দুই রোগীর মারামারিতে এক রোগীর মৃত্যু, অভিযোগ হাসপাতালের গাফিলতি

· Prothom Alo

পাবনার মানসিক হাসপাতালে ২৬ বছর বয়সী তরুণ ইনজামুল হককে ভর্তি করা হয়েছিল ২ জুন। সেদিন দিবাগত রাত সাড়ে তিনটার দিকে হাসপাতালের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে (অ্যাডমিশন) তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ওই ওয়ার্ডে একই দিন ভর্তি হওয়া নাজমুল ইসলামের সঙ্গে মারামারি করার একপর্যায়ে দেয়ালে আঘাত পান ইনজামুল। সেই আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

Visit casino-promo.biz for more information.

ইনজামুলের বড় ভাই মো. ইজাজুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘৩ জুন সকাল ১০টার দিকে খবর পাই ভাই মারা গেছে। দুপুরের দিকে হাসপাতালে পৌঁছে দেখি তখনো ভাইয়ের লাশ যেখানে মারা গেছে সেখানেই ফেলে রাখা হয়েছে। আমার এক স্বজন তখন ভিডিও করে। ভাই খালি গায়ে বাথরুমের দেয়ালের কাছে মেঝেতে পড়ে আছে। মাথার নিচে রক্ত। নাকে–মুখেও রক্ত। অভিযুক্ত যিনি তাঁকে লাল কাপড় দিয়ে হাত–পা বেঁধে উল্টো করে ফেলে রাখা হয়েছে।’

দুই মানসিক রোগীর মারামারির সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ইজাজুল। তিনি বলেন, ‘যিনি আঘাত করে মেরেছেন বলা হচ্ছে, তাঁর বিরুদ্ধে আমাদের কোনো অভিযোগ নেই, তিনিও তো আমার ভাইয়ের মতোই মানসিক রোগী। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সচেতন থাকলে, সেখানে যাঁরা দায়িত্ব পালন করছিলেন তাঁরা দায়িত্বে অবহেলা না করলে এভাবে আমার ভাইকে মরতে হতো না।’

ভাইয়ের এমন মৃত্যুর ঘটনায় ইজাজুল হক বাদী হয়ে পাবনা সদর থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের বাড়ি ঝিনাইদহে। এর আগেও তিনবার তাঁর ভাইকে এ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। কিছুদিন চিকিৎসার পর কয়েক দিন ভালো থাকতেন, আবার সমস্যা দেখা দিত। এবার ভর্তির এক দিনের মাথায় ভাইয়ের এভাবে মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না তিনি।

যাঁর বিরুদ্ধে এই হত্যার অভিযোগ আনা হচ্ছে, ভর্তির দিন তাঁর পায়ে শিকল বাঁধা দেখেছিলেন বলে উল্লেখ করেন ইজাজুল। তিনি বলেন, এমন একজন রোগীর সঙ্গে অন্যদের রাখার ফলেই এ ঘটনা ঘটেছে। তাঁকে আলাদা ওয়ার্ডে রাখা বা নজরদারির আওতায় রাখা হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।

সরেজমিনে পাবনার মানসিক হাসপাতাল: ‘অমানবিকতা’র নানা গল্প জমা যেখানে

অন্যদিকে নাজমুল ইসলামের চাচা সেনাবাহিনীতে কর্মরত রকিবুর হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘নাজমুল এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। তবে কোন প্রমাণের ভিত্তিতে এটা বলা হচ্ছে, তা জানি না। এখন তাঁর সঙ্গে পরিবারকেও দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না।’

রকিবুর হোসেন বলেন, ‘এই ঘটনার পর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিয়ে প্রথমে নাজমুলকে ছেড়ে দেয়। নাজমুলের মা–বাবা ছেলেকে নিয়ে বাড়ি যাওয়ার জন্য হাসপাতাল থেকে বের হলে তখন আবার আটকে দেওয়া হয়। তখন বলা হয়, নাজমুলের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাকে ছাড়া যাবে না।’ ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমার ভাতিজার এই অবস্থায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রথমে কীভাবে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়ি পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছিল?’

সিরাজগঞ্জের নাজমুল পাঁচ বছর ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছেন। এ হাসপাতালে চিকিৎসক দেখিয়ে ওষুধ খাচ্ছিলেন এবং এবারই প্রথম তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল বলে জানান রকিবুর।

অভিযুক্তকে লাল কাপড় দিয়ে হাত–পা বেঁধে উল্টো করে ফেলে রাখা হয়। ৩ জুন

হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বলছে, পাবনার তৎকালীন সিভিল সার্জন মোহাম্মদ হোসেন গাংগুলী ছিলেন হাসপাতালটির প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৫৭ সালে প্রথমে কার্যক্রম শুরু হয়েছিল পাবনা শহরের শীতলাই জমিদারবাড়িতে। পরে সদর উপজেলার হিমাইতপুর ইউনিয়নের হিমাইতপুর গ্রামে অধিগ্রহণ করা হয় ১১১ দশমিক ২৫ একর জমি। এ জমির বেশির ভাগই ছিল সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় গুরু শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের। ৬০ শয্যা থেকে শুরু করা হাসপাতালটিকে দফায় দফায় বাড়িয়ে ১৯৯৬ সালে ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। তবে জনবলকাঠামোতে কোনো পরিবর্তন হয়নি, তাই জনবলসংকট প্রকট। হাসপাতালটিতে রোগীর সঙ্গে অভিভাবকেরা থাকতে পারেন না। ভর্তির পর দেখা করারও সুযোগ নেই। রোগীদের ‘আক্রমণ’ ঠেকানো থেকে শুরু করে অন্যান্য কাজ করতে গিয়ে পেরেশানি পোহাতে হয় কর্মীদের। রোগীরা কখনো কামড় দেন, গলা টিপে ধরেন। প্রথম আলোর পক্ষ থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে গত বছরের ২৯ ও ৩০ অক্টোবর হাসপাতালটির সার্বিক চিত্র দেখার সুযোগ হয়েছিল প্রতিবেদকের।

পাবনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তারিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এ ঘটনায় ইনজামুল হকের ভাই বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেছেন। তিনি বলেন, এ মামলার অভিযুক্ত আসামি নিজেও মানসিক রোগী। হাসপাতালেই তিনি চিকিৎসাধীন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এই রোগীকে যেন আগেই ছেড়ে দেওয়া না হয়, তা বলা হয়েছে।

ওসি তারিকুল ইসলাম বলেন, এই মামলার আসামি সুস্থ হওয়ার পর তিনি ঘটনার সময় আসলেই মানসিক রোগী ছিলেন কি না, তা আদালতে উপস্থাপন করা হবে। ইনজামুলের পরিবার প্রথমে ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ বাড়ি নিতে চাইলেও তা দেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি।

ইনজামুলের মৃত্যুতে আসলেই হাসপাতালের অবহেলা ছিল কি না, এ প্রসঙ্গে হাসপাতালটির আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার চিকিৎসক মো. সেলিম মোরশেদ প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো গাফিলতি ছিল না। রোগী ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই অভিযুক্ত নাজমুল ইসলামের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। মানসিক অবস্থা খারাপ থাকে বলেই হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এখানে বেশি খারাপ রোগীদের আলাদা রাখা হয় না। একসঙ্গে থাকার পর পর্যায়ক্রমে রোগীদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে নেওয়া হয়।

মারা যাওয়া ইনজামুল এবং অভিযুক্ত নাজমুল দুজনেরই সিজোফ্রেনিয়া ছিল বলে জানান সেলিম মোরশেদ। তিনি বলেন, মধ্যরাতে ঘটনাটি ঘটেছে। সেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীরা মারামারি থামানোর চেষ্টা করেছেন। তবে এমন পরিস্থিতিতে মানসিক রোগীদের গায়ে প্রচণ্ড শক্তি থাকে, সহজেই থামানো যায় না। নাজমুলকে মারধর করার যে অভিযোগ করছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা, এটাও ঠিক নয়। রোগী ব্যবস্থাপনার কৌশল হিসেবে তাঁর গায়েও আঘাত লাগতে পারে।

নাজমুলই অভিযুক্ত, এটা কীভাবে প্রমাণিত হলো—এ প্রসঙ্গে সেলিম মোরশেদ জানান, ওয়ার্ডগুলোতে রোগীদের গোপনীয়তার স্বার্থেই সিসিটিভি ক্যামেরা লাগানো হয় না। এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত চলছে। তদন্তেই আসল ঘটনা বের হয়ে আসবে।

হাসপাতালটিতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারী ও পুরুষ রোগীদের ভর্তির পরপরই পৃথক অ্যাডমিশন ওয়ার্ডে রাখা হয়। এই রোগীরা সহিংস আচরণ করেন, মারমুখী থাকেন। ২৪ ঘণ্টা থেকে শুরু করে কাউকে কাউকে ৭২ ঘণ্টাও এ ওয়ার্ডে রাখা হয়। তারপর আস্তে আস্তে অন্য ওয়ার্ডে নেওয়া হয়। অন্য ওয়ার্ডে নেওয়ার পরও কারও মধ্যে মারমুখী আচরণ দেখা দিলে তাঁকে আবার এ ওয়ার্ডে ফেরত আনা হয়। এ ওয়ার্ডে কোনো বিছানা নেই, রোগীরা পায়চারি করেন, মেঝেতে ঘুমান। পুরুষদের অ্যাডমিশন ওয়ার্ডে পুরুষ কর্মীদের দায়িত্ব থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) চিকিৎসক মঈনুল আহসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি ঘটনাটি সম্পর্কে অবগত নই। আপনার কাছে শুনলাম। খোঁজ নিয়ে দেখব হাসপাতালটিতে সিসিটিভি ক্যামেরা কেন ছিল না, ঘটনার সময় দায়িত্বপ্রাপ্তরা দায়িত্ব পালন করেছেন কি না বা বিশেষ হাসপাতালটিতে অন্যান্য ব্যবস্থাপনা কতটুকু কার্যকর ছিল।’

Read full story at source