পরীক্ষা

· Prothom Alo

জর্ডান দম্পতি ওই পরীক্ষার কথা কখনো মুখে আনেন না। ডিকির বারোতম জন্মদিনে মিসেস জর্ডান প্রথম ছেলের সামনে প্রসঙ্গটা তুললেন। তাঁর গলায় একরাশ উদ্বেগ; সে জন্যই ডিকির বাবা বেশ কড়া গলায় জবাব দিতে বাধ্য হলেন।

Visit newsbetting.cv for more information.

‘অযথা দুশ্চিন্তা কোরো না তো। ও ভালোই করবে।’

নাশতার টেবিলে বসে আছে সবাই। ডিকি কৌতূহলী চোখে প্লেট থেকে মুখ তুলে তাকাল। তীক্ষ্ণ চোখ, সোনালি চুল; বেশ চটপটে আর অস্থির স্বভাবের কিশোর ডিকি। মা–বাবার মধ্যে হঠাৎ এই উত্তেজনার কারণ সে ঠিক বুঝতে পারল না। তবে সে জানে, আজ ওর জন্মদিন। আজকের দিনটা সবাই মিলেমিশে আনন্দে কাটাবে, এটাই ওর একমাত্র চাওয়া।

সে জানে, ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টের কোথাও নিশ্চয়ই উপহারের প্যাকেটগুলো আছে। র৵াপিং করা আছে নিশ্চয়ই, ওপরে ফিতেও বাঁধা থাকার কথা। দেয়ালঘেঁষা খুদে রান্নাঘর ওদের। সেখানে স্বয়ংক্রিয় চুলায় নিশ্চয়ই গরম গরম রান্না হচ্ছে। ফুরফুরে মনে একধরনের আনন্দমাখা উত্তেজনা চেপে অপেক্ষায় আছে ডিকি। কিন্তু এগুলো বাড়তি জিনিস, ওর মূল চাওয়া হলো আনন্দ। সেই আনন্দের আবহটা কেমন যেন নষ্ট হয়ে গেছে। মায়ের আর্দ্র চোখ আর বাবার কপালে বিরক্তির ভাঁজ ফুরফুরে দিনটাই মাটি করে দিল।

‘কিসের পরীক্ষা, বাবা?’

টেবিল ক্লথের দিকে তাকিয়ে মা-ই জবাবটা দিলেন, ‘একধরনের সরকারি আইকিউ পরীক্ষা, বাবা। বারো বছরের সবাইকেই এই পরীক্ষাটা দিতে হয়। বুদ্ধিমত্তা যাচাই করে দেখে আরকি, তোমার ঘাবড়ানোর কিচ্ছু নেই!’

‘স্কুলের পরীক্ষার মতো?’

‘হ্যাঁ, ও রকমই।’ এটুকু বলেই মিস্টার জর্ডান টেবিল থেকে উঠে পড়লেন। উঠতে উঠতে আবার বললেন, ‘যাও খোকা, গিয়ে কমিকস পড়ো।’

ডিকি উঠে পড়ল। বসার ঘরের একটা কোনা ওর জন্য বরাদ্দ। সেই শিশুকাল থেকেই এই কোনাটি ওর নিজস্ব, একান্ত আপন। ধীর পায়ে কোনাটায় গিয়ে দাঁড়াল সে। একটা কমিকসের স্ট্যাক আছে এখানে—একটার ওপরে আরেকটা রাখা, এভাবে সাজানো। একদম ওপরের কমিকসটা হাতে তুলে নিল সে, কিন্তু পাতায় পাতায় রঙিন অ্যাকশনের গল্পগুলো ওকে ঠিক টানতে পারল না। জানালার কাছে দাঁড়িয়ে বিষণ্ন চোখে বাইরে তাকিয়ে রইল ডিকি। কেমন মন খারাপ করা কুয়াশার আবরণে ঢেকে আছে সবকিছু। বৃষ্টি হচ্ছে।

‘আজই কেন বৃষ্টি হচ্ছে, বাবা?’ চাপা স্বরে জানতে চাইল ডিকি, ‘কাল হয়নি কেন?’

নাবিল মুহতাসিমের গল্প—গত বৃহস্পতিবার

একটা আর্মচেয়ারে বসে সরকারি খবরের কাগজ পড়ছিলেন মিস্টার জর্ডান, ছেলের কথা শুনে তাঁর কপালটা আরও কুঁচকে গেল। বিরক্তি প্রকাশের জন্য কাগজের পাতাগুলো ঝাড়া দিলেন জোরে, ‘কারণ আজই হচ্ছে—এর মধ্যে অত কারণ খোঁজার কিছু নেই। তা ছাড়া, বৃষ্টি হলে ঘাস বড় হয়।’

‘কেন, বাবা?’

‘এটাই নিয়ম।’

ডিকি ভ্রু কোঁচকালো। ‘আচ্ছা বাবা, ঘাস সবুজ হয় কেন?’

রুক্ষ গলায় মিস্টার জর্ডান বললেন, ‘কেউ জানে না!’ পরক্ষণেই অবশ্য অমন রূঢ় আচরণের জন্য মনে মনে লজ্জিত হলেন ভদ্রলোক।

***

বেলা পড়ে এলে জন্মদিনের আমেজটা আবার ফিরে এল। মিসেস জর্ডান হাসিমুখে ডিকির হাতে রঙিন র৵াপিং পেপারে মোড়া উপহারগুলো তুলে দিলেন; বাবাও একটু হেসে এলোমেলো করে দিলেন ওর চুলগুলো, পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দিলেন মাথায়। ডিকি ওর মায়ের গালে চুমু খেল; বাবার সঙ্গে গম্ভীরভাবে হাত মিলিয়ে বোঝাল, বড় হয়ে গেছে সে। এবার কেক কাটার পালা। সবাই মিলে খুশি খুশি ‘হ্যাপি বার্থডে’ গাইল ওরা—হ্যাপি বার্থডে টু ডিয়ার ডিকি, হ্যাপি বার্থডে…এভাবে ওর জন্মদিন উদ্‌যাপিত হলো।

এক ঘণ্টা পরের কথা। জানালার পাশে বসে ডিকি দেখল, মেঘের আড়াল থেকে সূর্য উঁকি দিচ্ছে।

‘বাবা, সূর্য কত দূরে?’

বাবা হালকা গলায় বললেন, ‘পাঁচ হাজার মাইল হবে ধরো।’

আসলেই কি তা-ই? ডিকির কেমন যেন সন্দেহ হলো। কিন্তু বাবার কথার পিঠে আর কিছু বলার সাহস হলো না ওর।

***

খাবার টেবিলে বসে আছে ডিকি। এমন সময় ও টের পেল, মায়ের চোখ আবারও আর্দ্র হয়ে উঠেছে। বাবার মুখে পরীক্ষার কথা শোনার পর বুঝতে পারল সে, মা নিশ্চয়ই ওর রেজাল্ট নিয়ে চিন্তিত। মা যে কেন এত চিন্তা করেন! ও একদম ফেল করার মতো খারাপ ছাত্র না, পাস করবে নিশ্চয়ই।

এমন সময় গম্ভীর স্বরে বাবা বললেন, ‘শোন ডিকি, আজ তোমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।’

‘জানি, বাবা। আশা করি—’

‘শোনো, ভয়ের কিছু নেই, বুঝলে? প্রতিদিন হাজার হাজার কিশোর এই পরীক্ষা দেয়। সরকার শুধু জানতে চায়, তুমি কতটা বুদ্ধিমান। এইটুকুই, আর কিছু না।’

‘আমি তো স্কুলে ভালোই নম্বর পাই,’ ডিকির গলায় দ্বিধা।

‘এটা একটু অন্য রকম, বিশেষ এক ধরনের পরীক্ষা। ওরা তোমাকে শরবতের মতো একটা জিনিস খেতে দেবে প্রথমে। এরপর তুমি একটা ঘরে ঢুকবে; দেখবে, ওখানে একটা যন্ত্র আছে—’

বাবার কথার মাঝখানেই ডিকি জানতে চাইল, ‘কিন্তু কী খেতে দেবে ওটা, বাবা?’

‘এই, একধরনের শরবত। স্বাদটা পুদিনার মতো। ওরা শুধু নিশ্চিত করতে চায় যে তুমি সব প্রশ্নের সত্যি উত্তর দিচ্ছ। না না, সরকার কাউকে মিথ্যাবাদী ভাবে না। কিন্তু ওরা শতভাগ নিশ্চিত হতে চায়, এই আরকি।’

রবার্ট ব্রুস

এবার ডিকির মুখে বিভ্রান্তির সঙ্গে সঙ্গে ভয়ের ছাপও পড়ল। মায়ের দিকে তাকাল সে; উনি ওকে ভরসা দেওয়ার জন্য হাসলেন। কিন্তু সেই ম্লান হাসির দিকে তাকিয়ে ওর ভয়টা ঠিক কাটল না, মনে হলো মা জোর করে হাসছেন।

মিসেস জর্ডান বললেন, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে, বাবা।’

‘অবশ্যই!’ বাবাও সায় দিলেন। ‘তুমি লক্ষ্মী ছেলে, ডিকি; ভালোভাবেই পাস করে যাবে, আমি জানি। এরপর বাড়ি ফিরে আমরা উদ্‌যাপন করব, ঠিক আছে?’

‘হ্যাঁ, বাবা!’

***

নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট আগেই সরকারি শিক্ষা ভবনে পৌঁছে গেল মিস্টার জর্ডান ও ডিকি। বিশাল সব থাম বসানো লবি, মার্বেল পাথরের মেঝে—আলিশান ব্যাপার। লবি পেরিয়ে একটা খিলানের নিচ দিয়ে গেলেই স্বয়ংক্রিয় লিফট। সেই লিফটে চড়ে ওরা চারতলায় গেল। ৪০৪ নম্বর ঘরের সামনে পলিশ করা একটা টেবিল রাখা। সেটার পাশে চেয়ারে বসে আছে এক তরুণ; হাতে ক্লিপবোর্ড, ওতে একটা কাগজে তালিকা। সেই তালিকায় জে (J) অক্ষর খুঁজে বের করল তরুণ, নামের পাশে টিকচিহ্ন দিয়ে জর্ডানদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি দিল।

ঘরটার পরিবেশ ভাবগম্ভীর শীতল—সত্যি সত্যি ঠান্ডা না, বরং মনে হচ্ছে ওরা কোনো আদালত কক্ষে ঢুকে পড়েছে, এক্ষুনি বিচারকার্য শুরু হবে। ঘরের দুই পাশে সারি করে বসানো ধাতব টেবিল, প্রতিটার পেছনে একটা করে লম্বা বেঞ্চ রাখা। সেখানে আরও অনেক বাবা-ছেলে বসে অপেক্ষা করছেন। এক নারী সবাইকে একটা করে কী যেন কাগজ ধরিয়ে দিচ্ছে। নারীর কালো চুল ছোট করে ছাঁটা, পাতলা ঠোঁট। মিস্টার জর্ডানের হাতে একটা ফরম ধরিয়ে দিল। ভদ্রলোক ফরমটা পূরণ করে ফেরত দিলেন। ডিকিকে বললেন, ‘আর বেশিক্ষণ লাগবে না। তোমার নাম ডাকবে, বুঝলে? তখন তুমি ওই দরজা দিয়ে ভেতরে যাবে।’ আঙুল দিয়ে দরজাটা দেখিয়ে দিলেন তিনি।

দেয়ালের ভেতরে লাউডস্পিকার বসানো আছে, সেখান থেকেই প্রথম নামটা ভেসে এল। ডিকি দেখল, একটা ছেলে নিতান্ত অনিচ্ছায় বাবার পাশ থেকে উঠে ধীর পায়ে দরজার দিকে এগোচ্ছে।

১১টা বাজার ৫ মিনিট আগে ওর নাম শোনা গেল লাউড স্পিকারে—জর্ডান।

‘শুভকামনা, খোকা,’ বাবা ডিকির দিকে তাকালেন না। ‘পরীক্ষা শেষে আমি তোমাকে নিতে আসব।’

ডিকি দরজার দিকে এগিয়ে গেল, নব ঘুরিয়ে ঢুকে পড়ল ভেতরে। আবছা অন্ধকার ঘরে ধূসর পোশাক পরা এক লোক বসে আছে, তার চেহারা ঠিকঠাক দেখাও যাচ্ছে না।

ইশারায় টেবিলের পাশের একটা উঁচু টুল দেখিয়ে লোকটা নিচু স্বরে বলল, ‘বসো। তোমার নাম রিচার্ড জর্ডান?’

‘জি, স্যার।’

‘তোমার ক্ল্যাসিফিকেশন নম্বর ৬০০-১১৫। এটা খেয়ে নাও, রিচার্ড।’

টেবিল থেকে একটি প্লাস্টিকের কাপ ডিকির হাতে দিল লোকটা। ভেতরের তরলটা ঘন, ঘোলের মতো; স্বাদটা পুদিনার মতো হলেও ফ্লেভারটা খুবই হালকা। ডিকি সেটা এক চুমুকে খেয়ে নিল, খালি কাপটা ফিরিয়ে দিল লোকটাকে।

চুপচাপ বসে কেমন যেন ঝিমুনি চলে এল ওর। লোকটা এখনো ব্যস্ত ভঙ্গিতে কাগজে কী যেন লিখছে। হঠাৎ মুখ তুলে ঘড়ি দেখল, এরপর দ্রুত পায়ে ডিকির ঠিক সামনে এসে দাঁড়াল। পকেট থেকে কলমের মতো কী যেন বের করে আলো ফেলল ডিকির চোখে।

‘ঠিক আছে। আমার সঙ্গে এসো, রিচার্ড।’

ডিউক জনের গল্প—কে

ডিকিকে ঘরের এক কোণে নিয়ে গেল লোকটা। এখানে একটা কাঠের আর্মচেয়ার, সামনে যন্ত্রের মতো রাখা। অনেকগুলো ডায়াল আছে যন্ত্রটায়। চেয়ারের বাঁ দিকের হাতলে একটা মাইক্রোফোন বসানো। বসার পর ডিকি দেখল, ওটার মাথাটা একদম ওর ঠোঁটের কাছে রয়েছে।

‘স্থির হয়ে বসো, রিচার্ড। এখন তোমাকে কিছু প্রশ্ন করা হবে। তুমি খুব সাবধানে সেগুলো নিয়ে ভাববে, এরপর উত্তরটা বলবে। ব্যস, এটুকুই—বাকিটা যন্ত্রই সামলে নেবে।’

‘জি, স্যার।’

‘আমি তোমাকে এখানে একা রেখে যাচ্ছি। তুমি যখন শুরু করতে চাও, তখন শুধু বলবে “রেডি”।’

‘জি, স্যার।’

লোকটা ডিকির কাঁধে আলতো করে চাপ দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।

ডিকি বলল, ‘রেডি।’

যন্ত্রটায় আলো জ্বলে উঠল। একটা যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ভেসে এল: ‘এই ধারাটি পূর্ণ করো—এক, চার, সাত, দশ...’

***

মিস্টার ও মিসেস জর্ডান ড্রয়িংরুমে বসে আছেন। কেউ কোনো কথা বলছেন না; কী হতে পারে, তা নিয়ে কল্পনাও করতে চাইছেন না।

বিকেল চারটার খানিকটা আগে টেলিফোন বেজে উঠল। দ্রুত হাতে ফোনটা ধরতে চাইছিলেন মিসেস জর্ডান, কিন্তু তাঁর স্বামী আরও দ্রুত ফোনটা তুলে নিলেন।

‘মিস্টার জর্ডান বলছেন?’ গম্ভীর, মাপা গলায় বলা হলো কথাটা।

‘জি, বলছি।’

‘সরকারি শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে বলছি। আপনার ছেলে রিচার্ড এম জর্ডান, ক্ল্যাসিফিকেশন নম্বর ৬০০-১১৫, সরকারি পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানাতে হচ্ছে, ওর বুদ্ধিমত্তার মাত্রা (আইকিউ) সরকার নির্ধারিত সীমার চেয়ে বেশি, যা নতুন আইনের কার্যপ্রণালি বিধির পঞ্চম অনুচ্ছেদের ৮৪ নম্বর ধারা অনুসারে দণ্ডনীয় অপরাধ।’

ঘরের ওপাশ থেকে মিসেস জর্ডান আর্তনাদ করে উঠলেন, স্বামীর মুখের অভিব্যক্তি দেখেই বুঝে গেছেন সব।

সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বরটা বলে চলল, ‘আপনি চাইলে এখন অথবা পরে ফোন করে জানাতে পারবেন, আপনার ছেলের মৃতদেহটি সরকারিভাবে সৎকার করতে চান, নাকি আপনারা ব্যক্তিগত কোনো কবরস্থানে দাফন করবেন? সরকারিভাবে সৎকারের জন্য খরচ পড়বে ১০ ডলার।’

লেখক পরিচিতি মার্কিন লেখক হেনরি স্লেজার (১৯২৭-২০০২) রহস্য ও থ্রিলার ঘরানার লেখার জন্য সুপরিচিত। সব বয়সী পাঠকের কাছেই তাঁর ছোটগল্পগুলো দারুণ জনপ্রিয়। বিজ্ঞাপনজগতে কপিরাইটার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেছিলেন স্লেজার। বিজ্ঞাপনের ভাষায় যে সংক্ষিপ্ততা ও তীক্ষ্ণতা থাকে, সেটি পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যকর্মেও প্রভাব ফেলেছিল। স্লেজার দীর্ঘদিন কাজ করেছেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা আলফ্রেড হিচককের সঙ্গে। হিচককের জনপ্রিয় টিভি সিরিজ ‘অ্যালফ্রেড হিচকক প্রেজেন্টস’-এর জন্য শতাধিক চিত্রনাট্য লিখেছিলেন হেনরি স্লেজার। ‘এক্সামিনেশন ডে’ তাঁর আলোচিত একটি গল্প।কেউঢালাতে ঈদ আনন্দ

Read full story at source