চাঁদের দেশে চার নভোচারী
· Prothom Alo

১০, ৯, ৮...৩, ২, ১... বুম!
প্রচণ্ড শব্দে কেঁপে উঠল চারপাশ। ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারের মাটি ফুঁড়ে যেন একটা আস্ত আগ্নেয়গিরি জেগে উঠল! কমলা রঙের আগুন ও সাদা ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী পাকিয়ে একটি বিশাল রকেট ছুটতে শুরু করল। প্রচণ্ড গর্জনে চারপাশ কাঁপিয়ে রকেটটি যখন ওপরে উঠছিল, মনে হচ্ছিল যেন রূপকথার কোনো আগুনমুখো ড্রাগন হুস করে আকাশে উড়াল দিল!
Visit freshyourfeel.com for more information.
না, এটা কোনো মুভির দৃশ্য নয়। এই তো, ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল (বাংলাদেশ সময় ২ এপ্রিল) ঠিক এভাবেই মানুষ আবার চাঁদের পানে পাড়ি জমিয়েছিল! ৫০ বছরের বেশি সময় পর মানুষ আবার চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছানোর এক রোমাঞ্চকর অভিযান শেষ করে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে। এই অভিযানের নাম আর্টেমিস–২।
আজ থেকে অনেক বছর আগে, ১৯৬৯ সালে মানুষ প্রথম চাঁদে গিয়েছিল। সেই অভিযানের নাম ছিল অ্যাপোলো। গ্রিক পুরাণে অ্যাপোলো আলোর দেবতা। আর আর্টেমিস হলো চাঁদের দেবী। সম্পর্কে তারা যমজ ভাই-বোন! কী দারুণ মিল, তাই না?
এই আর্টেমিস–২ মিশনে চারজন নভোচারী মহাকাশে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ক্রিস্টিনা কোচ, যিনি প্রথম নারী হিসেবে চাঁদের কাছাকাছি গেছেন। আরেকজন ভিক্টর গ্লোভার। তিনি প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে এই যাত্রায় গেছেন। বাকি দুজন হলেন রিড ওয়াইজম্যান এবং কানাডার নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন। শেষের জন ছাড়া বাকি তিনজন নাসার নভোচারী।
কীভাবে তাঁরা পৃথিবী থেকে চাঁদের পথে গেলেন, সেই ঘটনাই এই লেখায় বলার চেষ্টা করছি।
দেশ হারিয়ে যে মানুষ আটকে ছিলেন মহাকাশেদুই
আর্টেমিস–২ মিশনে যে রকেটটি ব্যবহার করা হয়েছে, সেটির নাম স্পেস লঞ্চ সিস্টেম বা সংক্ষেপে এসএলএস। এটি নাসার বানানো এযাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী রকেট। দেখতে একটা বহুতল ভবনের মতো। প্রায় ৩২ তলা ভবনের সমান উঁচু এটি! কিন্তু এত বিশাল একটা লোহার কাঠামো কীভাবে পৃথিবীর মহাকর্ষ বলকে হারিয়ে আকাশে উড়ে যায়?
পুরো ব্যাপারটা বোঝার জন্য আমরা একটা ছোট্ট পরীক্ষার কথা বলতে পারি। ধরো, তোমার কাছে একটা বেলুন আছে। তুমি বেলুনটা ভালো করে ফুলিয়ে মুখটা আঙুল দিয়ে শক্ত করে চেপে ধরলে। তারপর হঠাৎ করে আঙুলটা সরিয়ে নিলে কী হবে? বেলুনটা ফড়ফড় করে সামনের দিকে বা ওপরের দিকে ছুটে যাবে। রকেট ঠিক এই বেলুনের মতোই কাজ করে! স্যার আইজ্যাক নিউটনের একটা বিখ্যাত সূত্র আছে—প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে। আমাদের হাঁটার মধ্যেই এই সূত্র লুকিয়ে আছে। তুমি যখন হাঁটো, তখন পা দিয়ে মাটিকে পেছনের দিকে ঠেলে দাও। বিপরীতে মাটিও তোমাকে সামনে ঠেলে দেয়। তাই তুমি এগিয়ে যেতে পারো। আপাতত শুধু সূত্রের কথাটা মাথায় রাখলেই চলবে।
এই যে ৩২ তলা বিশাল রকেটের কথা বললাম, এর ভেতরে থাকে প্রচুর পরিমাণ জ্বালানি। যখন এই জ্বালানিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, তখন রকেটের পেছনের অংশ দিয়ে প্রচণ্ড জোরে ধোঁয়া ও গরম গ্যাস নিচের দিকে বেরিয়ে আসে। এই গরম গ্যাস ঠিক ওই বেলুনের ভেতরের বাতাসের মতো নিচের দিকে প্রচণ্ড জোরে ধাক্কা দেয়। আর এই বিশাল ধাক্কার কারণেই রকেট শাঁই করে ওপরের দিকে ছুটে যায়! মানে তোমার হাতের বেলুন থেকে যেমন বাতাস বেরিয়ে যাওয়ার কারণে বেলুনটি সামনের দিকে বা ওপরের দিকে চলে যায়, তেমনি রকেটের ভেতর থেকে জ্বালানি বেরিয়ে যাওয়ার কারণে রকেট ওপরের দিকে উঠে যায়।
এই বিশাল রকেটের একদম মাথায় ক্যাপসুলের মতো ছোট্ট একটা ঘরে বসে ছিলেন আমাদের চারজন নভোচারী। এই ছোট্ট ঘরটির নামই হলো অরায়ন। প্রচণ্ড শব্দে রকেট যখন মাটি ছাড়ল, তখন এর দুই পাশে দুটি চিকন সাদা রকেট লাগানো ছিল। এদের বলা হয় সলিড রকেট বুস্টার। এরা রকেটকে প্রথম ধাক্কাটা দিয়ে ওপরে তুলে দেয়। ওড়ার ঠিক দুই মিনিট পর এই বুস্টার দুটির জ্বালানি শেষ হয়ে যায়। তখন এগুলো মূল রকেট থেকে আলাদা হয়ে প্যারাস্যুটের সাহায্যে সাগরের পানিতে এসে পড়ে।
বুস্টার আলাদা হওয়ার পর রকেটের মাঝখানের বিশাল অংশটি জ্বলতে থাকে এবং রকেটকে আরও ওপরে নিয়ে যায়। মাঝের এই অংশকে বলে কোর স্টেজ। পৃথিবী থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার ওপরে ওঠার পর এই কোর স্টেজের কাজও শেষ হয়ে যায়। তখন সেটিও আলাদা হয়ে পড়ে যায় নিচে। এখন শুধু বাকি থাকে রকেটের ওপরের ছোট একটি অংশ, যাকে বলা হয় আইসিপিএস। এই আইসিপিএসের ঠিক ওপরেই লাগানো থাকে আমাদের নভোচারীদের স্পেসক্রাফট অরায়ন।
তিন
রকেট তো ওপরে উঠল, এখন কি সোজা চাঁদের দিকে চলে যাবে? মোটেই না!
পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছানোর পর নভোচারীরা সরাসরি চাঁদের দিকে যাননি। তাঁরা আইসিপিএস ইঞ্জিনের সাহায্যে প্রথমে পৃথিবীর চারপাশে উপবৃত্তাকার কক্ষপথে ঘুরতে শুরু করেন। অর্থাৎ পৃথিবীর চারপাশেই তাঁরা ঘোরেন। এভাবে কেটে যায় প্রায় ২৪ ঘণ্টা। কেন এই এক দিনের বিরতি?
বিষয়টি বোঝার জন্য একটা ছোট্ট উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরো, তোমার বাবা একটা নতুন গাড়ি কিনেছেন। ঠিক হলো, তোমাদের নিয়ে অনেক দূরের একটা শহরে বেড়াতে যাবেন। তিনি কি গাড়িটা কিনেই সোজা সেই শহরের দিকে রওনা হবেন? হয়তো না! তিনি প্রথমে গাড়িটা নিয়ে বাড়ির আশপাশের রাস্তায় একটু চালিয়ে দেখবেন। গাড়ির ব্রেক ঠিক আছে কি না, এসি চলে কি না, হর্ন বাজে কি না—এসব চেক করবেন।
নভোচারীদের এই এক দিনের বিরতিটাও ঠিক এ রকম একটা টেস্ট ড্রাইভ! ওরিয়ন নভোযানটি ছিল একদম নতুন। এই এক দিন তাঁরা পরীক্ষা করে দেখেছিলেন, মহাকাশযানের ভেতরের অক্সিজেন ঠিকমতো কাজ করছে কি না, তাপমাত্রা ঠিক আছে কি না এবং মহাকাশযানটি ঠিকমতো চালানো যাচ্ছে কি না। এমনকি তাঁরা আইসিপিএস ইঞ্জিনটিকে মহাকাশে একটি টার্গেট হিসেবে ব্যবহার করে তার কাছাকাছি গিয়েছিলেন। তাঁরা বুঝতে চাইছিলেন, ঠিকভাবে দিক নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে কি না। সাধারণত নভোযান নিজে নিজেই কম্পিউটারের সাহায্যে চলে। তবে দরকার হলে নভোচারীরা নিজেরাও নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন। ওই দিন তাঁরা কিছুক্ষণ নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করে সবকিছু ঠিক আছে কি না, তা পরীক্ষা করেছিলেন। সবকিছু একদম পারফেক্ট থাকার পরই তাঁরা চাঁদের দিকে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হন!
এক দিনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ। সব সিস্টেম ঠিকঠাক। এবার সময় চাঁদের দিকে যাওয়ার। মহাকাশযানকে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির মায়া কাটিয়ে অনেক দূরে যেতে হবে। এই কাজ করার জন্য অরায়নের সঙ্গে লাগানো সেই আইসিপিএস ইঞ্জিনটি আবার চালু করা হলো। এই ইঞ্জিন প্রায় ২০ মিনিট ধরে প্রচণ্ড শক্তিতে জ্বলেছিল এবং মহাকাশযানটিকে ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার বেগে সামনের দিকে ধাক্কা দিয়েছিল! বিজ্ঞানের ভাষায় এই ধাক্কা দেওয়াকে বলে ট্রান্স-লুনার ইনজেকশন। নামটা একটু কঠিন বটে!
এই বিশাল ধাক্কা খেয়ে অরায়ন মহাকাশযানটি চাঁদের রাস্তায় ঢুকে পড়ে। ধাক্কা দেওয়ার পর আইসিপিএস ইঞ্জিনটির কাজ শেষ, তাই সেটিও মহাকাশযান থেকে আলাদা হয়ে যায়। এরপর শুধু ইউরোপিয়ান সার্ভিস মডিউলের সাহায্যে অরায়ন একাই চাঁদের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে।
মহাকাশ স্টেশনে গরিলা স্যুটে মহাকাশচারী স্কট কেলিচার
আর্টেমিস–২ মিশনটি ছিল মোট ১০ দিনের। এর মধ্যে প্রথম দিন সফলভাবে উৎক্ষেপণের পর নভোযানটি পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করে। দ্বিতীয় দিন পৃথিবীর চারপাশে ঘুরতে ঘুরতে মহাকাশযানের সব যন্ত্রপাতি পরীক্ষা করা হয়। তবে দিনের শুরু হয়েছিল ব্যায়াম করে। তা ছাড়া খাবারদাবারের মতো নিয়মিত সব কাজ তো আছেই। তৃতীয় দিন সেই বিশাল ধাক্কা! মহাকাশযান পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চাঁদের দিকে ছুটতে শুরু করে। এরপর চতুর্থ ও পঞ্চম দিন তাঁরা শান্তিতে চাঁদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে তাঁরা দেখেছেন, পৃথিবীটা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে। একটা সময় বিশাল পৃথিবীকে দেখতে একটা ছোট নীল মার্বেলের মতো মনে হচ্ছিল! তাঁরা মহাকাশযানের ভেতরে ভেসে বেড়াচ্ছিলেন, ছবি তুলেছিলেন, ব্যায়াম করছিলেন এবং ভিডিও কলের মাধ্যমে পৃথিবীর মানুষের সঙ্গে কথা বলেছিলেন।
ষষ্ঠ দিন ছিল সবচেয়ে রোমাঞ্চকর! এদিন মহাকাশযানটি চাঁদের খুব কাছাকাছি পৌঁছায়। কিন্তু তাঁরা চাঁদে নামেননি! তাঁরা চাঁদের পাশ দিয়ে উড়ে গিয়েছিলেন। একে বলা হয় ফ্লাইবাই। এই ফ্লাইবাই করার সময় তাঁরা চাঁদের এমন একটা পাশ দিয়ে গিয়েছিলেন, যা পৃথিবী থেকে দেখা যায় না। একে বলে চাঁদের অন্ধকার দিক। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, এই দিন তাঁরা মহাকাশ থেকে চমৎকার একটি সূর্যগ্রহণও দেখেছিলেন! কারণ, তাঁদের দিক থেকে চাঁদ সূর্যকে পুরোপুরি ঢেকে দিয়েছিল টানা ৫৪ মিনিট। তাঁরা চাঁদের বুকে দুটি নতুন গর্ত আবিষ্কার করেন এবং সেগুলোর নামকরণ করেন। এর মধ্যে একটির নাম দেওয়া হয় ক্যারল। এখানে তোমাদের একটু জানিয়ে রাখি, নভোচারীরা যখন পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে যাওয়ার রেকর্ড গড়ছিলেন, তখন কানাডিয়ান নভোচারী জেরেমি হ্যানসেন মিশন কন্ট্রোলকে দুটি গর্তের এই নাম রাখার প্রস্তাব দেন। এটি ছিল খুব আবেগের একটা মুহূর্ত।
ক্যারল ছিলেন আর্টেমিস–২ মিশনের কমান্ডার রিড ওয়াইজম্যানের স্ত্রী। ২০২০ সালে মাত্র ৪৬ বছর বয়সে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ক্যারল মারা যান। স্ত্রী মারা যাওয়ার পর থেকে রিড ওয়াইজম্যান একাই তাঁদের দুই মেয়ে কেটি ও এলিকে বড় করছেন। গর্তটি চাঁদের এমন এক জায়গায় অবস্থিত, যেটি পৃথিবী থেকে নির্দিষ্ট কিছু সময়ের জন্য দেখা যায়। রিড ওয়াইজম্যান ও তাঁর দুই মেয়ে পৃথিবী থেকেই মাঝেমধ্যে চাঁদের বুকে থাকা ক্যারলকে দেখতে পারবেন!
আর অন্য গর্তের নাম দেওয়া হয় ইন্টিগ্রিটি। নভোচারীরা অরায়ন ক্যাপসুলকেই ভালোবেসে এই নামে ডাকতেন। তাই নিজেদের মহাকাশযান এবং এই ঐতিহাসিক মিশনকে স্মরণীয় করে রাখতেই তাঁরা দ্বিতীয় গর্তটির এমন নাম দিয়েছেন।
এরপর সপ্তম দিনে পৃথিবীর দিকে ফেরার পালা। ফ্লাইবাই শেষে মহাকাশযানটি পৃথিবীর দিকে ফিরতি পথ ধরে। তবে এদিন তাঁরা পৃথিবীতে অনেক ডেটা পাঠিয়েছেন। একই দিনে তাঁরা পৃথিবীর নিম্নকক্ষপথে থাকা আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের নভোচারীদের সঙ্গে অডিও কলে কথাও বলেছেন।
অষ্টম দিনে তাঁরা সৌরঝড় থেকে বাঁচার একটা মহড়া দেন। গভীর মহাকাশে বিকিরণ সবচেয়ে বড় শত্রু। হঠাৎ কোনো সৌরঝড় আঘাত হানলে তাঁরা কীভাবে বাঁচবেন, সেই মহড়াই দিলেন এই দিনে। সে জন্য তাঁরা অরায়নের ভেতরে একটি অস্থায়ী রেডিয়েশন শেল্টার বানানোর প্র্যাকটিস করেন।
নবম দিন ছিল তাঁদের মহাকাশে শেষ পুরো দিন। এদিন তাঁরা আরও কিছু প্রযুক্তিগত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। সবশেষে দশম দিনে মহাকাশযানটি পৃথিবীর খুব কাছাকাছি চলে আসে। এখন সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো নিরাপদে পৃথিবীতে নামা।
চাঁদ ধীরে ধীরে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে কেনপাঁচ
মহাকাশযানটি যখন পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢোকে, তখন তার গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার! এত বিশাল বেগে বাতাসের সঙ্গে ঘষা লাগার কারণে মহাকাশযানের বাইরের দিকে প্রচণ্ড তাপ তৈরি হয়। এই তাপমাত্রা ছিল প্রায় ২ হাজার ৭৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি! এই তাপে লোহাও গলে তরল হয়ে যায়। কিন্তু ওরিয়নের বাইরের দিকে থাকা হিট শিল্ড ভেতরের নভোচারীদের একদম নিরাপদে রেখেছিল।
আগের মিশনগুলোতে মহাকাশযান সোজা বায়ুমণ্ডলে ঢুকে সমুদ্রে আছড়ে পড়ত। কিন্তু আর্টেমিস–২ মিশনে একটা দারুণ কৌশল ব্যবহার করা হয়েছিল। একে বলে স্কিপ রিএন্ট্রি। বিষয়টি একটু বুঝিয়ে বলি।
তুমি কি কখনো পুকুরের শান্ত পানিতে চ্যাপটা পাথর ছুড়ে মেরেছ? পাথরটা পানিতে ধাক্কা খেয়ে আবার একটু ওপরে ওঠে, তারপর আবার পানিতে পড়ে; ঠিক যেন ব্যাঙের লাফ! অরায়ন মহাকাশযানটিও ঠিক এভাবেই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে ঢুকে বাতাসের স্তরে ধাক্কা খেয়ে একটু ওপরের দিকে উঠেছিল এবং গতি কিছুটা কমিয়ে তারপর আবার নিচের দিকে নেমেছিল। এতে দুটি সুবিধা হয়েছিল। প্রথমত, মহাকাশযানের তাপ অনেক কমে গিয়েছিল। দ্বিতীয়ত, নভোচারীরা ঠিক প্রশান্ত মহাসাগরের যে জায়গাটায় নামতে চেয়েছিলেন, একদম নিখুঁতভাবে সেখানে এসে নামতে পেরেছিলেন।
স্কিপ রিএন্ট্রি করার পর মহাকাশযানের গতি অনেক কমে আসে। এরপর আকাশ থেকে বিশাল বিশাল প্যারাস্যুট ধাপে ধাপে খুলে যায়। এই প্যারাস্যুটগুলো মহাকাশযানের গতিকে একদম কমিয়ে আনে। এরপর অরায়ন প্রশান্ত মহাসাগরের পানিতে খুব আলতো করে নেমে আসে। একে বলে স্প্ল্যাশডাউন!
পানিতে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাছাকাছি থাকা মার্কিন নৌবাহিনীর ইউএসএস জন পি মার্থা নামের উদ্ধারকারী জাহাজ ও হেলিকপ্টারগুলো ছুটে আসে। নেভির ডুবুরিরা স্পিডবোটে করে মহাকাশযানের কাছে যান। তাঁরা মহাকাশযানের দরজা খুলে চারজন নভোচারীকে বের করে আনেন।
এরপর তাঁদের উদ্ধারকারী জাহাজে তোলা হয়। সেখানে থাকা ডাক্তাররা সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। টানা ১০ দিন ওজনহীন অবস্থায় থাকার কারণে তাঁদের শরীর কিছুটা দুর্বল লাগছিল। জাহাজে কিছুদিন বিশ্রাম ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাঁরা নৌবাহিনীর ঘাঁটিতে পৌঁছান। সেখান থেকে তাঁদের নিয়ে যাওয়া হয় নাসার সদর দপ্তরে। সেখানে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে মিশন নিয়ে বিস্তারিত তথ্য দেওয়ার পর কিছুদিন বিশ্রাম নিয়ে অবশেষে তাঁরা নিজেদের বাড়িতে পরিবারের কাছে ফিরে গেছেন।
এভাবেই শেষ হয় ঐতিহাসিক আর্টেমিস–২ মিশন! এই মিশন সফল হওয়া মানে মানুষ শিগগিরই আর্টেমিস–৪ মিশনে আবার চাঁদের বুকে নামতে যাচ্ছে। এরপর হয়তো চাঁদে বাড়ি বানানো হবে। হয়তো তুমিও বড় হয়ে ঘুরতে যাবে চাঁদের দেশে! স্বপ্ন দেখতে তো আর বাধা নেই, তাই না?
সূত্র: নাসা ও স্পেস ডটকমসূর্যের চারপাশে পৃথিবীকে অনুসরণ করছে খুব ছোট একটি চাঁদ