পা ও হাতের সম্পর্ক
· Prothom Alo

একটা মেয়ে যাচ্ছে ফুটপাত দিয়ে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে। দৃশ্যটা সুন্দর। একটা রিকশা এসে অল্প দূরে থামল। যাত্রী রিকশাওয়ালাকে ১০০ টাকা দেওয়ার পর বাকি টাকা ফেরত দিতে গেলে যাত্রী বলল, ‘রেখে দেন।’ দৃশ্যটা সুন্দর। এক নববধূ গাড়িতে যাচ্ছিল, একটা কিশোর ফুল হাতে দৌড়ে গেল বিক্রি করতে। নববধূ টাকা দিতে গেলে কিশোর না নিয়ে দৌড়ে আবার মিলিয়ে গেল। দৃশ্যটা সুন্দর।
এই তিনটি দৃশ্য এই সকালের শুরুতে ফার্মগেটে দাঁড়িয়ে রোকন দেখল আর মনে মনে বলল—সবই সুন্দর দেখি। কিন্তু আমার কেন ভালো লাগে না?
Visit palladian.co.za for more information.
অল্প দূরে রোকনের ব্যাংক। পাঞ্চ করে বাঁ পা টেনে টেনে নিজের বসার জায়গায় গেল। কম্পিউটার সাইনইনের আগে একবার বাঁ পায়ের আঙুল দেখে নিল—কড়ে আঙুলে ব্যান্ডেজ। দেখে নেয় ওই জায়গাটা আজকাল প্রতিদিন, আসা–যাওয়ার পথে কোনো চোট লাগল কি না। বাসে মিরপুর থেকে যাওয়া–আসা করে। তাই ভয়, কেউ বাসে পা মাড়িয়ে দিতে পারে। রাস্তা পেরোনোর সময় রিকশার চাকা উঠে যেতে পারে। হাঁটার সময় কোথাও অসতর্কভাবে ধাক্কা লাগতে পারে। যদি ও রকম কিছু ঘটে আর রক্ত গলগল করে বেরোতে শুরু করে, তখন কোথায় পাবে ডেটল, নতুন ব্যান্ডেজ। ক্ষত যে একটা হয়েছে, সেটা বাইরে বোঝা না গেলেও রোকন তো স্পষ্টই টের পেয়েছে। ইন্টারনাল হেমারেজ বলে এটাকে। কেউ যদি বেশি ভালোমানুষি দেখিয়ে জানতে চায়, দেখতে চায় কোথায় ক্ষত, সে তো দেখাতেই পারবে না। বাড়তি সতর্কতায় আজ ভারী জুতোটা পরেছে। গুঁতোটুতো লাগলে কিছুটা সামলানো যাবে। বহুদিন বাদে জুতা পরেছে সে। অদ্ভুত লাগছিল। একটু অস্বস্তি, একটু লজ্জাও যেন। প্রায় নতুন, মশ্মশ্ শব্দ হচ্ছিল। বাসার ছোট বারান্দায় বেশ কবার এ–মাথা থেকে ও–মাথা হেঁটেছে।
মাস তিনেক আগের একদিন। ভোরবেলা ঘুমের মধ্যে তার মনে হলো পায়ের আঙুলে কী যেন কামড়েছে। ঘুমের ঘোরে ভেবেছিল মশা। সকালে উঠে সে কথা মনেও ছিল না। কোনো দাগ ছিল না মশা বা অন্য কোনো কিছু কামড়ানোর। দিন পনেরো পর টের পেল পায়ের পাতা ভারী ভারী ঠেকছে। থপথপ করছে হাঁটার সময়। ডাক্তার দেখিয়েছিল। ডাক্তার বলেছিল পা কাটতে। কেন এমন হয়েছে? ডাক্তার বলেছিল, পিটেড কেরাটোলাইসিস। ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের কারণে হয়। খুব দ্রুত বোঝা যায় না। মানুষ কি আর প্রতিদিন নিজের পা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে? প্রথমে পায়ে ছোট ছোট গর্তের মতো হয়, যা দুরবিন লাগিয়ে দেখা যাবে না। ডাক্তার বলেছিল, ঘাম ও অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে পায়ের ওপর চাপ পড়লে এটি হয়। রোকন তো হাঁটে প্রতিদিন। একসময় হেঁটেই আসত মিরপুর থেকে ফার্মগেট বাসভাড়া বাঁচাতে। অবশ্য তার শরীর জন্মের পর থেকেই ঘামত বেশি।
আজকাল রাতে রোকনের আরেক সমস্যা দেখা দিয়েছে—ঘুম হয় না। গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায়। চুপচাপ জানালার সামনে এসে দাঁড়ায়। তার শিরদাঁড়া বেয়ে একটা হিমশীতল অনুভূতি নেমে আসে। ব্যাপারটা কাউকে বলেনি এখনো, কিন্তু কিছুদিন ধরে মনে হচ্ছে, এটার জন্যও ডাক্তারের কাছে যাওয়া দরকার। কারণ, অসুখটা দিন দিন বেড়েই চলেছে। সে বুঝতে পারছে না এটা পায়ের অসুখের জন্য হচ্ছে নাকি মনের? আরেক অসুখ সপ্তাহখানেক আগে শুরু হয়েছে—সব সময় এক জিনিসের অন্য রকম গন্ধ পাচ্ছে। যেমন ভাতের মধ্যে বিয়ারের গন্ধ, বইয়ের মধ্যে বোটানিক্যাল গার্ডেনের মাটির গন্ধ, ফুটপাত থেকে কেনা করাতের মধ্যে নারীর চুলের গন্ধ।
রাহেলার গল্পটা ভিন্ন। রাহেলা তার এক কাজিনের বান্ধবী ছিল। দুদিনই দেখা ও আলাপ। প্রথম দিন কাজিনদের বাসায়, লালমাটিয়ায়। দ্বিতীয় দিন ধানমন্ডি ২৭–এ বেঙ্গল গ্যালারিতে। রাহেলাই প্রথম রোকনকে অবাক করে দিয়ে বলেছিল, ‘একধরনের গন্ধ ভাইসা আসতেছে আপনার শরীল থিকা।’ রোকন জানতে চেয়েছিল, ‘কী রকম?’ রাহেলা বলেছিল, ‘দামি সাবানের গন্ধ।’
ছোটবেলা থেকেই রোকন তার বাবা-মা দুজনকে একসঙ্গে খুব কম সময় পেয়েছে। দুজনেই চাকরি করতেন। সে তাঁদের একমাত্র সন্তান। কাজের এক বুয়া ছিল, সে–ই রোকনের দেখাশোনা করত। তার কোনো কিছুর অভাব ছিল না। প্রচুর খেলনা ছিল। বাবা-মা যখনই বাড়ি ফিরতেন, তার পছন্দের চকলেট বা খাবার নিয়ে আসতেন। তবু সারাক্ষণ তার কেমন যেন লাগত। এই কেমন লাগাটা সে এখনো ঠিক বোঝাতে পারবে না কেউ জানতে চাইলে।
রোকন আগামীকাল থেকে মাসখানেকের ছুটিতে যাচ্ছে। আগেই ছুটির আবেদন করেছিল। তবে সে জানে, এক মাস শেষ হওয়ার আগেই সে রিজাইন লেটার পাঠাবে আর তার পাওনা বুঝিয়ে দিতে আবেদন করবে। সেই হিসেবে আজই তার শেষ অফিস।
সকালের শুরুতে গ্রাহকদের ভিড় থাকে। মাসের প্রথম সপ্তাহ। পেনশনজীবীরা বেশি আসেন। এসে কত কথা! আবার ডিপোজিটের গ্রাহকেরাও আসেন। তাঁরা অবশ্য কম কথা বলেন। আজও ভিড়। এসব ভিড়ের ভেতরেই সে হঠাৎ দেখল রাহেলাকে। কত বছর হবে, কে জানে। মাথা-মুখ ওড়না প্যাঁচানো রাহেলার। তবু চিনতে পারল রোকন, মাথাটা অল্প নুইয়ে ফেলল। রাহেলা কার্ড সেকশনের কাউন্টারের দিকে গেল।
জীবন আদতে স্মৃতি সঞ্চয়েরই এক মঞ্চ। ছোট স্মৃতি, মেজ স্মৃতি, বড় স্মৃতি। রোকনের ‘বিস্তর না-পারা’ জীবনের শিক্ষা-অধ্যায় এমনই টেনেটুনে পার করে দেওয়া যে এইচএসসির রেজাল্টের পর দৌড়ে এসে আম্মাকে জড়িয়ে ধরা ছাড়া আর কোনো উজ্জ্বল স্মৃতিই নেই। বাবা-মায়ের মুখ অনুজ্জ্বল করেনি সে, কিন্তু আলোঝলমলে ফলও আনতে পারেনি কখনো। আরও অনেক কিছুর মতো গড়পড়তা অর্জনের একটা জীবন তার। সেই জীবনে রাহেলা এসেছিল। ধূমকেতুর মতো যেনবা। আবার সেভাবেই চলে গেছে।
রাহেলার গল্পটা ভিন্ন। রাহেলা তার এক কাজিনের বান্ধবী ছিল। দুদিনই দেখা ও আলাপ। প্রথম দিন কাজিনদের বাসায়, লালমাটিয়ায়। দ্বিতীয় দিন ধানমন্ডি ২৭–এ বেঙ্গল গ্যালারিতে। রাহেলাই প্রথম রোকনকে অবাক করে দিয়ে বলেছিল, ‘একধরনের গন্ধ ভাইসা আসতেছে আপনার শরীল থিকা।’
রোকন জানতে চেয়েছিল, ‘কী রকম?’ রাহেলা বলেছিল, ‘দামি সাবানের গন্ধ।’
প্রথম পরিচয়ে এমন করে একটা মেয়ে একটা ছেলেকে বলবে—এমনটা রোকনের ভাবনায়ও ছিল না। সে অল্প অপ্রস্তুতই হয়েছিল।
এর কয়েক দিন পর বেঙ্গলে আবার দেখা। রাহেলার সঙ্গে রোকনের কাজিন। রোকনের সঙ্গে দেখা হতেই কাজিন টেনে নিয়ে গেল। শিঙাড়া আর চা খাওয়াল। সে সময় রাহেলা হঠাৎ বলেছিল, ‘আজও গন্ধ পাইতেছি আপনার কাছ থিকা।’
রোকন বলেছিল, ‘সাবানের?’
রাহেলা বলেছিল, ‘নাহ্, আজ পাইতেছি কাঁঠালচাঁপার।’
আর কখনো দেখা হয়নি। মাঝে একদিন কাজিন বলেছিল, রাহেলা স্কলারশিপ নিয়ে মেলবোর্ন চলে গেছে। এটুকুই।
কিন্তু রোকনের মাথায় তত দিনে গন্ধের ব্যাপারটি কেন জানি ঢুকে গিয়েছিল। সে তার শরীরে সাবান বা কাঁঠালচাঁপার গন্ধ পেতে চেয়েছিল। পায়নি।
আজ রাহেলাকে এত বছর পর দেখে অবাক হওয়ার পাশাপাশি রোকনের বলতে ইচ্ছা করছে—‘এখন আমি আমার শরীরে অদ্ভুত সব গন্ধ পাই। আপনি কি আজ কোনো গন্ধ পাইতেছেন, রাহেলা?’
কিন্তু বলা দূরের কথা, রোকন মাথা নুইয়ে নিল। কেন নুইয়ে নিল, সে জানে না।
সন্ধ্যার পরপরই রোকন বাসায় ফিরল।
রোকন নীলক্ষেতের ফুটপাত থেকে অনেক আগে একটা বই কিনে এনেছিল। ফ্যান্টম লিম্ব সিনড্রোমে ভুগছিল সে নভেলের মূল চরিত্রটি। একটা অ্যাকসিডেন্টে সেই চরিত্র পা হারায়। ঘটনাস্থল থেকে এক নারী তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় এমন বাসায়, যেখান থেকে আর বেরোতে পারে না।
রোকনের আজকাল রমিজ স্যারের কথা মনে পড়ে। অঙ্কের শিক্ষক ছিলেন উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময়। এই যেমন এখন বিছানায় শুয়ে আছে সে, ডান পা–টা দেয়ালে লাগানো। এটা তার একধরনের আয়েশ। কিন্তু বাঁ পা বিছানায়। তো, রহিমা খালা, যে সন্ধ্যার পর এসে ঘর ঝাড়ু-মোছা আর কাপড় ধোয়ার থাকলে করে যায়, সে বাঁ পায়ে সালাম করল। সালাম করতেই রোকন ভয়ে কেঁপে উঠল। ‘কেন করতেছ খালা?’ জানতে চাইলে বলল, ‘ঝাড় দিতে গিয়া ঝাড়ু লাগছে। তাই হাত দিয়া মাফ চায়া নিলাম।’ রোকন উঠে বসে চুপচাপ দেখে আঙুলের ব্যান্ডেজ ঠিক আছে তো! আর তখনই রমিজ স্যারের কথা মনে পড়ে। একদিন সালাম করতে গেলে তিনি বলেছিলেন, ‘দেখো, মানুষ পায়ে কেন হাত দিয়ে সালাম করে জানো?’
রোকন নিরুত্তর। রমিজ স্যার বলেন, ‘পা গুরুত্বপূর্ণ অংশ শরীরের, সে জন্য করে। পা এমন একটা ব্যাপার, যেটি সম্মান ও শ্রদ্ধা করারও প্রতীক, যেমন তুমি আমায় করলা। আবার পা ধরো অধীনতাও দেয়। যেমন, দেখো নাই, ভৃত্যরা মনিবের পায়ের কাছে বসে থাকে? অথচ দেখো, পা ছাড়া দাঁড়ানোই সম্ভব না। আর না দাঁড়ালে একটা মানুষ কোথাও যাবে কীভাবে? সে গাছের মতো হয়ে যাবে। অথচ দেখো, পায়ে পা লাগলে মানুষ সরিও বলে। হাতে হাত লাগলে কিন্তু বলে না। ব্যাপারটা অদ্ভুত না?’
রোকন যে সেদিন সব বুঝেছিল এমন না, পরে যত বড় হয়েছে, তত কথাটা তার ভালো লেগেছে। আর এখন তো তার মনে হয় কোথাও সে যেতে পারবে না আর। রাহেলাকে দেখে নিজেকে মনে হয়েছিল, নতজানু কাঁঠালচাঁপার গাছ। আচ্ছা এ পা–কে শরীরের একটা বহিরাগত অংশ ভাবলে কেমন হয়? রোকন নীলক্ষেতের ফুটপাত থেকে অনেক আগে একটা বই কিনে এনেছিল। ফ্যান্টম লিম্ব সিনড্রোমে ভুগছিল সে নভেলের মূল চরিত্রটি। একটা অ্যাকসিডেন্টে সেই চরিত্র পা হারায়। ঘটনাস্থল থেকে এক নারী তাকে উদ্ধার করে নিয়ে যায় এমন বাসায়, যেখান থেকে আর বেরোতে পারে না। তখন সেই চরিত্রের মনে হয় পা–টা তার শরীরে বহিরাগত। সে সময়ই রোকন ফ্যান্টম লিম্ব সিনড্রম কী জিনিস বোঝে। মস্তিষ্ক কীভাবে শরীরের মানচিত্র তৈরি করে, মানুষের মস্তিষ্ক কীভাবে তার শরীরকে গাছ বানায় বা একটা পা, একটা হাত, একটা মুখকে পর্যন্ত শরীর থেকে নাই করে দেয়, উফফ, কী ভয়ংকর সব মানসিক জগৎ!
আগেই টিকিট কাটা ছিল রাতের বাসের। বাসার পাশেই বাস কাউন্টার। রাতের খাবার খেয়ে রওনা দিল রোকন। জানালার পাশে সিট। প্রথম সারির পরই। পায়ের কথা ভেবে রোকন দুই সিটের টিকিটই কিনেছে। বান্দরবান পৌঁছাতে পৌঁছাতে সম্ভবত সকাল সাতটা–আটটা বাজবে।
বাস ঠিক সময়েই ছেড়েছে। ঘুমিয়ে পড়েছিল। হঠাৎ বাসের কন্ট্রাক্টরের কথায় ঘুম ভাঙল। যাত্রাবিরতি। ২০ মিনিটের। রাতের খাবারের।
রোকন নামেনি। হঠাৎ তার মনে হলো, বাঁ পা–টা অবশ অবশ লাগছে। সে সিট থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল পায়ের শক্তি পরীক্ষা করার জন্য। না, পারল না। সে দুহাতে ভর দিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল আবার। ব্যর্থ হলো। ডান হাত দিয়ে বাঁ পায়ের গোড়ালিতে একটু চুলকিয়ে পরখ করল। না, কোনো অনুভূতি টের পাচ্ছে না। এসি যদিও চলছে, তবু রোকন একধরনের ভয় পেয়ে ঘামতে শুরু করল। ঘামার সঙ্গে সঙ্গে তার মনে হলো, ঘাম থেকেই তো তার এই রোগটা হয়েছে—ডাক্তার এমন কিছুই বলেছিল।
তাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সে তখন তার কাজিনকে বলে, ‘কাঁঠালচাঁপার গন্ধ পাচ্ছি।’ তখন তার কাজিন বলে, ‘ও তো রাহেলা সিনড্রোম। রাহেলা পেত। অস্ট্রেলিয়া থাকার সময়ও বহু ডাক্তার দেখিয়েছে। কাজ হয়নি। বিভিন্ন ঘ্রাণ পায়।’ রোকনকে অ্যানেসথেসিয়া করার পর সে অন্য জগতে যখন ডুবে যাচ্ছিল, তখন রাহেলার মুখ ভাসছিল।
কী আশ্চর্য, সে ঘামের গন্ধ পেতে শুরু করল। ঘামের গন্ধ কি কখনো কাঁঠালচাঁপার মতো হয়? কিন্তু সে তো ও রকমই পাচ্ছে। তার মনে হলো যেন একটা কাঁঠালচাঁপাগাছ বাসের সিটে বসে আছে। আসলে বেশ কিছুদিন ধরেই রোকনের মনে হচ্ছে, একটা করে ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তারপর স্লাইড শোর মতো আর একটা ছবি তার জায়গা নেয়... আবার হঠাৎ সব কটা ছবি একে অন্যের শরীরে সুপারইম্পোজড হয়ে তৈরি করে একটামাত্র ছবি। মুহূর্তগুলো এলোমেলো মনে পড়ে, আবার মুছে যায়। সব গল্পই একই রকম মনে হয়। জীবন যেন গল্পগুচ্ছ, বা কোনো কিছুই ঘটছে না।
অল্প পরেই যাত্রীরা আবার বাসে উঠলে বাস চলতে শুরু করল। রোকন অন্ধকারে তার বাঁ পায়ের আঙুলে হাত রাখে, চুলকায়, ওই জায়গাটার অবশ ভাব কেটেছে কি না বুঝতে চেষ্টা করে। না, যেন ওই আঙুলই নেই, এমন মনে হয়। এবার ডেটলের ঘ্রাণ।
রোকন যেন একটা দুঃস্বপ্নের ভেতর আর একটা দুঃস্বপ্নে, তার ভেতর আর একটা দুঃস্বপ্নে ঢুকতে ঢুকতে হারিয়ে যাচ্ছে। গুলিয়ে ফেলছে স্বপ্ন আর বাস্তব। ছোটবেলায় যেন একটা লাট্টু ছিল তার। সেটাই বলে দিত সে স্বপ্নে আছে, না বাস্তবে। একটা স্বপ্ন তার এতই পছন্দ হয়েছিল যে লাট্টুটা সে লুকিয়ে রেখেছিল গোপন এক সিন্দুকে। কিন্তু তার হয়তো কোনো স্বপ্নসঙ্গী চুরি করল লাট্টুটা। তারপর সে বাস্তবে ফিরতে চায়। লাট্টুটা চুরি যাওয়ায় রোকন বাস্তবে ফিরেও সেটাকে স্বপ্ন মনে করল। জেগে ওঠার জন্য সে লাফ দিল একটা। নিজেকে একবার চেনে তো আরেকবার চেনে না, বাস্তব কি একটাই? প্যারালাল রিয়েলিটি বলে কি কিছু থাকতে পারে না?
রোকন কেন যাচ্ছে বান্দরবান, সে বুঝে উঠতে পারে না। সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে বান্দরবান পৌঁছায় বাস। রোকন দেখে যাত্রীরা নামছে। সে বসে থাকে। নামতে পারবে কি না, বুঝে উঠতে পারে না।
সে সময়েই হঠাৎ রাহেলার কণ্ঠস্বর শুনতে পায়, ‘আরে, আপনে?’
রাহেলা পেছনের দিকে কোনো সিটে ছিল তার স্বামীসহ। পাশে এসে দাঁড়ায়। পেছনে তার স্বামী। ‘কেমন আছেন?’
রোকন হয়তো বলত না, কিন্তু নিরুপায় সে, তাই বলেই ফেলে, ‘পায়ে সমস্যা হইতেছে। একটু হেল্প করবেন? হাতটা ধরবেন?’
রাহেলা ‘কী বলেন, কী হইছে’ বলে হাত ধরে, তারপর তার স্বামীর সাহায্যে তারা রোকনকে নিচে নামায়।
রোকন টের পায় তার পা কাজ করছে না। কিন্তু সে কেন তাদের হাত ধরে রেখে বেকায়দায় ফেলবে, আনন্দ নষ্ট করবে? তাই যাত্রীছাউনির একটা রড ধরে কোনোমতে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলে, ‘ঠিক হয়া যাইতেছে, যান, থ্যাংকস ফর দ্য হেল্প।’
রাহেলা কী ভেবে স্বামীর দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলে, ‘এই উনিই হচ্ছেন কাঁঠালচাঁপা, তোমাকে যার কথা বলেছিলাম।’
তারপর তারা চলে যাচ্ছে, আর রোকন খেয়াল করে সে ধীরে ধীরে বসে পড়ছে। দাঁড়ানোর উপায় নেই। হাওয়ায় ভেসে আসছে অনেক অনেক কাঁঠালচাঁপার গন্ধ।
এর মাসখানেকের ভেতরই খালা, ফুপিদের জোরজবরদস্তিতে রোকনকে পা কেটে ফেলতে হয়।
তাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। সে তখন তার কাজিনকে বলে, ‘কাঁঠালচাঁপার গন্ধ পাচ্ছি।’
তখন তার কাজিন বলে, ‘ও তো রাহেলা সিনড্রোম। রাহেলা পেত। অস্ট্রেলিয়া থাকার সময়ও বহু ডাক্তার দেখিয়েছে। কাজ হয়নি। বিভিন্ন ঘ্রাণ পায়।’
রোকনকে অ্যানেসথেসিয়া করার পর সে অন্য জগতে যখন ডুবে যাচ্ছিল, তখন রাহেলার মুখ ভাসছিল।