কোথায় করছাড় থাকবে, কোথায় আওতা বাড়বে

· Prothom Alo

আগামী অর্থবছরের বাজেটে করছাড়ের ছড়াছড়ি আছে। সৃজনশীল অর্থনীতি সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিভিন্ন খাতের উদ্যোক্তাদের শুল্ক-করে ছাড় দেওয়া হচ্ছে। কর ছাড় দিয়ে করের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ থাকছে বাজেটে।

আবার করদাতা ও উদ্যোক্তাদের ওপর কর বসিয়ে কিংবা করজালের আওতায় আনার বাধ্যবাধকতার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। যেমন ব্যাংক হিসাব খুলতে কর শনাক্তকরণ নম্বর (টিআইএন) থাকতে হবে, খুচরা বিক্রেতাদের মালামাল কেনার সময় উৎসে কর বসানো হতে পারে। এতে সাধারণ করদাতা ও ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর করের চাপ বাড়বে। করের জাল সম্প্রসারণে এবার নজর বেশি অর্থমন্ত্রীর।

Visit freshyourfeel.com for more information.

আবার সৃজনশীল অর্থনীতি সম্প্রসারণের জন্য সংগীত, সিনেমার বিভিন্ন সামগ্রীতে কর ছাড় দেওয়া হচ্ছে। ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর উদ্যোগ থাকছে বাজেটে। করমুক্ত আয়সীমা প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাড়ছে।

এ বিষয়ে ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘সরকার এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বানাতে চায়, এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করতে চায়। এ জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে যেসব ছাড়ের কথা শোনা যাচ্ছে, তাকে স্বাগত জানাই। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে।’

তাসকীন আহমেদ আরও বলেন, আগামী অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ৩০ শতাংশের মতো বাড়ানোর কথা হচ্ছে। এই বাড়তি রাজস্ব আদায়ে যেন বিদ্যমান করদাতাদের ওপর বাড়তি চাপ না দেওয়া হয়। করজাল বাড়ানোর শক্ত উদ্যোগ নিতে হবে।

ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদসরকার এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বানাতে চায়, এক কোটি মানুষের কর্মসংস্থান করতে চায়। এ জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যে যেসব ছাড়ের কথা শোনা যাচ্ছে, তাকে স্বাগত জানাই। এতে ব্যবসা-বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে।

ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন লাগবে

ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন লাগবে—এবারের বাজেটের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে। যেকোনো ব্যক্তি ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ দেখাতে হবে—এমন ঘোষণা আসতে পারে। এই প্রস্তাব দেওয়া হলে ব্যাংক হিসাব খোলার আগেই টিআইএন সনদ নিতে হবে।

তবে এ ক্ষেত্রে কিছু ছাড় দেওয়া হতে পারে। যেমন শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব নেওয়ার সময় এই টিআইএন সনদ দেখাতে হবে না। আবার নো ফ্রিলস অ্যাকাউন্ট যেমন ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব, সরকারি ভাতা সুবিধা নেওয়ার জন্য যত হিসাবসহ পেনশনভোগীদের হিসাবের ক্ষেত্রে টিআইএন দেখানোয় অব্যাহতি দেওয়া হতে পারে।

দেশে ১৭ কোটির বেশি ব্যাংক হিসাব আছে। মূলত করের জাল বাড়ানোর জন্য এই উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।

এ ছাড়া ব্যক্তিশ্রেণির করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা গতবারের বাজেটে দেওয়া ঘোষণা অনুসারে পৌনে চার লাখ টাকা করা হচ্ছে। করপোরেট করহার অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে।

ব্যাংকে রাখা টাকার ওপর আবগারি শুল্ক বসানোর সীমা ৩ লাখ থেকে বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করা হচ্ছে। তবে ঋণের টাকার ক্ষেত্রে একবার আবগারি শুল্ক আরোপ হবে।

ব্যাংক হিসাব খুলতে টিআইএন লাগবে—এবারের বাজেটের অন্যতম বড় সিদ্ধান্ত হতে যাচ্ছে। যেকোনো ব্যক্তি ব্যাংক হিসাব খোলার সময় টিআইএন সনদ দেখাতে হবে—এমন ঘোষণা আসতে পারে। এই প্রস্তাব দেওয়া হলে ব্যাংক হিসাব খোলার আগেই টিআইএন সনদ নিতে হবে।

খুচরা ব্যবসায়ীদের হাজারে ২ টাকা কর

দেশের লাখ লাখ খুচরা ব্যবসায়ীর ওপর করের বোঝা নেমে আসতে পারে। নতুন প্রস্তাবটি এমন—খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্য সরবরাহের ওপর দশমিক ২ শতাংশ হারে অগ্রিম কর আরোপ। প্রতি ১ হাজার টাকায় ২ টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে। জানা গেছে, পণ্য কেনার সময় পণ্য সরবরাহকারী বা পরিবেশকেরা খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে এই অগ্রিম কর কেটে রেখে সরকারের কোষাগারে জমা দেবেন।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির হিসাবে, দেশে প্রায় ৭০ লাখ খুচরা বিক্রেতা আছেন।

প্রতি ১ হাজার টাকায় ২ টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখা হবে। জানা গেছে, পণ্য কেনার সময় পণ্য সরবরাহকারী বা পরিবেশকেরা খুচরা বিক্রেতার কাছ থেকে এই অগ্রিম কর কেটে রেখে সরকারের কোষাগারে জমা দেবেন।

চাল, ডাল, তেল-চিনিসহ ভোগ্যপণ্যে কর কমছে

উচ্চ মূল্যস্ফীতির এই সময়ে চাল, ডাল, তেল-চিনিসহ নিত্যপণ্যের দাম সহনীয় রাখতে করছাড় দেওয়া হতে পারে। ৬০টি নিত্যপণ্যের ওপর উৎসে কর হিসাবে ১ থেকে ৫ শতাংশ আছে। এটি কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করা হতে পারে।

এই পণ্যের তালিকায় আছে ধান, চাল, গম, আলু, গবাদিপশু, মাছ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, লবণ, চিনি, ভোজ্যতেল ইত্যাদি।

ডিজিটাল মিডিয়ায় ব্যবহৃত সংগীতের মান উন্নয়ন ও ক্রিয়েটিভ মিউজিক তৈরিতে গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন ইত্যাদি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হতে পারে।

সৃজনশীল অর্থনীতিতে যত ছাড়

দেশের সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মের মেধা ও মননকে কাজে লাগিয়ে একটি বৈশ্বিক মানের ‘ক্রিয়েটিভ ইকোনমি’ গড়ে তুলতে চায় নতুন সরবার। উচ্চমানের কনটেন্ট ও চলচ্চিত্র নির্মাণসামগ্রী তরুণদের নাগালের মধ্যে রাখতে কিছু পণ্যের ওপর শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব করা হচ্ছে।

ডিজিটাল মিডিয়ায় ব্যবহৃত সংগীতের মান উন্নয়ন ও ক্রিয়েটিভ মিউজিক তৈরিতে গিটার, পিয়ানো, ভায়োলিন ইত্যাদি এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার করা হতে পারে।

চলচ্চিত্র ও ক্রিয়েটিভ মিডিয়ার কারিগরি দিক আন্তর্জাতিক স্তরে উন্নীত করতে উচ্চপ্রযুক্তির সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা এবং সিনেমাটোগ্রাফিক ক্যামেরা ও প্রজেক্টরের খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান আমদানি শুল্ক ১৫ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হতে পারে।

হার্টের রিংয়ের জোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ কর প্রত্যাহার করা হতে পারে। এতে প্রতিটি রিংয়ে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে বলে জানা গেছে।

ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রীর দাম কমতে পারে

হৃদ্‌রোগের চিকিৎসা খরচ কমতে পারে। যেমন হার্টের রিংয়ের জোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ কর প্রত্যাহার করা হতে পারে। এতে প্রতিটি রিংয়ে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ কমতে পারে বলে জানা গেছে।

চোখের ইন্ট্রাওকুলার লেন্সের জোগানদার পর্যায়ে ১০ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করার ঘোষণা দিতে পারেন অর্থমন্ত্রী। এতে প্রতিটি লেন্সের দাম ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত কমতে পারে।

কিডনি সমস্যাজনিত রোগীদের ডায়ালাইসিস ফিল্টার আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট ও ৫ শতাংশ অগ্রিম কর তুলে দেওয়া হতে পারে। এতে ডায়ালাইসিস বাবদ প্রত্যেক রোগীর খরচ ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে বলে জানা গেছে।

কিডনির রোগীদের জন্য ব্যবহৃত হেমোডায়ালাইসিসের ব্লাড টিউবিং সেট আমদানি সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাটের আগাম কর প্রত্যাহার করা হতে পারে।

ডায়ালাইসিস বাবদ প্রত্যেক রোগীর খরচ ৮০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে বলে জানা গেছে।

শারীরিকভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তির ব্যবহারের জন্য আমদানি করতে হয় এমন ১৫টি পণ্যের অগ্রিম আয় ২ শতাংশ থেকে ১ শতাংশ করা হতে পারে। এ ছাড়া মৃতদেহ সংরক্ষণের জন্য মরচুয়ারি আমদানিতে আমদানি শুল্ক ২৫ থেকে কমিয়ে ১ শতাংশ করার ঘোষণা বাজেটে থাকতে পারে।

এ ছাড়া ওষুধশিল্পের উদ্যোক্তাদের জন্য সুখবর দিতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। দেশীয় ফার্মাসিউটিক্যালস শিল্পকে আন্তর্জাতিক মানের ও সাশ্রয়ী মূল্যের ক্যানসার প্রতিরোধী ওষুধ উৎপাদনে সক্ষমতা গড়ে তুলতে উদ্যোগ থাকছে বাজেটে।

ওষুধ শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে বিদ্যমান রেয়াতি শুল্ক সুবিধার তালিকায় আরও ৯ টি পণ্য যুক্ত করা হতে পারে।

অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রিডিয়েন্ট (এপিআই) তৈরির নতুন ৫১টি কাঁচামালের আমদানি শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হচ্ছে।

এ ছাড়া ওষুধ রপ্তানির প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিদ্যমান রেয়াতি সুবিধায় আরও ১৭টি মৌলিক কাঁচামাল যোগ হচ্ছে।

সোনার গয়না কিনলে খরচ কমতে পারে

সোনা ও স্বর্ণালংকার কেনাবেচায় বর্তমানে মোট বিক্রয়মূল্যের ওপর ৫ শতাংশ হারে মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট তুলে দিয়ে ভরিপ্রতি ২৫০০ টাকা করা হচ্ছে। সোনার দাম বেড়ে যাওয়ায় এবার এই ভ্যাট কমানো হচ্ছে। এতে সোনার গয়না কিনতে খরচ কমবে। এ ছাড়া স্বর্ণালংকার সরবরাহে উৎসে কর ৫ শতাংশ কমিয়ে দশমিক ৫ শতাংশ করা হতে পারে।

বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ও ফিটনেস নবায়নের সময় ২ লাখ টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখা হয়। তা কমিয়ে ২০০ কিলোওয়াট, ৩০০ কিলোওয়াট, ৪০০ কিলোওয়াট ও ৪০০ কিলোওয়াটের বেশি ইলেকট্রিক গাড়ির ক্ষেত্রে যথাক্রমে ২৫ হাজার টাকা, ৫০ হাজার টাকা, ৭৫ হাজার টাকা এবং ১ লাখ টাকা করা হতে পারে।

ইলেকট্রিক গাড়ির দাম কমবে

বৈদ্যুতিক গাড়ি (ইভি) আমদানির ক্ষেত্রে সার্বিক শুল্ক-কর কমানোর প্রস্তাব থাকছে বাজেটে। বর্তমানে ইভির ক্ষেত্রে শুল্ক-কর ভার ৯৩ শতাংশ। নতুন প্রস্তাবে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের ইভিতে ৬৪ শতাংশ এবং ২৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার ডলার পর্যন্ত দামের ইভির ক্ষেত্রে ৮০ শতাংশ শুল্ক-কর হারের প্রস্তাব করতে পারেন অর্থমন্ত্রী।

বৈদ্যুতিক গাড়ির নিবন্ধন ও ফিটনেস নবায়নের সময় ২ লাখ টাকা অগ্রিম কর কেটে রাখা হয়। তা কমিয়ে ২০০ কিলোওয়াট, ৩০০ কিলোওয়াট, ৪০০ কিলোওয়াট ও ৪০০ কিলোওয়াটের বেশি ইলেকট্রিক গাড়ির ক্ষেত্রে যথাক্রমে ২৫ হাজার টাকা, ৫০ হাজার টাকা, ৭৫ হাজার টাকা এবং ১ লাখ টাকা করা হতে পারে।

ইলেকট্রিক বাস ও ট্রাক উৎপাদনকারী শিল্পের উপকরণ ও কাঁচামালে আমদানির ক্ষেত্রে ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত সব রেয়াতি সুবিধা বহাল রাখার ঘোষণা আসছে।

এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য ব্যবহৃত ইলেকট্রিক বাস আমদানিতে শুল্ক-করমুক্ত সুবিধা ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অব্যাহত রাখার ঘোষণাও থাকবে।

এ ছাড়া ইলেকট্রিক গাড়ির চার্জার ও চার্জিং স্টেশন আমদানিতে সব ধরনের শুল্ক-কর প্রত্যাহার করা হতে পারে।

কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও তরুণদের জন্য যা থাকছে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের বিশেষ কর ছাড় আসছে। মানে অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করাকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন। কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ফ্রিল্যান্সাররা যে সেবা দেন, তার ওপর আরোপিত ১৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার হচ্ছে।

এ ছাড়া স্টার্টআপ, ইনোভেশন ভেঞ্চার ও প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানকে কর অব্যাহতি সুবিধা অব্যাহত রাখা হবে।

স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের স্থানীয় পর্যায়ে ১৫ শতাংশ ভ্যাট সম্পূর্ণ অব্যাহতি করা হতে পারে। স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সেবা আমদানির ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের স্থান ও স্থাপনা ভাড়া গ্রহণের ক্ষেত্রে ১৫ শতাংশ ভ্যাট অব্যাহতির ঘোষণা থাকবে।

Read full story at source