদন্তে অন্তর্ভুক্ত হয়নি, তাদের জন্য ভারতের বাজারে প্রতিযোগিতা করা আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াহাব জুট মিলসের পাটসুতা বা টুইনের ওপর প্রতি টনে ৬৯ মার্কিন ডলার অ্যান্টিডাম্পিং শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু তালিকার বাইরে থাকা অন্য যেকোনো বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানের একই পণ্যের জন্য শুল্ক ধরা হয়েছে ৪৪৫ ডলার। অর্থাৎ তালিকার বাইরে থাকা উৎপাদকদের প্রায় সাড়ে ছয় গুণ বেশি শুল্ক দিতে হবে। একইভাবে হেসিয়ান কাপড়ের ক্ষেত্রেও তালিকার বাইরে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রতি টনে ৮৮ ডলার শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে।

তবে চারটি প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বস্তির খবর রয়েছে। জনতা জুট মিলস, ন্যাশনাল জুট ম্যানুফ্যাকচারিং করপোরেশন, আলহাজ জুট মিলস ও সাদাত জুট ইন্ডাস্ট্রিজের ক্ষেত্রে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক শূন্য করার সুপারিশ করা হয়েছে। এত দিন ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর যথাক্রমে প্রতি টনে ১৯ দশমিক শূন্য ৫, ২৪ দশমিক ১৪, ৩৫২ দশমিক ৯২ এবং ৩৫১ দশমিক ৭২ মার্কিন ডলার শুল্ক কার্যকর রয়েছে। চার প্রতিষ্ঠানের শুল্ক হার কমানোর খবরে অবশ্য কেউ কেউ ‘রহস্যজনক’ বলে মন্তব্য করছেন।

চূড়ান্ত প্রতিবেদনে ডিজিটিআর বলেছে, ২০১৭ সালে অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপের পরও ভারতীয় পাটশিল্প এখনো ডাম্পিংয়ের ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে। তাই শুল্ক প্রত্যাহারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।

ভারতের অভিযোগ, বাংলাদেশের আপত্তি

প্রতিবেদন অনুসারে ভারতের দাবি, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ থেকে পাট সুতা ও হেসিয়ান কাপড়ের রপ্তানিমূল্য কমেছে, কিন্তু কাঁচা পাটের দাম সে হারে কমেনি। ফলে কম দামের আমদানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে ভারতীয় পাটশিল্প ক্ষতির মুখে পড়ছে।

২০২০-২১ সময়কে ভিত্তি ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি পাটের হেসিয়ান কাপড়ের গড় রপ্তানিমূল্য ৭ শতাংশ এবং পাটসুতার মূল্য ১২ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাটপণ্যের রপ্তানি বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ভারতে ১ লাখ ১১ হাজার ৯১২ টন পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ৮১৫ টনে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কিছুটা কমে ১ লাখ ১৭ হাজার ৫২৩ টনে নামলেও তা আগের সময়ের তুলনায় বেশি।

অবশ্য বাংলাদেশ সরকার ও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য ভিন্ন। তাঁদের দাবি, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন ব্যয় ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার কারণে রপ্তানিমূল্যে পরিবর্তন এসেছে। এটিকে ডাম্পিং বলা ঠিক নয়। তবে এই ব্যাখ্যা গ্রহণ করেনি ভারতের ডিজিটিআর।

মধ্যবর্তী পর্যালোচনায় বাংলাদেশের ৩৮টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। তবে আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী রপ্তানির পরিমাণ বিবেচনায় ১০টি প্রতিষ্ঠানকে নমুনা হিসেবে বেছে নিয়ে ডিজিটিআর তাদের তথ্য বিস্তারিত যাচাই করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ওই বিশ্লেষণের ভিত্তিতেই নতুন শুল্কহারের সুপারিশ করা হয়েছে।

১০টি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে আশা জুট ইন্ডাস্ট্রিজ, এ এম জুট ইন্ডাস্ট্রিজ, নওহাটা জুট মিলস, রানু অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ, সুপার জুট মিলস, বোনানজা জুট কম্পোজিট, লাভলি জুট মিলস, নাটোর জুট মিলস, পোদ্দার অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ও সেলিম অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ। এসব প্রতিষ্ঠানের তথ্য বিশ্লেষণ করেই নতুন শুল্কের সুপারিশ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ১৫ কোটি ৮ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ১০ মাসে রপ্তানি করে ১১ কোটি ৩৬ লাখ ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে রপ্তানি করায় দোষের কিছু নেই। দেখতে হবে কেউ উৎপাদন খরচের নিচে দামে পণ্য বিক্রি করছে কি না। বিদ্যুৎ ও গ্যাস-সংকটের বাস্তবতায় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন খরচের কম দামে ভারতে পাটপণ্য রপ্তানি করছে—এমনটি বিশ্বাস করা কঠিন।

রহিমআফরোজের ব্যাটারি নিয়ে যখন অ্যান্টিডাম্পিং শুল্ক আরোপ করেছিল ভারত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) কাছে যাওয়ার পর আলোচনা পর্যায়ের ৬০ দিনের মধ্যেই তা তুলে নেয় দেশটি—এ ঘটনা স্মরণ করে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ভারত মনে করেছিল প্যানেলে গেলে তারা টিকবে না। ফলে তারা সরে এসেছিল। পাটপণ্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ একই ধরনের উদ্যোগ বিবেচনা করতে পারে।

Read full story at source