‘আমরা তেলাপোকা, আমরা থাকব’

· Prothom Alo

সৌরভ কুশওয়াহা, বয়স মোটে ১৭ বছর। এক কাপড়েই বড় ভাইয়ের সঙ্গে ট্রেনে চেপেছিলেন এই কিশোর। ভারতের মধ্যপ্রদেশ থেকে, গন্তব্য রাজধানী দিল্লি।

Visit umafrika.club for more information.

গতকাল শনিবার ভোরে দুই ভাই নয়াদিল্লি পৌঁছান। এরপর ফুটপাতে বসে বিশ্রাম নিতে থাকেন। আর থাকেন অপেক্ষায়, কখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসবেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।

ভারতের তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ জমে উঠছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। দেশটির ১৪০ কোটি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ২৫ বছরের নিচে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোর্ডগুলোর পরীক্ষায় নানা অসংগতি এই ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

সেই ক্ষোভ অপ্রত্যাশিতভাবে রূপ নিয়েছে একটি অপ্রথাগত রাজনৈতিক দলে। সেটি হলো—‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি। মূলত ঠাট্টা-বিদ্রূপ আর ব্যঙ্গের মধ্য দিয়ে এ দলটির জন্ম।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর দীপকের ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) প্রথমে তরুণদের এই ক্ষোভকেই আন্দোলনের শক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা করে। দলটি রাজধানী নয়াদিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরে ‘সব তেলাপোকাকে’ একত্র হওয়ার আহ্বান জানায়। তাদের প্রধান দাবি, ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।

গত মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্য ব্যাপক বিতর্ক ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। তিনি দেশের একদল বেকার তরুণকে তেলাপোকার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, যা অনেকের কাছেই অপমানজনক ঠেকেছিল।

এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা ভারতীয় শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেন। তিনি লেখেন, ‘যদি সব তেলাপোকা একসঙ্গে জড়ো হয়, তাহলে কী হবে?’

তাঁর এই মন্তব্য অল্প সময়ের মধ্যেই ইন্টারনেটে আলোড়ন তোলে। সেখান থেকেই জন্ম ককরোচ জনতা পার্টির। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নামকে ব্যঙ্গ করে এই নামকরণ।

দীপকের ব্যঙ্গাত্মক এ উদ্যোগটি দ্রুতই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায়, যা ২০১৪ সাল থেকে ভারতে ক্ষমতায় থাকা বিজেপির অনুসারীর প্রায় দ্বিগুণ।

কিন্তু মজা থেকে শুরু হওয়া এই উদ্যোগ এখন নিছক মজায় নেই। দীপকে এবং গতকাল শনিবার নয়াদিল্লিতে জড়ো হওয়া শত শত মানুষ আন্দোলনে নেমেছেন। প্রধানমন্ত্রী মোদির নেতৃত্বাধীন সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তুলেছেন তাঁরা।

সৌরভ কুশওয়াহা, মধ্যপ্রদেশের বাসিন্দা এক কিশোরআমি প্রথমে মজা করেই তাদের ইনস্টাগ্রাম অনুসরণ করেছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সত্যিই হয়তো আমরা শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করতে পারব।

বিক্ষুব্ধ জনতার সামনে দাঁড়িয়ে দীপকে বলেন, ‘মোদি সরকারের প্রতি আমাদের বার্তা খুবই পরিষ্কার—শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করাতে হবে। তা না হলে আমরা এখান থেকে যাব না।’

শিক্ষার্থী সৌরভ কুশওয়াহাও এই আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠেছেন। মধ্যপ্রদেশের এ শিক্ষার্থী সম্প্রতি ভারতের সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই) পরিচালিত দ্বাদশ শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। তবে এই পরীক্ষার ফল প্রকাশ প্রক্রিয়া নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছে। উত্তরপত্রে ডিজিটাল মূল্যায়নসহ বিভিন্ন অসংগতি নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়।

কুশওয়াহা এখনো নিশ্চিত নন যে তিনি উচ্চশিক্ষার খরচ বহন করতে পারবেন কি না। কিন্তু তাঁর আরও বড় ক্ষোভ সেই সরকারের প্রতি, ‘যারা ক্ষমতায় এসেছে জনগণের ভোটে, অথচ এখন সেই জনগণের সমস্যার প্রতিই উদাসীন।’

স্কুল বোর্ডের এই বিতর্কের মাত্র এক সপ্তাহ আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে স্নাতক পর্যায়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করা হয়। ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এ ধরনের ঘটনা এখন প্রায় প্রতিবছরই ঘটে, কিন্তু এর জন্য রাজনৈতিকভাবে কাউকে জবাবদিহি করতে হয় না।

ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) লোগো

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর দীপকের ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) প্রথমে তরুণদের এই ক্ষোভকেই আন্দোলনের শক্তিতে রূপান্তরের চেষ্টা করেন।

দলটি রাজধানী নয়াদিল্লির নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল যন্তর মন্তরে ‘সব তেলাপোকাকে’ একত্র হওয়ার আহ্বান জানায়। তাদের প্রধান দাবি, ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।

ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে কুশওয়াহা বলেন, ‘আমি প্রথমে মজা করেই তাদের ইনস্টাগ্রাম অনুসরণ করেছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, সত্যিই হয়তো আমরা শিক্ষামন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করতে পারব।’

যদি সেটি ঘটে, তাহলে তা হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ১২ বছরের শাসনামলে ঘটা এ ধরনের প্রথম ঘটনা।

ভারতের জেন–জি প্রজন্মের বেশির ভাগই বড় হয়েছে শুধু মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শাসন দেখে। সমালোচকদের দাবি, ২০১৪ সালে মোদি ক্ষমতায় আসার পর থেকে সরকার ক্রমাগত ভিন্নমত দমন করেছে। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সূচকে ভারতের অবস্থানেরও অবনতি হয়েছে।

মোহাম্মদ আফতাব, দিল্লির বাসিন্দা এক যুবকআমি স্কুল শেষ করতে পারিনি। কিন্তু লাখো শিক্ষার্থী আছে, যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য রাত জেগে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে। তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং ওই অপরাধী মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করাটা আমাদের দায়িত্ব।

অভিজিৎ দীপকের আগমন

যুক্তরাষ্ট্রের শীতল আবহাওয়ার পরিবেশ থেকে সবে দেশে ফেরা অভিজিতের গায়ে ছিল কালো জিপ-আপ হুডি, মাথায় ক্যাপ।

চারপাশে অসংখ্য ক্যামেরা তাঁকে ঘিরে ধরেছিল। ভিড় ঠেলে মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে দীপকে জনতার দিকে ইশারা করতেই চারদিক স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। নয়াদিল্লির প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ঘামে ভিজে একপর্যায়ে তিনি হুডিটিও খুলে ফেলেন।

প্রথম বক্তব্যেই দীপকে আগের রাতের উদ্বেগপূর্ণ বিমানযাত্রার কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, তাঁর পরিবার আশঙ্কা করছিল, দিল্লিতে নামার পরপরই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।

‘কিন্তু এই ভয় শুধু আমার মায়ের নয়’—এ কথা বলতেই জনতা সমস্বরে চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘লজ্জা! লজ্জা!’

দীপকে এরপর বলেন, ‘এ দেশের প্রতিটি মা–ই ভয় পান যে তাঁর সন্তান যদি রাজনীতি নিয়ে কথা বলে, যদি সরকারের সমালোচনা করে, তাহলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে।’

গত কয়েক বছরে মোদি সরকারের আমলে বেশ কয়েকজন মানবাধিকারকর্মী ও ছাত্রনেতাকে বন্দী করা হয়েছে। বিরোধী দল ও সরকারের সমালোচকদের অভিযোগ, এটি দেশকে ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তবে বিজেপি এবং নরেন্দ্র মোদির সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের দাবি, দেশের আইন ও সংবিধান মেনেই তারা কাজ করেছে।

৩০ বছর বয়সী দীপকে মাত্র দুই বছর আগে জনসংযোগ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নিতে যুক্তরাষ্ট্রে যান। অথচ এখন হঠাৎ করেই নিজেকে একটি রাজনৈতিক আন্দোলনের নেতৃত্বে দেখতে পাচ্ছেন। গত মাসে আল–জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, তাঁর উদ্যোগ যে বিপুল সাড়া পেয়েছে, সেটির প্রতি তিনি একধরনের দায়িত্ববোধ অনুভব করেন।

প্রচণ্ড গরমে ক্লান্ত হয়ে একসময় দীপকে মাইক্রোফোন অন্য একজনের হাতে তুলে দেন। তিনি দেয়ালে হেলান দিয়ে পানি পান করেন এবং হাতে থাকা বোতলের বাকি অংশ জনতার দিকে ছুড়ে দেন।

ভিড়ের মধ্য থেকে এক তরুণ চিৎকার করে বলে ওঠে, ‘অভিজিৎ, আমরা তোমাকে ভালোবাসি!’

অনেক বিক্ষোভকারী তেলাপোকার মুখোশ পরে এসেছিলেন। কারও হাতে ছিল গোলাপ, কারও হাতে ফুলের তোড়া। আবার অনেকে বইও সঙ্গে এনেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীপকের দল তাঁদের এমনটাই করতে বলেছিল।

অনেক বিক্ষোভকারী তেলাপোকার মুখোশ পরে এসেছিলেন। কারও হাতে ছিল গোলাপ, কারও হাতে ফুলের তোড়া। আবার অনেকে বইও সঙ্গে এনেছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দীপকের দল তাঁদের এমনটাই করতে বলেছিল।

পরে ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলের নীল জার্সি পরে আবার বক্তব্য দেন দীপকে। তিনি বলেন, ‘যাঁরা মনে করেন ভারতের তরুণেরা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেয়, তাঁরা এখানে এসে এই দৃশ্য দেখে যান।’

এরপর আরও দৃঢ় কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘যাঁরা ভাবছেন আমরা শুধু স্লোগান দিয়ে চলে যাব, আমি তাঁদের বলছি—আমরা তেলাপোকা। আর শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা এখানেই থাকব।’

ভারতের নয়াদিল্লির বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) নেতা অভিজিৎ দীপকে তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে হাত নেড়ে অভিবাদন জানান। এ সময় তাঁর হাতে বি আর আম্বেদকরের আত্মজীবনীর একটি কপি দেখা যায়। ৬ জুন, ২০২৬

‘রাস্তায় নামতেই হবে’

অভিজিৎ দীপকেকে ভালোভাবে দেখার জন্য একটি গাছে উঠে বসেন ২৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ আফতাব। দিল্লির উপকণ্ঠের একটি স্যাটেলাইট শহরে তাঁর বসবাস।

আফতাব বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে তাঁর পক্ষে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে তিনি জীবিকা নির্বাহের জন্য মুদি পণ্য সরবরাহের কাজ করেন। তাঁর কোনো সামাজিক নিরাপত্তা–সুবিধাও নেই।

তেলাপোকার মুখোশ পরে থাকা আফতাব আল–জাজিরাকে বলেন, ‘একদিন কাজ না করলে হয়তো রাতের খাবারের অর্থও জুটবে না। তারপরও আমি এখানে আসতে চেয়েছি।’

আফতাব আরও বলেন, ‘আমি স্কুল শেষ করতে পারিনি। কিন্তু লাখো শিক্ষার্থী আছে, যারা নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য রাত জেগে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে। তাদের পাশে দাঁড়ানো এবং ওই অপরাধী মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করাটা আমাদের দায়িত্ব।’

ভারতে সাড়া ফেলা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতা কে এই অভিজিৎ

এদিকে মোদি সরকার এখনো এই বিক্ষোভ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি।

বিক্ষোভস্থল থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে পুরো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছিলেন শিবানি নামের এক পুলিশ কর্মকর্তা। তাঁর বড় মেয়ে এই বিক্ষোভে ছিল। তবে এতে তাঁর কোনো আপত্তি নেই বলে জানান শিবানি। সরকারি আক্রোশের আশঙ্কায় তিনি নিজের পুরো নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।

শিবানি বলেন, ‘এই ছেলেমেয়েরা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন। একজন অভিভাবক হিসেবে আমিও উদ্বিগ্ন।’

এরপর তিনি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘একটা সময় তো আসে, যখন মানুষের রাস্তায় নামা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না, তাই না?’

দিল্লির যন্তর মন্তরে ‘তেলাপোকা’র সমাবেশ

Read full story at source