‘মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু’: সম্ভাব্য মার্কিন হামলা ঠেকাতে যেভাবে প্রস্তুত হচ্ছে কিউবা

· Prothom Alo

হেলেন ইয়াফে ৩০ বছর ধরে নিয়মিত কিউবায় আসা–যাওয়া করছেন। একবার এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় (ক্যাটাগরি ফোর হারিকেন) যখন দ্বীপরাষ্ট্রটির দিকে ধেয়ে আসছিল, সেই সময়ের স্মৃতি আজও গেঁথে আছে তাঁর মনে।

Visit livefromquarantine.club for more information.

এই শিক্ষাবিদ ও পডকাস্টার তখন একটি বাড়িতে আরও ১৩ জনের সঙ্গে অবস্থান করছিলেন। প্রবল ঝড় আঘাত হানলেও সেখানে থাকা মানুষের মধ্যে কোনো আতঙ্ক ছিল না। কারণ, দুর্যোগের সময় কার কী ভূমিকা হবে, তা প্রত্যেকে আগে থেকেই জানতেন।

ওই বাড়িতে থাকা কেউ কেউ বয়স্ক ও অসহায় প্রতিবেশীদের আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছে দিচ্ছিলেন। অন্যরা ঝড়ের বেগ কমার সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় কিউবার জাতীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা প্রশংসা পেয়েছে জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) কাছ থেকে। চরম আবহাওয়ার কবলে ঘনঘন পড়লেও কিউবায় প্রাণহানির সংখ্যা খুব কম। দেশটির এই সক্ষমতা সমাদৃত বিশ্বজুড়ে।

দুর্যোগ মোকাবিলার সেই একই মডেলকে এখন অন্য একটি হুমকির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে চাইছে হাভানা। তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত।

কিউবার প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্য সম্প্রতি আরও তীব্রতর হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় কৌঁসুলিরা ৩০ বছর আগের এক ঘটনায় কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রোকে অভিযুক্ত করেছেন। এতে দুই দেশের সম্পর্ক গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

১৯৯৬ সালে কিউবার কয়েকটি বিমান দেশটির নির্বাসিতদের দ্বারা পরিচালিত দুটি উড়োজাহাজ ভূপাতিত করেছিল। এতে তিনজন মার্কিন নাগরিকসহ চারজন নিহত হয়েছিলেন। এই ঘটনায় রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের হত্যার ষড়যন্ত্র, হত্যাকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট চারটি ও বিমান ধ্বংস-সংক্রান্ত দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে।

১৯৯৬ সালে কিউবার কয়েকটি বিমান দেশটির নির্বাসিতদের দ্বারা পরিচালিত দুটি উড়োজাহাজ ভূপাতিত করেছিল। এতে তিনজন মার্কিন নাগরিকসহ চারজন নিহত হয়েছিলেন। এই ঘটনায় রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে মার্কিন নাগরিকদের হত্যার ষড়যন্ত্র, হত্যাকাণ্ড–সংশ্লিষ্ট চারটি ও বিমান ধ্বংস–সংক্রান্ত দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে।

উত্তেজনার এই আবহে ১৬ মে কিউবার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ ‘সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সুরক্ষায় পারিবারিক নির্দেশিকা’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এতে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা মোকাবিলায় পরিবারের দায়িত্ব ও সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা নিয়মাবলি কী হবে, তা বলা হয়েছে।

যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের লাতিন আমেরিকান রাজনৈতিক অর্থনীতির অধ্যাপক ও ‘কিউবা অ্যানালাইসিস’ পডকাস্টের উপস্থাপক ইয়াফে আল–জাজিরাকে বলেন, এই নির্দেশিকা কিউবার প্রতিরক্ষা তত্ত্ব ‘ওয়ার অব অল পিপল’ বা জনযুদ্ধের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর কিউবা এ নীতি গ্রহণ করে। এর মূল লক্ষ্য হলো গেরিলা যুদ্ধ, স্থানীয় মিলিশিয়া এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের সাধারণ জনগণকে সংগঠিত করে বিদেশি হামলা প্রতিহত করা।

– হেলেন ইয়াফে, অধ্যাপক, গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়কিউবার প্রতিরক্ষা তত্ত্ব ‘ওয়ার অব অল পিপল’ বা জনযুদ্ধের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে। এর মূল লক্ষ্য হলো গেরিলা যুদ্ধ, স্থানীয় মিলিশিয়া এবং বেসামরিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের সাধারণ জনগণকে সংগঠিত করে বিদেশি হামলা প্রতিহত করা।

ইয়াফে বলেন, ‘কিউবার প্রত্যেক নাগরিক সামরিকভাবে প্রশিক্ষিত। তাঁরা এই জাতীয় প্রতিরক্ষাব্যবস্থার আওতাভুক্ত।’

রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান চাপের একটি অংশ। অন্যান্য চাপের মধ্যে রয়েছে গত কয়েক মাস ধরে কিউবার উপকূলে মার্কিন নজরদারি বিমানের টহল বৃদ্ধি, মার্কিন সিনেটে কিউবার বিরুদ্ধে ট্রাম্পের সামরিক শক্তি ব্যবহারের ক্ষমতা সীমিত করার ব্যর্থ চেষ্টা এবং কিউবাকে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ‘উল্লেখযোগ্য হুমকি’ ঘোষণা করে নির্বাহী আদেশ জারি।

কিউবার সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো রাউল কাস্ত্রোর বিরুদ্ধে খুনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ এনেছে যুক্তরাষ্ট্র

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবার বিরুদ্ধে নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন। ট্রাম্প গতকাল বৃহস্পতিবার ইঙ্গিত দিয়েছেন, কিউবার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলে সেটি তাঁর আমলেই হবে।

একই দিন রুবিও সাংবাদিকদের বলেন, রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে অনেক বছর ধরে কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি। তাঁর দাবি, কিউবার বর্তমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং বর্তমান শাসনব্যবস্থা রেখে সেটি আর ঠিক করা সম্ভব নয়।

১৬ মে কিউবার বেসামরিক প্রতিরক্ষা বিভাগ ‘সামরিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সুরক্ষায় পারিবারিক নির্দেশিকা’ শিরোনামে একটি দীর্ঘ নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে। এতে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা মোকাবিলায় পরিবারের দায়িত্ব ও সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা নিয়মাবলি কী হবে, তা বলা হয়েছে।

কিউবাকে অন্যায়ভাবে ‘হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করায় রুবিওর তীব্র সমালোচনা করেছেন কিউবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রদ্রিগেজ। তিনি বলেন, ‘মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবারও মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন, যাতে একটি সামরিক আগ্রাসন উসকে দেওয়া যায়। এমন পদক্ষেপ কিউবা ও যুক্তরাষ্ট্র—উভয় দেশের নাগরিকদের রক্তপাতের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’

এই পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত শিগগিরই কিউবায় সামরিক অভিযান চালাতে যাচ্ছে।

কিউবা বর্তমানে কতটা সুরক্ষিত, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তা সত্ত্বেও কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, দীর্ঘ বিদ্যুৎ–বিভ্রাট, মার্কিন অবরোধের কারণে জ্বালানিসংকট এবং ভেনেজুয়েলায় প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতি থাকলেও কিউবা মোটেও অরক্ষিত নয়।

কী ঘটেছিল ৩০ বছর আগে, যে জন্য রাউল কাস্ত্রোর বিচার করতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

ভেনেজুয়েলা মডেল ‘কাজ করবে না’ কিউবায়

যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ বাহিনী গত ৩ জানুয়ারি মাদুরোকে তাঁর দেশ থেকে তুলে নিয়ে যায়। সেই অভিযানের ক্ষিপ্রতা বিশ্বকে স্তম্ভিত করেছিল।

ইয়াফে জানান, সেই লড়াইয়ে নিহতদের মধ্যে ৩২ জন ছিলেন কিউবার নাগরিক, যাঁরা ‘সত্যিই প্রচণ্ড প্রতিরোধ’ গড়ে তুলেছিলেন। খোদ ট্রাম্প এই প্রতিরোধের কথা স্বীকার করেন।

– কার্লোস মালামুদ, বিশ্লেষক, এলকানো রয়্যাল ইনস্টিটিউটভেনেজুয়েলার তুলনায় কিউবার সেনাবাহিনী অনেক বেশি প্রশিক্ষিত। তাদের সরঞ্জামও তুলনামূলকভাবে উন্নত।

এদিকে কিউবার প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ-ক্যানেল ১৮ মে বলেন, কিউবার বিরুদ্ধে যেকোনো মার্কিন সামরিক পদক্ষেপ একটি ‘রক্তবন্যা’ ডেকে আনবে। অথচ এই দ্বীপরাষ্ট্র কারও জন্য হুমকি নয়।

ইয়াফে বলেন, ‘তাঁরা (যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা) ভেনেজুয়েলা মডেলের কথা বলছেন। প্রশ্ন হলো, তাঁরা কি কিউবাতেও একই মডেল প্রয়োগ করবেন? কিন্তু এটি কিউবায় কাজ করবে না।’

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘কিউবার নেতা ও জনগণের কথা হলো তাঁরা (মার্কিন কর্মকর্তারা) কী মনে করেন, ওটাই প্রচণ্ড প্রতিরোধ ছিল? সেখানে তো কিউবার নিরাপত্তাকর্মী ছিলেন মাত্র ৩২ জন। ভাবুন—তাঁরা যদি এখানে আসে, তাহলে এক কোটি মানুষ তাঁদের প্রতিরোধ করবে।’

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প

স্পেনের মাদ্রিদে অবস্থিত এলকানো রয়্যাল ইনস্টিটিউটের আর্জেন্টাইন লাতিন আমেরিকা বিশ্লেষক কার্লোস মালামুদও একমত পোষণ করেন ইয়াফের সঙ্গে। কিউবার চ্যালেঞ্জ ভেনেজুয়েলার চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে মনে করেন তিনি।

মালামুদ বলেন, ভেনেজুয়েলার তুলনায় কিউবার সেনাবাহিনী অনেক বেশি প্রশিক্ষিত। তাঁদের সরঞ্জামও তুলনামূলকভাবে উন্নত।

তবে ফ্লোরিডা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ইনস্টিটিউট ফর কিউবান স্টাডিজের কিউবান-আমেরিকান পরিচালক সেবাস্তিয়ান আরকোস সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি আল–জাজিরাকে বলেন, ‘কিউবার সামরিক বাহিনী সেকেলে। তাদের মার্কিন বাহিনীকে প্রতিরোধ করার তেমন একটা সামর্থ্য নেই।’

তবে তিনি এটাও মানেন, ভেনেজুয়েলার তুলনায় কিউবা বেশি চ্যালেঞ্জিং। এটা যতটা না সামরিক শক্তির কারণে, তার চেয়ে বেশি হলো তারা এই ধরনের অভিযান মোকাবিলায় প্রস্তুতির জন্য দীর্ঘ সময় পেয়েছে।

কিউবার সামরিক সক্ষমতা যা–ই হোক, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির দূরত্বকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

মালামুদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের খুব কাছে হওয়ার কারণে কিউবার পাল্টা জবাব দেওয়ার ক্ষমতা অনেক বেশি। ভেনেজুয়েলা বা ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের এমন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি।

কিউবায় হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে যে পাল্টা হামলা হবে, তা কোনো কল্পনা নয়, বরং তা বাস্তব হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষক কার্লোস মালামুদ। তাঁর ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক জনগণ, মিয়ামিসহ বিভিন্ন শহরে ক্ষয়ক্ষতি করার ক্ষমতা তাদের অনেক বেশি।’

১৭ মে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, কিউবা ৩০০টি সামরিক ড্রোন সংগ্রহ করেছে। তারা গুয়ান্তানামো বে–র মার্কিন নৌঘাঁটি, নৌযান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বীপ শহর কী ওয়েস্টে হামলার পরিকল্পনা করছে।

অন্যদিকে সেবাস্তিয়ান আরকোস বলেন, ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মার্কিন জনমতকে খেপিয়ে তুলতে কিউবা যুক্তরাষ্ট্রের বেসামরিক কেন্দ্রগুলোতে হামলা চালাতে পারে।

১৭ মে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস মার্কিন গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে দাবি করা হয়েছে, কিউবা ৩০০টি সামরিক ড্রোন সংগ্রহ করেছে। তারা গুয়ান্তানামো বে–র মার্কিন নৌঘাঁটি, নৌযান ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বীপ শহর কী ওয়েস্টে হামলার পরিকল্পনা করছে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও

তবে ইয়াফে ও মালামুদ এই গোয়েন্দা তথ্যের সত্যতা নিয়ে সন্দিহান। তাঁদের মতে, কিউবা কোনো ধরনের সামরিক সংঘাতের পক্ষে নয়। অন্যদিকে আরকোস মনে করেন, অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনটি ‘যৌক্তিক’। কারণ, কিউবা সব সময় রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। সম্পদের অভাব থাকা সত্ত্বেও দেশটি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে।

তবে কিউবা এরই মধ্যে প্রতিবেদনটিকে মার্কিন হামলার অজুহাত তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। তারা বলেছে, যেকোনো ধরনের মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তাদের আত্মরক্ষার অধিকার রয়েছে।

ভিন্নধর্মী অভ্যন্তরীণ সীমাবদ্ধতা

সামরিক হিসাব-নিকাশের বাইরে এমন কিছু রাজনৈতিক বিষয় আছে, যা কিউবায় মার্কিন হামলাকে অনেক বেশি জটিল করে তুলতে পারে।

ইয়াফে বলেন, দ্বীপটিতে হামলা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন করে অভিবাসনের জোয়ার সৃষ্টি হতে পারে। আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এটা ট্রাম্প ও তাঁর দলকে বড় ধরনের চাপে ফেলতে পারে। কারণ, অভিবাসনবিরোধিতা করেই ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুলেছেন।

মালামুদ বলেন, কিউবা বংশোদ্ভূত আমেরিকানরা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ভেনেজুয়েলার প্রবাসীদের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছেন। মূলত এই দুই পক্ষের মধ্যে কোনো তুলনা চলে না। মার্কিন কংগ্রেসে কিউবা বংশোদ্ভূত রাজনীতিবিদের উল্লেখযোগ্য প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও কিউবা বংশোদ্ভূত। এসব কারণে কিউবার প্রবাসী জনগণ ভেনেজুয়েলা ধরনের সমাধান মেনে নেবে না।

মালামুদ এ জটিলতা ব্যাখ্যা করে বলেন, ভেনেজুয়েলায় নেতার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু পুরোনো ক্ষমতা কাঠামো রয়ে গেছে। কিউবার নির্বাসিতরা কাস্ত্রো পরিবারের নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যবস্থার পরিবর্তন ছাড়া কোনো কিছু মেনে নেবে না।

অন্যদিকে ‘মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু, আমাদের জয় হবেই’—এটা হলো কিউবার বর্তমান শাসক গোষ্ঠীর জাতীয়তাবাদী চেতনার মূল কথা। তাই যুক্তরাষ্ট্রে অভিযুক্ত রাউল কাস্ত্রোকে অপহরণ করে সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ, এতে একদিকে কিউবান-আমেরিকান সমর্থকেরা সন্তুষ্ট হবেন না। অন্যদিকে রাউল কাস্ত্রোর অপহরণ কিউবার সরকারকে নমনীয় করার বদলে জেদ বাড়িয়ে দেবে।

চরম অর্থনৈতিক সংকটে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি

উরুগুয়ের ওআরটি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সহকারী অধ্যাপক মাতিয়াস ব্রাম সতর্ক করে বলেন, ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ কমে যাওয়ার পর কিউবায় ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশটিতে হামলার মতো কোনো ঘটনা পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

ব্রাম আল–জাজিরাকে বলেন, তাঁর ধারণা ছিল যুক্তরাষ্ট্র কখনো ভেনেজুয়েলায় সরাসরি হামলা চালাবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা হামলা চালিয়েছে এবং মাদুরোকে অপহরণ করেছে। তাই তিনি আগে ট্রাম্পকে গুরুত্ব না দিলেও এখন তাঁকে ভয় পাচ্ছেন।

তাঁর মতে, কিউবার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র কী পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে, লাতিন আমেরিকার বামপন্থী সরকারগুলো সেদিকে নিবিড় নজর রাখবে। বিশেষ করে কলম্বিয়া ও মেক্সিকো। কারণ, ট্রাম্প এসব দেশকেও হুমকি দিয়ে রেখেছেন।

কিউবার রাজধানী হাভানার সড়কের পাশে শোভা পাচ্ছে কিউবা বিপ্লবের নেতা ফিদেল কাস্ত্রো, সাবেক প্রেসিডেন্ট রাউল কাস্ত্রো এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিগেল দিয়াজ–ক্যানেলের প্রতিকৃতি

এদিকে কিউবার গভীর সংকটের মধ্যেই বুধবার দেশটির সঙ্গে নতুন সম্পর্ক গড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন রুবিও। তিনি হাভানাকে ১০ কোটি ডলারের খাদ্য ও ওষুধ সহায়তা দেওয়ার কথা বলেছেন। এটি মূলত ট্রাম্প প্রশাসনের আগের প্রস্তাবেরই অংশ। কিউবার প্রেসিডেন্ট দিয়াজ-ক্যানেল তাতে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছিলেন বলে জানা যায়।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধই যে কিউবার বর্তমান সংকটের মূল কারণ, তা রুবিও স্বীকার করেননি। বরং বিদ্যুৎ, খাদ্য ও জ্বালানি ঘাটতির জন্য তিনি কিউবার নেতৃত্বকেই দায়ী করেছেন।

বিশ্লেষক মালামুদ মনে করেন, ভেনেজুয়েলার তুলনায় কিউবা এখনো কিছু কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হামলা ঠেকানোর সক্ষমতা দেশটির রয়েছে। কিন্তু গভীর মানবিক সংকট শেষ পর্যন্ত সেই সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

মালামুদ বলেন, কিউবার পরিস্থিতির জটিলতা এখানেই। সংকট এখন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।

এই অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে, যুক্তরাষ্ট্র ও কিউবার দীর্ঘদিনের উত্তেজনার মধ্যে কিউবার ওয়ার অব অল পিপল বা জনগণের যুদ্ধ নীতি কি শুধু তাত্ত্বিক ধারণা হয়েই থাকবে, নাকি বাস্তবে রূপ নেবে।

হেলেন ইয়াফে মনে করেন, কিউবা লড়বে। তাঁর ভাষায়, হাভানাজুড়ে এখনো একটি স্লোগানই বেশি শোনা যাচ্ছে—‘নো সে রিন্দে নাদিয়ে’, অর্থাৎ এখানে কেউ আত্মসমর্পণ করে না।

Read full story at source