ছুটির দিনে ঘুরে আসুন পুরান ঢাকার এই ১০ ঐতিহাসিক স্থান থেকে
· Prothom Alo
ঢাকায় জন্ম, ঢাকায় বসবাস; কিন্তু ঢাকা দর্শন হয়নি এমন মানুষ কম নেই। আমার অষ্টাদশী কন্যাও তা–ই। কন্যার অনুরোধে তাই একদিন আমরা দিনব্যাপী পুরোনো ঢাকা ভ্রমণের একটা পরিকল্পনা করে ফেললাম। পরিকল্পনায় সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন আমাদের বন্ধু ও ঢাকার ঐতিহ্যবিষয়ক গবেষক হোসেইন জাকি। তিনি নিজেও সোৎসাহে আমাদের সঙ্গী হতে চাইলেন। আমরা সময় ও ভ্রমণসূচি লিখে, ছক করে, আটঘাট বেঁধে একদিন ভোরে রওনা দিলাম। আমাদের ভ্রমণ ঘণ্টা হবে ঠিক ১২ ঘণ্টা, মানে গোটা একদিন।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
বলধার আমাজন লিলিসকাল ৭টা ৩০ মিনিট: বলধা গার্ডেন
সকাল সাতটার ঢাকায় ফাঁকা রাস্তা দিয়ে ওয়ারী পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে না। জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী ঢাকার ওয়ারী এলাকায় বলধা গার্ডেন তৈরিতে হাত দেন ১৯০৬ সালে। বাগানের কাজ সম্পূর্ণ হয় ১৯৩৬ সালে। দীর্ঘ ২৮ বছরে বিশ্বের ৫২টি দেশ থেকে দুর্লভ সব গাছের চারা সংগ্রহ করেন তিনি। ৮০০ প্রজাতির প্রায় ১৮ হাজার গাছ, লতাগুল্ম রয়েছে এখানে। তিনি কেবল শৌখিন উদ্যানবিদই ছিলেন না, ছিলেন লেখক, নাট্যকার ও সাংস্কৃতিক অনুরাগী। প্রায়ই এই বাগানবাড়িতে গানের আসর বসত, হতো স্বরচিত নাটকের মঞ্চায়ন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ বাড়িতে এসে উদ্যান দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন। জানা যায়, অনেকগুলো বৃক্ষ ও ফুলের নাম তাঁরই দেওয়া। বাগানের দায়িত্ব নিয়েছিলেন বিখ্যাত উদ্যানবিদ অমৃতলাল আচার্য। অনেক ফুলের নাম অমৃতলালও রেখেছেন।
৩ দশমিক ৩৮ একরের বলধা গার্ডেনের দুটি অংশ মুখোমুখি রাস্তার এপার–ওপার। সিবিলি অংশে ৩০ টাকার টিকিট করে প্রাতর্ভ্রমণকারীরা প্রবেশ করতে পারবেন। ঘন সবুজ গাছপালার মধ্য দিয়ে হাঁটুন, প্রাণভরে শ্বাস নিন। একটা বুনো গন্ধ আর প্রকৃতির খাঁটি অনুরণন টের পাবেন। গোটা বাগান চক্কর দিয়ে ক্লান্ত হয়ে এসে বসতে পারেন বিখ্যাত শঙ্খনাদ পুকুরপাড়ে। মার্বেল পাথরে বাঁধানো পুকুরপাড়ে বসে মাছদের খাবার দিতে পারেন। দুই টুকরা রুটি ছিঁড়ে দিতেই পায়ের কাছে চলে আসবে রং–বেরঙের শত শত মাছ, খাবারের স্বাদ নিতে ছোট ছোট কচ্ছপ মার্বেল বেয়ে উঠে আসতে থাকবে। ভিড় করবে বলধার কুকুররা। এইখানে বসে বিপরীত দিকে তাকালে যে হলদে দালান চোখে পড়ে, সেটাই জয় হাউজ। কথিত আছে, এই বাগানবাড়ির জয় হাউজে বসে ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতাটি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, তবে এ নিয়ে মতভেদ আছে। বিখ্যাত ক্যামেলিয়াগাছও দেখতে পাবেন এই অংশে। হাঁটতে হাঁটতে একটি ভাঙা সূর্যঘড়ি চোখে পড়বে।
রাস্তার বিপরীতে অবস্থিত সাইকি অংশে প্রবেশ করতে অনুমতি লাগে। অনুমতি নিয়েই প্রবেশ করলাম। প্রবেশের পরই বিশাল বিশাল আমাজন লিলি। নানা রঙের শাপলা ফুটে রয়েছে। ক্যাকটাস ঘরটি অপূর্ব। এখানে আছে হিমালয় অঞ্চলের বিখ্যাত ভূর্জপত্র। অতীতে এই গাছের বাকল শুকিয়ে পালিশ করে মন্ত্র লেখা হতো। সোনালি রঙের কনকসূধা ফুল থোকা থোকা ফুটে আছে। উল্টো করে ঝুলতে থাকা লাল ও হলুদ উলট চণ্ডাল। সীতা অশোক একেবারে টকটকে লাল, কেন ওর নাম সীতা কে জানে? কাকতুরি নামের আশ্চর্য সুন্দর ফুলকেই বোধ হয় বনকাঞ্চন বলে। ইট–কংক্রিটের এই শহরে এই অবর্ণনীয় সবুজ আর রঙের সমাহারে দিনের শুরুটাই রঙিন হয়ে উঠবে।
ঢাকাবাসীর জন্য খালি পায়ে হাঁটার ব্যবস্থা করল বোটানিক্যাল গার্ডেনসকাল ৮টা: ছানা, মাঠা, চা ও কলম্বো সাহেবের সমাধি
বলধা থেকে বেরিয়ে হেঁটে বা একটা রিকশা নিয়ে চলে আসুন পাশেই খ্রিষ্টান কবরস্থানের সামনে। তাড়াহুড়ায় বেরোতে গিয়ে সকালে চা খাওয়া হয়নি। টিপু সুলতান রোডের বিখ্যাত মাদানী চায়ের বাড়িতে এসে দেখি এই সাতসকালে ভিড় লেগে গেছে। প্রায় ২০ রকমের চা বিক্রি হয় এখানে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে মাটির খুড়িতে অপূর্ব মালাই–চা খেলাম। এখানে আসার পথে নারিন্দা পুলিশ ফাঁড়ির সামনে ছানা, মাঠার স্বাদও নিতে পারেন।
চায়ের বাড়ির উল্টো দিকেই খ্রিষ্টান কবরস্থান। এখানে আছে কলম্বো সাহেবের সমাধি। সমাধিটি মোগল স্থাপত্যরীতিতে বর্গাকারভাবে তৈরি করা হয়েছে। চারদিকের প্রতিটি দেয়ালে চারটি করে প্রবেশপথ, সামনের অংশে নকশা অঙ্কিত পিলার। অষ্টভুজাকৃতির একটি পিলারে একটি পরীর ছবি আঁকা। সমাধি ক্ষেত্রটিতে বেশ কয়েকটি শিলালিপি দেখতে পাওয়া যায়। এই কলম্বো সাহেব কে ছিলেন, তা নিয়ে রহস্য আছে।
কবরস্থান থেকে বেরিয়ে বাঁয়ে কয়েক পা হাঁটলে পেয়ে যাবেন বিনত বিবির মসজিদ। মসজিদটির গায়ে উৎকীর্ণ শিলালিপি অনুসারে ৮৬১ হিজরি সন, অর্থাৎ ১৪৫৭ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান নাসিরুদ্দিন মাহমুদ শাহর শাসনামলে তাঁর কন্যা মুসাম্মাত বখত বিনত বিবি এটি নির্মাণ করান। ঢাকার প্রাচীনতম স্থাপনার একটি এটি।
৯টা-৯টা ৪৫ মিনিট: জয়কালী মন্দির ও প্রাতরাশ
ওয়ারী ও ঠাটারিবাজারের মধ্যবর্তী জায়গায় জয়কালী মন্দির স্ট্রিটে প্রাচীন জয়কালী মন্দির। ১৫৯৩ সালে মন্দিরটি তৈরি করেন তুলসীনারায়ণ ঘোষ ও নবনারায়ণ ঘোষ। সকালে পূজার্চনা শুরু হয়েছে মন্দিরে। খানিকটা দেখে নিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটলেই পেয়ে যাবেন হোটেল সুপার স্টার। দোতলায় গিজগিজে ভিড়। উদ্দেশ্য ছিল এখানকার বিখ্যাত নেহারি দিয়ে পরোটা খাওয়া, কিন্তু ব্যস্ত বেয়ারা জানাল, সাতসকালেই নেহারি ‘ফিনিশ’। অগত্যা সবজি, ডাল, মাটন, সুজির হালুয়া দিয়ে প্রাতরাশ করা গেল। আরেক প্রস্থ চা তো লাগবেই।
সকাল ১০টা ৩০ মিনিট-বেলা ১১টা ৩০ মিনিট: রোজ গার্ডেন
এবার গন্তব্য টিকাটুলির কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেন। খোলে সকাল সাড়ে ১০টায়। টিকিট করে প্রবেশ করতে হবে। ১৯৩০ সালের দিকে ধনাঢ্য ব্যবসায়ী হৃষিকেশ দাস প্রাসাদটি তৈরি শুরু করেন। পরে তিনি দেউলিয়া হয়ে গেলে ১৯৩৭ সালে খানবাহাদুর আবদুর রশীদ এটি কিনে নেন, নাম দেন রশীদ মঞ্জিল। ২০১৮ সালে সরকার এটি কিনে নেয় এবং বর্তমানে এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।
করিন্থীয় ও গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর সাত হাজার বর্গফুটের ধবধবে সাদা দোতলা প্রাসাদ। রয়েছে মার্বেল পাথরের মেঝে, ছাদে ইউরোপীয় শৈলীর কারুকাজ ও খিলান আকৃতির দরজা। দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতি, প্রশস্ত সিঁড়ি ও জানালায় খোদাই করা কাজ, নাচঘর, সবুজ বেলজিয়ান কাচ। বিশাল গোলাপ ফুলের বাগান আর তার মধ্যে শ্বেতপাথরের কয়েকটি ভাস্কর্য, কৃত্রিম ফোয়ারা, শানবাঁধানো পুকুর—সব মিলিয়ে ঋষিকেশ দাস যে ইউরোপিয়ান রাজপ্রাসাদের আদলে শখ পূরণ করতে চেয়েছিলেন, তা স্পষ্ট বোঝা যায়। কথিত আছে, বলধা গার্ডেনের জমিদার নরেন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর এক আয়োজনে অপমানিত হয়ে তিনি জিদ করেছিলেন বলধার চেয়েও সুন্দর প্রাসাদ গড়ে দেখিয়ে দেবেন। গোলাপ ভালোবাসতেন, তাই এ বাড়ির ২২ একর জুড়ে লাগিয়েছিলেন নানা জাতের গোলাপ। আর গোলাপের নামে নাম রেখেছিলেন—রোজ গার্ডেন।
বিউটি বোর্ডিংয়ে লেখকবেলা ১১টা ৩০ মিনিট-দুপুর ১২টা: বিউটি বোর্ডিং
রোজ গার্ডেন থেকে বেরিয়ে আবার রিকশা নিলাম। গন্তব্য প্রিয় বিউটি বোর্ডিং। বিউটি বোর্ডিং নিয়ে আমার একটা বিজ্ঞান কল্পকাহিনি আছে—বিউটি বোর্ডিং রহস্য। উপন্যাসটি লেখার সময় এই বিউটি বোর্ডিং নিয়ে কত কিছু যে পড়েছি। শ্রীশ দাস লেনের এই ঐতিহাসিক বাড়িটি ছিল জমিদার সুধীরচন্দ্র দাসের। ১৯৪৯ সালে দুই ভাই প্রহ্লাদচন্দ্র সাহা ও নলিনীমোহন সাহা এই বাড়ি ভাড়া নিয়ে গড়ে তোলেন বিউটি বোর্ডিং। বাড়িটি ১১ কাঠা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
জন্মলগ্ন থেকেই এখানে আড্ডা দিতেন প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক, চিত্রপরিচালক, নৃত্যশিল্পী, গায়ক, অভিনেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। প্রিয় কবি সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, শিল্পী দেবদাস চক্রবর্তী, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান, খান আতা—আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের পদধূলিতে সিক্ত এই বিউটি বোর্ডিং। ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বিউটি বোর্ডিংয়ে ঢুকে হত্যাযজ্ঞ চালায়। প্রহ্লাদ সাহাসহ ১৭ জন মারা যান।
যেভাবে কম খরচে এশিয়ার শতাধিক শহরে ঘুরেছিআর্মেনিয়ান চার্চদুপুর ১২টা-বেলা ১টা ৩০ মিনিট: নর্থব্রুক হল, ঢাকা কেন্দ্র ও বুলবুল ললিতকলা একাডেমি
ভারতের গভর্নর জেনারেল জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুকের ঢাকা সফরকে উপলক্ষ করে ১৮৭৪ সালে বুড়িগঙ্গার তীরে ওয়াইজঘাটে নির্মাণ করা হয় একটি টাউন হল, দৃষ্টিনন্দন এই লাল ভবনটিই নর্থব্রুক হল। এখানে একটি নাট্যালয় রয়েছে। ১৯২৬ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটি ও পিপলস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে এখানে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে সংবর্ধনা জানানো হয়।
ওয়াইজঘাটে আরেকটি ভবন ওয়াইজ হাউজ, এখানে ছিল বুলবুল ললিতকলা একাডেমি। ১৯৫৫ সালে আফরোজা বুলবুল এই সংস্কৃতিকেন্দ্র চালু করেন। প্রায় ভেঙে পড়া এই ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে সরকার। ভবনের সামনে প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী বুলবুল চৌধুরীর ভাস্কর্য ধুলোয় ধূসরিত। দেখবার কেউ নেই।
ফরাশগঞ্জে মাওলা বখশ সরদার মেমোরিয়াল ট্রাস্টের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে ঢাকা কেন্দ্র। দোতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় সুপরিসর পাঠাগারে ঢাকাবিষয়ক দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ, পত্রপত্রিকার সংগ্রহটি দেখার মতো। লাগোয়া ছাদটিতে নানা সাংস্কৃতিক আয়োজন ও আড্ডা হয়। প্রদর্শনী কক্ষে প্রাচীন তৈজসপত্র, আসবাব, অলংকার ইত্যাদি। গবেষকদের জন্য একটি লোভনীয় জায়গা। সাধারণ পাঠক বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং গবেষকেরা সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত পাঠাগার ও কেন্দ্রে সময় কাটাতে পারেন। পারিবারিক উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতিকেন্দ্র ও পাঠাগার মন ভরানোর মতো।
বেলা ১টা ৩০ মিনিট-২টা: শাঁখারীবাজার
শাঁখারীবাজারে শাঁখের কাজ দেখতে রিকশা ছেড়ে দিয়ে অলিগলি দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। দুই ধারে চুড়ি, বালা, টিপ আর বাদ্যযন্ত্রের দোকান। জলধি শঙ্খভান্ডার থেকে দুই হাত ভরে পলার চুড়ি কেনা হলো।
উত্তমদার পাঠানো একজন বাড়ির ভেতর পানে ডেকে নিয়ে দেখালেন কীভাবে শঙ্খ থেকে চুড়ি তৈরি হচ্ছে। সকালবেলা ব্যস্তসমস্ত কর্মমুখর গলি। দুষ্টু এক বানর আমাদের দেখে গায়ে কলা ছুঁড়ে মারল!
হাতির মল থেকে কাগজ, দেখে বেশ বিস্মিতই হলামলালবাগ কেল্লাবেলা ২টা ১৫ মিনিট-বিকেল ৩টা ৩০ মিনিট: মধ্যাহ্নভোজ ও লালবাগ কেল্লা
লালবাগ কেল্লার বিপরীত রাস্তায় ও কাছাকাছি রয়েছে বেশ কয়েকটি খাবার দোকান ও রেস্তোরাঁ। ঐতিহ্যবাহী রয়েল হোটেল, জান্নাত, আরসালান ছাড়া কিছু আধুনিক খাবার দোকানও মিলবে। এর কোনো একটায় মধ্যাহ্নভোজ সেরে নিয়ে ঢুকে পড়বেন লালবাগ কেল্লায়। মোগল স্থাপত্যের এই নিদর্শন কেল্লা আওরঙ্গবাদ নামেও পরিচিত। এই কেল্লা বা দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু হয় সম্রাট আওরাঙ্গজেবের রাজত্বকালে, ১৬৭৮ সালে, পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদ আজম শাহ যখন বাংলার সুবেদার।
এরপর ১৬৮০ সালে পরবর্তী সুবেদার শায়েস্তা খাঁ আবার এটির নির্মাণকাজ শুরু করেন, কিন্তু সে সময় তাঁর কন্যা পরী বিবির অকালমৃত্যু হলে কেল্লাটিকে অপয়া ধারণা করে নির্মাণকাজ আর সমাপ্ত করা হয়নি। পরী বিবির সমাধিও এখানেই অবস্থিত। লালবাগ কেল্লার প্রধান ভবনটিতে শায়েস্তা খাঁ বাস করতেন এবং এটাই ছিল তার আদালত। এ ছাড়া আছে ১৬৭৮ সালে নির্মিত তিন গম্বুজওয়ালা শাহী মসজিদ। দুর্গ প্রাচীর, জলাধার, সুড়ঙ্গ, ফোয়ারাসহ গোটা লালবাগ কেল্লা বিকেলের আলোয় মনোরম সুন্দর।
বেলা ৩টা ৪৫ মিনিট-বিকেল ৪টা ১৫ মিনিট: আর্মেনিয়ান চার্চ ও কবরস্থান
কেল্লা থেকে বেরিয়ে একটা রিকশা নিয়ে চলে আসুন আরমানিটোলা। সতেরো শ শতকের আর্মেনীয় বণিকেরা ব্যবসার উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসতে শুরু করেন। ঢাকার যে জায়গাটিতে তাঁরা বসত গাড়েন, সেটিই আজকের আরমানিটোলা। ১৭৮১ সালে আরমানিয়ান স্ট্রিটে এই গির্জার স্থাপনা শুরু হয়।
গির্জাটি ৭৫০ ফুট দীর্ঘ। একেবারে শীর্ষে শঙ্খনীল মিনার। পাশেই আর্মেনীয় কবরস্থান। শেষ বিকেলের আলোয় শত শত কবরে উৎকীর্ণ এপিটাফগুলো মন দিয়ে পড়ছিলাম। ক্যাচিক থমাসের সমাধির ওপর একটি সুন্দর মেরি মূর্তি। আর্মেনিয়ার এই গির্জা ও কবরস্থানটিতে বেশ অনেকটা সময় স্বচ্ছন্দে কাটানো যায়।
শ্রীলঙ্কায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন অভিনেত্রী সারিকা, দেখুন ৯টি ছবিরোজ গার্ডেনবিকেল ৪টা ৩০ মিনিট-৫টা ৩০ মিনিট: আহসান মঞ্জিল
ভ্রমণের এই অংশটুকু বাস্তবে আমাদের বাদ দিতে হয়েছিল, কারণ বৃহস্পতিবার আহসান মঞ্জিল বন্ধ থাকে। তবে পুরোনো ঢাকা দর্শন অবশ্যই আহসান মঞ্জিল দিয়েই শেষ করা উচিত। এর প্রতিষ্ঠাতা নওয়াব আবদুল গণি। পুত্র খাজা আহসানউল্লাহর নামে নাম। বুড়িগঙ্গার তীরে ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে আহসান মঞ্জিলের নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ১৮৭২ খ্রিষ্টাব্দে সমাপ্ত হয়। একসময় এই মঞ্জিলের গম্বুজের চূড়াটি ছিল ঢাকা শহরের সর্বোচ্চ। এখানেই ঢাকার প্রথম বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলেছিল।
মূল ভবনের বাইরে ত্রি-তোরণবিশিষ্ট প্রবেশদ্বারও দেখতে ভারী সুন্দর। আহসান মঞ্জিলের অভ্যন্তরে দুটি অংশ আছে। পূর্ব অংশে আছে বৈঠকখানা ও পাঠাগার। পশ্চিম অংশে নাচঘর ও অন্যান্য আবাসিক কক্ষ। নিচতলার দরবারগৃহ ও ভোজন কক্ষ। জাদুঘরের সংগ্রহশালায় রয়েছে ৪ হাজারের বেশি নিদর্শন। ৩২টি কক্ষের মধ্যে ৯টি নবাবি আমলের মতো সাজানো। শনি থেকে বুধবার সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকে আহসান মঞ্জিল।
ঢাকা কেন্দ্রের দোতলা ভবনের পাঠাগারে লেখকসন্ধ্যা ৬টা-৭টা: ইমরান হেরিটেজ
বুড়িগঙ্গার বুকে সূর্য অস্ত যেতে শুরু করেছে। এবার বাড়ি ফেরার পালা। তবে পুরোনো ঢাকা ভ্রমণ শেষে যদি ঐতিহ্যবাহী একটি নৈশভোজের স্বাদ নিতে চান, তবে সন্ধ্যা নামার পর বেচারাম দেউড়ির ইমরান হেরিটেজে একটা বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন। আর্মেনীয় স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত দেড় শ বছরের বেশি বয়সী বাড়িটি পাড়ার লোকের কাছে ‘সাহেব বাড়ি’। ঐতিহ্য দর্শনের সুযোগ আর পারিবারিক আবহে রকমারি ঢাকাই খাবারের স্বাদ দিতে বাড়ির একাংশে চালু হয়েছে ব্যতিক্রমী এক রেস্তোরাঁ। নাম ‘ইমরান’স হেরিটেজ হোম’।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি ছয় বিঘা জমির ওপর বাড়িটি তৈরি করেছিলেন ঢাকা ও সোনারগাঁয়ের তৎকালীন জমিদার মৌলভি আবুল খায়রাত মোহাম্মদ। এই বাড়িতে আতিথেয়তা নিয়েছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পী এস এম সুলতানসহ অবিভক্ত ভারত ও পাকিস্তানের প্রথম সারির রাজনৈতিক নেতারা। পঞ্চাশের দশকে যুক্তফ্রন্টের বেশ কয়েকটি বৈঠকও হয় এই বাড়িতে। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হলে এই বাড়িতেই তাঁকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেই দুর্লভ ছবি, নজরুলের শোবার খাটসহ নানা নিদর্শন ঘুরিয়ে দেখালেন আবুল খায়রাত সাহেবের পুত্র নাবালক মিয়ার নাতি ও বর্তমান বংশধর ইমরান মিয়া। ইমরান ভাইয়ের এই আতিথেয়তা সত্যি ভোলার মতো নয়।
ঈদের ছুটিতে ঢাকায় থাকলে আপনার সেরা গন্তব্য হতে পারে উদয়পুর