যে ৭ কারণে পাপে লিপ্ত হয় মানুষ
· Prothom Alo

মানুষ স্বভাবগতভাবে দুর্বল। মহান আল্লাহ তাকে বিবেক, জ্ঞান ও সঠিক পথের নির্দেশনা দিয়েছেন, আবার পরীক্ষা নেওয়ার জন্য প্রবৃত্তি ও শয়তানের প্ররোচনাও রেখেছেন। ফলে জীবনের নানা পর্যায়ে মানুষ পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ে।
পাপ বান্দা ও তার প্রতিপালকের মধ্যকার সম্পর্ক দুর্বল করে আখেরাতের সফলতাকে বিপন্ন করে তোলে। তাই পাপের কারণগুলো জানা এবং সেগুলো থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য অপরিহার্য।
Visit forestarrow.help for more information.
১. ইমানের দুর্বলতা
পাপের অন্যতম প্রধান কারণ হলো ইমানের দুর্বলতা। যখন মানুষের হৃদয়ে আল্লাহর প্রতি ভয় ও জবাবদিহির অনুভূতি কমে যায়, তখন সে সহজেই পাপের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কারো অন্তরে যদি এই অনুভূতি জাগ্রত থাকে যে আল্লাহ তাকে দেখছেন এবং তার প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব নেওয়া হবে, তাহলে পাপ করার আগে সে বহুবার চিন্তা করবে।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন সে (পূর্ণ) ইমানদার থাকে না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৭৮২)
অর্থাৎ ইমান যত শক্তিশালী হবে, পাপ থেকে দূরে থাকা তত সহজ হবে। ইমান দুর্বল হলেই পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়ে যায়।
২. শয়তানের কুমন্ত্রণা
মানবজাতির চিরশত্রু শয়তান। আদম (আ.)-এর যুগ থেকেই সে মানুষকে পথভ্রষ্ট করার কাজে লিপ্ত। শয়তান সাধারণত মানুষকে বড় পাপের দিকে সরাসরি আহ্বান করে না। প্রথমে সে ছোটোখাটো অবাধ্যতাকে তুচ্ছ ও স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করে, এরপর পর্যায়ক্রমে বড় পাপে জড়িয়ে ফেলে।
ইসলামে ধ্যান করার কার্যকর ৫ পদ্ধতিশয়তানের কুমন্ত্রণা সম্পর্কে সতর্ক করে আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। যে শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে, সে জেনে রাখুক, শয়তান তো অশ্লীলতা ও মন্দ কাজেরই নির্দেশ দেয়।’ (সুরা নুর, আয়াত: ২১)
মুমিনের কর্তব্য হলো শয়তানের প্রতিটি কুমন্ত্রণার ব্যাপারে সতর্ক থাকা এবং আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা।
৩. প্রবৃত্তির অনুসরণ
মানুষের নফস বা প্রবৃত্তি তাকে বিভিন্ন কামনা-বাসনা ও ভোগবিলাসের দিকে আহ্বান করে। ইসলামে বৈধ চাহিদা পূরণের সুযোগ থাকলেও অবাধ প্রবৃত্তির অনুসরণকে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
কেউ যখন আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে নিজের ইচ্ছা, আবেগ ও স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়, তখনই গুনাহের জন্ম হয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তুমি প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না, কেননা তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।’ (সুরা সাদ, আয়াত: ২৬)
তাই কুপ্রবৃত্তি নিয়ন্ত্রণ করে শরয়ি নির্দেশনার আলোকে নিজের চাহিদা নিয়ন্ত্রণ করা উচিত।
৪. অসৎ সঙ্গ ও পরিবেশ
মানুষ তার সঙ্গ ও পরিবেশ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। ভালো মানুষের সাহচর্য যেমন নেক আমল, আল্লাহভীতি ও সৎ চরিত্র গঠনে সহায়তা করে, তেমনি অসৎ সঙ্গ মানুষকে ধীরে ধীরে গুনাহের দিকে নিয়ে যায়।
রাসুল (সা.) বলেন, ‘মানুষ তার বন্ধুর আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে, সুতরাং সে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে তা লক্ষ্য করা উচিত।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৭৮)
অশ্লীল সংস্কৃতি, অনৈতিক বিনোদন এবং পাপকে স্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপনকারী পরিবেশও মানুষকে পাপের প্রতি আকৃষ্ট করে। তাই পাপ থেকে বাঁচতে হলে সৎসঙ্গ গ্রহণ এবং পাপের পরিবেশ থেকে দূরে থাকা অত্যন্ত জরুরি।
চোখের পাপ থেকে বাঁচার ৫ আমল৫. ধর্মীয় জ্ঞানের অভাব
দ্বীনি জ্ঞানের অভাব গুনাহের একটি বড় কারণ। অনেক মানুষ জানেই না কোন কাজ হালাল আর কোনটি হারাম। আবার কেউ কেউ পাপের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে সহজেই গুনাহে জড়িয়ে পড়ে।
এজন্যই আল্লাহ-তাআলা বলেন, ‘যারা জানে এবং যারা জানে না, তারা কি সমান হতে পারে?’ (সুরা জুমার, আয়াত: ৯)
পাপ থেকে বাঁচতে হলে তাই জ্ঞান অর্জনের বিকল্প নেই।
৬. দুনিয়ার মোহ
পার্থিব জীবনের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি মানুষকে গুনাহে নিমজ্জিত করে। যখন পার্থিব সম্পদ অর্জনই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হয়ে যায়, তখন অনেকেই বৈধ-অবৈধের সীমারেখা অতিক্রম করে।
নবীজি (সা.) দুনিয়ার মোহ সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের জন্য দারিদ্র্যের আশঙ্কা করি না। বরং আমি আশঙ্কা করি যে, তোমাদের জন্য দুনিয়া উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছিল। তখন তোমরাও তাদের মতো এর জন্য প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে, আর তা তোমাদেরও ধ্বংস করবে, যেমন তাদের ধ্বংস করেছিল।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩১৫৮)
৭. তওবার প্রতি উদাসীনতা
মানুষ ভুল করতেই পারে, কিন্তু ভুলের পর আল্লাহর কাছে ফিরে না আসা এবং সংশোধনের চেষ্টা না করা তাকে আরো বেশি গুনাহের দিকে ধাবিত করে। তওবার প্রতি উদাসীনতা মানুষকে ধীরে ধীরে আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
আল্লাহ-তাআলা মুমিনদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা করো, যেন সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩১)
রাসুল (সা.) বলেন, ‘আদমসন্তান সবাই ভুলকারী, আর ভুলকারীদের মধ্যে তারাই উত্তম, যারা অধিক তওবাকারী।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৯৯)
তাই কোনো কারণে পাপ হয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে অনুতপ্ত হওয়া এবং আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া জরুরি। এর মাধ্যমে অন্যান্য গুনাহ থেকেও বাঁচা যাবে। কারণ অনুতপ্ত হৃদয় খুব সহজে পুনর্বার পাপে জড়ায় না।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ : মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ