ট্রাম্পের বিরুদ্ধে কি আগ্রাসনের অভিযোগ আনা যাবে?

· Prothom Alo

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানের বিরুদ্ধে চালানো সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নিয়ে বিতর্ক যেন থামছেই না। শুধু বিরোধী শিবির নয়, ডানপন্থী বিশ্লেষকদের মধ্যেও অনেকেই এটিকে কটাক্ষ করে ‘অপারেশন এপিক ফেইল’ বলছেন। তাঁদের যুক্তি, এই যুদ্ধ কোনো সুপরিকল্পিত কৌশলের ফল নয়; বরং এটি ছিল উদ্দেশ্যহীন এক সামরিক অভিযান। এখানে বিপুল অর্থ, আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র বিনষ্ট হয়েছে এবং অসংখ্য প্রাণ হারিয়েছে; কিন্তু রাজনৈতিক বা কৌশলগত কোনো সুস্পষ্ট সাফল্য মেলেনি।

Visit bettingx.club for more information.

আইনগত দিক থেকেও এই অভিযানের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অধিকাংশ আন্তর্জাতিক আইনবিশেষজ্ঞ মনে করেন, এই যুদ্ধ জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিকে লঙ্ঘন করেছে। সেই সনদ স্পষ্ট করে বলেছে—কোনো রাষ্ট্র আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছাড়া বা নিরাপত্তা পরিষদের অনুমোদন ছাড়া অন্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করতে পারবে না। ট্রাম্প প্রশাসনের এই অভিযান সেই সীমারেখা অতিক্রম করেছে বলেই তাঁদের মত।

যুদ্ধটি সফল না ব্যর্থ কিংবা বৈধ না অবৈধ—এ আলোচনা এই দুই সীমার মধ্যেই আটকে থাকলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন আড়ালে থেকে যায়। সেটি হলো এই যুদ্ধ কি কেবল অবৈধ, নাকি এটি আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে ‘আগ্রাসনের অপরাধ’? আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রথম প্রসিকিউটর লুইস মোরেনো অকাম্পো ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই অভিযানে সেই অপরাধের লক্ষণ রয়েছে। 

এই জায়গায় এসে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য সামনে আসে। আন্তর্জাতিক আইনে কোনো যুদ্ধ অবৈধ হতে পারে, কিন্তু তা সব সময় অপরাধ নয়। অবৈধ যুদ্ধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক চাপ বা আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা আরোপ করা যায়। উদাহরণ হিসেবে স্পেনের অবস্থান উল্লেখযোগ্য। তারা এই অভিযানের সময় যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয়নি এবং নিজেদের আকাশসীমাও বন্ধ করে দেয়। এটি একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রতিবাদ। কিন্তু যদি কোনো যুদ্ধকে ‘অপরাধ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তাহলে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা পায়। তখন আর শুধু রাষ্ট্র নয়, সেই যুদ্ধের পরিকল্পনাকারী ও পরিচালনাকারী ব্যক্তিদেরও (যেমন রাষ্ট্রনেতা, সামরিক কমান্ডার) ব্যক্তিগতভাবে আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব হয়। অর্থাৎ দায়বদ্ধতা রাষ্ট্র থেকে সরে এসে ব্যক্তির ওপর বর্তায়।

এই ধারণা কিন্তু খুব পুরোনো নয়। দীর্ঘকাল ধরে যুদ্ধ ঘোষণা করা ছিল রাষ্ট্রের সার্বভৌম অধিকারের অংশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নুরেমবার্গ বিচারে প্রথমবারের মতো এই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। নাৎসি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ‘শান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ’—অর্থাৎ আগ্রাসী যুদ্ধ পরিকল্পনা ও পরিচালনার অভিযোগ আনা হয়। এই বিচারই আন্তর্জাতিক আইনে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে, যেখানে যুদ্ধ নিজেই অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

অবশেষে এসে দেখা যায়, এই পুরো বিতর্কই অনেকটা তাত্ত্বিক। কারণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কাঠামোই এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রায় অসম্ভব। এমনকি যদি কোনো রাষ্ট্রনেতা স্বেচ্ছায় আদালতের সামনে হাজিরও হন, তবু নানা আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁকে আগ্রাসনের অপরাধে বিচার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

মানবতাবিরোধী অপরাধ বা গণহত্যা সরাসরি মানুষের ওপর সংঘটিত ক্ষতির প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা যায়। কিন্তু আগ্রাসনের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন। এখানে প্রশ্ন ওঠে—আন্তর্জাতিক আইন কি ব্যক্তিকে রক্ষা করতে চায়, নাকি রাষ্ট্রের সীমারেখাকে? আগ্রাসনের অপরাধ কি রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে একধরনের নিয়ন্ত্রণ, নাকি সেই ক্ষমতাকেই আরও শক্তিশালী করার একটি হাতিয়ার? এই বিতর্ক কয়েক দশক ধরে চলেছে। শীতল যুদ্ধের সময় রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে কোনো ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি। অবশেষে ২০১০ সালে রোম সনদের পর্যালোচনা সম্মেলনে একটি সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয় এবং ২০১৭ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে এই অপরাধে বিচার করার ক্ষমতা পায়।

কিন্তু এখানেও একটি বড় শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। সব আগ্রাসন অপরাধ নয়—শুধু সেই আগ্রাসনই অপরাধ, যা তার ‘চরিত্র, গুরুত্ব এবং ব্যাপ্তি’ দিয়ে জাতিসংঘ সনদের একটি ‘স্পষ্ট’ লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত হয়। এই ‘স্পষ্টতা’ বা ‘ম্যানিফেস্টো’ শব্দটাই সবচেয়ে বেশি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। কারণ, এটি নির্ধারণের কোনো নির্দিষ্ট মানদণ্ড নেই।

এই অস্পষ্টতার মধ্যেই অনেক আইনজ্ঞ মনে করেন, আগ্রাসন তখনই অপরাধ হয়ে ওঠে, যখন তা একধরনের বিকৃত রূপ নেয়; অর্থাৎ যখন সেই যুদ্ধের সঙ্গে ব্যাপক ও নিয়মিত নৃশংসতা জড়িয়ে পড়ে। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণকে সহজেই আগ্রাসনের অপরাধ বলা যায়। অন্যদিকে ট্রাম্পের ইরান অভিযান এই নিরিখে অনেক বেশি জটিল। একদিকে ১৩ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা (যার মধ্যে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও ছিল) এবং ‘অপ্রয়োজনীয় নিয়ম মেনে চলার দরকার নেই’ বলে করা মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রকাশ্য মন্তব্য ইঙ্গিত দেয়, যুদ্ধটি নিয়ন্ত্রণহীন এবং বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল। এসব উপাদান এটিকে অপরাধের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।

কিন্তু বিপরীত যুক্তিও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তারা ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করেনি। অর্থাৎ এখানে পরিকল্পিত গণহত্যা বা নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের প্রমাণ নেই, যা আগ্রাসনের অপরাধ প্রমাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হতে পারে।

সবশেষে এসে দেখা যায়, এই পুরো বিতর্কই অনেকটা তাত্ত্বিক। কারণ, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কাঠামোই এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রায় অসম্ভব। এমনকি যদি কোনো রাষ্ট্রনেতা স্বেচ্ছায় আদালতের সামনে হাজিরও হন, তবু নানা আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁকে আগ্রাসনের অপরাধে বিচার করা কঠিন হয়ে পড়ে।

  • লরেন্স ডগলাস আমহার্স্ট কলেজের আইন, বিচারতত্ত্ব ও সামাজিক চিন্তার অধ্যাপক

  • স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

Read full story at source