সবুজ জ্বালানির আড়ালের প্রশ্নগুলো সামনে আনা কেন জরুরি

· Prothom Alo

অন্য রকম এক শিহরণ নিয়ে আমরা দুই বন্ধু শিনকানসেন বুলেট ট্রেনে চেপে জাপানের টোকিও শহরে এডিবি-জেএসপি স্কলারদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়েছিলাম। সেটা ২০১৫ সালের কথা। বাংলাদেশ থেকে কয়েকজন বিসিএস কর্মকর্তাও ওই সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন। সম্মেলনের একটি সেশনে ব্যাটারিচালিত যানবাহনের পরিবেশবান্ধব ভবিষ্যৎ নিয়ে অত্যন্ত আশাবাদী উপস্থাপনা হচ্ছিল। সেখানে করতালির মধ্যেই আমরা একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলেছিলাম—এই বিপুল পরিমাণ ব্যবহৃত ব্যাটারির বর্জ্য কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হবে? কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা সেই প্রশ্নের গুরুত্বই তুলে ধরেছিল।

এর বছর কয়েক পর অস্ট্রেলিয়ায় পিএইচডি করতে গিয়েও একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলাম। সিডনিতে পরিবেশ অর্থনীতি ও সার্কুলার অর্থনীতি এবং টেকসইকরণ বিষয়ে আয়োজিত এক সম্মেলনে শীতের উষ্ণ দুপুরে খাবারের পর জমজমাট সেশন চলছিল।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

গবেষকদের সেই প্রাণবন্ত একাডেমিক আড্ডার সেশনে দুজন অধ্যাপক বেশ উৎসাহ নিয়ে কয়েকটি উন্নত দেশের সৌরশক্তি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির সাফল্যের গল্প করছিলেন। দুপুরের খাবার শেষে কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে আমরাও সেই আলোচনায় যোগ দিলাম। প্রবন্ধ উপস্থাপনা শেষে প্রশ্নোত্তর পর্বে আমরা সেই পুরোনো প্রশ্নটিই আবার করলাম, ‘আপনারা যে সৌরশক্তির বিপ্লবের কথা বলছেন, এই সোলার প্যানেল আর ব্যাটারির ভবিষ্যৎ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে কি সত্যিই আমরা প্রস্তুত? এগুলো তো এক সময় বিশাল পরিমাণ রাসায়নিক আবর্জনায় পরিণত হবে।’

কোটি কোটি সৌরপ্যানেল আর ব্যাটারি বর্জ্য কীভাবে আমরা সংগ্রহ করব কিংবা কীভাবে পুনর্ব্যবহার করব, তা নিয়ে এখনই আমাদের নিজস্ব গবেষণার বড় অভাব রয়েছে।

তাঁরা কিছুক্ষণ চুপ থেকে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা নিয়ে অনেক তাত্ত্বিক পরিকল্পনার কথা শোনালেন। আমরা তখন তাঁদের কাছে অস্ট্রেলিয়ার হান্টার ভ্যালির উদাহরণ তুলে ধরেছিলাম। একসময় যে অঞ্চলটি কেবল কয়লাখনির জন্য পরিচিত ছিল, সেখানকার মানুষ ধীরে ধীরে কয়লানির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে এসে স্থানীয় কারুশিল্প, ঐতিহ্যভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা আর সংস্কৃতিনির্ভর অর্থনীতির দিকে ঝুঁকেছেন। এতে শুধু কার্বন নিঃসরণই কমেনি, বরং স্থানীয় অর্থনীতি নতুন এক প্রাণ পেয়েছে।

পৃথিবীর বহু দেশে আজ লোকশিল্প, মৃৎশিল্প, কাঠের কাজ কিংবা স্থানীয় কৃষিভিত্তিক জীবনযাত্রাকেই ‘ডিকার্বোনাইজেশন’-এর বড় অস্ত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, টেকসই ভবিষ্যৎ শুধু আমদানিকৃত উচ্চ প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি আমাদের আদি সংস্কৃতি, প্রাত্যহিক জীবনধারা আর শিকড়ের জ্ঞানের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।

রাঙামাটির বিলাইছড়ির ​পাংখোপাড়ায় স্থাপিত সৌরবিদ্যুতের প্যানেল। এই সৌর প্যানেলের মাধ্যমে চলছে কম্পিউটার, টেলিভিশন ও বৈদ্যুতিক পাখা

বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশেও এখন নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে বড় বড় কর্মযজ্ঞ চলছে। শহরে বাড়ির ছাদে সোলার প্যানেল বসছে, গ্রামে সোলার হোম সিস্টেম জনপ্রিয় হয়েছে, ইলেকট্রিক যানবাহনের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও অনেক কথা হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকা আমাদের মতো একটি দেশের জন্য জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প খোঁজা অবশ্যই সময়ের দাবি। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কি এর দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত মূল্য দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছি?

একটি সৌরপ্যানেলের গড় আয়ু সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর। এরপর সেটি প্রায় নিছক আবর্জনা। এই প্যানেলগুলোতে কাচ ও অ্যালুমিনিয়ামের পাশাপাশি ক্যাডমিয়াম, সিসা বা সিলিকনের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর উপাদান থাকে। উন্নত বিশ্বে এই বর্জ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশের মতো এমন ঘনবসতিপূর্ণ দেশে এটি আরও বড় সংকট হয়ে দেখা দিতে পারে, যেখানে এখনো সাধারণ প্লাস্টিক বর্জ্য বা ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনাই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। সেখানে কোটি কোটি সৌরপ্যানেল আর ব্যাটারি বর্জ্য কীভাবে আমরা সংগ্রহ করব কিংবা কীভাবে পুনর্ব্যবহার করব, তা নিয়ে এখনই আমাদের নিজস্ব গবেষণার বড় অভাব রয়েছে।

ঢাকার পল্টন এলাকায় প্রধান সড়কে বড় গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে ব্যাটারিচালিত রিকশা

আমাদের দেশে এই সংকটের সবচেয়ে বাস্তব উদাহরণ হলো ব্যাটারিচালিত রিকশা খাত। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) এক প্রতিবেদনে (২০২০) বলা হয়, বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ ই-রিকশা থেকে বছরে আনুমানিক ৯০ হাজার মেট্রিক টন ব্যবহৃত লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি বর্জ্য উৎপন্ন হয়। ব্যাটারিগুলোর স্বল্প আয়ু এবং ব্যাপক ব্যবহার দেশের লিড–দূষণ ও অনিয়ন্ত্রিত পুনর্ব্যবহার ব্যবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির মোট বর্জ্যের ৭৭ শতাংশ উৎপন্ন হয় ই–রিকশার কারণে।

গত পাঁচ–ছয় বছরে এর পরিমাণ নিশ্চয়ই বেড়েছে। এই বর্জ্যের বড় অংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে, অবৈধ ও অনিরাপদ পদ্ধতিতে পুনর্ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে সিসা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং অ্যাসিড মাটি ও পানিতে মিশে গিয়ে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে—বিশেষ করে শিশুদের জন্য এটি অত্যন্ত ক্ষতিকর।

প্রযুক্তি আমদানিই শেষ কথা নয়

আমরা যদি সত্যিই টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটতে চাই, তবে শুধু বিদেশ থেকে প্রযুক্তি আমদানি করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না; এর আদ্যোপান্ত নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব ঐতিহ্যবাহী নির্মাণসামগ্রীর দিকেও আমাদের নজর দেওয়া প্রয়োজন। যেমন বাসাবাড়ির ছাদে মাটির তৈরি টাইলস ব্যবহার করলে তা প্রাকৃতিকভাবেই তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে, যা বিদ্যুতের চাহিদা বা এসির ব্যবহার কমিয়ে দেবে। তবে সেখানেও পরিকল্পনার ছোঁয়া থাকতে হবে, যাতে কৃষিজমির মাটি নষ্ট না হয়। আবার বড় বড় সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য যে বিপুল পরিমাণ জমি প্রয়োজন হয়, তা যেন আমাদের সীমিত কৃষিজমি বা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য হুমকি না হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্য ভাসমান সোলার প্যানেল বা শিল্পাঞ্চলের ছাদ ব্যবহারের মতো সৃজনশীল চিন্তা জরুরি।

সিঙ্গাপুরে সাগরে বসানো হয়েছে সৌরপ্যানেল

প্রয়োজন সুস্পষ্ট নীতিমালা

এই প্রেক্ষাপটে আমাদের একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা জরুরি হয়ে পড়েছে। যেমন প্রথমত, ব্যবহৃত ব্যাটারির জন্য ‘টেক-ব্যাক’ নীতি বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে আমদানিকারক বা উৎপাদক প্রতিষ্ঠানগুলোই বর্জ্য সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের দায়িত্ব নেয়।

দ্বিতীয়ত, অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ রিসাইক্লিং খাতকে নিয়ন্ত্রণে এনে আধুনিক, পরিবেশসম্মত রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে।

তৃতীয়ত, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ব্যাটারি রিকশা খাতকে অবিলম্বে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। অনিয়ন্ত্রিত লিড-অ্যাসিড ব্যাটারিনির্ভর এই ব্যবস্থা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এর বদলে পরিকল্পিত গণপরিবহন জোরদার করলে ব্যাটারির ব্যবহার ও দূষণ—দুটোই দ্রুত কমানো সম্ভব।

চতুর্থত, ইলেকট্রিক যানবাহনের প্রসারের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এখনই লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবস্থাপনার জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন।

সবশেষে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ব্যাটারি ও ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সেসবের টেকনো-ইকোনমিক ও টেকনো-সোশ্যাল ইস্যু নিয়ে প্রকৌশলী ও সামাজিক উন্নয়ন ও অর্থনীতিবিষয়ক গবেষণা বাড়াতে হবে, যাতে দেশীয় প্রেক্ষাপটে কার্যকর সমাধান তৈরি করা যায়।

সবুজ জ্বালানি নিঃসন্দেহে আমাদের ভবিষ্যৎ। কিন্তু সেই ভবিষ্যৎ টেকসই হবে তখনই, যখন আমরা প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়ও সমান গুরুত্ব দিয়ে গ্রহণ করব। তা না হলে আজ যে প্রযুক্তিকে সমাধান ভাবা হচ্ছে, আগামীকাল তা সংকটে পরিণত হতে পারে।


লেখক:

* আব্দুল্লাহ আল মামুন: অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ([email protected])

* রিপন কুমার মন্ডল: অধ্যাপক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ([email protected])

Read full story at source