বদলে যাচ্ছে পর্যটন করপোরেশনের সেবা
· Prothom Alo

বাংলাদেশের জিডিপিতে পর্যটন খাতের অবদান বর্তমানে মাত্র ৩ শতাংশের ঘরে। অথচ নদীমাতৃক এই দেশের পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস। এই বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে পর্যটনকে একটি টেকসই ও লাভজনক শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে এখন আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের গৃহ চেইন হোটেল বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন (বাপক)। গতানুগতিক খোলস ভেঙে সংস্থাটি এখন গুরুত্ব দিচ্ছে আধুনিকায়ন ও ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর। নতুন নতুন অনেক হোটেল ও মোটেল তৈরি করছে করপোরেশন। এতে যুক্ত হচ্ছে চাহিদা অনুযায়ী নানা আধুনিক সেবা।
একুশ শতকের পর্যটকেরা শুধু সুন্দর দৃশ্য দেখেই তুষ্ট নন; তাঁরা খোঁজেন ঐতিহাসিক গাম্ভীর্যের সঙ্গে আধুনিক নাগরিক সুবিধা ও সব ধরনের নিরাপত্তা। এই চাহিদা মাথায় রেখে পর্যটন করপোরেশন এখন ইউনেসকো–স্বীকৃত ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটগুলোকে ঢেলে সাজাচ্ছে। বর্তমান সরকার দায়িত্বে আসার পরে নতুন প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে।
Visit casino-promo.biz for more information.
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গড়ে ওঠা বেশ কিছু নতুন হোটেল মোটেলে সেবা চালু হয়েছে।
বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ ও হজরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজারকে কেন্দ্র করে এলাকাটিকে একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন হাবে রূপান্তর করা হচ্ছে। সেখানে প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয়েছে অত্যাধুনিক ৭ তলাবিশিষ্ট ‘পর্যটন মোটেল ও ইয়ুথ ইন’। আধুনিক স্যুট রুম থেকে শুরু করে স্বল্প ব্যয়ের ডরমিটরি—সবই আছে এই একটি ভবনে। এর ফলে ওই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের আবাসন সংকটের স্থায়ী সমাধান হতে যাচ্ছে।
একই চিত্র দেখা যাচ্ছে উত্তরের জেলা দিনাজপুরেও। ঐতিহাসিক কান্তজিউ মন্দিরের স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ন রেখেই পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক মোটেল। অন্যদিকে মেহেরপুরের মুজিবনগরেও আধুনিক ডিজিটাল সেবাসহ পর্যটন মোটেল ঢেলে সাজানো হয়েছে, যা তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে ভ্রমণে আরও আগ্রহী করে তুলছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পর্যটনের আইকনিক ল্যান্ডমার্ক রাঙামাটির ‘ঝুলন্ত সেতু’ নিয়ে নেওয়া হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রতিবছর কাপ্তাই হ্রদের পানি বাড়লে সেতুটি তলিয়ে যাওয়ার যে চিরচেনা সমস্যা, তার স্থায়ী সমাধান খুঁজছে কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কতৃপক্ষের উদ্যোগে দেশের সেরা পর্যটন অর্থনৈতিক অঞ্চল সাবরাং ও নাফ ট্যুরিজম পার্ক স্থাপনের কাজ চলছে। বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে সেতুটির উচ্চতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘস্থায়ী উপকরণ ব্যবহার করে একটি নতুন ও টেকসই নকশা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেতুর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের স্বার্থে এর প্রবেশমূল্যও সামান্য বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
আগামীর পথে ‘স্মার্ট ট্যুরিজম’
বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে দেশে ‘স্মার্ট ট্যুরিজম’ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা হচ্ছে। পর্যটন করপোরেশন এখন এআই-চালিত ন্যাশনাল ড্যাশবোর্ড, স্মার্ট গাইড অ্যাপ এবং আরএফআইডি ট্যাগ প্রবর্তনের মতো আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করার কাজ করছে। বিশেষ করে সেন্ট মার্টিনের মতো পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন এলাকায় পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ই-টিকেটিং ও অনলাইন বুকিং বাধ্যতামূলক করার প্রক্রিয়া দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।
দীর্ঘদিন লোকসানে থাকা হোটেল-রেস্তোরাঁগুলোকে লাভজনক করতে এখন পেশাদার ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। এমনকি পর্যটনবহরে যুক্ত হচ্ছে পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক গাড়ি।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, ঐতিহ্যের কোনো ক্ষতি না করে আধুনিক স্থাপত্যের ব্যবহার এবং প্রযুক্তির সঠিক সমন্বয় ঘটলে বাংলাদেশ অচিরেই এশিয়ার অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হবে। আধুনিকায়নের এই হাত ধরেই পর্যটন খাত হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতির নতুন ‘গেম চেঞ্জার’।
পর্যটনে বিনিয়োগে আস্থা
মো. তারিক মাহমুদদেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে কক্সবাজারে বিশ্বমানের আতিথেয়তা ও নিরাপদ বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে চায় ‘ছুটি রিসোর্ট কক্সবাজার’। আমাদের মূল লক্ষ্য কেবল আবাসন নয়, বরং ছুটি মানেই প্রিয় আপনজন—এই
দর্শন সামনে রেখে একটি মানসম্মত ও পরিবারবান্ধব পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলা।
কক্সবাজারের মতো প্রতিযোগিতামূলক বাজারে স্থায়িত্ব ও গুণগত মান নিশ্চিত করতে রিসোর্টটির নির্মাণকাজ পরিচালনা করছে অভিজ্ঞ চীনা প্রতিষ্ঠান। পর্যটন খাতে বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আধুনিক নির্মাণশৈলী, পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও অতিথিদের নিরাপত্তাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার দিচ্ছি। আমরা এমন একটি সম্পদ তৈরি করতে চেয়েছি, যা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের পর্যটন ও বিনিয়োগকারী উভয় পক্ষের জন্যই লাভজনক হবে।
আতিথেয়তায় স্বকীয়তা বজায় রাখতে ‘ছুটি রিসোর্ট কক্সবাজার’ দক্ষ জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সেবার ওপর জোর দিচ্ছে। বিশেষ করে, নির্ধারিত সময়ে ভিলা-১–এর নির্মাণকাজ শেষ করে শেয়ার ওনারদের সাফকবলা রেজিস্ট্রেশন বুঝিয়ে দিয়ে ব্যবসায়িক স্বচ্ছতার নজির স্থাপন করেছি।
দেশের সামগ্রিক পর্যটন পরিবেশের দিক থেকে সড়ক ও বিমান যোগাযোগসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং ওয়ান-স্টপ সার্ভিস নিশ্চিত করলে এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আরও গতিশীল হবে। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে ‘ছুটি গ্রুপ’কে দেশের অন্যতম বিশ্বস্ত হসপিটালিটি ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় কুয়াকাটায় ‘ছুটি ভিলা’র নির্মাণকাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
স্বচ্ছতা, আস্থা ও মানসম্মত সেবা—এই ত্রিমুখী লক্ষ্যেই আগামীর স্মার্ট পর্যটন গড়া ছুটি রিসোর্ট কক্সবাজারের সবচেয়
বড় শক্তি।
● লেখক: মো. তারিক মাহমুদ ,চেয়ারম্যান, ছুটি রিসোর্ট কক্সবাজার।
হোটেলে ব্যয় সাশ্রয়
মো. শাখাওয়াত হোসেনখাদ্য ও পানীয় ব্যবসায় টেকসই প্রবৃদ্ধি কেবল বিক্রি বাড়ানোর ওপর নির্ভর করে না; বরং প্রতিটি ধাপে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও অপচয় রোধের মাধ্যমে মুনাফা সুরক্ষিত রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে ‘সিক্স কন্ট্রোল পয়েন্ট’ মডেলটি বর্তমানে আতিথেয়তা খাতে ব্যয় সাশ্রয় ও ব্যবসায়িক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে কার্যকর। এই মডেল অনুসরণের মাধ্যমে দ্য ওয়েস্টিন ঢাকা, শেরাটন ঢাকা ও হ্যান্সা বছরে প্রায় দুই কোটি টাকা সাশ্রয় করছে।
এই কৌশলের মূলে রয়েছে ছয়টি নিয়ন্ত্রণ বিন্দু—ক্রয় নিয়ন্ত্রণ, ইনভেন্টরি, সঠিক স্থানান্তর, পোরশন নিয়ন্ত্রণ, যথাযথ রান্না ও অপচয় রোধ। ক্রয়পর্যায়ে সঠিক সময়, মান ও সাশ্রয়ী দর নিশ্চিত করাকে প্রথম রক্ষাকবচ হিসেবে ধরা হয়। ইনভেন্টরিতে ‘ফার্স্ট ইন, ফার্স্ট আউট’ পদ্ধতি এবং
সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখা পণ্যের গুণমান ঠিক রাখতে সহায়তা করে।
রান্না ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে ‘পোরশন কন্ট্রোল’ বা খাবারের পরিমাপ নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি গ্রাহকের সন্তুষ্টি না কমিয়েই ব্যবসায়িক মার্জিন রক্ষা করে। এ ছাড়া গেস্ট প্রোফাইল ও চাহিদার পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে ১০ শতাংশ কমবেশি খাবার রান্নার পরিকল্পনা করলে অপচয় উল্লেখযোগ্য হারে কমে।
ব্যয় সংকোচন মানেই নিম্নমানের সেবা নয়, বরং মেনু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে জনপ্রিয় ও লাভজনক খাবারের প্রবর্তন এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য ব্যবহারের ওপর জোর দিতে হবে। এটি আমদানিনির্ভরতা কমায় ও স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
ব্যয় কমিয়ে আনা কোনো একক বিভাগের কাজ নয়; এটি একটি সম্মিলিত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি। ফাইন্যান্স, কিচেন ও সার্ভিস টিমের মধ্যে সঠিক সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে খাদ্য ও পানীয় ব্যবসা আরও টেকসই ও লাভজনক হয়ে উঠবে। এই সুশৃঙ্খল পন্থাই দীর্ঘ মেয়াদে ব্র্যান্ড ইমেজ ও গ্রাহক অভিজ্ঞতাকে উন্নত করবে।
● লেখক: মো. শাখাওয়াত হোসেন, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও), ইউনিক হোটেল ও রিসোর্টস